বিশ্বায়ন (তৃতীয় অধ্যায়) রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার

Table of Contents

বিশ্বায়ন (তৃতীয় অধ্যায়) রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার | Globalisation Question Answer Class 12 Political Science

বিশ্বায়ন (তৃতীয় অধ্যায়) রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর
বিশ্বায়ন (তৃতীয় অধ্যায়) রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর

১। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব আলোচনা করো।

রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব:

বিশ্বায়নের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমিকতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব নিম্নে আলোচনা করা হল-

রাষ্ট্রীয় সার্বাভৗমিকতার অপসারণ: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা সার্বভৌম ক্ষমতার উপরে বিশ্বায়ন কতটা প্রভাব ফেলেছে, এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করে প্রথমেই বলা যায়, বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার পূর্বে পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্রের (Nation State) যে অসীম সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল, বিশ্বায়ন পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই খর্ব হয়েছে। সারা পৃথিবী জুড়ে ‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্র’ বা ‘Welfare state’-এর কাঠামো বদলে গিয়ে বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্র ‘ন্যূনতম রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। এই নতুন রাষ্ট্র এখন তার কাজকর্মের পরিধিকে অনেকটা গুটিয়ে ফেলেছে। আগে নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্র যে বহুরকমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি রূপায়িত করত এখন তা সীমিত। কারণ আজকের দিনে কোনো রাষ্ট্র এককভাবে চলতে পারে না। একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও আঞ্চলিকীকরণের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রগুলিকে চলতে হয়।

উন্মুক্ত বাজার এ অবাধ বাণিজ্য: বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের জায়গা নিয়েছে বাজার। সারা বিশ্বের বহুজাতিক কোম্পানিগুলি যেভাবে তাদের কর্তৃত্ব বাড়িয়ে চলেছে তাতে কর্পোরেট দুনিয়ায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের লেখকরা মনে করেন। বিশ্বায়ন জাতিরাষ্ট্রের সাবেকি সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করে তাকে একটি ‘বাজারকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত করতে চায়। অবশ্য জাতিরাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ‘বিশ্বরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ বিশ্বায়নে দেখা যায় না। কিন্তু পণ্যের অবাধ বাজার, রাষ্ট্রীয়করণের জায়গায় বেসরকারিকরণ, উদারীকরণ, বিদেশি পুঁজি লগ্নি, বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে ব্যাবসা করার অনুমতি প্রদান ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণে রাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে।

অর্থনৈতিক আগ্রাসন: বিশ্বায়নের ফলে নয়া বিশ্বব্যবস্থা চালু হওয়ার পরে পুঁজি বা শ্রমের অবাধ চলাচল অনুমোদিত হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি বা আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজ হচ্ছে, এক দেশের দক্ষ শ্রমিক অন্য দেশে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের বা রাজ্যের তেমন কোনও ভূমিকা নেই। এই কারণে অনেকে মনে করেন, সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের ক্ষমতা কর্পোরেট দুনিয়ার দাপটে যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

বহুজাতিক সংস্থার প্রভাব: সারা বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত বাণিজ্য নীতি গ্রহণের ফলে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থাগুলি তাদের উদ্যোগ আয়োজন সম্প্রসারিত করেছে। বহুজাতিক সংস্থার উদ্যোগপতিরা খুব সহজেই বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারে যা উন্নয়নশীল দেশের কোনো শিল্পনীতির পক্ষে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নীতি নির্ধারণের বিষয়ে বহুজাতিক সংস্থার মতামত গ্রহণ করে।

পারমাণবিক ভীতি: বর্তমান যুগ হল পারমাণবিক অস্ত্রের যুগ। বিশ্বের বহু দেশ আজ পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান। ফলে সাবেকি সমরাস্ত্রে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও তাকে সহজেই পরমাণু অস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস করে দেওয়া যায়। বর্তমানে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির কাছে আন্তর্জাতিক ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক বোমা প্রভৃতি রয়েছে। এই অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রকে ভীতি প্রদর্শন করতে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তাই বলাই যায় প্রযুক্তিগত উন্নতি ভূখণ্ডগত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস: দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে দরকষাকষির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলি কিছু পরিমাণে স্বাধীনভাবে অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণ ও কার্যকর করতে পারত। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে এবং বর্তমানে একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলি স্বাধীনভাবে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নীতি অনুসরণ করতে পারছে না। উন্নত রাষ্ট্রসমূহ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার, বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নির্দেশে উন্নয়নশীল দেশসমূহকে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস সাধন করতে বাধ্য করা হয়েছে। মূলত কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের ফলে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বায়নের ফলে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসে বাধ্য হওয়ায় রাষ্ট্রগুলির অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমিকতা যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

