শিখন (প্রথম অধ্যায়) প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার শিক্ষাবিজ্ঞান | Shikhon Long Question Answer | Class 12 Semester 4th Education

১। শিখনের সংজ্ঞা দাও। শিখনের বৈশিষ্ট্য লেখো।
শিখনের সংজ্ঞা:
শিখন একটি মানসিক প্রক্রিয়া যা পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে দৈহিক ও মানসিকভাবে সংগতিবিধানে সাহায্য করে ও জন্মের পর থেকে এই শিখন আমৃত্যু চলতে থাকে।
(১) মানাবিদ উডওয়ার্থ (Woodworth): মনোবিদ উডওয়ার্থ-এর মতে, চাহিদার বস্তু বা লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার সঠিক বন্ধন সৃষ্টির কৌশলই হল শিখন।
(২) এইচ পি স্মিথ (HP Smith): এইচ পি স্মিথ-এর মতে, শিখন হল অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতি হিসেবে নতুন আচরণ আয়ত্তীকরণ অথবা পুরাতন আচরণের দৃঢ়ীকরণ বা শিথিলকরণের প্রক্রিয়া।
(৩) কো এবং কো (Crow & Crow): ক্রো এবং ক্রো-এর মতে, শিখন হল অভ্যাস, মনোভাব গঠন এবং জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া।
কার্যকরী সংজ্ঞা: পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে সার্থক সংগতিবিধানের উদ্দেশ্যে অতীত অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আচরণধারার পরিবর্তনের প্রক্রিয়াই হল শিখন।
শিখনের বৈশিষ্ট্য
(১) বিকাশের প্রক্রিয়া: শিখন বলতে কোনো আচরণ সম্পাদনের ক্ষমতাকে বোঝায় না। শিখন হল ব্যক্তি বা শিশুর এমন এক বিকাশের প্রক্রিয়া, যার দ্বারা তার আচরণের উৎকর্ষ সাধন হয়।
(২) ভাভিজ্ঞতানির্ভর ও অভিযোজনমূলক: বর্তমান শিখনের মূল ভিত্তি হল অতীতের অভিজ্ঞতা। আর এই শিখনলব্ধ অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনে সাহায্য করে।
(৩) চাহিদানির্ভর ও উদ্দেশ্যমুখী: শিখন প্রক্রিয়ার দ্বারা ব্যক্তির চাহিদাপূরণ হয়। আর যেহেতু কোনো উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য আমরা শিখতে চাই, তাই এটি উদ্দেশ্যমুখী প্রক্রিয়া।
(৪) অনুশীলননির্ভর: শিখনের জন্য অভিজ্ঞতার অনুশীলন খুব জরুরি। অনুশীলন যত বেশি শিখনলব্ধ হবে, অভিজ্ঞতার সংরক্ষণ তত বেশি হবে।
(৫) প্রেষণানির্ভর ও আত্মসক্রিয়তাকেন্দ্রিক ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ ইচ্ছা হলপ্রেষণা, যা ব্যক্তিকে কোনো কাজে প্রেরণা দেয় ও সে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে ব্যক্তি তথা শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মসক্রিয়তা দেখা যায় ও সে নতুন আচরণ আয়ত্ত করতে নানান প্রচেষ্ঠা চালায়। ফলে শিখন সম্ভব হয়।
(৬) নিরবচ্ছিন্ন: শিশুর জন্মের পর থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং চলে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। অর্থাৎ শিখন হল জীবনব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।
(৭) সঞ্চালনমূলক ও স্থায়ী পরিবর্তন: শিখনলব্ধ অভিজ্ঞতা এক পরিস্থিতি থেকে অন্য পরিস্থিতিতে সঞ্চালিত হয়। আর শিখনের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আচরণের স্থায়ী পরিবর্তন হয়।
(৮) সর্বজনীন: মানুষ ছাড়াও অন্যান্য সকল প্রাণী শিখনের মাধ্যমে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করতে সমর্থ হয় এবং তারা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। তাই শিখন হল একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়া।
(৯) আচরণের উৎকর্ষসাধন: শিখনের ফলে কর্মসম্পাদনের ক্ষমতা উন্নততর হয়। পুরাতন আচরণ সমস্যাসমাধানে বা পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত হয়ে পড়লে, সমস্যাসমাধানের জন্য বা সার্থক অভিযোজনের জন্য পুরাতন আচরণের পরিবর্তনসাধন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। অর্থাৎ আচরণের উৎকর্ষসাধন ঘটে শিখনের মাধ্যমে।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, শিখন হল উদ্দেশ্যমূলক, সচেতন এবং ব্যক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া।
২। পরিণমন কাকে বলে? শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের ভূমিকা আলোচনা করো।
পরিণমনের সংজ্ঞা: পরিণমন একটি অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তির মধ্যে সংঘটিত হয় কোনো বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাব ছাড়াই। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিকাশ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়, তাকে অন্তর্জাত বৃদ্ধি হল পরিণমন। কোলেসনিক-এর মতে, ‘জন্মগত সম্ভাবনাগুলি স্বাভাবিকভাবে প্রস্ফুটিত হওয়ার ফলে শিশুর আচরণের গুণগত এবং পরিমাণগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়াই হল পরিণমন।’ থম্পসনের মতে, পরিণমন প্রক্রিয়া হল একটি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিশু একজন পরিণত মানুষরূপে গড়ে ওঠে। মনোবিদ স্কিনারের মতে, পরিণমন হল একধরনের বিকাশ, যা পরিবেশগত অবস্থার ব্যাপক তারতম্য থাকলেও মোটামুটিভাবে নিয়মমাফিক সংঘটিত হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের ভূমিকা:
(1) দৈহিক ও মানসিক প্রক্রিয়া: শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশের দ্বারা তার পরিণমনের প্রকাশ ঘটে। এর ফলে শিশুর ভাষার বিকাশ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ ঘটে। শিশু পাঠগ্রহণে সক্ষম হয়।
(2) শিখনের গতি ও সীমা নির্ধারণ: শিখনের গতি ও সীমা নির্ধারণে পরিণমনের ভূমিকা লক্ষ করা যায়। নির্দিষ্ট পরিণমনের পর শিশুর শিখন শুরু হয় এবং তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলতে থাকে। পরিণমনই ঠিক করে দেয় কোন্ সময়ে কোন্ ধরনের শিখন সার্থক ও সফল হবে।
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
(3) ভাষাবিকাশ: শিক্ষার্থীর ভাষাবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পরিণমন। উপযুক্ত পরিণমন ছাড়া কখনোই শিক্ষার্থীর ভাষাবিকাশ সম্ভব নয়।
(4) জ্ঞানেন্দ্রিয় এ কার্মন্দ্রিয়ের সমন্বয়: শিক্ষার্থীর সার্থক বিকাশের উপর নির্ভর করে জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়ের সমন্বয়সাধন, যা শিক্ষার্থীকে যে-কোনো বিষয় শিখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
(5) পরিণমনের ধরন নির্ধারণ: অনেকক্ষেত্রে শিখন পরিণমনের ধরন নির্ধারণ করে। যেমন- কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাঠ্যের বিষয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে শিশুদের ইন্দ্রিয়সমূহকে পরিমার্জনের শিক্ষা দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে পরিণমন শিখন দ্বারা নির্ধারিত হয়।
(6) জীবনবিকাশ: শিক্ষার্থীদের জীবনবিকাশে শিখন গুরুত্বপূর্ণ। আর শিখনকে ফলপ্রসূ করতে পরিণমনের বিকাশ আবশ্যক।
(7) পরিকল্পনামাফিক পাঠ ও শিক্ষা পরিকল্পনা: সঠিক পরিণমন না হলে শিক্ষার্থীদের পাঠগ্রহণে সমস্যা হয়। তাই উপযুক্ত পরিণমনের উপর নির্ভর করে পাঠক্রম রচনা ও শিক্ষা পরিকল্পনা করা হয়।
(8) পরিণমনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা: শৈশব, বয়ঃসন্ধি এইসব পর্যায়ে সঠিক পাঠক্রম রচনার জন্য পরিণমনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন।
(9) শিখন ত্বরান্বিতকরণ: পরিণমন শিখনকে ত্বরান্বিত করে। শিক্ষার্থীর উপযুক্ত পরিণমন হলে যে-কোনো বিষয় অতি দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে।
(10) আত্মপ্রত্যয় ও শিখন প্রচেস্টার কার্যকারিতা বৃদ্ধি: পরিণমনের পর্যায়ের প্রতি লক্ষ রেখে শিখন পরিকল্পনা করলে শিখন ফলপ্রসূ হয় ও আত্মপ্রত্যয় বাড়ে। অন্যদিকে শিখন প্রচেষ্টাকে কার্যকরী করতে পরিণমনজনিত ফল পরবর্তী শিখনে শিক্ষার্থীকে আগ্রহী করে।
(11) অধিক সুফল ও উন্নত আচরণ: নির্দিষ্ট বয়সে শিক্ষারম্ভ হলে অল্প শ্রমে অধিক সুফল মেলে ও শিক্ষার্থীরা জটিল সম্যসার সমাধান করে উন্নত আচরণ করে।
৩। প্রেষণার বৈশিষ্ট্য লেখো। প্রেষণার প্রকারভেদ আলোচনা করো।
প্রেষণার বৈশিষ্ট্য:
(১) চাহিদানির্ভর প্রক্রিয়া: বিশেষ চাহিদাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ বস্তুর চাহিদা বা অভাববোধ হল প্রেষণা সৃষ্টির মূল উৎস।
(২) আচরণের গতিপথ নির্ধারক: প্রেষণা আচরণের গতিপথ নির্দেশ করে। প্রেষণা আচরণের জন্য শক্তি, সামর্থ্য, দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে, যা শিখনের জন্য একান্তভাবে প্রয়োজনীয়।
(৩) অভ্যন্তরীণ মানসিক প্রক্রিয়া: প্রেষণা হল একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক প্রক্রিয়া। দেহের অভ্যন্তরীণ কারণে প্রেষণা সৃষ্টি হয়, যার ফলে ব্যক্তির আচরণের উদ্দেশ্যমুখী পরিবর্তন ঘটে।
(৪) লক্ষ্যমুখী প্রক্রিয়া: প্রেষণাকে আশ্রয় করে শিক্ষার্থী তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে সমর্থ হয়। অর্থাৎ প্রেষণার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লক্ষ্যবস্তু প্রাপ্তি। প্রত্যেক প্রেষণা শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য সম্পর্কে সজাগ করে।
(৫) ধারাবাহিক প্রক্রিয়া: প্রেষণা একটি ধারাবাহিক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। ব্যক্তির একটি প্রেষণা পূরণ হলে পরমুহূর্তে অপর একটি প্রেষণার সৃষ্টি হয়।
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপ(৬) ভারসাম্য রক্ষা: প্রেষণা ব্যক্তিজীবনে ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। দৈহিক, মানসিক এবং সামাজিক চাহিদাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিজীবনে যে দৈহিক বা মানসিক পরিবর্তন ঘটে, চাহিদা পরিতৃপ্তির মাধ্যমে তার ভারসাম্য ফিরে আসে। অর্থাৎ ব্যক্তিজীবনে অস্থিরতা দূর করার জন্য প্রেষণার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
(৭) নির্বাচনধর্মী প্রক্রিয়া: প্রেষণা একটি নির্বাচনধর্মী মানসিক প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট বস্তুকে কেন্দ্র করে প্রেষণা জাগ্রত হয়। যেমন- গৃহহীন ব্যক্তি আশ্রয়ের অন্বেষণ করে।
(৮) মানসিক শক্তির সমন্বিত রূপ: প্রেষণার সঙ্গে কতকগুলি মানসিক শক্তি যুক্ত থাকে, সেগুলি হল- চাহিদা, তাড়না, আগ্রহ, পুরস্কার ইত্যাদি।
(৯) কর্মের মানোন্নয়ন: প্রেষণা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীকে কর্মে নিয়োজিত করে না, কর্মের মানোন্নয়ন ঘটায়।
(১০) আগ্রহবর্ধক: সবশেষে বলা যায়, প্রেষণা শিক্ষায় শিক্ষার্থীর আগ্রহ সৃষ্টি করতে এবং আগ্রহ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
(১১) শিখনের মূল শক্তি: মনোবিদ ক্রো এবং ক্রো (Crow and Crow)-এর মতে, প্রেষণা হল এমন এক শক্তি, যা শিখনের প্রতি আগ্রহ জাগায়। তাই প্রেষণা হল শিখনের মূল শক্তি।
প্রেষণার প্রকারভেদ: প্রেষণাকে মনোবিজ্ঞানীগণ প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন।
(১) জৈবিক বা শারীরবৃত্তীয় প্রেষণা (Biological Motivation or Physiological Motivation): ব্যক্তির জৈবিক বা শারীরবৃত্তীয় চাহিদাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয় প্রেষণার সৃষ্টি হয়, তাকে জৈবিক বা শারীরবৃত্তীয় প্রেষণা বলে। জল, আলো, বাতাস, খাদ্য, মাতৃত্ব, যৌনতা ইত্যাদি জৈবিক চাহিদাকে কেন্দ্র করে এই জাতীয় প্রেষণা জাগ্রত হয়। বাঁচার তাগিদে এই প্রেষণার পরিতৃপ্তি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখে, দৈহিক সুস্থতা বজায় রাখে।
(২) ব্যক্তিগত প্রেষণা (Personal Motivation): ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তাকে কেন্দ্র করে যে ধরনের প্রেষণা কার্যকরী হয়, তাকে ব্যক্তিগত প্রেষণা বলে। মানুষের আত্মসচেতনতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় মানসিক চাহিদা (Psychological need) এবং এই চাহিদাগুলির সঙ্গে যুক্ত প্রেষণা হল ব্যক্তিগত প্রেষণা। মনোবিদ ম্যাসলো (Maslow)-র মতে, মানসিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির মধ্যে আত্মশ্রদ্ধার প্রেষণার (Need for self-esteem) উন্মেষ ঘটে। এই প্রেষণা ব্যক্তিকে তার আত্মমর্যাদা রক্ষার অনুকূলে আচরণ করতে উদ্যত করে। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত প্রেষণা যা সকলের মধ্যে দেখা যায়, সেগুলি হল- আগ্রহ, মনোভাব, মূল্যবোধ, আত্মসচেতনতা, আত্মপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। শিশুদের আত্মসচেতনতা ব্যক্তিগত প্রেষণা জাগ্রত করে। বাবা, মা এবং অন্যান্য গুরুজনদের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিস্তৃতি ঘটে। তার ফলে প্রেষণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রভাবিত হয়।
(৩) সামাজিক প্রেষণা (Social Motivation): সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে সুস্থ-সামাজিক জীবনযাপনের জন্য নিরাপত্তা, ভালোবাসা, আত্মপ্রতিষ্ঠা, খ্যাতির স্পৃহা প্রভৃতি সামাজিক চাহিদাগুলিকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যে ধরনের প্রেষণা কার্যকরী হয়, তাকে সামাজিক প্রেষণা বলে। সামাজিক প্রেষণা সামাজিক পরিবেশ থেকে অর্জিত হয় এবং ব্যক্তির সামাজিক বিকাশে সাহায্য করে। অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার প্রভাবে সামাজিক প্রেষণা বিকশিত হয়। শিশুর জীবনে এইসকল সামাজিক প্রেষণা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এইসকল সামাজিক প্রেষণা সামাজিক পরিণমনের সূচক।
৪। শিখণের ক্ষেত্রে প্রেষণার ভূমিকা কী? শিক্ষার্থীর মধ্যে শিখনের প্রেষণা সৃষ্টিতে শিক্ষকের ভূমিকা আলোচনা করো।
শিখনে প্রেষণার ভূমিকা: শিখন হল ব্যক্তির আচরণ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। ব্যক্তিকে পরিবর্তনশীল পরিবেশে সার্থকভাবে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়, যা আচরণধারায় পরিবর্তন ঘটায়, তাই হল শিখন। শিখনে প্রেষণার ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই ভূমিকাগুলি হল-
[1] উদ্যম সৃষ্টি: প্রেষণার মাধ্যমে ব্যক্তি বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্যম সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এই উদ্যম শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়।
[2] আচরণের প্রবণতা নির্ধারণ: শিক্ষার্থীদের আচরণের প্রকৃতি নির্বাচনধর্মী। সকল শিক্ষার্থীদের বিষয় বা বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে আচরণের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রেষণা সৃষ্টি এমন হওয়া দরকার, যাতে শিক্ষার্থী তাদের প্রবণতা অনুযায়ী শিখতে পারে।
[3] আগ্রহ সৃষ্টি: শিক্ষার্থীদের বিশেষ বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে প্রেষণার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
[4] মনোযোগী করে তোলা: প্রেষণা শিক্ষার্থীকে শিখনে মনোযোগী করে তোলে এবং এর ফলে শিক্ষার্থীর বিষয় সম্পর্কে শিখন নিখুঁত হয়।
[5] লক্ষ্যাভিমুখী: শিক্ষার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে গেলে শিখনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী করা প্রয়োজন এবং এই কাজে প্রেষণার গুরুত্ব রয়েছে।
[6] ব্যস্তিত্বের উন্মেষ: প্রেষণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটাতে পারে। শিক্ষার্থীর শিখন ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটানোর উপযোগী হওয়া প্রয়োজন।
[7] শিখন কৌশল: প্রেষণা শিক্ষার্থীর শিখন কৌশলকে প্রভাবিত করে। শিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতিটি অভিজ্ঞতা যাতে অর্থপূর্ণ হয়, সেইদিকে লক্ষ রেখে শিখন কৌশল তৈরি হওয়া দরকার।
[8] যথাযথভাবে কর্ম সম্পাদন: প্রেষণার ফলে ব্যক্তি কেবলমাত্র কোনো কাজে অগ্রসর হয় তাই নয়, বরং কাজটিকে যাতে সঠিকভাবে সম্পাদন করা যায়, সেই বিষয়ে যথাযোগ্য শিখনের চেষ্টা করে। যথাযোগ্য শিখনের জন্য প্রয়োজন প্রেষণার।
[9] আচরণের গতিপথ নির্ণয়: শিক্ষার লক্ষ্যে পৌঁছোতে গেলে উপযুক্ত আচরণের গতিপথ অনুযায়ী শিখন সঞ্চালিত হওয়া প্রয়োজন। শিখনের আচরণের সঠিক গতিপথ নির্ণয়ে প্রেষণার ভূমিকা রয়েছে।
[10] দক্ষতা সম্বাষ আত্মবিশ্বাস: দক্ষতা সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে প্রয়োজন যথাযথ শিখনের। আবার আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে প্রেষণার প্রয়োজন হয়। তাই দক্ষতাজনিত শিখনে প্রেষণার ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টিতে শিক্ষকের ভূমিকা:
[1] পুরস্কার: প্রেষণা সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত (মূর্ত) মাধ্যম হল পুরস্কার। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টির জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে পারেন। এই প্রসঙ্গে মনোবিদ বার্নার্ড-এর মত হল, শিখনের জন্য পুরস্কার এরূপ হাওয়া উচিত, যাতে সেগুলি প্রাথমিক ভূমিকার পর শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর শিখনের কার্যাবলিকে পরিচালিত করবে।
[2] লক্ষ্য স্থির: প্রেষণা লক্ষ্যের অভিমুখকে নির্দেশ করে। প্রেষণা লক্ষ্যস্তরে পৌঁছোতে সাহায্য করে। শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত হবেন, তারপর সেই লক্ষ্যপথে চলার জন্য প্রেষণার জোগান দেবেন।
[3] শাস্তি ও নিন্দা: অনেকসময় শাস্তি অনেক খারাপ আচরণ থেকে শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করে। অন্যদিকে নিন্দায় ব্যক্তিত্বের অসামঞ্জস্যতা লক্ষ করা যায়। তাই শিক্ষক খুব সতর্কভাবে এইসকল উদ্বোধকগুলি ব্যবহার করবেন।
[4] ঘাটতিপূরণ: কোনো শিক্ষার্থীর যে বিষয়ে দুর্বলতা বা ঘাটতি লক্ষ করা যাবে, সেই বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকার দ্বারা সৃষ্ট উদ্দীপনায় সঠিক সাড়া আসবে।
[5] প্রশংসা: প্রশংসাও একপ্রকার অমূর্ত পুরস্কার। প্রশংসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রেষণা সঞ্চার করে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক মহাশয় শিক্ষার্থীদের ছোটো ছোটো সাফল্যের প্রশংসা করলে তারা উজ্জীবিত হবে এবং যে-কোনো কাজের প্রতি উৎসাহ দেখাবে।
[6] প্রতিলিপির ব্যবহার: শিক্ষার্থীদের নিকট উদাহরণ হিসেবে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতিলিপি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রেষণার সঞ্চার ঘটে।
[7] উচ্চাকাঙ্ক্ষা: উচ্চাকাঙ্ক্ষা জীবনে সাফল্য আনে। তাই শিক্ষকের কাজ হবে শিক্ষার্থীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্তরটিকে উন্নত করা। শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রেষণা জাগ্রত করতে হলে পাঠক্রমে এমন বিষয়বস্তু নির্বাচন করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতার আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত হয়।
[8] মূল্যায়নের ব্যবস্থা: মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আত্মসংশোধনের সুযোগ পায়। তাই শিক্ষক যদি অল্প সময়ের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা দান করতে পারেন বা ধারাবাহিক উন্নতির মূল্যায়ন করতে পারেন তাহলে শিক্ষার্থীর মনে প্রেষণার উন্মেষ ঘটে।
[9] সহাযাগিতা ও প্রতিযোগিতা: পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টি করে। মনোবিদ সাইমন্ড-এর মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, সামাজিক বাস্তবের আঙিনায় মাধুর্যপূর্ণ সুযোগসুবিধা দান করে। এইজন্য বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকারা দলগত কাজের ব্যবস্থা করতে পারেন।
৫। স্মৃতি বা স্মরণক্রিয়ার শ্রেণীবিভাগ আলোচনা করো।
স্মৃতির শ্রেণিবিভাগ:
[1] ইন্দ্রিয়জাত স্মৃতি:
ইন্দ্রিয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্মৃতিকে ইন্দ্রিয়জাত স্মৃতি বলে। প্রত্যেক্ষণের বিভিন্নতা অনুযায়ী, এই স্মৃতিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
দর্শনগত স্মৃতি (Visual Memory): দর্শন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা স্মৃতিকে দর্শনগত স্মৃতি বলে। এইপ্রকার স্মৃতি দর্শনগত প্রত্যক্ষণের প্রভাবে ঘটে। যাদের দর্শনগত স্মৃতি প্রখর, তারা দর্শন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
শ্রবণগত স্মৃতি (Auditory Memory): শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা স্মৃতিকে শ্রবণগত স্মৃতি বলে। এই ধরনের স্মৃতি শ্রবণগত প্রত্যক্ষণের প্রভাবে ঘটে থাকে।
ঘ্রাণজাত স্মৃতি (Olfactory Memory): ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা স্মৃতিকে ঘ্রাণজাত স্মৃতি বলে। এই জাতীয় স্মৃতি ঘ্রাণগত প্রত্যক্ষণের প্রভাবে ঘটে থাকে।
স্পর্শগত স্মৃতি (Tactual Memory): এই জাতীয় স্মৃতি স্পর্শগত প্রত্যক্ষণের প্রভাবে ঘটে থাকে।
স্বাদমূলক স্মৃতি (Gustatory Memory): এই জাতীয় স্মৃতি স্বাদেন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের প্রভাবে ঘটে থাকে।
[2] ইচ্ছাজাত স্মৃতি:
ইচ্ছাজাত স্মৃতির দুটি ভাগ, যথা-
সক্রিয় স্মৃতি (Active Memory): যখন শিক্ষার্থী মনে রাখার জন্য তার নিজস্ব মানসিক ইচ্ছাশক্তিকে প্রয়োগ করে, তখন তাকে সক্রিয় স্মৃতি বলে।
নিষ্ক্রিয় স্মৃতি (Passive Memory): যখন মনে রাখার জন্য শিক্ষার্থীর মানসিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না, তখন তাকে নিষ্ক্রিয় স্মৃতি বলে।
[3] অভিজ্ঞতা অনুযায়ী স্মৃতি:
এই প্রকার স্মৃতিরও দুটি ভাগ-
ব্যক্তিগত স্মৃতি (Personal Memory): এই জাতীয় স্মৃতি ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষণের প্রভাবে ঘটে থাকে।
নৈর্ব্যক্তিক স্মৃতি (Impersonal Memory): বস্তুগত প্রত্যক্ষণের প্রভাবে গড়ে ওঠা স্মৃতিকে নৈর্ব্যক্তিক স্মৃতি বলে।
[4] স্থায়িত্ব অনুযায়ী স্মৃতি:
স্থায়িত্ব অনুযায়ী স্মৃতির দুটি ভাগ। যথা-
তাৎক্ষণিক স্মৃতি (Immediate Memory): শিখনের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে স্মরণ করাকে তাৎক্ষণিক স্মৃতি বলে।
এই প্রকার স্মৃতি সংরক্ষণের স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করে। এই স্মৃতিতে সংরক্ষণের স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড মাত্র হয়। পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা এইরূপ স্মৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এর ফলে পরীক্ষা দেওয়ার পর এটি বিস্মৃত হয়।
দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি (Long term Memory): পূর্ব অভিজ্ঞতা যখন দীর্ঘ সময় ধরে স্মৃতিতে সঞ্চিত থাকে, তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি বলে।
[5] সংগঠনগত:
সংগঠনগত স্মৃতি দুই প্রকারের-
ক্ষণস্থায়ী স্মৃতি (Temporary Memory): এই প্রকার স্মৃতি কোনো মানসিক সংগঠন গড়ে তোলে না। এই স্মৃতির মাধ্যমে সংরক্ষিত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে সচেতন থাকে।
স্থায়ী স্মৃতি (Permanent Memory): এই স্মৃতির অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন মস্তিষ্কে সংরক্ষিত হয়। এই স্মৃতির অভিজ্ঞতা ক্ষণস্থায়ী স্মৃতি থেকে আসে।
[6] শিখন কৌশলগত স্মৃতি:
মনোবিদ Bargson (বার্গস) কৌশলগত স্মৃতিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-
অভ্যাসগত স্মৃতি বা যান্ত্রিক স্মৃতি (Habit Memory or Rote Memory): অভ্যাসবশত আমরা যখন কোনো ঘটনাকে স্মরণ করি, তখন তাকে অভ্যাসগত স্মৃতি বলে। পুনঃপুন চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তি এই স্মৃতি যখন না বুঝে আরও করে, তখন বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে শিখন হয় বলে এটিকে যান্ত্রিক স্মৃতি বলে।
প্রকৃত বা যৌক্তিক স্মৃতি (True Memory or Logical Memory): অন্যদিকে বিষয়বস্তুর অর্থ উপলব্ধি করে মানসিক কল্পনার সাহায্যে আমরা যখন কল্পনা করি, তখন তাকে প্রকৃত স্মৃতি বা যৌক্তিক স্মৃতি বলে। এক্ষেত্রে যুক্তিশক্তিরও প্রয়োজন হয়।
৬। বিস্মৃতি বা বিস্মরণ কী? বিস্মরণের কারণগুলি আলোচনা করো।
বিস্মৃতি বা বিস্মরণ: বিস্মৃতি বা বিস্মরণ (Forgetting)-এর সাধারণ অর্থ হল কোনো জিনিস ভুলে যাওয়া, মনে করতে না পারা। পূর্বে শেখা বিষয়কে আমরা অনেকসময় নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে মনে করতে পারি না, একে বলে বিস্মৃতি। এটি হল স্মৃতির ক্ষয়প্রাপ্তি, এখানে যতটুকু মনে থাকে না, সেটি হল ক্ষয়প্রাপ্তি বা বিস্মৃতির পরিমাণ।
মনোবিদদের প্রদত্ত সংজ্ঞা: মনোবিদ রিবোঁ (Ribot) বলেছেন যে, স্মৃতির অপরিহার্য শর্ত হল বিস্মৃতি। মান (Munn) বলেছেন, পূর্বার্জিত কোনো বিষয়কে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে স্মরণ করার অক্ষমতাকেই বিস্মরণ বলে। মনোবিদ ড্রেভার (Drever) বলেছেন, কোনো সময়ে পূর্বার্জিত কোনো কাজ পুনরায় সম্পন্ন করার ব্যর্থতাকে বিস্মৃতি বলে। মনোবিদ ভাটিয়া (Bhatia)-র মতে, মূল উদ্দীপকের সাহায্যে কোনো ভাবনা বা ভাবনাগুলিকে চেতনমনে নিয়ে আসার ব্যর্থতাই হল ভুলে যাওয়া। মনোবিজ্ঞানী রস বলেন, অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক, বেদনাদায়ক যাইহোক-না-কেন তাতে যদি আমাদের প্রক্ষোভ বা অনুভূতির স্পর্শ লেগে থাকে, তবে তা বেশিদিন মনে থাকবে।
বিস্মৃতির কারণ: এবিংহস-এর পরীক্ষার মধ্য দিয়েই আমরা বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার কারণগুলির ব্যাখ্যা দিতে পারি, কারণগুলি নিম্নরূপ-
[1] চর্চার অভাব: ‘অনভ্যাসে বিদ্যাহ্রাস’- কথাটি আমরা প্রায় সকলেই জানি। সাধারণত যে বিষয়গুলি শেখার পর আমরা মাঝে মাঝে চর্চা করে থাকি, সেগুলি আমরা মনে রাখতে পারি। কিন্তু কোনোকিছু শেখার পর দীর্ঘদিন যদি তার চর্চা না করা হয়, তাহলে তার বিস্মরণ ঘটে।
[2] বিষয়বস্তুর প্রকৃতি: বিষয়বস্তুর প্রকৃতির উপর মনে রাখা বা ভুলে যাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে। এবিংহসের পরীক্ষা থেকে জানা যায়-অর্থহীন শব্দ তালিকা, গদ্য, কবিতা ও অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে শেখা বিষয়বস্তুর মধ্যে অর্থহীন শব্দতালিকার ক্ষেত্রে বিস্মরণের হার সবচেয়ে বেশি।
[3] শিখনের মাত্রা: প্রত্যেকটি বিষয় শেখার একটি মাত্রা থাকে, যেখানে পৌঁছালে শিখন সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে শেখার পরেও যদি চর্চা করা হয়, তাহলে তাকে অতিশিখন বলে। অতিশিখনের ফলে বিস্মরণ কম ঘটে। আবার বিষয়টির শিখন যদি সম্পূর্ণ না হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে বিস্মরণ বেশি পরিমাণে ঘটে থাকে।
[4] অবদমন: ‘ফ্রয়েড’-এর মতে, অবদমন হল বিস্মরণের মূল কারণ। যা আমরা চাই না, যা অসামাজিক বা আমাদের কাছে অপ্রিয় তাকে আমরা তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে চাই। শিক্ষাবিদ নান বলেছেন, আমরা সুখকর ঘটনা মনে রাখি, অপ্রিয় ঘটনা ভুলে যাই। কিন্তু আবার মেল্টজার, রস, স্ট্যাগনার প্রমুখ মনোবিজ্ঞানী বলেন- অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক বা বেদনাদায়ক যাই হোক না কেন, তাতে যদি আমাদের প্রক্ষোভ বা অনুভূতির স্পর্শ লেগে থাকে, তা হলে তা আমাদের ভুলতে অনেক সময় লাগে।
[5] পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ: কোনো বিষয় ভালোভাবে শেখার আগে যদি অন্য কোনো সদৃশ বিষয়বস্তু শিখতে যাই, তবে দ্বিতীয় বিষয়টি প্রথমে শেখা বিষয়টির কিছু অংশ ভুলিয়ে দেয়। এই মানসিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ। প্রদত্ত চিত্রে দেখা যায়, প্রথমে একটি অভিজ্ঞতা আয়ত্তের পর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়, এইরূপ অভিজ্ঞতা আয়ত্ত করলে তৃতীয় পর্যায়ে এসে দেখা যায় প্রথম অভিজ্ঞতার অনেকটা ও দ্বিতীয় অভিজ্ঞতার খানিকটা অংশ বিস্মৃত হয়েছে।
পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ
[6] নেশাকারক দ্রব্য: দীর্ঘদিন ধরে নেশার বস্তু ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোশগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে। স্মরণক্রিয়া হল মস্তিষ্কজনিত প্রক্রিয়া। তাই নেশাকারক বস্তু গ্রহণে মস্তিষ্কের স্মরণ চিহ্ন অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং বিস্মৃতি ঘটে।
[7] আবেগজনিত প্রতিরোধ: তীব্র আবেগমূলক পরিস্থিতিতে খুব ভালো করে শেখা বিষয়গুলিকেও মনে করতে কষ্ট হয়। ভয়, রাগ, দুঃখ, লজ্জা ইত্যাদি প্রক্ষোভ তীব্রমাত্রায় দেখা দিলে বিস্মরণের মাত্রা বেড়ে যায়।
[8] পরিবর্তিত পরিবেশ: যে পরিবেশে আমরা শিখে থাকি, সেই পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানগুলি স্মরণের সহায়ক। পরিবর্তিত পরিবেশে এইসব উপাদানের অভাবে শেখা জিনিস আমরা মনে করতে পারি না। সেই কারণে বাড়িতে ভালো করে তৈরি করা প্রশ্নোত্তর পরীক্ষার হলে অনেকসময় ভুলে যাই।
[9] আঘাতজনিত বিস্মরণ: সংরক্ষণ নির্ভর করে মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্কে কোনো কারণে আঘাত লাগলে সাময়িকভাবে স্মৃতি নষ্ট হয়।
[10] তীব্র শোক: তীব্র শোকের ফলে ব্যাক্তির স্মৃতি সম্পূর্ণ লোপ পায়। একে ‘অ্যামনেশিয়া’ বলে।
৭। কল্পনা কাকে বলে? কল্পনার শ্রেণীবিভাগ করে বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো।
কল্পনা: কল্পনা হল সেই মানসিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের মনের মধ্যে অবস্থিত প্রতিরূপগুলিকে ইচ্ছামতো সাজিয়ে নিয়ে নব-নব মানসিক অভিজ্ঞতা বা ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে। অর্থাৎ যে অতীত অভিজ্ঞতা বিবর্জিত কল্প আমাদের মনে সৃষ্টি হচ্ছে, তাকে বলা হয় কল্পনার কল্প (Image of Imagination), আর এই কল্পনাগত কল্প সৃষ্টির জন্য যে মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে, তাকে বলা হয় কল্পনা বা কল্পন প্রক্রিয়া (Imagination)।
এই অর্থে কল্পনা হল এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া, যার দ্বারা আমরা অতীত অভিজ্ঞতা ও ধারণার যথেচ্ছ সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন ধারণা বা অভিজ্ঞতার কল্প সৃষ্টি করি।
কল্পনার শ্রেণিবিভাগ: কল্পনাকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়-
[1] নিষ্ক্রিয় কল্পনা: যখন আমরা নিষ্ক্রিয় থাকি, তখন তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঘটনার ভাবমূর্তি বা প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে, যা কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যায় এবং এদেরকে মনে আনার জন্য চেষ্টা করি না, এই ধরনের কল্পনা হল নিষ্ক্রিয় কল্পনা। যেমন- দিবাস্বপ্ন।
[2] সক্রিয় কল্পনা: আমরা ইচ্ছে করে অনেকসময় বিভিন্ন জিনিস কল্পনা করি। এই ধরনের কল্পনা হল সক্রিয় কল্পনা। এই কল্পনা সুখকর হতে পারে, আবার দুঃখদায়কও হতে পারে। যেমন- আমি কল্পনা করলাম আমি একজন বড়ো সাহিত্যিক বা লেখক বা বিজ্ঞানী হয়েছি ইত্যাদি। যে-কোনো উদ্ভাবনী চিন্তার মধ্যে দুই ধরনের কল্পনা একসঙ্গে ক্রিয়াশীল হয়।
[3] মৌলিক কল্পনা: যখন কল্পনাকারী নিজে কল্পনার সৃষ্টি করে, তাকে মৌলিক কল্পনা বলে। কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিশু প্রমুখের কল্পনা হল মৌলিক কল্পনা।
[4] কৃত্তিম কল্পনা: অন্যের সাহায্য নিয়ে যে কল্পনা করা হয়, তাকে কৃত্রিম কল্পনা বলে। পৃথিবী একটি গ্রহ যেখানে বিভিন্ন ধরনের জীব, জন্তু, জড় পদার্থ রয়েছে, সেগুলিকে চিন্তা করে অন্য কোনো গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে কল্পনা হল কৃত্রিম কল্পনা।
[5] বিশেষ উদ্দেশ্যযুদ্ধ কল্পনা: এই ধরনের কল্পনাগুলি হল-
বৌদ্ধিক কল্পনা: কোনো জিনিসের প্রকৃত রূপ বুঝতে অনেকসময় আমরা যে কল্পনার আশ্রয় নিই, তা হল বৌদ্ধিক কল্পনা। যেমন- বিজ্ঞানীরা এই কল্পনাকে আশ্রয় নিয়ে নতুন জ্ঞানের বিষয় বুঝতে চেষ্টা করেন। নিজস্ব কল্পনা যদি বৌদ্ধিক কাজে লাগে, তাকে বৌদ্ধিক মৌলিক কল্পনা বলে। যেমন- নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আবিষ্কার। আবার বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করে কোনো বৌদ্ধিক বিষয় সম্পর্কে যে কল্পনা করা হয়, তাই হল কৃত্রিম বৌদ্ধিক কল্পনা। যেমন- রাদার ফোর্ড তত্ত্ব সম্পর্কিত কল্পনার ভিত্তিতে বোরের পরমাণু সংক্রান্ত কল্পনা হল কৃত্রিম বৌদ্ধিক কল্পনা।
সৌন্দর্যবোধক কল্পনা: যে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে নতুন শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব হয়, তাকে সৌন্দর্যবোধক কল্পনা বলে। কবি, শিল্পীদের কল্পনা হল এই ধরনের কল্পনা। সৌন্দর্যবোধ আশ্রিত কল্পনা হল মৌলিক কল্পনা। যেমন- কবি বা লেখক বিশেষ জায়গার বর্ণনা করতে গিয়ে এই ধরনের কল্পনার আশ্রয় নেন। বিভিন্ন সৌন্দর্যবোধক কল্পনাকে অনুভব করে যে নতুন ধরনের সৌন্দর্যবোধক কল্পনা করা হয়, তা হল সৌন্দর্যবোধক কৃত্রিম কল্পনা। কবি, সাহিত্যিক প্রমুখেরা এই ধরনের কল্পনা করেন।
কার্যকরী কল্পনা: যে কল্পনার সাহায্যে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা যায় তাকে কার্যকরী কল্পনা বলে। এই কল্পনার সাহায্যে ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ প্রমুখেরা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে থাকেন। যেমন-একজন ইঞ্জিনিয়ার বাঁধ তৈরি করবেন, তাই তিনি বাঁধের নকশা করেন, খরচের হিসাব করেন ইত্যাদি।
[6] বিশ্বাসজনিত কল্পনা: যে কল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে, তাই হল বিশ্বাসযোগ্য কল্পনা। যেমন- সূর্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রহগুলি ঘুরছে। তাই কাল্পনিক হলেও এর সত্যতা প্রমাণিত। তাই একে বিশ্বাসযোগ্য কল্পনা বলে। এই কল্পনার ভাগগুলি হল-
ঐতিহাসিক কল্পনা: অতীতের কোনো ঘটনা বা বস্তুকে সত্য বলে জেনে কল্পনা করলে, তা হল ঐতিহাসিক কল্পনা। যেমন- সিন্ধু সভ্যতা।
প্রতীক্ষা: কোনো দৃঢ় ধারণার বসবর্তী হয়ে আমরা অনেকসময় ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কল্পনা করি। একে বলে প্রতীক্ষা। প্রতীক্ষার জন্য দরকার- গঠনমূলক কল্পনা, ভবিষ্যতের সঙ্গে কল্পনার সংযোগ, বিশ্বাস করা কল্পনাকে সত্য করতে হবে, কল্পিত ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিজেকে প্রস্তুত করা ইত্যাদি।
বৈজ্ঞানিক কল্পনা: যে কল্পনা বৈজ্ঞানিক সত্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই হল বৈজ্ঞানিক কল্পনা। এই কল্পনা সর্বজনীন। এই কল্পনাও বিশ্বাসযোগ্য। অণুর গঠন সম্পর্কে অ্যাভোগাড্রো প্রকল্প বৈজ্ঞানিক কল্পনা।
বিশ্বাসমুক্ত কল্পনা: যে কল্পনার বাস্তব অস্তিত্ব নেই বা আমরা অনেকসময় নিজেও বিশ্বাস করি না, যেগুলি মিথ্যা বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি, এই কল্পনা হল বিশ্বাসমুক্ত কল্পনা। আমরা বিভিন্ন কাল্পনিক গল্প অবলম্বনে সিনেমা দেখি, যার বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। তাই হল বিশ্বাসমুক্ত কল্পনা।
কল্পনা প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যসমূহ:
[1] আমরা কোনো বস্তুর কল্পনা করি ভাবমূর্তির মাধ্যমে।
[2] কল্পনা প্রক্রিয়ার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে না। মনের খুব দুর্বল অবস্থায় কল্পনা সৃষ্টি হয়।
[3] এই প্রক্রিয়া কোনো যুক্তি বা বিচার-বিবেচনাভিত্তিক হয়।
[4] না। এই প্রক্রিয়ায় যে কল্পগুলি সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য থাকে
[5] কল্পনার উপাদান পূর্ব অভিজ্ঞতা হওয়ায়, কল্পগুলিকে আপাতভাবে বস্তুধর্মী মনে হয়।
[6] কল্পনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়াতীত বস্তুর অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
৮। মনোযোগ বলতে কী বোঝো? শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের ভূমিকা মূল্যায়ন করো।
মনোযোগ: কোনো বিষয়ের সঙ্গে মনের যোগকে মনোযোগ বলে। উদ্দেশ্যপূরণের জন্য যখন কোনো বস্তুকে আমরা চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে হাজির করি, তখন তাকে মনোযোগ বলে। অর্থাৎ কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সুষ্পষ্ট জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে মনকে নিবিষ্ট করার দৈহিক-মানসিক প্রক্রিয়াকে মনোযোগ বলে।
মনোবিদ ম্যাকডুগাল (McDougall): ম্যাকডুগাল-এর মতে, যে মানসিক সক্রিয়তা আমাদের প্রত্যক্ষণের উপর প্রভাব বিস্তার করে, তাকে মনোযোগ বলে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের ভূমিকা ও শিক্ষকের দায়িত্ব:
[1] ব্যক্তিগত বৈষম্য: মনোযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়, তাই ব্যক্তিগত বৈষম্যের নীতি অনুসরণে শিক্ষাক্ষেত্রে বিষয়বস্তু নির্বাচন করা হয়।
[2] মনোযোগের নির্ধারকের ব্যবহার: মনোযোগের বিভিন্ন নির্ধারকসমূহকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে শিক্ষক-শিক্ষিকা কাজে লাগান। যেমন-রঙিন পাঠ্যপুস্তকের ব্যবহার, শিক্ষাসহায়ক চার্ট ব্যবহার ইত্যাদি।
[3] উন্নত বিদ্যালয় পরিবেশ: শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ করতে উন্নত বিদ্যালয় পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। মনোরম পরিবেশ মনোনিবেশের অন্যতম হাতিয়ার।
[4] ইচ্ছাসাপেক্ষ মনোযোগ ও শিক্ষা: শিক্ষককে শিখনের উদ্দেশ্য ও ব্যাবহারিক প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত করে, সেন্টিমেন্ট সৃষ্টি করে, উপদেশ দিয়ে, প্রয়োজন হলে লঘু শাসনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণে সচেষ্ট হতে হবে।
[5] বিষয় বৈচিত্র্য : শিক্ষাদানের সময় পাঠ্যসূচির বিষয়টি নীরস হওয়ার জন্য বা অন্য কোনো কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি দেখা যায়। তাই নিরবচ্ছিন্নভাবে কোনো কিছু দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা না করে, মাঝে মাঝে শিক্ষক অন্য বিষয়ে চলে যাবেন। কঠিন ও নীরস পাঠে মনোযোগ আসে না।
[6] প্রাক্ষোভ অনুসরণ: মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক, যেমন-শিক্ষার্থীর প্রক্ষোভ, প্রবণতা, কৌতূহল প্রভৃতির দিকে লক্ষ রেখে শিক্ষাদান করা হলে শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হয়, ফলে শিক্ষার ইতিবাচক দিকগুলির বিকাশ ঘটে এবং শিক্ষা ফলপ্রসূ হয়।
[7] বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মনোযোগ: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ইচ্ছাপ্রণোদিত মনোযোগ সৃষ্টি হয়। এই অনুযায়ী শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের বিমূর্ত ভাবনার প্রতি আগ্রহী করে তুলবেন। এই ইচ্ছাপ্রণোদিত মনোযোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করবেন।
[8] মনোযোগের ক্ষেত্রসীমা: শিশুর মনোযোগের পরিসীমা যেহেতু সীমিত, তাই শিক্ষক-শিক্ষিকা লক্ষ রাখবেন যাতে পাঠক্রম দীর্ঘ না হয় এবং বিষয়বস্তুকে খন্ডীকরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করবেন।
পরিশেষে বলা যায়, মনোযোগ পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান শর্ত, শিক্ষার্থীর জৈব-মানসিক সংগঠনের উপর শিক্ষককে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর প্রতি তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক মনোযোগ সৃষ্টি হয়।
৯। শিক্ষাক্ষেত্রে আগ্রহের গুরুত্ব আলোচনা করো।
শিক্ষাক্ষেত্রে আগ্রহের ভূমিকা: আধুনিক শিক্ষায় শিশুর সামগ্রিক জীবনবিকাশে আগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলি হল-
[1] সক্রিয়তা বৃদ্ধি: আগ্রহ শিক্ষার্থীকে শিক্ষাগ্রহণে সক্রিয় করে তোলে, যে সক্রিয়তা জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
[2] নতুন কর্মে অনুপ্রেরণা: আগ্রহ শিক্ষার্থীকে নতুন নতুন কর্মে অনুপ্রেরণা জোগায়, নতুন সৃষ্টির প্রতি শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করে।
[3] প্রেষণা সঞ্চার: আগ্রহ শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষাভিমুখী প্রেষণা সঞ্চার করে শিখন প্রক্রিয়াকে অধিক ফলপ্রসূ করে।
[4] নির্দেশনা প্রদান: শিক্ষার্থীর আগ্রহ অনুশীলন করে তার ভবিষ্যৎ বৃত্তি নির্বাচনে নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যার ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনপথ সুগম হয়।
[5] অনুশীলনে সহায়তা: শিশুর আগ্রহ বৃদ্ধি পেলে অনুশীলনে সহায়ক হয়, এই অনুশীলন তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
[6] দক্ষতা বৃদ্ধি: আগ্রহের মাধ্যমে শেখা বিষয় শিক্ষার্থীর বিষয়জ্ঞান নিখুঁত করে এবং তার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে। ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পেলে সে যে-কোনো কাজ সাবলীলভাবে করতে পারে।
[7] সৃজনশীলতার বিকাশ: অনুরাগ শিশুর অন্তর্নিহিত সৃজনাত্মক ক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজে অনুপ্রেরণা জোগায়।
[8] নির্ভুল বিষয় জ্ঞান অর্জন: আগ্রহ শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষণীয় বিষয়ে নিখুঁত বা নির্ভুল জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে। ফলে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে।
[9] শিক্ষামূলক ও বৃত্তিমূলক নির্দেশনা: শিক্ষার্থীর অনুরাগকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে শিক্ষামূলক ও বৃত্তিমূলক নির্দেশনা দেওয়া উচিত। তবেই তার জীবনে সাফল্য আসে।
[10] মনোযোগ বৃদ্ধি: আগ্রহকে আশ্রয় করে শিক্ষার্থী শিক্ষণীয় বিষয়ে অধিক মনোযোগী হয়ে ওঠে। কোনো বিষয়ে সুষ্ঠু আয়ত্তীকরণ এবং জ্ঞানার্জন মনোযোগেরই ফসল।
১০। শিখনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তরের নাম উল্লেখ করে প্রত্যেকটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
শিখনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর এবং তাদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
শিখনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল- [1] জ্ঞানার্জন (Acquiring knowledge), [2] সংরক্ষণ বা ধারণ (Retention), [3] পুনরুদ্রেক (Recall) ও প্রত্যভিজ্ঞা (Recognition)। শিখনের এই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নীচে দেওয়া হল-
[1] জ্ঞানার্জন: শিখনের প্রথম স্তর হল জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অর্জন। কোনো ব্যক্তি প্রথাগত বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই জ্ঞান বিভিন্নভাবে অর্জন করা যায়। ব্যক্তি বই পড়ে, শিক্ষক, অভিভাবক বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, যেমন-সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন, যাত্রা, নাটক ইত্যাদির সাহায্যেও ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে।
[2] সংরক্ষণ বা ধারণ: শিখন বা অভিজ্ঞতাগুলিকে মনের মধ্যে ধরে রাখাকে সংরক্ষণ বলা হয়। সংরক্ষণের সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব না হলেও, এর জন্য অনুকূল পরিস্থিতির উল্লেখ করা যায়। যেমন-
- [i] যে-কোনো বিষয় ভালোভাবে বুঝে নেওয়া এবং বিষয়টিকে বারবার অনুশীলন করা।
- [ii] বিষয়টি যত সাম্প্রতিক হবে সংরক্ষণও তত ভালো হবে।
- [iii] বিষয়টির প্রতি আগ্রহ থাকলে সংরক্ষণ উত্তম হয়।
- [iv] শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য উত্তম সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন। অর্থপূর্ণ বিষয়, অনুশীলন, আগ্রহ, অতিশিখন, দেহ ও মনের সুস্থতা ইত্যাদি সংরক্ষণের সহায়ক। এ ছাড়াও ছন্দ সহকারে পাঠ, সংকেতের ব্যবহারের ফলেও সংরক্ষণের উন্নতি ঘটে।
[3] পুনরুদ্রেক ও প্রত্যভিজ্ঞা: শিখনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল পুনরুদ্রেক। সংরক্ষিত অভিজ্ঞতাকে যদি ঠিক সময় ঠিক জায়গায় পুনরুদ্রেক করা না যায়, তাহলে শিখন সম্পূর্ণ হয় না। পূর্ব-অভিজ্ঞতাকে পুনরায় মনে করাকে পুনরুদ্রেক বলে। পুনরুদ্রেক প্রধানত দুই প্রকারের। যথা-
- [i] প্রত্যক্ষ পুনরুদ্রেক: যখন কোনো অভিজ্ঞতাকে পুনরুদ্রেক করার ক্ষেত্রে কেবল তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত অভিজ্ঞতাটির সাহায্য গ্রহণ করা হয়, তখন তাঁকে প্রত্যক্ষ পুনরুদ্রেক বলে।
- [ii] পরোক্ষ পূনরুদ্রেক: যখন কোনো অভিজ্ঞতাকে পুনরুদ্রেক করার জন্য তার সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত অভিজ্ঞতাটির সাহায্য নেওয়া হয়, তখন তাকে পরোক্ষ পুনরুদ্রেক বলে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা পুনবুদ্রেক প্রক্রিয়াটির ক্ষেত্রে তিনটি সূত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল-
- [i] সান্নিধ্যের সূত্র: পুনরুদ্রেকের ক্ষেত্রে যখন একটি ঘটনা আর-একটি ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়, তখন তাকে সান্নিধ্যের সূত্র হিসেবে ধরা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় রসগোল্লার কথা মনে আসলেই তার মিষ্টত্ব এবং রসের কথা মনে হয়।
- [ii] সাদৃশ্যের সূত্র: পুনরুদ্রেকের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। দুটি বিষয়ের মধ্যে বেশি মিল থাকলে একটির কথা মনে হলেই অপরটির কথা মনে আসে। যেমন-রামায়ণের গল্পে লবের কথা মনে পড়লে কুশের কথাও মনে পড়বে।
- [iii] বৈসাদৃশ্যের সূত্র: বৈসাদৃশ্যও পুনরুদ্রেকের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুটি বিষয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্য থাকলেও তা সহজে আমাদের মনে আসে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়-আলোর কথা মনে হলেই অন্ধকারের কথা মনে হয়। রোগা লোকের কথা মোটা লোককে মনে করিয়ে দেয়।
প্রত্যভিজ্ঞা: প্রত্যভিজ্ঞা হল একটি পরিচিতির বোধ যা না থাকলে শিখনকে সফল বলা যায় না। প্রত্যভিজ্ঞা কথাটির প্রকৃত অর্থ হল ‘চিনে নেওয়া’। পূর্বে প্রত্যক্ষ করা অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানকে বর্তমানে চিনে নেওয়ার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় প্রত্যভিজ্ঞা। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রত্যভিজ্ঞা হল একটি পরিচিতির বোধ বা চেতনা, যার অভাব ঘটলে শিখন ক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় না।
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ সেমিস্টার সব অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর
১১। শিখন ও পরিণমনের মধ্যে সম্পর্ক কী? শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের ভূমিকা আলোচনা করো।
শিখন ও পরিণমনের সম্পর্ক
শিখন ও পরিণমনের মধ্যে কতগুলি বিশেষ সম্পর্ক লক্ষ করা যায়।
[1 ] বিকাশমূলক প্রক্রিয়া: শিখন ও পরিণমন-দুটিই বিকাশমূলক প্রক্রিয়া যার ফলে ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন ঘটে। শিশুর জীবনবিকাশের ক্ষেত্রে এই দুই প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দুটি প্রক্রিয়া পরস্পর নির্ভরশীল।
[2] নির্ভরশীলতা: প্রক্রিয়া দুটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল উভয়ই উভয়ের ওপর নির্ভরশীল। শিখনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল পরিণমন। যথাযথ পরিণমন ছাড়া শিখন অসম্ভব। পরিণমন প্রক্রিয়াটি শিখনের সীমারেখা নির্ধারণ করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শিখনও পরিণমনের ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করে, যেমন-দৈহিক অনুশীলন দৈহিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই বলা যায়, শিখন এবং পরিণমন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং উভয়েই শিশুর জীবনবিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
[3] মনোবিদদের অভিমত: মনোবিদরা পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখেছেন উপযুক্ত পরিণমন ঘটলেই শিশুর বিশেষ বিশেষ শিখন সম্ভব হয়। শারীরিক পরিবর্তন বিশেষ করে স্নায়ুতন্ত্রের বৃদ্ধি ও বিকাশ নির্ধারণ করে শিশু কী শিখতে পারে এবং কতখানি শিখতে পারে। বাস্তবে দেখা গেছে, কোনো বিষয় শেখার জন্য শিশু যদি পরিণত বা প্রস্তুত না হয় এবং তাকে যদি জোর করে সেই বিষয় শেখানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে ফল বিপরীত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়-দুই-তিন বছর বয়সের শিশুকে ভাষাসাহিত্য বিষয়ে পাঠদান করলে কিংবা জটিল অঙ্কের নিয়মকানুন শেখানোর চেষ্টা করলে তা কোনোদিনই সফল হবে না। তাই বলা যায়, পরিণমনই ঠিক করে শিশুর শিখনের সীমারেখা।
[4] শিক্ষাবিদদের অভিমত: শিক্ষাবিদদের মতে শিখন শুরু করার আগে তার পরিণমনের স্তর সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত পরিণমন ঘটলে তবেই তার শিখনের কাজটি শুরু করা উচিত। শিশুর জীবনবিকাশের ক্ষেত্রে শিখনের ভূমিকাও অপরিসীম। এই কারণে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, পরিণমন ও শিখন দুটি পরস্পরবিরোধী ধারণা নয়। বরং শিশুর সামগ্রিক বিকাশের জন দুটিই আবশ্যক।
শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের গুরুত্ব
পরিণমন হল এক ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া, যা জীবকে তার বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এটি মূলত বংশগত বা জেনেটিক উপাদান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং পরিবেশের প্রভাব এতে কম। সহজ কথায়, কোনো কিছু শেখার জন্য শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত হওয়ার প্রক্রিয়াকেই পরিণমন বলা হয়। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে পরিণমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, কারণ এটি শিখনের ভিত্তি তৈরি করে। শিক্ষাক্ষেত্রে তথা শিখনের উপর পরিণমনের ভূমিকা আলোচনা করা হল-
[1] পরিণমন ও শিখনের সম্পর্ক: পরিণমন ও শিখন একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিণমন হল শিখনের একটি পূর্বশর্ত। কোনো শিক্ষার্থী যখন কোনো কিছু শেখার জন্য শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়, তখন তার শিখন প্রক্রিয়া সহজ হয়। যেমন, কোনো শিশু যদি দৌড়ানোর জন্য শারীরিকভাবে প্রস্তুত না হয়, তাহলে তাকে দৌড় শেখানো সম্ভব নয়। আবার কোনো জটিল গাণিতিক সমস্যাসমাধানের জন্য যদি তার মস্তিষ্কের বিকাশ না ঘটে, তাহলে সে তা শিখতে পারবে না। পরিণমন মানুষের মধ্যে সম্ভাবনা তৈরি করে, আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিখন সম্পন্ন হয়।
[2] শারীরিক পরিণমন ও শিখন: শারীরিক পরিণমন শিখনের জন্য একটি অপরিহার্য দিক। এটি একজন শিক্ষার্থীর পেশি, স্নায়ুতন্ত্র এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশের সঙ্গে জড়িত। পেশির সুসংবদ্ধ বিকাশ না হলে কোনো শারীরিক কাজ শেখা সম্ভব নয়। যেমন, হাতের পেশির বিকাশ না হলে লেখা বা আঁকা শেখা কঠিন। এ ছাড়া, মস্তিষ্কের এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ শিখনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্নায়ুকোষের সংযোগ তৈরি হওয়া এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পরিণমন শিখনের গতি ও গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। স্মৃতি, মনোযোগ এবং সমস্যাসমাধানের মতো উচ্চতর মানসিক দক্ষতা বিকাশের জন্য স্নায়বিক পরিণমন অপরিহার্য।
[3] মানসিক পরিণমন ও শিখন: শারীরিক পরিণমনের মতোই মানসিক পরিণমনও শিখনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক দক্ষতার বিকাশের জন্য অপরিহার্য। মনোবিজ্ঞানী জ্যাঁ পিঁয়াজে (Jean Piaget) তাঁর জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, শিশুরা বিভিন্ন স্তরের জ্ঞানীয় পরিণমনের মধ্য দিয়ে যায় এবং প্রতিটি স্তরে তাদের শেখার ধরন ও ক্ষমতা আলাদা হয়। কোনো নির্দিষ্ট স্তরের কাজ শেখার জন্য শিক্ষার্থীর সেই স্তরের জ্ঞানীয় পরিণমন আবশ্যক।
[4] পরিণমন ও পাঠক্রম প্রণয়ন: শিক্ষণের ক্ষেত্রে পরিণমনের ধারণাটি পাঠক্রম প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পাঠক্রম এমনভাবে তৈরি করা উচিত, যা শিক্ষার্থীর বয়স এবং পরিণমনের স্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্ন ধরনের পাঠক্রম তৈরি করা হয়। যেমন-প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য খেলার ছলে বর্ণমালা শেখানো হয়। কারণ এই বয়সে তাদের পেশি এবং মানসিক পরিণমন লেখালেখি শেখার জন্য যথেষ্ট নয়। উচ্চতর শ্রেণিতে জটিল বিষয় যেমন, বিজ্ঞান বা বীজগণিত শেখানো হয়, কারণ সেই বয়সে তাদের জ্ঞানীয় ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয়।
[5] পরিণমন ও বৌদ্ধিক ক্ষমতার বিকাশ: পরিণমনের ফলে শিশুর চিন্তা, যুক্তি ও সমস্যাসমাধানের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায়। শিক্ষককে এই ধাপগুলি বিবেচনা করে পাঠ পরিচালনা করতে হয়।
[6] আবেগীয় পরিণমন ও শিক্ষা: আবেগীয় পরিণমন শিক্ষার্থীর আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহযোগিতার মানসিকতা ও দলগত কাজ শেখার ক্ষমতা বাড়ায়। ছোটো শিশুরা আবেগে বেশি প্রভাবিত হয়, কিন্তু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখে।
[7] সামাজিক পরিণমন ও শিক্ষা: শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিকতা গড়ে ওঠে, তবে তার ভিত্তি হল সামাজিক পরিণমন। পরিণমনের মাধ্যমে শিশু সামাজিক নিয়মকানুন বুঝতে পারে এবং বিদ্যালয় পরিবেশে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
[৪] ব্যক্তিভেদ ও পরিণমন: সব শিশুর পরিণমনের গতি সমান নয়; কারও বিকাশ দ্রুত হয়, কারও একটু ধীরে। শিক্ষক এই বৈচিত্র্যকে বুঝে শিক্ষাদান করলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অগ্রগতি সম্ভব হয়।
[9] শিক্ষা ব্যর্থতার প্রতিকারে পরিণমন: অনেক সময় শিক্ষার্থী যদি নির্দিষ্ট পাঠে ব্যর্থ হয়, তবে তার অন্যতম কারণ হতে পারে পরিণমনের অভাব। শিক্ষক যদি এটি বুঝতে পারেন, তবে শিশুর প্রতি অযথা চাপ সৃষ্টি করবেন না।
[10] মানসিক স্বাস্থ্য ও পরিণমন: পরিণমনকে উপেক্ষা করে অতিরিক্ত চাপ দিলে শিশু মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমনের গুরুত্ব মানসিক সুস্থতার সাথেও গভীরভাবে জড়িত।
শিক্ষাক্ষেত্রে পরিণমন এমন এক মৌলিক ভিত্তি, যার উপর সমগ্র শিক্ষা প্রক্রিয়া দাঁড়িয়ে রয়েছে। শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক ও বৌদ্ধিক দিকের স্বাভাবিক বিকাশ ছাড়া শিক্ষা কখনও সফল হতে পারে না। তাই শিক্ষককে অবশ্যই পরিণমনের ধাপ ও সীমাবদ্ধতাকে অনুসরণ করে শিক্ষার্থীর উপযোগী পাঠক্রম ও শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।
১২। সামাজিক প্রেষণা কী? যে-কোনো ছয়প্রকার সামাজিক প্রেষণা ‘সম্পর্কে আলোচনা করো।
সামাজিক প্রেষণা
মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা, ভালোবাসা, খ্যাতির স্পৃহা প্রভৃতি সামাজিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে যে সকল প্রেষণা জাগ্রত হয়, তাদের সামাজিক প্রেষণা বলে। সামাজিক প্রেষণা ব্যক্তির সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছয়প্রকার সামাজিক প্রেষণার বর্ণনা
এখানে ছয় প্রকার সামাজিক প্রেষণার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হল-
[1] খ্যাতি (Fame): খ্যাতি মানুষকে অত্যধিক পরিশ্রমী করে তোলে। সমাজে এমন অনেক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়, যারা পদমর্যাদার উচ্চ আসনে পৌঁছোনোর জন্য অধিক পরিশ্রম করতে দ্বিধা করেন না। খ্যাতি বা পদমর্যাদা ব্যাপারটি অনেকাংশে নির্ভর করে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও তার পরিবেশের ওপর।
[2] যূথচারিতা (Gregariousness): যুথচারিতা প্রেষণাটি মানুষ-সহ অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও দেখা যায়। প্রায় সকল প্রাণীই নিজ নিজ দলের প্রাণীদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে থাকতে চায়। প্রাণীদের এইপ্রকার ইচ্ছাকে যূথচারিতা বলে। যুথচারিতা একটি অর্জিত প্রেষণা। প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবার এবং পরিবেশ থেকে এই প্রেষণাটি অর্জন করে।
[3] নিরাপত্তা (Security): নিরাপত্তাবোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রেষণা। শিশু তার বাবা-মা বা বয়স্কদের কাছ থেকে দৈহিক নিরাপত্তা চায়। নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র, জল, বায়ু প্রভৃতি শিশুর দৈহিক নিরাপত্তামূলক প্রেষণা। মানুষ তার সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করে, বাড়ির চারদিকে প্রাচীর নির্মাণ করে। দৈনন্দিন জীবনেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
[4] স্বীকৃতি (Approval): প্রায় সকল মানুষই তার নিজের সম্পর্কে অন্যান্যদের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আশা করে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থায় তার কর্মের স্বীকৃতি প্রত্যাশা করে। কোনো বিষয়ে স্বীকৃতি পেলে, ব্যক্তির মধ্যে সেই বিষয়ে আরও বেশি উৎসাহ ও উদ্দীপনা জেগে ওঠে।
[5] সাফল্য (Achievement): মানুষ কেবলমাত্র খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে চায় না। সে সমাজে নিজেকে ভালো করে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এইরূপ ইচ্ছাকে সাফল্য প্রেষণা বা কৃতি প্রেষণা বলে। সাফল্য লাভের ইচ্ছা মানুষকে অধিক পরিশ্রমী হতে সাহায্য করে।
[6] আক্রমণধর্মিতা (Aggression Motive): একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রেষণা হল আক্রমণাত্মক প্রেষণা। এই প্রেষণাটি অন্য ব্যক্তির সাফল্যের ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। কোনো ব্যক্তি যখন তার লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছোতে ব্যর্থ হয়, তখন তার মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ লক্ষ করা যায়।
১৩। প্রেষণা হ্রাসের কারণগুলি চিহ্নিত করো।
প্রেষণা হ্রাসের কারণ
মনোবিদগণ প্রেষণা হ্রাসের অনেকগুলি কারণ চিহ্নিত করেছেন। নীচে প্রেষণা হ্রাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করা হল-
[1] উদ্বেগ: প্রেষণা হ্রাসের অন্যতম কারণ উদ্বেগ। কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়, তবে তা ব্যক্তির প্রেষণার ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। উদ্বেগের ফলে বহুক্ষেত্রে প্রেষণা বা প্রেষণক্রিয়া হ্রাস পায়।
[2] বিষয়ের কাঠিন্য: বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা গেছে, যদি কোনো বিষয় খুব কঠিন হয় অথবা খুব সহজ হয়, তাহলেও ব্যক্তির বা শিক্ষার্থীর প্রেষণা হ্রাস পায়।
[3] উৎসাহ বা আগ্রহ: প্রেষণার সাথে আগ্রহের নিবিড় সম্পর্ক বর্তমান। কোনো বিষয়বস্তুর প্রতি ব্যক্তির বা শিক্ষার্থীর উৎসাহ বা আগ্রহ কম হলে ওই বিষয়বস্তুর প্রতি তার প্রেষণা হ্রাস পায়।
[4] কৌতূহলের অভাব: কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে যদি ব্যক্তির বা শিক্ষার্থীর কৌতূহল না থাকে তাহলে সে ওই বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থী অনুৎসাহী হয়ে পড়ে। ফলে তার মধ্যে বিষয়ের প্রতি প্রেষণা হ্রাস পায়।
[5] অতি-অসহায়ত্ব: মনোবিদরা বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কোনো শিক্ষার্থী বা ব্যক্তি যদি কোনো কাজে বারে বারে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই কাজের প্রতি তার উৎসাহ নষ্ট হয়, ব্যর্থতার দরুন তার মধ্যে এক অসহায়তার সৃষ্টি হয়। ফলে তার প্রেষণা হ্রাস পায়।
[6] প্রক্ষোভ বা আবেগ: লজ্জা, ঘৃণা, ভয় প্রভৃতি প্রক্ষোভগুলি ব্যক্তির প্রেষণার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এই-জাতীয় আবেগ বা প্রক্ষোভের ফলে ব্যক্তির প্রেষণা হ্রাস পায়।
[7] মানসিক দুর্বলতা: মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা গেছে বহু ব্যক্তি পরিবেশ অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না। অনেক সময় তারা নিজেদের দুর্বলতাগুলিকে বড়ো করে দেখে। সামান্য বাধাকেও তারা অতিক্রম করতে পারে না। ফলে এই কাজে তারা প্রেষণা হারায়।
[৪] পরিবেশ: কাজের পরিবেশ যথোপযুক্ত না হলেও ব্যক্তি বা শিক্ষার্থী কাজের প্রতি প্রেষণা হারায়। পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা, দলগত উৎসাহ, সহমর্মিতার অভাবে বহু ব্যক্তি বা শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট কাজে প্রেষণা হারায়।
[9] চাহিদাপূরণ না হওয়া: বিভিন্ন প্রকার শারীরবৃত্তীয় চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ না হলে ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট কাজে প্রেষণা হারায়। যেমন-খাদ্য, পানীয় প্রভৃতির চাহিদাপূরণ না হলে ব্যক্তির মধ্যে প্রেষণা হ্রাস পায়।
[10 ] নিরাপত্তার অভাব: প্রতিটি ব্যক্তির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা হল নিরাপত্তা। সুরক্ষা, স্থায়িত্ব, ভয় থেকে মুক্তি প্রভৃতি নিরাপত্তামূলক চাহিদাগুলি সঠিকভাবে পূরণ করা না হলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে ব্যক্তির প্রেষণা হ্রাস পায়।
[11] আত্মসম্মানের চাহিদাপূরণ না হওয়া: ব্যক্তির মধ্যে উপযুক্ত মাত্রায় আত্মসম্মানবোধ তৈরি না হলে বিভিন্ন কাজে প্রেষণার ঘাটতি লক্ষ করা যায়।
[12] আত্মপ্রতিষ্ঠার চাহিদাপূরণ না হওয়া: প্রত্যেক ব্যক্তিই জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চায়। কোনো কারণে এই কাজে বিফল হলে ব্যক্তি নিজেকে সংকুচিত করে ফেলে। ফলে তার প্রেষণা বাধাপ্রাপ্ত হয়। সে পরবর্তী কাজে অগ্রসর হওয়ার প্রেষণা হারায়।
১৪। বিস্মৃতি বা বিস্মরণ কী? বিস্মরণের কারণগুলি আলোচনা করো।
বিস্মৃতি বা বিস্মরণ
স্মৃতির অভাবকেই বিস্মৃতি বা বিস্মরণ বলা হয়। বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়া হল মনে রাখার বিপরীত। স্মৃতি হল শিখন, সংরক্ষণ, মনে করা এবং চেনা এই কয়েকটি মানসিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত রূপ। এই জটিল ক্রিয়া কোনো কারণে ব্যাহত হলে বিস্মৃতি দেখা দেয়।
কয়েকজন বিখ্যাত মনোবিদ বিস্মরণের কিছু সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমন-
মান (Munn) প্রদত্ত সংজ্ঞা: পূর্বার্জিত কোনো বিষয়কে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে স্মরণ করার অক্ষমতাকেই বিস্মৃতি বলা হয়।
ড্রেভার (Drever) প্রদত্ত সংজ্ঞা: কোনো সময়ে কোনো অভিজ্ঞতা বা পূর্বার্জিত কোনো কাজ পুনরায় সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়াকেই বিস্মৃতি বলে।
ভাটিয়া (Bhatia) প্রদত্ত সংজ্ঞা: মূল উদ্দীপকের সাহায্য ব্যতীত কোনো ভাবনা বা ভাবনা-গুলিকে চেতন মনে নিয়ে আসার ব্যর্থতাই হল বিস্মৃতি।
বিস্মরণের কারণ
[1] চর্চার অভাব: অনভ্যাসে বিদ্যাহ্রাস-কথাটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো কিছু শেখার পর দীর্ঘদিন চর্চা না করলে তার বিস্মরণ ঘটে।
[2 ] বিষয়বস্তুর প্রকৃতি: বিষয়বস্তুর প্রকৃতির ওপর মনে রাখা বা ভুলে যাওয়া অনেকখানি নির্ভর করে। এবিংহাউসের পরীক্ষা থেকে জানা যায়, অর্থহীন শব্দতালিকা, অর্থযুক্ত শব্দতালিকা, সম্পূর্ণ বাক্য ইত্যাদি বিষয়বস্তুর মধ্যে অর্থহীন শব্দতালিকার ক্ষেত্রে বিস্মরণের হার সবচেয়ে বেশি।
[3] শিখনের মাত্রা: প্রত্যেক বিষয় শেখার একটা মাত্রা আছে যেখানে পৌঁছোলে শিখন সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে শেখার পরেও যদি চর্চা করা হয় তাহলে তাকে অতিশিখন বলা হয়। অতিশিখনের ক্ষেত্রে বিস্মরণ কম ঘটে।
[4] অবদমন: ফ্রয়েড বলেন, অবদমন হল বিস্মরণের মূল কারণ। যা আমরা চাই না, যা অসামাজিক বা আমাদের কাছে অপ্রিয় তাকে আমরা অবদমন অর্থাৎ, ভুলে যেতে চাই।
[5] পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ: কোনো বিষয় ভালোভাবে শেখার আগে যদি অন্য কোনো সদৃশ বিষয়বস্তু শিখতে যাই, তবে দ্বিতীয় বিষয়টি প্রথমে শেখা বিষয়টির কিছু অংশ ভুলিয়ে দেয়। এই মানসিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ। পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ বিস্মরণের অন্যতম কারণ।
[6] নেশাকারক বন্ধু: দীর্ঘদিন ধরে নেশার বস্তু ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের স্মরণচিহ্ন অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং বিস্মৃতি ঘটে।
[7] আবেগজনিত প্রতিরোধ: তীব্র আবেগমূলক পরিস্থিতিতে খুব ভালো করে শেখা বিষয়গুলিকেও মনে করতে কষ্ট হয়। ভয়, রাগ, দুঃখ, লজ্জা ইত্যাদি প্রক্ষোভ তীব্রমাত্রায় দেখা দিলে বিস্মরণের মাত্রা বেড়ে যায়।
[৪] পরিবর্তিত পরিবেশ: যে পরিবেশে আমরা শিখে থাকি, সেই পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানগুলি স্মরণে সহায়ক হয়। বাড়িতে ভালো করে তৈরি প্রশ্নোত্তর পরীক্ষার হলে আমরা অনেকসময় ভুলে যাই।
[9 ] আঘাতজনিত বিস্মরণ: আমরা জানি, সংরক্ষণ নির্ভর করে মস্তিষ্কের ওপর। মস্তিষ্কে কোনো কারণে গুরুতর আঘাত লাগলে সাময়িকভাবে স্মৃতি নষ্ট হয়।
[10] তীব্র শোক: তীব্র শোকের ফলে ব্যক্তির স্মৃতি সম্পূর্ণ লোপ পায়। এই স্মৃতিলোপকে বলা হয় ‘অ্যামনেশিয়া’।
যেসব অবস্থা ধারণ বা সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে, সেগুলির বিপরীত অবস্থা বিস্মৃতি আনে। তাই সংরক্ষণ, শিখন এবং অভ্যাস বাড়ালে বিস্মৃতি কমে।
১৫। শিশুদের মধ্যে কল্পনা বিকাশের উপায়গুলি লেখো।
শিশুদের মধ্যে কল্পনা বিকাশের উপায়
কল্পনা একটি শক্তিশালী মানসিক প্রক্রিয়া, যা শিশুদের সৃজনশীলতা এবং বুদ্ধির বিকাশে সাহায্য করে। শিশুর কল্পনাশক্তি উন্নত করতে, কিছু কার্যকরী উপায় রয়েছে, যেগুলি তাদের মেধার বিকাশে সহায়ক হতে পারে। নীচে কিছু উপায় উল্লেখ করা হল-
[1] গল্প শোনা এবং গল্প বলা: শিশুদের কল্পনাশক্তি উন্নত করতে গল্প শোনানো এবং তাদের গল্প বলা শেখানো অত্যন্ত কার্যকর। গল্পের মধ্যে নানারকম চরিত্র, ঘটনা এবং পরিস্থিতি থাকে, যা শিশুকে কল্পনা করতে সাহায্য করে। শিশুদের প্রতিদিন একটি নতুন গল্প শোনালে তারা গল্পের চরিত্র ও ঘটনা কল্পনা করতে পারে, যা তাদের চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতা বাড়ায়।
[2] বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ: খেলাধুলা ও সৃজনশীল গেমস শিশুর কল্পনাশক্তি বিকাশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শিশুদের বিভিন্ন ধরনের খেলায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া উচিত, যেখানে তারা নতুন নতুন পরিস্থিতি এবং চরিত্র কল্পনা করতে পারে। ব্লক দিয়ে বাড়ি তৈরি করা বা সাজানোর খেলা, রোল প্লে গেমস (যেমন-ডাক্তারের খেলা) শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
[3] ছবি আঁকা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ: শিশুদের ছবি আঁকা এবং সৃজনশীল অন্যান্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে, তাদের কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়। এটি তাদের চিন্তাভাবনা এবং নিজস্ব অভিব্যক্তি প্রকাশে সহায়তা করে। শিশুদের ছবি আঁকতে দেওয়া, যেখানে তারা কল্পনা করে একটি দৃশ্য বা চরিত্র তৈরি করে, তাদের কল্পনাশক্তি বিকশিত হয়।
[4] প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে সময় কাটানো: প্রকৃতির মধ্যে শিশুদের জন্য নানা ধরনের উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা লুকিয়ে থাকে। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান (পশুপাখি, গাছপালা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, ফুলফল ইত্যাদি)-এর সঙ্গে সময় কাটালে, শিশুদের কল্পনা বিকশিত হয়, কারণ তারা পরিবেশ, পশুপাখি এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্পর্কে ভাবতে শেখে। বাগানের গাছপালা, ফুল, পাখি বা আকাশের পরিবর্তন দেখে শিশুদের কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা নতুন কিছু চিন্তা করতে শেখে।
[5] সিনেমা, কার্টুন বা অ্যানিমেশন দেখা: শিশুদের জন্য নির্মিত সিনেমা, কার্টুন বা অ্যানিমেশন তাদের কল্পনাশক্তি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এই ধরনের ভিস্যুয়াল মিডিয়া তাদের কল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে সাহায্য করে। একাধিক কাল্পনিক চরিত্র বা রঙিন দৃশ্য দেখা শিশুর কল্পনাশক্তি বাড়িয়ে দেয়, কারণ তারা নিজেরাই সেই দৃশ্যগুলি কল্পনা করতে পারে।
মন্তব্য
শিশুদের মধ্যে কল্পনাশক্তি বিকাশের জন্য ওপরে উল্লিখিত উপায়গুলি অত্যন্ত কার্যকরী। কল্পনা শুধু শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক নয়, এটি তাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং আবেগিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই – উপায়গুলি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়তা করতে পারে এবং তাদের ভবিষ্যতের সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে।
৭। মনোযোগের শর্ত বা নির্ধারকগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
অথবা, মনোযোগের শর্তগুলি কী কী?
মনোযোগের শর্ত বা নির্ধারকসমূহ
মনোযোগের শর্তগুলিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হল-
[1] বন্ধুগত নির্ধারক: বস্তু বা উদ্দীপকের বৈশিষ্ট্যই যখন ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণ করে, তখন তাকে বস্তুগত নির্ধারক বলা হয়। এখানে নির্ধারক ব্যক্তিনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। বস্তুগত নির্ধারকগুলির মধ্যে রয়েছে-
- [i] তীব্রতা: তীব্র আলো, প্রচণ্ড শব্দ, গাঢ় রং ইত্যাদি আমাদের মনকে জোর করে আকর্ষণ করে।
- [ii] বিস্তৃতি: উদ্দীপকের বিস্তৃতি আমাদের মনোযোগকে আকর্ষণ করে। অস্বাভাবিক দীর্ঘ বা খর্ব কিংবা বেজায় স্থূলকায় ব্যক্তির প্রতি আমাদের মনোযোগ সহজেই চলে যায়।
- [iii] পুনরাবৃত্তি: পুনরাবৃত্তি মনোযোগের অন্যতম বস্তুগত নির্ধারক। ‘সাহায্য করো’ কথাটি একবার উচ্চারিত হলে, আমরা মনোযোগ দিতে নাও পারি, কিন্তু ওই কথাটি বারবার উচ্চারিত হলে আমরা মনোযোগ না দিয়ে পারি না।
- [iv] অভিনবত্ব: অভিনব কোনো বস্তুর প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষিত হয়। যেমন-নতুন ধরনের পোশাক-পরা ব্যক্তি সহজেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
- [v] গতিশীলতা: উদ্দীপকের গতিশীলতা মনোযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত নির্ধারক। অনেক সময় বিজ্ঞাপনদাতারা তাঁদের বিজ্ঞাপনটি চলমান করে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
- [vi] স্পষ্টতা: উদ্দীপকের স্পষ্টতা মনোযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত নির্ধারক। পরিষ্কার হাতের লেখার প্রতি আমরা মনোযোগী হই।
- [vii] বৈপরীত্য বা পার্থক্য: একটি দীর্ঘকায় ব্যক্তির পাশে খর্বকায় ব্যক্তি বা একটি স্থূলকায় ব্যক্তির পাশে যদি একটি শীর্ণকায় ব্যক্তি থাকে, সহজেই সেই দিকে আমাদের মনোযোগ চলে যায়।
- [viii] বিশেষ অবস্থিতি: কোনো বস্তুর বিশেষ অবস্থিতির জন্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। পত্রিকার নীচের অংশের থেকে ওপরের অংশের দিকে আমাদের দৃষ্টি আগে পড়ে।
- [ix] রং: সাদা-কালো লেখার মধ্যে যদি রঙিন লেখা থাকে, তখন রঙিন লেখার প্রতি আমাদের দৃষ্টি প্রথমেই চলে যায়।
- [x] উদ্দীপকের স্থায়িত্ব বা দীর্ঘ সময়: উদ্দীপক অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হলে আমাদের মনোযোগ এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হলে আমরা মনোযোগ দিতে বাধ্য হই।
[2] ব্যক্তিগত নির্ধারক: মনোযোগ যখন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নির্ধারিত হয় তখন তাকে ব্যক্তিগত নির্ধারক বলে। এই ধরনের নির্ধারকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
- [i] আগ্রহ: ম্যাকডুগাল-এর মতে, আগ্রহ হল সুপ্ত মনোযোগ এবং মনোযোগ হল সক্রিয় অনুরাগ। আগ্রহ ও মনোযোগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বর্তমান।
- [ii] চাহিদাপূরণ: খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্য খাদ্যবস্তুর প্রতি আমরা মনোযোগ দিই। কোনো বিষয়ে জ্ঞানের চাহিদা পূরণের জন্য আমরা সেই বিষয়ের বইয়ে মনোযোগী হই।
- [iii] অভ্যাস: অভ্যাস মনোযোগের অন্যতম ব্যক্তিগত নির্ধারক। ঘুম থেকে উঠে যাদের খবরের কাগজ পড়া অভ্যাস, তারা যতক্ষণ না খবরের কাগজ পড়তে পারে ততক্ষণ অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারে না।
- [iv] সেন্টিমেন্ট: সেন্টিমেন্ট এক ধরনের মানসিক সত্তা যা কোনো ব্যক্তি, ঘটনা, বস্তু বা বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস প্রভৃতি সেন্টিমেন্টের উদাহরণ। যে বিষয় বা বস্তুকে কেন্দ্র করে সেন্টিমেন্ট গড়ে ওঠে, তার প্রতি আমরা মনোযোগী হই।
- [v] মনঃপ্রকৃতি: বিশেষ ধরনের মনঃপ্রকৃতির অধিকারী ব্যক্তি বিশেষ বিশেষ ঘটনার প্রতি আকৃষ্ট হয়। স্বাভাবিকভাবেই তার সেই দিকেই মনোযোগ দিতে ইচ্ছা হয়।
- [vi ] শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা: দর্শনীয় কোনো জায়গায় বেড়াতে গিয়ে ইতিহাসবিদদের দৃষ্টি ঐতিহাসিক বস্তুর দিকে থাকে। ভূতত্ত্ববিদদের কাছে শিলার প্রকৃতি গুরুত্ব পায়। শিল্পরসিকের শিল্পের অভিনবত্বের ওপর নজর পড়ে। মনোযোগের এই রকম বিভিন্নতার কারণ ব্যক্তির শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা।
- [vii] প্রবণতা: ব্যক্তিভেদে প্রবণতার পার্থক্য দেখা যায়। ব্যক্তির নির্দিষ্ট দিকে প্রবণতা মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক। যার সংগীতে প্রবণতা আছে, সে সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
- [viii] কৌতূহল: দৈনন্দিন চলার পথে আমরা অনেক ঘটনার মুখোমুখি হই। অধিকাংশ মানুষই বেশিরভাগ ঘটনার প্রতি মনোযোগী হয় না। কিন্তু যারা কৌতূহলী তারা যতটা সম্ভব বেশিসংখ্যক ঘটনার প্রতি মনোযোগ দেয়।
[3] শারীরিক বা দৈহিক শর্ত বা কারণ: মনোযোগের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও অন্যতম শর্ত হিসেবে কাজ করে। যদিও শারীরিক শর্তগুলি সঠিক অর্থে মনোযোগের শর্ত নয়, তবুও তা মনঃসংযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেমন-
[i] জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহকে নিবদ্ধ করা: মনোযোগের বিষয়বস্তুর প্রতি জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলিকে নিবদ্ধ করতে হয়। যেমন-চোখ বা কানকে সজাগ করা।
[ii] শারীরিক পরিবর্তন: মনোযোগ দেওয়ার জন্য আমরা শারীরিক অঙ্গ, পেশি বা ইন্দ্রিয়ের পরিবর্তন ঘটাই। যেমন-মনোযোগের বস্তুর দিকে আমরা মাথা হেলাই।
[iii] দেহের বিশেষ ভঙ্গিমা: মনোযোগ দেওয়ার জন্য অনেকের মধ্যে বিশেষ ধরনের দেহভঙ্গিমা দেখা যায়। যেমন-বহু শিল্পী মনোযোগ দিয়ে গান গাওয়ার সময়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেন।
[iv] ব্যক্তিগত অভ্যাস: বহু ব্যক্তি বিশেষ কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিলে পা নাচাতে থাকেন। পা নাচানো বন্ধ করলেই তাদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়।
১৬। মনোযোগ আকর্ষণের উপায় লেখো। মনোযোগের কয়েকটি বিকর্ষক উল্লেখ করো। শিক্ষায় মনোযোগের ভূমিকা লেখো।
মনোযোগ আকর্ষণের উপায়
মনোযোগ আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলি হল-
[1] শান্ত পরিবেশ: কোলাহলমুক্ত শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে বিদ্যালয় স্থাপিত হলে পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ সহজে আকৃষ্ট হয়।
[2] বিশ্রামের ব্যবস্থা: শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য সময়সূচিতে মনোবিজ্ঞানসম্মতভাবে বিভিন্ন বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাঝে মাঝে বিশ্রামের ব্যবস্থা করাও একান্তই বাঞ্ছনীয়।
[3] শিক্ষাব্যবস্থার বৈচিত্র্যকরণ: পাঠক্রমকে কেবলমাত্র গ্রন্থকেন্দ্রিক না করে বিচিত্র ও বহুমুখী করে তুলতে হবে। ক্রীড়া ও কর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের বিচিত্র বিষয়ে রুচি ও অনুরাগ তৈরি হয়।
[4] দৃষ্টি ও শ্রুতিনির্ভর শিক্ষার ব্যবস্থা: শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বা অনুরাগকে ক্রিয়াশীল করতে হলে, পাঠদানকালে দৃষ্টিনির্ভর ও শ্রুতিনির্ভর শিক্ষার উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়াও পাঠদানকালে মনোযোগের নির্ধারকগুলিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে।
[5] জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষার ব্যবস্থা: দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় ঘটালে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে।
[6] উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্টতা: শিক্ষার উদ্দেশ্যকে শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
মনোযোগের বিকর্ষক
মনোযোগে বাধাপ্রদানকারী বিষয়গুলিকে মনোযোগের বিকর্ষক বলা হয়। এখানে কয়েকটি বিকর্ষকের উল্লেখ করা হল-
- [1] দুশ্চিন্তা, অহেতুক ভয় এবং বিভিন্ন ধরনের সমস্যা মনোযোগ নষ্ট করে দেয়।
- [2] বাহ্যিক উদ্দীপক, যেমন-অতি জোর শব্দ, কানের কাছে অনেকক্ষণ ধরে ধ্বনিত হওয়া যে-কোনো শব্দ মনোযোগের বিকর্ষক হিসেবে কাজ করে।
- [3] বিভিন্ন প্রকার অভাববোধ, চাহিদা, অতৃপ্ত বাসনা আমাদের মনোযোগে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
- [4] বিভিন্ন প্রকার প্রতিকূল পরিবেশ, শারীরিক অসুস্থতা মনোযোগের বিকর্ষক হিসেবে কাজ করে।
- [5] পরিকল্পনার অভাব, শৃঙ্খলাহীন অবস্থা, ইচ্ছার অভাবও মনোযোগের বিকর্ষক হিসেবে কাজ করে।
মন্তব্য
ছাত্রছাত্রীদের পাঠে মনোযোগী হওয়ার জন্য যতদূর সম্ভব অনুকূল পরিবেশ গঠন করতে হবে এবং বিকর্ষকগুলিকে দূর করতে হবে। ইচ্ছা বা প্রেষণাকে উদ্দীপিত করতে হবে। প্রতিটি কাজের জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা নিতে হবে এবং যথাসম্ভব শৃঙ্খলাপরায়ণ হতে হবে। তাহলে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে পারবে।
শিক্ষায় মনোযোগের ভূমিকা
শিক্ষার সঙ্গে মনোযোগের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শিখনের একটা বড়ো সমস্যা হল শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণ করা। এ ব্যাপারে মনোবিদরা কয়েকটি কৌশলের কথা উল্লেখ করেছেন-
[1] মনোযোগ আকর্ষণকারী কৌশল: ব্যক্তিজীবনে মনোযোগের রূপ এক থাকে না। শৈশবকালে ব্যক্তিনিরপেক্ষ মনোযোগের প্রাধান্য দেখা যায়। এই স্তরে বস্তুর বৈশিষ্ট্যই মনোযোগের নির্ধারক। চাহিদাকে কেন্দ্র করে শিশুর শিখনকে বিন্যস্ত করতে হবে। শিশুর চাহিদা হল খেলা। তাই শিশুর পাঠক্রম হবে ক্রীড়াভিত্তিক এবং শিখনপদ্ধতি হবে ক্রীড়াকেন্দ্রিক।
[2] ইচ্ছাসাপেক্ষ কৌশল: পরবর্তী স্তরে ইচ্ছাসাপেক্ষে মনোযোগ দেখা যায়। এই সময় শিখনের উদ্দেশ্য ও ব্যাবহারিক প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত করে, সেন্টিমেন্ট সৃষ্টি করে, উপদেশ দিয়ে, প্রয়োজনে লঘু শাসন ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে।
[3] পরিসর অনতিক্রম্য কৌশল: বিষয়বস্তু নির্বাচনে শিক্ষককে লক্ষ রাখতে হবে তা যেন শিক্ষার্থীর মনোযোগের পরিসর অতিক্রম না করে। প্রয়োজন হলে বড়ো ও জটিল বাক্যকে ছোটো সরল বাক্যে পরিণত করতে হবে।
[4] নির্ধারক প্রয়োগ কৌশল: মনোযোগের নির্ধারকগুলিকে প্রয়োজনমতো প্রয়োগ করতে হবে। তীব্রতা, স্পষ্টতা, নতুনত্ব, পুনরাবৃত্তি প্রভৃতি মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারকগুলিকে শিখনীয় বিষয়গুলির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
[5] বিষয়-বৈচিত্র্য প্রয়োগ কৌশল: মনোযোগের পরিবর্তন- শীলতা ও চঞ্চলতা সম্পর্কে শিক্ষক সচেতন হবেন। নিরবচ্ছিন্নভাবে কোনো কিছু দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা না করে, মাঝে মাঝে তিনি অন্য বিষয়ে চলে যাবেন।
মন্তব্য
পরিশেষে বলা যায়, মনোযোগ পঠনপাঠনের প্রথম ও প্রধান শর্ত। তাই শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণে লিখিত ও অলিখিত সব ধরনের চেষ্টা করতে হবে, যাতে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর প্রতি তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক মনোযোগ সৃষ্টি হয়।
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| স্বাধীনতার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কমিশনসমূহ MCQ প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 তৃতীয় সেমিস্টার শিক্ষাবিজ্ঞান প্রথম অধ্যায় | Click here |
| শিখন এবং শিখন কