সমসাময়িক ভারতীয় চিন্তাধারা প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন

Table of Contents

সমসাময়িক ভারতীয় চিন্তাধারা প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ, স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগ ও মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা | Samosamoyik Varotiyo Cintadhara Queastion Answer | Class 12 4th Semester Philosophy

সমসাময়িক ভারতীয় চিন্তাধারা প্রশ্ন উত্তর
সমসাময়িক ভারতীয় চিন্তাধারা প্রশ্ন উত্তর

সমসাময়িক ভারতীয় চিন্তাধারা রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর (মান ৬)

১। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ: মানবতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং সকল মানুষের মধ্যে আত্মিক সংযোগের ধারণার উপর ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ গড়ে উঠেছে। তাঁর মানবতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

১. সমান মর্যাদা ও অধিকার: রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানবতাবাদী চিন্তায় সকল মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। তিনি সমগ্র মানবজাতিকে এক অখণ্ড সত্তা হিসেবে দেখেছেন।

২. মানবপ্রেম ও সহানুভূতি: মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদের মূল ভিত্তি। তিনি তাঁর রচনায় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, আন্তরিকতা এবং অন্তর্নিহিত মানবিক অনুভূতিগুলিকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

৩. সৃজনশীলতা: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, মানুষ একটি সৃজনশীল জীব। সৃজনশীলতার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশ করে এবং পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তোলে। তাই তিনি কর্ম ও সেবার মাধ্যমে মানবতাবাদকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

৪. আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ: রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি মনে করতেন, মানুষের মধ্যে এক ধরনের দেবত্ব রয়েছে, যা তাকে বিশ্বজগতের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

৫. বিশ্বমানবতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ: রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে প্রসারিত হয়েছিল। তিনি সকল মানুষের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

২। মানবসত্তার অসীম দিকটিকে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর The Religion of Man গ্রন্থে মানবপ্রকৃতির দুটি দিকের কথা বলেছেন। একটি হল মানুষের সসীম বা সীমাবদ্ধ দিক এবং অপরটি হল মানুষের অসীম দিক। তিনি মানুষের এই অসীম দিকটিকে কখনও ‘বিশ্বপ্রকৃতি’ আবার কখনও ‘মানুষের মধ্যে উদ্বৃত্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন।

মানবসত্তার অসীম দিক: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানবজীবন একদিকে সীমাবদ্ধ হলেও অন্যদিকে অসীম ও অনন্ত। মানুষের অন্তরে এক অবিনশ্বর আত্মা রয়েছে, যা পরমাত্মা বা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হতে চায়। মানবসত্তার অসীম দিকের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

১. প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ: মানুষের মধ্যে অসীম সত্তা রয়েছে বলেই সে প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। জৈবিক চাহিদার বন্ধন অতিক্রম করে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে চায়। প্রকৃতি প্রতিকূল হলেও মানুষ তাকে ভালোবাসে।

২. স্বাধীনতা: রবীন্দ্রনাথের মতে, স্বাধীনতা মানবসত্তার অসীম দিকের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। দৈহিক কারণে মানুষ অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে এই স্বাধীনতা খাঁচার স্বাধীনতার মতো। প্রকৃত স্বাধীনতা হল আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা, যা মানুষের মধ্যে একত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।

৩. অমরতার আকাঙ্ক্ষা: মানুষের অসীম সত্তার কারণেই তার মধ্যে অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। অসীম চেতনা মানুষকে অমরত্বের দিকে চালিত করে এবং সমগ্র জগৎকে আপন করে নিতে সাহায্য করে।

৪. উচ্চতর লক্ষ্য: মানুষের অসীম সত্তা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে চায়। এই প্রচেষ্টায় মানুষ বারবার ব্যর্থ হলেও পুনরায় উদ্যমী হয়। এই নিরন্তর প্রচেষ্টাই তাকে উচ্চতর লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

৫. জীবনদেবতা: রবীন্দ্রনাথ মানুষের অসীম সত্তাকে ‘জীবনদেবতা’ নামে অভিহিত করেছেন। জীবনদেবতা হল মানুষের অন্তর্নিহিত দেবসত্তা, যা মানুষের ক্ষুদ্র ‘আমি’-কে অতিক্রম করে আনন্দের উপলব্ধি ঘটায়। এই অসীম সত্তাই মানুষকে ঈশ্বরের সদৃশ করে তোলে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের মধ্যে নিহিত অসীম চেতনা তাকে সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আত্মোপলব্ধি ও উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর সাহিত্য ও দর্শনে মানবসত্তার এই অসীমতার ধারণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।

৩। মানবতাবাদ কী? রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিশ্বমানবতাবাদের তাৎপর্য উল্লেখ করো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শনচিন্তার সমস্ত ক্ষেত্রে মানবিক বিশ্বাসের ছাপ লক্ষ করা যায়। তিনি তাঁর The Religion of Man গ্রন্থে মানবতাবাদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। মানবতাবাদ হল এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা মানুষের মর্যাদা, মূল্যবোধ ও স্বাধীনতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়।

মানবতাবাদের সংজ্ঞা: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানবসমাজের সর্বাঙ্গীণ বিকাশসাধনের প্রতি ব্যক্তিমানুষের যে দায়বদ্ধতা, তাই হল মানবতাবাদ। মানবতাবাদের মূল কথা হল মানবতার জয়গান, যা সকল মানুষকে একই সূত্রে গ্রথিত করে। মানুষের মনের মধ্যে থাকা দয়া-মায়া, প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার মতো মানবিক গুণগুলিকে মনুষ্যত্ব বা মানবতা বলা হয়। এই মানবতা সম্পর্কিত মতবাদই হল মানবতাবাদ।

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিশ্বমানবতাবাদ: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, মানুষ কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতি বা সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং সে সমগ্র বিশ্বমানবের অংশ। তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্বমানবতাবাদের তাৎপর্যগুলি হল—

১. মানবসত্তার দুটি দিক: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা রয়েছে—ব্যক্তিমানব ও বিশ্বমানব। মানুষের একদিকে রয়েছে ‘জীবসত্তা’ এবং অন্যদিকে রয়েছে ‘বিশ্বসত্তা’। মানুষ একদিকে ব্যক্তিরূপে স্বতন্ত্র, আবার অন্যদিকে বিশ্বমানব বা বিরাট পুরুষের অংশ হিসেবে সমগ্র বিশ্বের মানুষের সঙ্গে একাত্ম। ব্যক্তিমানব নিজের স্বার্থ অনুযায়ী কর্তব্য নির্ধারণ করে। কিন্তু মানুষের মধ্যে এমন একটি সত্তাও রয়েছে, যা ব্যক্তিস্বার্থকে অতিক্রম করে সর্বজনীন কল্যাণ, সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় তাকে অনুপ্রাণিত করে। রবীন্দ্রনাথ এই সত্তাকে বিশ্বমানব, মহামানব ও সনাতন মানব প্রভৃতি নামে অভিহিত করেছেন।

২. বিশ্বমানবের সাধনাই মানবতাবাদের লক্ষ্য: রবীন্দ্রনাথের মতে, বৃহৎ মানুষের সাধনাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সাধনা। বিশ্বমানবের উপলব্ধির মাধ্যমে অসংখ্য বিচিত্র মানুষের মধ্যে ঐক্যবোধ জাগ্রত হয়। এই ঐক্যবোধের ফলে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে এসে ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে অপরের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হয়।

❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন

  • ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
  • ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
  • ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
  • ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
  • ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
⭐ এতসব সুবিধা পাবেন মাত্র ২৫ টাকার বিনিময়ে। আমাদের মূল লক্ষ্য শুধু সাজেশন বিক্রি করা নয়; বরং ছাত্রছাত্রীদের উপকৃত করা, তাদের ভালো ফলাফল করতে সাহায্য করা এবং সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে সাফল্যের পথে এগিয়ে দেওয়া।

৩. বিশ্বমানবের স্বরূপ: মানবতার উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জন করে এবং নিজের সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে অখণ্ড অসীমের দিকে এগিয়ে যায়। তখন সে নিজের সম্পর্কে ‘সোহহম্’ অর্থাৎ ‘আমিই সেই’ বলে উপলব্ধি করে। এখানে ‘সেই’ বলতে বিশ্বমানবকে বোঝানো হয়েছে। এই উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ সংকীর্ণতার গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বমৈত্রীর পথে এগিয়ে যায় এবং বিরোধ ও দুঃখের মধ্যেও পরম সুখের সন্ধান পায়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের মতে, বিশ্বমানবের সঙ্গে প্রেম ও সেবার বন্ধনে মিলিত হওয়াই ঈশ্বরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম মিলন। তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত মহামানবকে ঈশ্বররূপে গণ্য করেছেন এবং বিশ্বমানবের সেবাকেই ঈশ্বরসেবা বলে মনে করেছেন।

৪। বিবেকানন্দ কীভাবে কর্মযোগের অনুশীলনের মাধ্যমে মুক্তি লাভের কথা বলেছেন?

জগতে সুখ ও দুঃখের ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। সুখ ও দুঃখ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই দুইয়ের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে পারলে মানুষ মোক্ষলাভের পথে অগ্রসর হতে পারে। এই মোক্ষলাভ বা মুক্তিই হল কর্মযোগের আদর্শ। নিষ্কাম কর্মে অহংবোধ ও চিত্তের চাঞ্চল্য থাকে না। তাই নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপাসনা করাই ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের মুক্তির পথ। স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের লক্ষ্যও হল এই মুক্তিলাভ।

মুক্তিলাভের পথ: স্বামী বিবেকানন্দের মতে, মানবজীবনের চরম লক্ষ্য হল মুক্তি। মুক্তিলাভের দুটি পথ রয়েছে। যথা—

  1. প্রবৃত্তিমার্গ: এই পথে মানুষ প্রথমে ‘ইতি ইতি’ অর্থাৎ সবকিছুকে গ্রহণ করে এবং পরে তা ত্যাগ করতে শেখে।
  2. নিবৃত্তিমার্গ: এই পথে মানুষ ‘নেতি নেতি’ অর্থাৎ সবকিছুকে ত্যাগ করার মাধ্যমে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। মহাপুরুষেরা সাধারণত নিবৃত্তিমার্গকে মুক্তির পথ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রবৃত্তিমার্গ অনুসরণ করেন।

১. অনাসক্ত কর্মই মুক্তির পথ: গীতায় বলা হয়েছে, মানুষকে নিরন্তর কর্ম করে যেতে হবে, কিন্তু কর্মের প্রতি আসক্ত হওয়া চলবে না। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, জীব যদি নিজের সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরকে সমর্পণ করে অনাসক্তভাবে কর্ম করে, তাহলে সে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয় না। তিনি সমাজ ও সংসবের প্রতি উদাসীন হয়ে বৈরাগ্য অবলম্বনের মাধ্যমে মুক্তিলাভের কথা বলেননি। বরং সংসারে থেকেই অনাসক্তভাবে কর্ম করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

২. ঈশ্বরের কাছে সমস্ত কর্মফল সমর্পণ: বিবেকানন্দের মতে, মানুষকে নিজের সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করে কর্ম করতে হবে। কর্ম করার সময় মনে রাখতে হবে, সে কেবল নিজের ইচ্ছায় কর্ম করছে না; বরং ঈশ্বরের ইচ্ছায় তাঁরই কর্ম সম্পাদন করছে। অর্থাৎ, ঈশ্বরের ইচ্ছাই জীবের কর্মের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তাই নিষ্কাম কর্ম কামনাশূন্য হলেও উদ্দেশ্যহীন নয়, কারণ এই কর্ম ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই সম্পাদিত হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, স্বামী বিবেকানন্দের মতে, নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমেই মোক্ষলাভ সম্ভব। জগতের সকলের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে হলে কর্মফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে। কর্মফলের কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে কর্তব্য পালনের জন্য যে কর্ম করা হয়, তাই প্রকৃত সৎকর্ম। গীতার কর্মযোগেও এই ধরনের নিষ্কাম কর্মের উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

৫। স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের আদর্শ কী, তা আলোচনা করো।

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগ গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়ে কর্মযোগের আদর্শ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। স্বামীজির মতে, নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে অহংবোধ ত্যাগ করে পরের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করাই হল কর্মযোগ। তিনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বর্ণিত কর্মযোগ ও নিষ্কাম কর্মের ধারণা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর কর্মযোগের প্রধান আদর্শগুলি হল—

১. কর্মের মূল্য ও নিঃস্বার্থপরতা: স্বামী বিবেকানন্দ কর্মযোগের ক্ষেত্রে কর্মের মূল্য ও গুরুত্ব এবং নিঃস্বার্থপরতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, মুক্তিলাভের জন্য প্রথমেই স্বার্থপরতার বন্ধন ছিন্ন করতে হবে। নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মুক্তিলাভ করাই কর্মযোগের আদর্শ।

২. মানুষের পরম লক্ষ্যপ্রাপ্তি: স্বামীজির মতে, কর্মযোগ হল নৈতিকতা ও ধর্মের এমন একটি যোগসূত্র, যা পরের উপকার এবং শুভকর্মের মাধ্যমে মানুষকে মোক্ষলাভে সাহায্য করে। তাই নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে জীবনের পরম লক্ষ্য বা মোক্ষলাভ করাই কর্মযোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

৩. কর্মই ধর্ম: স্বামী বিবেকানন্দ মনে করতেন, কর্মই মানুষের ধর্ম। প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের কর্মকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তা সম্পাদন করা। তাঁর মতে, যেসব কর্ম মানুষকে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেগুলিই সৎকর্ম। এই সৎকর্মগুলিই মানুষের কর্তব্যকর্ম।

৪. গীতার নিষ্কাম কর্ম: স্বামী বিবেকানন্দ গীতায় বর্ণিত নিষ্কাম কর্মযোগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। গীতায় বলা হয়েছে, মানুষের অধিকার কেবল কর্মে, কর্মফলে নয়। তাই কর্মযোগীকে কর্মফলের আশা ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে কর্ম করতে হবে এবং নিজেকে কর্মের নিমিত্তমাত্র কর্তা হিসেবে ভাবতে হবে।

৫. জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়: স্বামী বিবেকানন্দের মতে, কর্মযোগ শুধু কর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়ও প্রয়োজন। জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং ভক্তি মানুষের মনে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে কর্মযোগ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের মূল আদর্শ হল নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্য পালন, কর্মফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ এবং পরের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। তাঁর এই আদর্শ মানুষকে নৈতিক জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে এবং ব্যক্তিগত মুক্তিলাভের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণসাধনে সাহায্য করে।

৬। সকাম ও নিষ্কাম কর্মের মধ্যে প্রভেদ করো।

ভারতীয় দর্শনে কর্মকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা— সকাম কর্ম ও নিষ্কাম কর্ম। যে কর্মের সঙ্গে ফললাভের কামনা যুক্ত থাকে, তাকে সকাম কর্ম বলে। অন্যদিকে, যে কর্মের সঙ্গে ফললাভের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত থাকে না, তাকে নিষ্কাম কর্ম বলে। সকাম ও নিষ্কাম কর্মের মধ্যে পার্থক্যগুলি হল—

HS Class 12

সেমিস্টার প্রস্তুতি

WhatsApp গ্রুপ

বিষয়

সকাম কর্ম

নিষ্কাম কর্ম

১. ফললাভের বাসনা সকাম কর্মে ফললাভের বাসনা থাকে। নিষ্কাম কর্মে ফললাভের বাসনা থাকে না।
২. জন্মগ্রহণের প্রবণতা ফলভোগের জন্য জীবকে বারবার জন্মগ্রহণ করতে হয়। ফলাকাঙ্ক্ষা না থাকায় ফলভোগের জন্য জীবকে বারবার জন্মগ্রহণ করতে হয় না।
৩. আবেগের গুরুত্ব রাগ, দ্বেষ ও মোহের বশবর্তী হয়ে সকাম কর্ম করা হয়। রাগ, দ্বেষ ও মোহমুক্ত হয়ে নিষ্কাম কর্ম করা হয়।
৪. উদ্দেশ্যের চরিতার্থতা বিশেষ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য সকাম কর্ম সম্পাদিত হয়। ফলের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই নিষ্কাম কর্ম সম্পাদিত হয়।
৫. কর্মবাদের প্রভাব সকাম কর্ম কর্মবাদের অধীন। নিষ্কাম কর্ম কর্মবাদের অধীন নয়।
৬. বিষয়ের প্রতি আসক্তি সকাম কর্ম বিষয়ের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে। নিষ্কাম কর্মে বিষয়ের প্রতি আসক্তি থাকে না।
৭. কর্মনিয়মের গুরুত্ব সকাম কর্মের ক্ষেত্রে কর্মনিয়ম প্রযোজ্য হয়। নিষ্কাম কর্মের ক্ষেত্রে কর্মনিয়ম প্রযোজ্য হয় না।
৮. বন্ধনের প্রভাব সকাম কর্মে বন্ধনের গভীর প্রভাব থাকে। নিষ্কাম কর্মে বন্ধনের কোনো প্রভাব থাকে না।
৯. মোক্ষের গুরুত্ব সকাম কর্মের মাধ্যমে মোক্ষলাভ সম্ভব হয় না। নিষ্কাম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে মোক্ষলাভ সম্ভব হয়।
১০. সার্বিক মঙ্গল সকাম কর্মের মাধ্যমে জগতের মঙ্গল সাধিত হয় না। নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে জগতের মঙ্গল সাধিত হয়।

৭। কর্মযোগ বলতে কী বোঝায়? বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগের ভাবনায় নিষ্কাম কর্মের স্বরূপ কীভাবে নির্দেশ করেছেন?

কর্মযোগ: স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনে কর্মযোগ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। ‘কর্ম’ বলতে সাধারণভাবে কাজ করাকে বোঝায়। বিবেকানন্দের মতে, শরীর, ইন্দ্রিয় ও মনের যাবতীয় ক্রিয়াই হল কর্ম। এই কর্ম যখন মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে নিষ্কামভাবে সম্পাদিত হয়, তখন তাকে কর্মযোগ বলে। তাঁর মতে, সুচিন্তিত, সুনিয়ন্ত্রিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে কর্ম সম্পাদন করাই কর্মযোগ। লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয় ও সুখ-দুঃখকে সমান মনে করে কর্ম করা এবং কর্মের মাধ্যমে চিত্তশুদ্ধি সাধন করাই কর্মযোগের মূল লক্ষ্য।

নিষ্কাম কর্মের স্বরূপ: গীতায় কর্মকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—সকাম কর্ম ও নিষ্কাম কর্ম। রাগ, দ্বেষ, মোহ ও কামনা-বাসনাযুক্ত কর্ম হল সকাম কর্ম। অন্যদিকে, রাগ, দ্বেষ, কামনা-বাসনা, কর্তৃত্বাভিমান ও অহংবোধ থেকে মুক্ত কর্ম হল নিষ্কাম কর্ম। বিবেকানন্দ গীতার নিষ্কাম কর্মের ধারণাকে গ্রহণ করে তাঁর কর্মযোগের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। নিষ্কাম কর্মের স্বরূপগুলি হল—

১. নিষ্কাম কর্মের অর্থ: গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, মানুষের অধিকার কেবল কর্মে, কর্মফলে নয়। তাই কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা না করে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। একইভাবে, কর্ম থেকে বিরত থাকাও উচিত নয়। বিবেকানন্দের মতে, মানুষের কর্মের জন্যই কর্ম করা উচিত। কর্ম করা মানুষের অধিকার, তাই ফলের আশা ত্যাগ করে কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে।

২. ফলের আসক্তি ত্যাগ: বিবেকানন্দের মতে, কর্মফলের প্রতি আসক্তিই মানুষের দুঃখের অন্যতম কারণ। মানুষ ফলের আশা নিয়ে কর্ম করলে প্রত্যাশা পূরণ না হলে হতাশ ও দুঃখিত হয়। তাই সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে উঠে নিষ্কামভাবে কর্ম করা উচিত। নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মানুষ কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে।

৩. নিষ্কাম কর্মের সুফল: নিষ্কাম কর্মে কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা থাকে না বলে তা মানুষের মনে মানসিক শান্তি আনে। ফলের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ কর্মে অধিক মনোযোগ দিতে পারে। এই কর্ম মুক্তিকামী ব্যক্তির মোক্ষলাভেও সহায়তা করে।

৪. নিষ্কাম কর্মের ব্যবহারিক প্রয়োগ: স্বামী বিবেকানন্দ নিষ্কাম কর্মকে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি নিঃস্বার্থভাবে সমাজের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ এবং মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নিষ্কাম কর্মের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই মানুষ নিজের জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, স্বামী বিবেকানন্দের মতে, নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মোক্ষলাভ সম্ভব। জগতের সকলের মঙ্গলের জন্য কর্ম করতে হলে কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে। ফলের কামনা পরিত্যাগ করে কর্তব্য পালনের জন্য যে কর্ম করা হয়, তাই প্রকৃত সৎকর্ম। গীতার কর্মযোগেও এই নিষ্কাম কর্মের আদর্শের উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

৮। স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের ধারণা ব্যাখ্যা করো। অথবা, স্বামী বিবেকানন্দ কীভাবে গীতার ‘কর্মযোগ’ তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেছেন, তা আলোচনা করো।

কর্মযোগ শব্দটি ‘কর্ম’ ও ‘যোগ’-এর সমন্বয়ে গঠিত। ‘কৃ’ ধাতুর অর্থ কিছু করা। তাই কর্ম বলতে কাজ করাকে বোঝায়। ‘যোগ’ শব্দের অর্থ হল শৃঙ্খলাবদ্ধ পথ। সুতরাং, শৃঙ্খলাবদ্ধ পথে কর্ম সম্পাদন করাই হল কর্মযোগ।

কর্মযোগের মূলকথা: স্বামী বিবেকানন্দ গীতায় বর্ণিত কর্মযোগের মূল বক্তব্যকে তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। যথা— ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জন, কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ এবং সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ।

নিষ্কাম কর্মসাধন: গীতার কর্মযোগের মূল ভিত্তি হল নিষ্কাম কর্ম। যে কর্মের সঙ্গে ফলপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা যুক্ত থাকে না, তাকে নিষ্কাম কর্ম বলে। অর্থাৎ, কামনাবিহীন কর্মই হল নিষ্কাম কর্ম। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগের ব্যাখ্যায় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই নিষ্কাম কর্মের ধারণাকে গ্রহণ করেছেন।

কর্মযোগের স্বরূপ: স্বামীজির মতে, সুচিন্তিত, সুনিয়ন্ত্রিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে কর্ম সম্পাদন করাই হল কর্মযোগ। এই কর্ম মানুষকে ঈশ্বরের দিকে পরিচালিত করে এবং কর্মের মাধ্যমে চিত্তশুদ্ধি ঘটায়। কর্মযোগের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

১. কর্মের গুরুত্ব ও নিঃস্বার্থপরতা: বিবেকানন্দের মতে, যে নীতি ও ধর্মের সাহায্যে হিতকর ও স্বার্থহীন কর্মের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা যায়, তাই কর্মযোগ। কর্মযোগী নিঃস্বার্থপরতার আদর্শ উপলব্ধি করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন। তাই তাঁর কর্মযোগে কর্মের গুরুত্ব ও নিঃস্বার্থপরতার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

২. কর্মযোগের আদর্শ: বিবেকানন্দের মতে, যশ বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই যে কর্ম করা হয়, তা সর্বোত্তম কর্ম। যিনি এইভাবে কর্ম করতে পারেন, তিনি বুদ্ধের মতো মহৎ আদর্শের পরিচয় দেন। তাঁর কর্মের মাধ্যমে জগতের পরিবর্তন সাধিত হতে পারে। এভাবেই ব্যক্তি কর্মযোগের সর্বোচ্চ আদর্শকে তুলে ধরতে পারেন।

৩. ফলাকাঙ্ক্ষাশূন্যতা: স্বামী বিবেকানন্দ গীতার নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। নিষ্কাম কর্মের মূল কথা হল, মানুষকে ফলের আশা ত্যাগ করে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। কর্মফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে কর্ম করাই কর্মযোগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৪. অমরত্বের উপলব্ধি: বিবেকানন্দের মতে, অমরত্ব হল সব ধরনের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া। সবকিছুর মধ্যে একত্বের অনুভূতি উপলব্ধি করাই অমরত্বের প্রকৃত তাৎপর্য। ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ও কামনা-বাসনাই আত্মার বন্ধনের কারণ। তাঁর মতে, কর্মের মাধ্যমেই মানুষ এই বন্ধন অতিক্রম করতে পারে।

৫. মুক্তিই জীবনের লক্ষ্য: কর্মযোগের আদর্শ মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়। বিশুদ্ধ নিষ্কাম কর্মই হল মোক্ষসাধনার উপায়। এই কর্মে অহংবোধ ও চিত্তের চাঞ্চল্য থাকে না। তাই নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপাসনা করাই ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের মুক্তির পথ। এই মুক্তিলাভই হল কর্মযোগের চরম লক্ষ্য।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বেদান্ত দর্শনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বামী বিবেকানন্দ কর্ম ও যোগের সমন্বয়ে কর্মযোগের ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, নিষ্কামভাবে, ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে এবং নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমেই মানুষ মুক্তিলাভের পথে অগ্রসর হতে পারে। কর্মের মাধ্যমেই ব্যক্তির যোগ্যতা ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়।

৯। ‘বিবেকানন্দের কর্মযোগের ধারণার ভিত্তি হল প্রয়োগমূলক বেদান্ত’—ব্যাখ্যা করো। অথবা, স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের ধারণায় কীভাবে প্রয়োগমূলক বেদান্ত প্রতিফলিত হয়েছে?

বেদের অন্ত বা শেষ ভাগকে বেদান্ত বলা হয়। বেদান্তকে ভিত্তি করে যে দর্শনশাস্ত্রের সৃষ্টি হয়েছে, তা হল বেদান্ত দর্শন। ‘বেদান্ত’ শব্দের অর্থ সর্বোত্তম জ্ঞান। বেদান্তের চরম সত্য হল—‘আমিই সেই পরমসত্তা বা ব্রহ্ম’। স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তকে কেবল দার্শনিক তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ না করে জীবনে পালনীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বেদান্তে আলোচিত বিষয়গুলিকে কর্মে রূপ দিতে হবে এবং বেদান্তের আদর্শ অনুসারে জীবনযাপন করতে হবে। তাই বিবেকানন্দের বেদান্তচিন্তাকে ব্যবহারিক বা প্রয়োগমূলক বেদান্ত বলা হয়।

বেদান্তের মূল তত্ত্ব: বেদান্তের মূল বক্তব্য হল, সমস্ত মানুষের মধ্যেই দৈবসত্তা রয়েছে। ‘তত্ত্বমসি’ অর্থাৎ ‘তুমিই সেই’—এই কথাই বেদান্তের সারসত্য। স্বামী বিবেকানন্দ মনে করতেন, প্রতিটি মানুষই ব্রহ্মের অংশ। এই অদ্বৈতবোধ থেকেই তিনি মানুষকে নিঃস্বার্থ কর্মে অনুপ্রাণিত করেছেন। বেদান্তের মূল তত্ত্বগুলি হল—

১. একত্ব: বেদান্তের মূল কথা হল একত্ব। এই বিশ্বে একমাত্র পরমসত্তা ব্রহ্মেরই অস্তিত্ব রয়েছে। সকল মানুষের মধ্যে এই এক সত্তার উপলব্ধি থেকেই পারস্পরিক ঐক্য ও ভালোবাসার জন্ম হয়।

২. অন্তর্নিহিত দেবত্ব: বেদান্ত অনুসারে, জীবাত্মা হল অব্যক্ত ব্রহ্ম। বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যেই সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের প্রকাশ রয়েছে। বিবেকানন্দের মতে, মানুষের অন্তর্নিহিত এই দেবত্বকে উপলব্ধি করাই জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

৩. স্বাধীনতা: বেদান্তে স্বাধীনতার অর্থ হল মুক্তি। আত্মার স্বরূপে অবস্থান করাই প্রকৃত মুক্তি। স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের লক্ষ্যও হল কর্মের মাধ্যমে এই মুক্তি অর্জন করা।

৪. আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা: বেদান্তের মতে, মানুষ যখন নিজের অন্তরাত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং সে আত্মনির্ভর হতে শেখে। বিবেকানন্দও কর্মযোগের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভর করে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষ আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা অর্জন করতে পারে।

৫. কর্মের প্রতি নিষ্ঠা: বেদান্তে বলা হয়েছে, কর্তব্য পালন মানুষকে আত্মিক উন্নতির পথে পরিচালিত করে। বিবেকানন্দের কর্মযোগেও এই আদর্শের প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর মতে, কর্তব্যকর্মে পূর্ণ নিষ্ঠা, প্রেম ও ভালোবাসা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মফলের প্রতি কোনো প্রত্যাশা বা আসক্তি থাকা উচিত নয়। এভাবেই নিষ্কাম কর্ম যথার্থ কর্তব্যকর্মে পরিণত হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বেদান্তে আত্মজ্ঞান অর্জনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগের মাধ্যমে নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থতার সঙ্গে কর্তব্যকর্ম সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, কর্মের মাধ্যমে আত্মজ্ঞান অর্জন করা সম্ভব এবং এই আত্মজ্ঞানই মানুষকে মুক্তির পথে পরিচালিত করে। তাই বলা যায়, বিবেকানন্দের কর্মযোগের ধারণায় প্রয়োগমূলক বেদান্তের আদর্শ সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

১০। মহাত্মা গান্ধির ভাবনায় অহিংসার স্বরূপ আলোচনা করো।

ভারতীয় দর্শনে মহাত্মা গান্ধির চিন্তাধারায় অহিংসার গুরুত্ব অপরিসীম। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অহিংসাই ছিল তাঁর আদর্শ। বেদের বাণী, ভগবান বুদ্ধের চিন্তাধারা এবং ভগবদ্গীতার শিক্ষা গান্ধিজির অহিংসার ধারণাকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর মতে, সত্যের পথে চলতে গেলে অহিংসা অপরিহার্য। তাই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি অহিংসার নীতি গ্রহণ করেন, যা তাঁর সত্যাগ্রহ নীতির মূল ভিত্তি।

১. অহিংসার প্রকৃত অর্থ: গান্ধিজির মতে, জীবন্ত কোনো কিছুকে আঘাত না করা অহিংসার একটি দিক মাত্র। কিন্তু এটিই অহিংসার সম্পূর্ণ অর্থ নয়। অশুভ চিন্তা ও ইচ্ছার দ্বারা, মিথ্যা কথার মাধ্যমে কিংবা হঠকারিতার দ্বারা কাউকে আঘাত না করাও অহিংসার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, নিজের আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে অন্যের প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাশীল মনোভাব পোষণ করাই হল প্রকৃত অহিংসা।

২. হিংসার বিরোধিতা: মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করে গান্ধিজি মনে করেছিলেন যে মানুষ ক্রমশ হিংসা পরিত্যাগ করে অহিংসার দিকে এগিয়ে চলেছে। তাঁর মতে, হিংসার মাধ্যমে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। হিংসা মানুষকে যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং তার মনুষ্যত্বের বিনাশ ঘটায়। তাই স্থায়ী শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য অহিংসার পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন।

৩. ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক হিংসা: গান্ধিজি ব্যক্তিগত হিংসা ও প্রাতিষ্ঠানিক হিংসার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। অন্যকে দমন বা পীড়ন করাকে ব্যক্তিগত হিংসা বলা হয়। অন্যদিকে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব প্রভৃতি কারণে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক হিংসার উদ্ভব হয়। গান্ধিজি উভয় ধরনের হিংসা দূর করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

৪. প্রতিপক্ষের হৃদয় পরিবর্তন: গান্ধিজির মতে, অহিংসার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বিবেকবুদ্ধিকে জাগ্রত করতে হবে। প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা বা প্রতিশোধের মনোভাব না রেখে তার অন্তরশুদ্ধি ঘটাতে হবে। এর ফলে মানুষ পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। এর মধ্য দিয়েই সমাজের সার্বিক কল্যাণ বা সর্বোদয় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

৫. সাম্য ও রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা: গান্ধিজি বিশ্বাস করতেন, অহিংসার আদর্শ অনুসরণ করলে ধনী-দরিদ্র, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য এবং সবল-দুর্বলের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করা সম্ভব। তিনি অহিংসার পথে সাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যেখানে সকল মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবে। তাঁর কল্পিত এই আদর্শ সমাজই ছিল রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মহাত্মা গান্ধির অহিংসার আদর্শ কেবল শারীরিক আঘাত না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সত্য, দয়া, সহানুভূতি, প্রেম ও শ্রদ্ধার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, অহিংসার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে শান্তি, সাম্য এবং সর্বজনীন কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আরো বাড়ুন : মিলের পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান পদ্ধতি প্রশ্ন উত্তর

১১। ‘অহিংসা’ শব্দটি গান্ধিজির দর্শনে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, আলোচনা করো। অথবা, ‘অহিংসা’ শব্দটিকে গান্ধিজি কোন্ কোন্ অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন, আলোচনা করো।

‘অহিংসা’ ধারণাটি মহাত্মা গান্ধির দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। তবে অহিংসার ধারণা গান্ধিজির নিজস্ব উদ্ভাবন নয়; এটি একটি সুপ্রাচীন ধারণা। গান্ধিজি বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অহিংসার আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে লিও টলস্তয়ের লেখা ও বাইবেল থেকেও তিনি অহিংসার ধারণায় অনুপ্রেরণা লাভ করেন। গান্ধি দর্শনে অহিংসা শব্দটি নঞর্থক ও সদর্থক—এই দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

১. অহিংসার নঞর্থক অর্থ: গান্ধিজির মতে, অহিংসা বলতে কোনো জীবকে দৈহিক ও মানসিক আঘাত করা থেকে বিরত থাকাকে বোঝায়। অর্থাৎ, হিংসার সম্পূর্ণ বিপরীত হল অহিংসা। অহিংসার এই নঞর্থক ধারণা তিনি জৈনধর্ম থেকে গ্রহণ করেছিলেন। জৈন দর্শনে যেমন কায়, মন ও বাক্যের মাধ্যমে অহিংস আচরণের কথা বলা হয়েছে, তেমনই গান্ধিজিও সর্বক্ষেত্রে অহিংস আচরণের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে গান্ধিজি জৈন দর্শনের অহিংসার নীতিকে সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করেননি। জৈন দর্শনে অহিংসাকে অনুব্রত ও মহাব্রত—উভয় রূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গান্ধিজি অহিংসার আদর্শে বিশ্বাসী হলেও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে প্রাণীহত্যাকে সমর্থন করেছিলেন।

২. অহিংসার সদর্থক অর্থ: গান্ধিজি অহিংসাকে কেবল হিংসা না করা বা হত্যা থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর মতে, অহিংসার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে হলে এর সঙ্গে করুণা, ভালোবাসা ও প্রেমের ধারণাকে যুক্ত করতে হবে। তিনি অহিংসাকে ভালোবাসার সঙ্গে প্রায় অভিন্ন বলে মনে করেছেন।

গান্ধিজির মতে, হিংসার মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ থাকে। অন্যদিকে, অহিংসার মূল উপাদান হল প্রেম, প্রীতি ও সৌহার্দ্য। অহিংসার মধ্যে কোনো তিক্ততা, স্বার্থপরতা বা অহংবোধ থাকা উচিত নয়। অর্থাৎ, অন্যের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করাই হল অহিংসার সদর্থক রূপ।

৩. সত্যের অনুসরণ ও নির্ভীকতা: গান্ধিজি সদর্থক অর্থে অহিংসাকে সত্যের অনুসরণ ও নির্ভীকতার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, অহিংসা ও সত্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সত্যের পথে চলতে হলে অহিংসার আদর্শ অনুসরণ করা প্রয়োজন। একইভাবে, প্রকৃত অহিংস হতে হলে ভয় ও দুর্বলতা পরিত্যাগ করে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির দর্শনে অহিংসা কেবল অন্যকে আঘাত না করার নীতি নয়; এটি প্রেম, করুণা, সত্য ও নির্ভীকতার সমন্বিত আদর্শ। অহিংসার নঞর্থক ও সদর্থক—উভয় দিকের অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যক্তিজীবন ও সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

১২। অহিংসার বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।

মহাত্মা গান্ধিজি অহিংসাকে অসীম, সর্বশক্তিমান ও ঈশ্বরের প্রতিরূপ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অহিংসাকে তাঁর জীবনের আরাধ্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অহিংসা তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

১. জীবের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ: অহিংসার নীতি সকল জীবের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে সম্মান করতে শেখায়। এই নীতি অনুসারে কোনো জীবের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করা উচিত নয়। সহজ কথায়, কায়, মন ও বাক্যে হিংসা থেকে দূরে থাকাই হল অহিংসা।

২. অহিংসার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ: গান্ধিজি সকলকে অহিংসার আদর্শে দীক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধ ও হিংসাত্মক প্রতিবাদের বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই অহিংস উপায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাই তাঁর আদর্শ।

৩. অহিংসা সবলের হাতিয়ার: গান্ধিজির মতে, অহিংসা দুর্বল মানুষের হাতিয়ার নয়। দুর্বলতা, ভীরুতা ও কাপুরুষতা ত্যাগ করতে পারলেই অহিংসার পথ অনুসরণ করা সম্ভব। তাই অহিংসা কাপুরুষের নয়, বরং সাহসী ও সবল মানুষের হাতিয়ার।

৪. ভালোবাসা ও করুণা প্রদর্শন: অহিংসার মাধ্যমে শত্রুর প্রতিও মমতা ও দয়া প্রদর্শন করা হয়। শত্রুর ক্ষতি না করে ভালোবাসার মাধ্যমে তার হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। এই কারণেই গান্ধিজি হিংসার পথ পরিহার করে অহিংসাকে তাঁর জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

৫. অহিংসা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক: গান্ধিজি মনে করতেন, অহিংসা হল আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তির প্রকাশ। তাঁর মতে, ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস মানুষকে নির্ভীক হতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জোগায়।

৬. অহিংসা একটি চারিত্রিক গুণ: গান্ধিজি অহিংসাকে মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক গুণ বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, চরিত্রবান ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ অহিংসার আদর্শ অনুসরণ করতে পারেন। অহিংসার পথে চলতে গিয়ে যতই দুঃখ-কষ্ট আসুক না কেন, তাঁকে ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে তা অতিক্রম করে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির অহিংসার আদর্শ জীবের প্রতি শ্রদ্ধা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, ভালোবাসা, করুণা, আধ্যাত্মিক শক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

১৩। গান্ধিজিকে অনুসরণ করে সত্যাগ্রহীর লক্ষণগুলি আলোচনা করো।

গান্ধিজির মতে, সত্যাগ্রহ ব্যক্তির একটি সহজাত বা জন্মগত অধিকার এবং পবিত্র কর্তব্য। দৃঢ় মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিই সত্যাগ্রহের পথ অনুসরণ করতে পারেন। সত্যাগ্রহের জন্য কঠোর নৈতিক ও ধর্মীয় নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন। গান্ধিজি একজন সত্যাগ্রহীর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল—

১. সত্যবাদিতা: সত্যাগ্রহের মূল ভিত্তি হল সত্য। যিনি সত্যের প্রতি একনিষ্ঠভাবে আগ্রহী, তিনিই প্রকৃত সত্যাগ্রহী। যত প্রতিকূল পরিস্থিতিই আসুক না কেন, তাঁকে সত্যের পথে অবিচল থাকতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া চলবে না।

২. অহিংসা: একজন সত্যাগ্রহীকে কায়, মন ও বাক্যে অহিংস হতে হবে। তিনি কোনো ধরনের হিংসাত্মক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। গান্ধিজির মতে, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা বজায় রেখে অহিংস পথে চলাই হল সত্যাগ্রহের প্রকৃত অর্থ।

৩. নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস: সত্যাগ্রহীর নিজের কাজের প্রতি গভীর নিষ্ঠা থাকতে হবে এবং তাঁকে দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। তিনি হবেন দৃঢ়চিত্ত ও নিয়মনিষ্ঠ সৈনিক। একই সঙ্গে নিজের প্রতি তাঁর অটল ও অবিচল বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন।

৪. ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা: সত্যাগ্রহের পথ অত্যন্ত কঠিন। এই পথে চলতে গিয়ে একজন সত্যাগ্রহীকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি ও দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাঁর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা হারালে চলবে না। এমনকি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি যেন হিংসাত্মক কাজে প্ররোচিত না হন, সে বিষয়ে তাঁকে সতর্ক থাকতে হবে।

৫. নির্ভীকতা: নির্ভীকতা সত্যাগ্রহীর অন্যতম প্রধান গুণ। গান্ধিজির মতে, যিনি ভয়কে জয় করতে পারেননি, তিনি সত্যাগ্রহের পথ অনুসরণ করতে পারবেন না। তাই সত্যাগ্রহীকে ভয় ও দুর্বলতা ত্যাগ করে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির আদর্শ অনুসারে একজন সত্যাগ্রহীকে সত্যবাদী, অহিংস, নিষ্ঠাবান, আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল ও নির্ভীক হতে হবে। এই গুণগুলির সাহায্যে তিনি সমাজে ন্যায়, শান্তি ও সাম্য বজায় রাখার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবেন।

১৪। গান্ধিজি তাঁর রাজনৈতিক ভাবনায় কীভাবে অহিংসার স্বরূপ ও গুরুত্ব নির্দেশ করেছেন?

অহিংসার স্বরূপ: মহাত্মা গান্ধিজি তাঁর সমাজবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যে আদর্শ সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা হল সর্বোদয় সমাজ। সর্বোদয় সমাজ বলতে তিনি সমাজের সকল স্তরের মানুষের সার্বিক উন্নতি ও উৎকর্ষসাধনকে বুঝিয়েছেন। এই সমাজ গঠনের প্রধান উপায় হিসেবে তিনি অহিংসার কথা বলেছেন। গান্ধিজির মতে, একমাত্র অহিংসার পথ অনুসরণ করেই প্রতিপক্ষের দুষ্ট স্বভাবের পরিবর্তন ঘটানো, তার বিবেকবুদ্ধিকে জাগ্রত করা এবং চরিত্র সংশোধন করা সম্ভব। অহিংসাকে হাতিয়ার করেই সমাজের সংস্কার সাধন ও সর্বোদয় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়। তাঁর মতে, অন্যের প্রতি শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক স্তরে ঘৃণা, ক্রোধ এবং অশুভ চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার প্রচেষ্টাই হল অহিংসা।

অহিংসার গুরুত্ব: গান্ধিজির রাজনৈতিক আন্দোলনে অহিংসার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, অহিংসার মাধ্যমেই সমাজকে সত্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাঁর রাজনৈতিক ভাবনায় অহিংসার গুরুত্বগুলি হল—

১. সমাজের ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা: অহিংসা সমাজের প্রতিটি মানুষের সমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এই নীতি অনুসরণের মাধ্যমে গোষ্ঠীগত সংঘর্ষ, জাতিগত হিংসা ও ধর্মীয় হিংসা এড়ানো সম্ভব। এর ফলে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. নৈতিক শক্তি: গান্ধিজির মতে, অহিংসা কোনো দুর্বলতার নীতি নয়; বরং এটি একটি শক্তিশালী নৈতিক আদর্শ। অহিংসার মধ্যে নিহিত শক্তি মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলে। এই শক্তির সাহায্যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে।

৩. সামাজিক পরিবর্তন: অহিংসার মাধ্যমে সমাজের অশান্তি, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্ভব। গান্ধিজি অহিংস পদ্ধতিতে অন্যায় ও শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর অহিংসার তত্ত্ব সামাজিক পরিবর্তন সাধন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির রাজনৈতিক দর্শনে অহিংসা ছিল সমাজসংস্কার, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও সর্বোদয় সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান উপায়। তাঁর মতে, অহিংসার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের হৃদয় পরিবর্তন, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

সমসাময়িক ভারতীয় চিন্তাধারা অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (মান ৩)

১। মানবধর্ম বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বুঝিয়েছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, সকল প্রকার ভেদবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে সকলের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হল প্রকৃত মানবধর্ম। বিশ্বজনীন কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত ধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথের মানবধর্মের ধারণা:

  1. মনুষ্যত্বের বিকাশ: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের মধ্যে একটি অতিরিক্ত সচেতন সত্তা রয়েছে, যা তাকে সাধারণ পার্থিব অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এই সত্তাই হল মনুষ্যত্ব।
  2. চিরন্তন সৃজনশীল শক্তি: মানুষের মধ্যে থাকা চিরন্তন সৃজনশীল শক্তিই তার প্রকৃত ধর্ম। এই ধর্ম অর্জন করতে হলে মানুষকে সাধনা করতে হয়।
  3. সর্বজনীন মানব: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের অন্তরে যে মানবসত্তা বিরাজ করে, তা ব্যক্তিমানবের সীমা অতিক্রম করে। এই মানবসত্তা সর্বজনীন ও সর্বকালীন।
  4. বিশ্বজনীন কল্যাণ: সকল সংকীর্ণতা ও ভেদবুদ্ধি ত্যাগ করে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হল মানবধর্মের মূল আদর্শ।

উপসংহার: রবীন্দ্রনাথের মতে, সর্বজনীন ও সর্বকালীন মানবের আদর্শকে উপলব্ধি করে নিঃস্বার্থভাবে বিশ্বমানবের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই হল প্রকৃত মানবধর্ম।

২। মানব প্রকৃতির সসীম ও অসীম দিক বলতে কী বোঝো? অথবা, রবীন্দ্রনাথের মতে মানব প্রকৃতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কী কী?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, মানব প্রকৃতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। একটি হল সসীম দিক এবং অপরটি হল অসীম দিক বা উদ্বৃত্ত। এই দুটি দিকের মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয়।

১. সসীম দিক: মানুষের অস্তিত্বের একটি সীমাবদ্ধ দিক রয়েছে, যা তাকে পার্থিব জগতের সঙ্গে যুক্ত রাখে। এই দিকটি মানুষের নিজস্ব স্বার্থ ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয়। সসীম দিকের মাধ্যমে মানুষ তার সীমিত অস্তিত্বের মধ্যে এমন কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, যা তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে তোলে।

২. অসীম দিক বা উদ্বৃত্ত: মানুষের মধ্যে এমন একটি অসীম সত্তা রয়েছে, যা তাকে সীমিত অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে। এই অসীম দিকের জন্যই মানুষ মুক্তি ও অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে। রবীন্দ্রনাথের মতে, অসীমতার চেতনা মানুষকে অমরত্বের দিকে ধাবিত করে। এই দিকের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল স্বাধীনতা। স্বাধীনতার মাধ্যমে মানুষ তার দৈহিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বৃহত্তর ঐক্যের উপলব্ধি লাভ করতে পারে।

উপসংহার: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানব প্রকৃতির সসীম দিক মানুষকে তার সীমাবদ্ধ অস্তিত্বের মধ্যে আবদ্ধ রাখে, আর অসীম দিক তাকে সেই সীমা অতিক্রম করে মুক্তি, অমরত্ব ও একত্বের উপলব্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

৩। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানবতাবাদে ‘ছোটো আমি’ বা ‘ক্ষুদ্র আমি’ এবং ‘বড়ো আমি’ বা ‘বৃহৎ আমি’ বলতে কী বুঝিয়েছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর The Religion of Man গ্রন্থে প্রতিটি মানুষের মধ্যে দুটি সত্তার কথা উল্লেখ করেছেন। যথা—ছোটো আমি বা ক্ষুদ্র আমি এবং বড়ো আমি বা বৃহৎ আমি।

১. ছোটো আমি বা ক্ষুদ্র আমি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটো আমি বা ক্ষুদ্র আমিকে জীবসত্তা বলেছেন। জীবসত্তা হল সাধারণ ব্যক্তিমানবের স্বভাব, যার মধ্যে স্বার্থপরতা, দ্বেষ-বিদ্বেষ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য থাকে। এই সত্তা মানুষকে নিছক জীব হিসেবে গণ্য করে। ফলে মানুষ নানা ধরনের জৈবিক কামনা-বাসনা ও সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

২. বড়ো আমি বা বৃহৎ আমি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, বড়ো আমি বা বৃহৎ আমি হল বিশ্বসত্তা। এই বিশ্বসত্তা মহৎ এবং সকল মানুষকে একসূত্রে আবদ্ধ করে। মানুষ যখন জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও বর্ণের সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে বিশ্বচেতনায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তখন সে বিশ্বসত্তার উপলব্ধি লাভ করে। এর ফলে তার মধ্যে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ অর্থাৎ ‘আমিই ব্রহ্ম’—এই উপলব্ধি জাগ্রত হয়। এটিই মানুষের সর্বোচ্চ আদর্শ।

উপসংহার: রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদে ছোটো আমি মানুষের সংকীর্ণ স্বার্থ ও জৈবিক কামনা-বাসনার পরিচায়ক, আর বড়ো আমি হল বিশ্বজনীন চেতনা ও বৃহত্তর মানবিক ঐক্যের প্রতীক। বৃহৎ আমির উপলব্ধির মধ্য দিয়েই মানুষ তার সর্বোচ্চ আদর্শে পৌঁছাতে পারে।

৪। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানবতাবাদী ভাবনায় মানুষের মধ্যে কীরূপ দ্বৈততা (Duality)-র কথা উল্লেখ করেছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিসত্তার মধ্যে দুটি ভিন্ন দিক লক্ষ করা যায়। যথা—প্রকৃতিগত বা বস্তুগত দিক এবং আত্মিক বা চেতনার দিক। এই দুটি বিপরীত প্রবণতার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা সৃষ্টি হয়।

১. প্রকৃতিগত বা বস্তুগত দিক: মানুষের প্রকৃতিগত প্রবণতার কারণে সে কখনো কখনো স্বার্থপর হয়ে ওঠে। এই দিকটি মানুষকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারে।

২. আত্মিক বা চেতনার দিক: মানুষের আত্মিক সত্তা তাকে উদারতা, প্রেম ও মানবতার পথে পরিচালিত করে। এই সত্তার প্রভাবে মানুষ নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবসমাজের কল্যাণে কাজ করতে আগ্রহী হয়।

৩. দ্বৈততার প্রকৃতি: মানুষের মধ্যে একদিকে স্বার্থপরতা ও সংকীর্ণতার প্রবণতা, অন্যদিকে উদারতা ও মানবতার প্রবণতা কাজ করে। এই দুই বিপরীত প্রবণতার সহাবস্থানই হল মানুষের দ্বৈততা।

৪. দ্বৈততা অতিক্রমের উপায়: রবীন্দ্রনাথ মানুষের এই দ্বৈততাকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ তার সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবসমাজের জন্য কাজ করতে পারে। প্রেম, সৌন্দর্য ও জ্ঞানের সাধনার মাধ্যমে মানুষ এই দ্বৈততা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।

উপসংহার: রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদে মানুষের দ্বৈততা হল তার প্রকৃতিগত স্বার্থপরতা ও আত্মিক উদারতার মধ্যকার বিরোধ। প্রেম, সৌন্দর্য ও জ্ঞানের সাধনার মাধ্যমে এই বিরোধ অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক আদর্শে পৌঁছানোই মানুষের লক্ষ্য।

৫। কর্মযোগের আদর্শ কী?

নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করাই হল কর্মযোগের অন্তর্নিহিত ভাব বা আদর্শ। মানুষের মনন, চিন্তন ও আত্মিক প্রবণতা অনুসারে জীবন গঠনের চারটি মার্গ রয়েছে। যথা—কর্ম, ভক্তি, যোগ ও জ্ঞান।

কর্মযোগের আদর্শ:

  1. নিঃস্বার্থ কর্ম: কর্মযোগের মূল আদর্শ হল কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই কর্ম সম্পাদন করা। এই নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মানুষ মোক্ষ লাভ করতে পারে।
  2. সর্বজনীনতা: কর্মযোগ জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জীবনে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর। তাই এটি সর্বজনীন আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।
  3. জীবনে কর্মের গুরুত্ব: জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কর্মযোগের ভূমিকা রয়েছে। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সাধনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই কারণে কর্মযোগ সর্বব্যাপী ও অধিকতর ক্রিয়াশীল।
  4. মোক্ষ লাভ: সকল ধর্ম ও সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হল মুক্তি বা মোক্ষ লাভ। কর্মযোগ অনুসারে, নিঃস্বার্থ বা নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে এই মুক্তি অর্জন করা সম্ভব।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, কর্মযোগের প্রধান আদর্শ হল ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদন করা এবং সেই কর্মের মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করা।

৬। বিবেকানন্দ কেন কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগকে অবিরোধী যোগদ্বয় বলে উল্লেখ করেছেন?

ভারতীয় দর্শনচিন্তায় মোক্ষ বা মুক্তি লাভের প্রধান উপায় হিসেবে জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ ও ভক্তিযোগের উল্লেখ রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং এই দুটি যোগ পরস্পরের পরিপূরক। মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ এবং মোক্ষ লাভের জন্য উভয় পথই গুরুত্বপূর্ণ।

১. কর্মযোগের ভূমিকা: কর্মযোগ মানুষকে স্বার্থশূন্য হয়ে পরের কল্যাণে কাজ করতে শেখায়। নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মানুষের আত্মশুদ্ধি ঘটে এবং তার সংকীর্ণ স্বার্থবোধ দূর হয়।

২. জ্ঞানযোগের ভূমিকা: জ্ঞানযোগের মাধ্যমে মানুষ সত্যের উপলব্ধি লাভ করে। এর ফলে তার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয় এবং সে সকল জীবের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে শেখে।

৩. পরস্পরের পরিপূরক: জ্ঞানযোগ মানুষকে সকলের মধ্যে একত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, কর্মযোগ সেই একত্বের জ্ঞানের ভিত্তিতে কামনা-বাসনা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করতে শেখায়। তাই জ্ঞানযোগ ও কর্মযোগ একে অপরের পরিপূরক।

৪. মোক্ষ লাভে সহায়ক: কর্মযোগের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি এবং জ্ঞানযোগের মাধ্যমে সত্যের উপলব্ধি—উভয়ই মানুষের মোক্ষলাভের পথকে প্রশস্ত করে। কোনো যোগই অন্যটির পথে বাধা সৃষ্টি করে না।

উপসংহার: সুতরাং, কর্মযোগ মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করতে শেখায় এবং জ্ঞানযোগ তাকে সত্য ও একত্বের উপলব্ধি দান করে। এই দুটি যোগ পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। এই কারণেই স্বামী বিবেকানন্দ কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগকে ‘অবিরোধী যোগদ্বয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।

৭। ‘চরিত্রের উপর কর্মের প্রভাব’ বলতে বিবেকানন্দ কী বুঝিয়েছেন?

স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের নাম হল ‘চরিত্রের উপর কর্মের প্রভাব’। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, মানুষের চরিত্র গঠনে কর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে যে ছাপ ফেলে যায়, সেই সংস্কারগুলির সমষ্টি নিয়েই মানুষের চরিত্র গঠিত হয়।

চরিত্রের উপর কর্মের প্রভাব:

  1. চরিত্র গঠন: মানুষের প্রতিটি কর্ম তার মনে কোনো না কোনো সংস্কার সৃষ্টি করে। এই সংস্কারগুলি ধীরে ধীরে মানুষের চরিত্র গঠন করে। তাই মানুষের ভালো-মন্দ কর্ম তার চরিত্রের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
  2. কর্মের গুরুত্ব: বিবেকানন্দ মনে করতেন, কর্মের মাধ্যমেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করতে পারে এবং নিজের জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে কর্মের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণেও অবদান রাখা সম্ভব।
  3. নিষ্কাম কর্ম: স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “কর্মের জন্য কর্ম করো।” অর্থাৎ, কেবল কর্মফল লাভের আশায় নয়, বরং কর্ম করার জন্যই কর্ম করা উচিত। ফলের প্রত্যাশা ত্যাগ করে কাজ করলে মানুষের মধ্যে নিঃস্বার্থ কর্মের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
  4. আত্মোন্নতি: নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করার মাধ্যমে মানুষ নিজের সংকীর্ণ স্বার্থবোধ অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে তার চরিত্রের উন্নতি ঘটে এবং সে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে।

উপসংহার: স্বামী বিবেকানন্দের মতে, কর্ম মানুষের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান উপায়। তাই ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদন করাই হল উন্নত চরিত্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ।

৮। বিবেকানন্দ কেন কর্মযোগের ভাবনায় সত্ত্ব, রজো ও তমো—এই তিন প্রকার গুণের আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন?

স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি বলেছেন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বড়ো। এই প্রসঙ্গে তিনি মানুষের তিনটি গুণের কথা আলোচনা করেছেন। যথা—সত্ত্ব, রজো ও তমো। এই তিনটি গুণ মানুষের কর্মপ্রবণতা, স্বভাব ও চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

১. সত্ত্ব গুণ: সত্ত্ব গুণ হল শুদ্ধতা, জ্ঞান, আলো ও সাম্যতার প্রতীক। এই গুণ মানুষের মধ্যে পবিত্রতা, জ্ঞান ও মানসিক স্থিরতা সৃষ্টি করে। সত্ত্ব গুণের প্রভাবে মানুষ সঠিকভাবে নিজের কর্তব্য পালন করতে পারে।

২. রজো গুণ: রজো গুণ হল উৎসাহ, কর্ম, শক্তি ও বাসনার প্রতীক। এই গুণ মানুষকে সক্রিয় ও কর্মপ্রবণ করে তোলে। রজো গুণের প্রভাবে মানুষ বিভিন্ন কাজে উদ্যোগী হয় এবং নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য চেষ্টা করে।

৩. তমো গুণ: তমো গুণ হল অলসতা, অন্ধকার ও অজ্ঞতার প্রতীক। এই গুণ মানুষের মধ্যে কর্মবিমুখতা ও জ্ঞানের অভাব সৃষ্টি করে। ফলে মানুষের কর্মসম্পাদনের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

৪. কর্তব্যকর্মের গুরুত্ব: বিবেকানন্দের মতে, মানুষের মধ্যে এই তিনটি গুণের তারতম্য থাকার কারণে প্রত্যেকের প্রকৃতি ও কর্তব্যকর্ম আলাদা হয়। তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের নির্দিষ্ট কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা। এর মাধ্যমেই সে কর্মযোগী হয়ে উঠতে পারে এবং মুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারে।

উপসংহার: স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের ধারণায় সত্ত্ব, রজো ও তমো—এই তিনটি গুণের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি মানুষের প্রকৃতি, চরিত্র ও কর্মকে প্রভাবিত করে। নিজের প্রকৃতি অনুযায়ী কর্তব্যকর্ম পালন করার মাধ্যমে মানুষ কর্মযোগের আদর্শ অনুসরণ করে মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারে।

৯। “কর্মরহস্য অবগত হওয়াই কর্মযোগ”—উক্তিটির তাৎপর্য কী?

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে ‘কর্মরহস্য’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “কর্মরহস্য অবগত হওয়াই কর্মযোগ।” এই উক্তির মাধ্যমে তিনি কর্মের প্রকৃত অর্থ এবং কর্ম সম্পাদনের সঠিক পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন।

১. নিষ্কাম কর্ম: গীতায় কর্মযোগের যে আদর্শের কথা বলা হয়েছে, তা হল ফললাভের আশা না রেখে, কামনা-বাসনা ত্যাগ করে কর্ম সম্পাদন করা। অর্থাৎ, ফলের আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে কর্মের জন্যই কর্ম করা হল কর্মযোগের মূল শিক্ষা।

২. আসক্তি ত্যাগ: বিবেকানন্দের মতে, মানুষকে আসক্তি ত্যাগ করে কর্মে নিযুক্ত হতে হবে। কারণ আসক্তি দুঃখের কারণ। কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে।

৩. নিঃস্বার্থ কর্ম: স্বার্থপরতা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করতে পারলে মানুষ কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে। সংসারে থেকেও নিরাসক্তভাবে কর্ম সম্পাদন করা সম্ভব।

৪. আত্মজ্ঞান লাভ: সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ও নিষ্কামভাবে কর্ম করা কঠিন। আধ্যাত্মিক বা আত্মিক জ্ঞান লাভের মাধ্যমে এই কঠিন কাজ সম্ভব হয়। তাই নিষ্কাম কর্মের জন্য আত্মজ্ঞান লাভ করা প্রয়োজন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, কর্মের অন্তর্নিহিত রহস্য হল কামনা-বাসনা ও আসক্তি ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদন করা। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাহায্যে নিষ্কাম ও নিরাসক্তভাবে কর্ম করার আদর্শ উপলব্ধি করাই হল কর্মরহস্য জানা এবং এই আদর্শ অনুসরণ করাই কর্মযোগ।

১০। বিবেকানন্দের মতে মুক্তিতে নিষ্কাম কর্মের ভূমিকা কী?

স্বামী বিবেকানন্দ কর্মযোগের আলোচনায় মানুষের মুক্তির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্যক্তিজীবনের চরম লক্ষ্য হল মুক্তি। মানুষ সমস্ত প্রকার আসক্তি ত্যাগ করে সসীমত্বের বন্ধন ভেঙে অসীমত্বের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এই মুক্তি লাভের ক্ষেত্রে নিষ্কাম কর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১. আসক্তি ত্যাগ: বিবেকানন্দের মতে, আসক্তিই মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। তাই মুক্তি লাভের জন্য মানুষকে সমস্ত প্রকার আসক্তি ত্যাগ করতে হবে। নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মানুষ কর্মফলের প্রতি আকর্ষণ ত্যাগ করতে শেখে।

২. মুক্তির দুটি মার্গ: বিবেকানন্দ আসক্তি ত্যাগের দুটি মার্গের কথা বলেছেন। যথা—নিবৃত্তিমার্গ ও প্রবৃত্তিমার্গ। সাধারণ গৃহী মানুষ মুক্তির জন্য প্রবৃত্তিমার্গ অনুসরণ করলেও সন্ন্যাসী ও মহাপুরুষেরা নিবৃত্তিমার্গকে মুক্তির পথ হিসেবে গ্রহণ করেন।

৩. নিষ্কাম কর্মের গুরুত্ব: মুক্তির জন্য মানুষ যে মার্গই অনুসরণ করুক না কেন, তাকে নিষ্কাম কর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত লাভ বা কর্মফলের প্রত্যাশা না করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদন করতে হবে।

৪. মুক্তি লাভ: নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মানুষ স্বার্থপরতা ও আসক্তি অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে সে সসীমত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে অসীমত্বের উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যায়।

উপসংহার: স্বামী বিবেকানন্দের মতে, মুক্তি লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল নিষ্কাম কর্ম। প্রবৃত্তিমার্গ বা নিবৃত্তিমার্গ—যে পথই অনুসরণ করা হোক না কেন, আসক্তি ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমেই মানুষ কর্মযোগের আদর্শ অনুসরণ করে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারে।

১১। ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ বলতে স্বামীজি কী বুঝিয়েছেন?

অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘তত্ত্বমসি’ বা ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’। স্বামী বিবেকানন্দের কাছে এই তত্ত্ব ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ আদর্শের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মনে করতেন, জীবসেবা হল অদ্বৈতবাদের একটি বিশেষ রূপ। তাঁর মতে, সকল জীবের মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজমান। তাই জীবের সেবা করাই হল ঈশ্বরের সেবা।

১. জীবের মধ্যে ঈশ্বরের অবস্থান: বিবেকানন্দের মতে, সাধারণ মানুষই হলেন সর্বব্যাপী ঈশ্বর এবং সমস্ত আত্মার আত্মা। তাই প্রতিটি জীবকে ঈশ্বরের প্রকাশ হিসেবে দেখা উচিত।

২. দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবা: সাধারণ মানুষের প্রতি স্বামীজির গভীর আন্তরিকতা ও সহানুভূতি ছিল। ‘পিতৃদেবো ভব, মাতৃদেবো ভব’ মন্ত্রের পরিবর্তে তিনি ‘দরিদ্রদেবো ভব, মূর্খদেবো ভব’ আদর্শের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞ ও দুঃখী মানুষকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা ও সেবা করতে হবে।

৩. অদ্বৈতবাদের বাস্তব প্রয়োগ: অদ্বৈত বেদান্ত অনুসারে, সকল জীবের মধ্যে একই ব্রহ্মসত্তা বিরাজমান। এই উপলব্ধি থেকে মানুষ যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থানের ভেদাভেদ ভুলে সকলের সেবা করে, তখনই অদ্বৈতবাদের আদর্শ বাস্তবে প্রকাশিত হয়।

৪. মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা: বিবেকানন্দের মতে, মানুষের সেবা করাকে কখনোই সাধারণ দয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে শ্রদ্ধার সঙ্গে তার সেবা করাই হল ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র মূল কথা।

উপসংহার: স্বামী বিবেকানন্দের মতে, সকল জীবের মধ্যে শিব বা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে দরিদ্র, অসহায় ও দুঃখী মানুষের সেবা করাই হল ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’। এই আদর্শের মধ্য দিয়েই অদ্বৈত বেদান্তের তত্ত্ব বাস্তব জীবনে রূপায়িত হয়।

আমাদের যে কোনো E-Book সরাসরি WhatsApp-এর মাধ্যমে কিনতে বা কোনো সমস্যা হলে নিচের বাটনে ক্লিক করে মেসেজ করুন -
আরও পড়ুন প্রয়োজনে
মিলের পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান পদ্ধতি প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন পঞ্চম অধ্যায় Click here
কারণতা প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন চতুর্থ অধ্যায় Click here
আরোহ অনুমানের স্বরূপ প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন তৃতীয় অধ্যায় Click here
বাক্য থেকে বচনে রূপান্তর | গুণ ও পরিমাণ নির্ণয় | ব্যাপ্য ও অব্যাপ্য নির্ণয় Click here

Our Latest Products

উচ্চমাধ্যমিক

উচ্চমাধ্যমিক বাংলা সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম বাংলা সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹25.00
উচ্চমাধ্যমিক English সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক English সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹25.00
উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম ইতিহাস সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹25.00
উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹25.00
উচ্চমাধ্যমিক দর্শন সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক দর্শন সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
উচ্চমাধ্যমিক সংস্কৃত সাজেশন

উচ্চমাধ্যমিক সংস্কৃত সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00

একাদশ শ্রেণি

একাদশ শ্রেণি বাংলা সাজেশন

একাদশ শ্রেণি বাংলা সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹25.00
একাদশ শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন

একাদশ শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
একাদশ শ্রেণি দর্শন সাজেশন

একাদশ শ্রেণি দর্শন সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
একাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন

একাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
একাদশ শ্রেণি ভূগোল সাজেশন

একাদশ শ্রেণি ভূগোল সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
একাদশ শ্রেণি শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন

একাদশ শ্রেণি শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00
একাদশ শ্রেণি English সাজেশন

একাদশ শ্রেণি English সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹25.00
একাদশ শ্রেণি সাজেশন SALE

একাদশ শ্রেণি সাজেশন

★★★★★
₹49.00 ₹35.00

Leave a Comment

PDF সাজেশন নিতে ক্লিক করুন