উক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় বিশ্বায়ন নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমিকতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।

২। ভারতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিবর্তন সম্পর্কে লেখো।

ভারতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিবর্তন:

ভারতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ১৯৯০-এর দশক থেকে গৃহীত হয়েছে। এরপর দীর্ঘ তিন দশক অতিক্রম করে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। সংক্ষেপে এই বিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

স্বাধীনতার পূর্বে বিশ্বায়ন: ঠান্ডাযুদ্ধের পরবর্তীকালে ভারতে বিশ্বায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হলেও প্রাচীন ভারতেও বিশ্ব বাণিজ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। রেশম পথ, আন্তঃসাহারান বাণিজ্য পথ, ভারত মহাসাগরের মাধ্যমে রেশম, মশলা, সোনা, হাতির দাঁত ইত্যাদি পণ্যের আদানপ্রদান সম্ভব হয়েছিল। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক ও ধর্মগত আদানপ্রদানও গড়ে উঠেছিল। আবার ব্রিটিশ শাসনকালের ঔপনিবেশিক যুগে ভারত থেকে কাঁচামাল ও অন্যান্য দ্রব্য বিদেশে রফতানি হত। বিদেশ থেকেও মিলে উৎপাদিত বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য ভারতে আমদানি করা হত। এইভাবে বিশ্ব বাণিজ্য চলত।

স্বাধীন ভারতে বিশ্বায়ন: তবে স্বাধীন ভারতে বিদেশি নির্ভরতা হ্রাস করতে আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে স্বাধীন ভারতে দেশীয় শিল্প স্থাপনের চেষ্টা শুরু হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে প্রায় দীর্ঘ ৪০ বছর শিল্পক্ষেত্রে এক চরম ও ব্যাপক সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান ছিল (লাইসেন্স রাজ বা পারমিট রাজ)। যে-কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প পরিচালনা করার জন্য ব্যক্তিকে সরকারের থেকে লাইসেন্স বা পারমিট গ্রহণ করতে হত। রাজীব গান্ধি এই বিষয়ে পরিবর্তন সাধন করেন এবং দেশীয় শিল্পপতিদের করের বোঝা কমানো, ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা প্রদান করার কথা বলেন। এ ছাড়া টেলিকমিউনিকেশন ক্ষেত্রেও তাঁর হাত ধরে বিপ্লব আসে। অর্থাৎ ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি সর্বপ্রথম দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

রাজীব গান্ধির আমলে বিশ্বায়নের সূচনা হলেও ভারতে প্রকৃত বিশ্বায়ন ঘটে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও-এর আমলে। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং বিশ্বায়নের শর্ত মেনে ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় শিল্পনীতিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই পর্বে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে। উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও পরিসেবা ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় সংকোচের ফলে ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত বিকাশ ঘটে।

এই সময় পরম্পরাগত সংরক্ষরণবাদী, রাষ্ট্র নির্দেশিত অর্থনীতির পরিবর্তে ভারত সরকার ‘মুক্ত’ বা ‘অবাধ বাজার’ ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এর ফলস্বরূপ ভারতে একদিকে যেমন প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment বা FDI)-এর দ্বার উন্মুক্ত হয়, তেমনই অন্যদিকে ভারতের জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির বন্ধন দৃঢ়তর হয়।

পরবর্তীকালে বিজেপির নেতৃত্বে NDA জোট ক্ষমতায় এলে অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। এই সময় বিশ্বায়নের প্রভাবে ভারতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি বিনিয়োগ হতে থাকে। বিশেষ করে বিমা, ব্যাংক, বিমান প্রভৃতি ক্ষেত্রগুলি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় বিদেশি পুঁজিপতিরা ভারতকে আকর্ষণ করার জন্য নানান উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং পুঁজি বিনিয়োগের আহবান জানায়। সরকার সবকিছুতেই চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করে জনগণের জন্য সরকারি পরিসেবা প্রদান কমিয়ে ফেলে।

। ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করো।
অথবা, ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের সুফলগুলি লেখো।

ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের সুফল:

বিশ্বায়ন একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। এটি মূলত অর্থনৈতিক একীকরণের উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে আবির্ভূত হয়। বিশ্বায়নের ফলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, পরিবেশগত এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও অর্থনৈতিক প্রভাব সর্বাধিক। ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবগুলি হল-

① অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: বিশ্বায়নের প্রভাবে ১৯৯০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, মুক্ত বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির গতিকে ত্বরান্বিত করেছিল।

সরাসরিভাবে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয় অর্থনীতির সাবেকি চেহারায় বদল এসেছে। নাগরিকদের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের জিডিপি বা মোট জাতীয় উৎপাদনের ক্রমবর্ধমানতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এবং নীতি আয়োগ প্রদত্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশ।

② বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ: বিশ্বায়নের ফলে ভারতের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রটি সম্প্রসারিত হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী ভারতীয় পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ওষুধ, বস্ত্র, কৃষিপণ্য ইত্যাদি রফতানির কথা বলা যায়। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী রফতানির ক্ষেত্রে ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগীমূলক হতে পেরেছে।

③ বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বিশ্বায়নের মাধ্যমে ভারতের শিল্প খাতে বিদেশি বিনিয়োগ তথা FDI-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদেশি পুঁজি প্রবাহ সহজতর হয়েছে। আবার ভারতও বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে কলকারখানা স্থাপন করেছে। যেমন- টাটা গোষ্ঠী শ্রীলঙ্কায় তাজ হোটেল স্থাপন করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ইনফোসিস টিসিএস (TCS)-ও বর্তমানে MNC কোম্পানিতে। পরিণত হয়েছে।

④ কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন: বিশ্বায়নের কারণে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কৃষকরা আন্তর্জাতিক বাজারে ফসল বিক্রয় করে তাদের আয় বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছে। এজন্য তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। পাশাপাশি, ভারত সরকার বিশ্বায়নের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য কৃষি ভরতুকি, কৃষির সরঞ্জাম কেনার জন্য। ঋণপ্রদান, কৃষি প্রযুক্তিজ্ঞান প্রদানের ব্যবস্থা করেছে।

⑤ শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: বিশ্বায়নের ফলস্বরূপ বহু বিদেশি কোম্পানি বা বহুজাতিক সংস্থাগুলি ভারতে তাদের ইউনিট স্থাপন করেছে। ফলে ভারতের শ্রমবাজারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেমন- মার্কিন কোম্পানি অ্যাপেল ব্যাঙ্গালোরে কারখানা স্থাপন করেছে, এ ছাড়া গুগল, মাইক্রোসফ্ট, অ্যামাজন, টেসলা, সুইস কোম্পানি নেস্টলে ইত্যাদির কথা বলা যায়।

⑥ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উদ্ভাবন: বিশ্বায়ন ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উদ্ভাবনকে আরও বিকশিত করেছে। ভারত বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি পরিসেবায় নিজেকে পাওয়ার হাউস হিসেবে তুলে ধরেছে। বর্তমানে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম আই টি (IT) আউটসোর্সিং হাব। ২০২২-২০২৩ সালে অর্থবর্ষে ভারতের আই টি রফতানি ১৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। এর ফলে আউটসোর্সিং এবং বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO)-এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে ভারত মহাকাশ প্রযুক্তিতেও ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘ইসরো’ (ISRO)-র চন্দ্রযান ৩-এর সফল উৎক্ষেপণের কথা বলা যায়। অন্যদিকে বিশ্বায়নের ফলে ভারতে ব্যাংকিং ও আর্থিক ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। নেট বা মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম-এর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে UPI-এর মাধ্যমে ‘ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম’ ভারতকে আর্থিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

৪। ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলাফলগুলি আলোচনা করো।
অথবা, ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলি লেখো।

ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলাফল:

ভারতে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলাফলগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা, ইতিবাচক ও নেতিবাচক। এগুলি সংক্ষেপে আলোচিত হল-

ইতিবাচক প্রভাব:

① জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: অনেকে মনে করেন, বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয়দের জীবনযাত্রার মান পূর্বের তুলনায় উন্নত হয়েছে। কারণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয়দের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রভাবে নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে, যারা এই বিকাশজনিত অর্থনীতির প্রভাবে ভোগ্যপণ্য ও পরিসেবা ক্রয়ের ক্ষমতার অধিকারী, তাই ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

② উন্নত পরিকাঠামো ও নগরায়ণ: বিশ্বায়নের ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ভারতের উন্নত পরিকাঠামো নির্মাণে ও নগরায়ণে যেভাবে সহায়তা করেছে তার ফলে জাতীয় সড়ক এবং অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা-সহ শহরগুলির আধুনিকীকরণ সম্ভব হয়েছে। স্মার্ট সিটি মিশন অনুযায়ী ভারতে ১০০টি স্মার্ট সিটি তৈরি করার কথা ঘোষিত হয়েছে।

③ ভোগ্যপণ্যের বিকল্প বৃদ্ধি: বিশ্বায়ন ভারতীয় ভোক্তাদের কাছে বিকল্প পণ্যের পথ সুগম করেছে। একদিকে ব্যাবসাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির ফলে নির্মাতারা কম দামে ভালো পণ্যের জোগান দিয়ে ক্রেতাকে পছন্দের পণ্য ক্রয় করার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমি ব্র্যান্ড ও পণ্যগুলির প্রবাহ বেড়েছে। ভারতীয় ভোক্তারা নতুন পণ্য ও পরিসেবার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। তাদের বিশ্বমানের পণ্য ও পরিসেবা ক্রয়ের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নেতিবাচক প্রভাব :

① শ্রমিক শোষণ: বিশ্বায়নের ফলে বহুজাতিক সংস্থাগুলির জন্য বাণিজ্য দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে এবং ভারতব্যাপী বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া প্রসারিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে বিশ্বের প্রথম সারির শিল্পগুলি এদেশে সস্তা শ্রমিক ও অন্যান্য সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে পণ্য, পরিসেবা জোগান দিচ্ছে। এর ফলে আমরা কম দামে পণ্য, পরিসেবা পেলেও কম পারিশ্রমিকে অধিক কাজ করানোর প্রবণতা বেসরকারি সংস্থা গুলির বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আসলে শ্রমিক শোষণকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। বিশ্বায়নের এই কুপ্রভাবটি কখনোই উপেক্ষনীয় নয়।

② ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষতিসাধন: ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হওয়ায় পৃথিবীর বড়ো বড়ো শিল্পগোষ্ঠীরা ভারতের বাজারকে দখল করতে তৎপর। ভারতে বিনিয়োগ করে তারা যে মুনাফা অর্জন করতে পারে, সেই পরিমাণ মুনাফা অর্জন করতে গেলে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ করতে হয়। এই অবস্থায় দেখা যাচ্ছে বিগত কয়েক দশক ধরে ছোটো ছোটো ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি তারা বাজার থেকে হারিয়েও যাচ্ছে।

③ প্রতিরক্ষা খাতে অত্যধিক ব্যয়: বর্তমান প্রতিরক্ষাগত ক্ষেত্রে ভারত উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রের আদানপ্রদানে সমর্থ হয়েছে ভারত। রাশিয়া, ফ্রান্স, ইজরায়েল থেকে ভারত প্রভৃত পরিমাণ সামরিক অস্ত্র আমদানি করছে। তবে ভারতের মতো একটি দারিদ্র্যপিড়ীত দেশ যেখানে ক্ষুধা, অশিক্ষা, অস্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলি দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সেখানে প্রতিরক্ষা খাতে প্রয়োজন ব্যতীত অত্যধিক ব্যয় করা হচ্ছে। এর ফলে উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলির প্রতি সরকারের মনযোগ কমে যাচ্ছে।

উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, বিশ্ব অর্থনীতির থেকে ভারতীয় অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ব্যবস্থা ভারত সরকার এখনও গ্রহণ করেনি। সেই বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে।

৫। ভারতের উপর রাজনৈতিক বিশ্বায়নের প্রভাবগুলি লেখো।
অথবা, ভারতের উপর রাজনৈতিক বিশ্বায়নের সুফল ও কুফলগুলি আলোচনা করো।
অথবা, ভারতে রাজনৈতিক বিশ্বায়নের ফলাফলগুলি লেখো।

ভারতের উপর বিশ্বায়নের রাজনৈতিক ফলাফল: রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর বিশ্বায়নের প্রভাবকেও ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিক থেকে ভাগ করা যায়।

ইতিবাচক ফলাফল :

① রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি: বিশ্বায়নের ফলে সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খবরের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ও আলোচনা তুলে ধরা হয়। এই কারণে ভারতীয়দের রাজনৈতিক সচেতনতা যথেষ্ট বৃদ্ধি ঘটেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নাগরিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে যেমন সোচ্চার হয়েছে তেমনই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের বৃহত্তর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেছে।

② ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বৃদ্ধি: বিশ্বায়ন ভারতের কূটনৈতিক বা বৈদেশিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন যেমন জাতিপুঞ্জ, G-20, ব্রিকস (BRICS), BIMSTEC, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো সংস্থায় ভারতের অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা ভারতকে এক নতুন বিশ্বশক্তির পরিচিতি দিয়েছে। ফলে বিশ্বায়নের প্রভাবে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক একদিকে যেমন উন্নত হয়েছে তেমনই আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

③ নাগরিক আন্দোলনের প্রভাব বৃদ্ধি: বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে নাগরিক সমাজ অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরোধী, সন্ত্রাসবাদবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী, পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে পৃথিবী জুড়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে ভারতও তাতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে যেভাবে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় অবাধে তথ্যের আদানপ্রদান ঘটছে তাতে পরিবেশদূষণ, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়-এর মতো ইস্যু নিয়ে নাগরিক সমাজ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে। এভাবে ভারতীয় রাজনীতিতে নাগরিক আন্দোলন একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

নেতিবাচক প্রভাব:

① কর্পোরেট সংস্থার প্রভাব বৃদ্ধি: বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে কর্পোরেট সংস্থাগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে মূলধন বা পুঁজির অবাধ সচলতা, এক দেশ থেকে অন্য দেশে দক্ষ শ্রমিকের গমন, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থ ও শেয়ার হস্তান্তর ইত্যাদি বিষয়গুলিতে অন্যান্য দেশের মতো ভারত সরকারেরও কর আরোপ করার সাবেকি ক্ষমতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

② রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হ্রাস: বিশ্বায়নের ফলে ভারত-সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় সার্বভৌমিকতা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। যা স্বাধীনভাবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

③ অসন্তোষ ও প্রতিবাদ প্রতিরোধ: বিভিন্ন উৎস থেকে বিশ্বায়নের বিপক্ষে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদ গড়ে উঠেছে। যেমন- অর্থনৈতিক উদারীকরণের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি ও ইন্ডিয়ান সোশ্যাল ফোরামের মতো সংগঠনগুলি তীব্র বিরোধিতা করে এসেছে। কর্পোরেট সংস্থাগুলির অবাধ প্রবেশের বিপক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিল্পশ্রমিক সংগঠনগুলিও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। বিশ্বায়নের ফলে কৃষিক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছে। কৃষক স্বার্থগোষ্ঠীগুলি বিভিন্ন সময়ে তীব্র আন্দোলনে শামিল হয়েছে।

উপসংহার: স্বাধীন ভারতে সূচনালগ্ন থেকেই কেন্দ্রীভূত অর্থনীতির মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করা হয়েছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারত ধনতন্ত্রের পথ অনুসরণ করে। ফলে নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণ করার কারণে ভারতে ভোগবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

৬। ভারতের উপর সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবগুলি লেখো।
অথবা, ভারতের উপর সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের কুফলগুলি আলোচনা করো।

ভারতে সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব:

ভারতে সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবগুলি হল-

① সাংস্কৃতিক সমসত্ত্বতা: বিশ্বায়ন তথা বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণে সারা পৃথিবীতে একইরকম সংস্কৃতি গড়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। ভারতের পরম্পরাগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিশ্বায়নের হাত ধরে অনেক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসমূহ আধিপত্য বিস্তার করেছে। আসলে বিশ্বায়ন বহুমুখী বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলিকে এক ছাঁচে ঢেলে সমজাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়।

② খাদ্যভ্যাসে পরিবর্তন: বিশ্বায়নের প্রভাবে ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের দৈনন্দিন খাদ্য রুচিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি-র মতো বহুজাতিক কর্পোরেট খাদ্য বিপণিতে ফাস্ট ফুড খাওয়ার ভিড় দেখা যাচ্ছে। পূর্বে এধরনের কর্পোরেট ফুড স্টোর ভারতে ছিল না। বিশ্বায়নের ফলে এই সংস্থাগুলি ভারতে বিপুল ব্যাবসা করতে সক্ষম হয়েছে। পিৎজা ও বার্গারের মতো পশ্চিমি খাবারের চাহিদা দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী বহু খাদ্য অবলুপ্তির পথে। যেমন- বিভিন্ন রকম পিঠে, পুলি ইত্যাদি।

③ পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা: বিশ্বায়ন ভারতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় করেছে তেমনই অন্যদিকে পাশ্চাত্য সঙ্গীত, নৃত্যকলা, সাহিত্যচর্চা, সিনেমা ইত্যাদির জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বজনীন পপ সংস্কৃতির উত্থান হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের বহুদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের আক্রমণাত্মক থাবা বসছে। পাশ্চাত্য গান, সিনেমা, গেমস্ত্র-র আকর্ষণ বেড়েছে তরুণ প্রজন্মের কাছে। বাউল গান, পালাগান, লোকগীতি, ভাটিয়ালি ও অন্যান্য লোকসঙ্গীত ইত্যাদি বিষয়ে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে আধুনিক প্রজন্ম। পোশাকের ক্ষেত্রেও বিশ্বায়ন প্রভাব ফেলেছে। সেই জন্য ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যতা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে।

④ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেসরকারিকরণ : যে-কোনো দেশের মেরুদণ্ড হল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ফলে বেসরকারিকরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি একটি ভয়ানক সর্বনাশের সংকেত। বর্তমানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে যত্রতত্র বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল ও নার্সিংহোম গড়ে উঠছে। এর ফলে একদিকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জনপ্রিয়তা খর্ব হচ্ছে। সরকার ধীরে ধীরে শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ হ্রাস করে বেসরকারিকরণকে উৎসাহিত করছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও সরকার অর্থ বরাদ্দ হ্রাস করায় সরকারি হাসপাতালগুলির স্বাস্থ্য পরিসেবার মান নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে একদিকে বেসরকারি নার্সিংহোমগুলির যেমন প্রাধান্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষগুলি অসহায় অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় দিনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

⑤ ইংরেজি ভাষায় প্রাধান্য: বিশ্বায়নের পরে ভারতে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া শেখার প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় ভাষাগুলির উপরে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু বয়স থেকেই মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা-আবেগ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। তার বদলে তারা আয়ত্ত করছে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আদব কায়দা এবং বাচনভঙ্গি। বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেখানোর প্রবণতা আগের চেয়ে যতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে স্থানীয় মাধ্যমে লেখাপড়া শেখার প্রবণতা ততটাই হ্রাস পেয়েছে।

⑥ মেধা চালান : বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য প্রভাব হল মেধার চালান। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ মানবসম্পদ অধিকাংশ সময়ে নিজদেশে সুযোগসুবিধার অভাবে পশ্চিমি দেশগুলিতে অভিবাসন করে। যার ফলে দক্ষ, মেধাবী ব্যক্তিরা নিজের দেশকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে উন্নত দেশগুলিকেই আরও সমৃদ্ধ করে চলেছে।

তবে উক্ত আলোচনা সত্ত্বেও বলা যায়, ভারতের সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের কিছু ইতিবাচক প্রভাবও বিদ্যমান। যেমন ভারতীয় শিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে ইত্যাদি।

৭। ভারতীয় পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের প্রভাবগুলি লেখো।

অথবা, ভারতীয় পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের ফলাফলগুলি মূল্যায়ন করো।

অথবা, ভারতীয় পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো।

ভারতীয় পরিবেশের উপর বিশ্বায়নের ফলাফল: ভারতীয় পরিবেশে বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ফলাফল বা প্রভাবগুলি লক্ষণীয়। যথা- ইতিবাচক প্রভাব বিশ্বায়ন ভারতীয়

পরিবেশের উপর কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এগুলি হল-

① পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাপী আন্তঃসংযোগ জলবায়ু পরিবর্তন, বনচ্ছেদ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ইত্যাদি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। ফলে সরকারও পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুস্থায়ী ব্যবহার সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি হায়দরাবাদে কাঞ্চা গাচ্চিবওলিতে তেলেঙ্গানা সরকারের বনচ্ছেদন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তীব্র পরিবেশ আন্দোলন গড়ে উঠেছে।

② সুস্থায়ী প্রযুক্তির প্রবেশ: বিশ্বায়নের ফলে ভারত উন্নত দেশগুলি থেকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আমদানি করতে এবং পুনর্নবিকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে উৎসাহী করেছে। এর মাধ্যমে পরিবেশদূষণের মতো চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করার উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে।

③ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: বিশ্বায়ন ভারত এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে পরিবেশগত বিষয়গুলিতে সহযোগিতার পথকে মসৃণ ও প্রশস্ত করেছে। জাতিপুঞ্জের পরিবেশগত কর্মসূচি বা UNEP কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগগুলিতে ভারত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে মোদিজি আন্তর্জাতিক সৌরজোট গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সৌরশক্তির দক্ষ ব্যবহার সুনিশ্চিত করা। বর্তমানে এই জোটে ১২০টি রাষ্ট্র একত্রিত হয়েছে।

নেতিবাচক প্রভাব : বিশ্বায়নের ফলে ভারতের পরিবেশের উপর যেসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেগুলি হল-

① পরিবেশদূষণ: বিশ্বায়নের ফলে ভারতে পরিবেশদূষণের মাত্রা অনেকটাই বেড়ে গেছে। এর ফলে বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাগুলি ভারতে যেসব শিল্প গড়ে তুলেছে তার ফলে পরিবেশ যথেষ্টভাবে। দূষিত হচ্ছে। বস্তুত ভারতে পরিবেশের ব্যাপারে কোনো কঠোর আইন না থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলি খুব সহজেই এখানে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প গড়ে তুলছে এবং শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে ও জলাভূমি বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান বাজার ও অন্যান্য কারণে প্লাসটিক বর্জ্য যেভাবে জমে উঠেছে তা পরিবেশের পক্ষে রীতিমতন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

② চাষাবাদের দেশীয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন: বিশ্বায়নের প্রভাবে ভারতে চাষাবাদের দেশীয় পদ্ধতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এর ফলে কৃষিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বায়নের দরুন বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলি রাসায়নিক সার, কীটনাশক, উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যাবসায় একচেটিয়া বাজার গড়ে তুলেছে। ভারতের গ্রামীণ এলাকায় তারা যে কৃৎকৌশলের মাধ্যমে কর্পোরেট ব্যাবসার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে তাতে দেশীয় প্রথায় চাষবাসের পদ্ধতি প্রায় ধ্বংসের মুখে।

③ জলবায়ু পরিবর্তন: বিশ্বায়নের ফলে জীবনযাপনের আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কর্পোরেট দুনিয়ার ভোগ্যপণ্যের বাজার যেভাবে দ্রুতগতিতে বিস্তৃতি লাভ করে চলেছে তাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসি মেশিন ও রেফ্রিজারেটর ব্যবহারের ব্যাপক বৃদ্ধি, শিল্প ও পরিবহনের কার্বন নিঃসরণের মাত্রা আগের চেয়ে বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনে লক্ষ করা যাচ্ছে।

উপসংহার: বিশ্বায়নের ফলে ভারতের সার্বিক উন্নতি হলেও পরিবেশ ও সামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। বিশ্বায়ন ও নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ বেড়েছে, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment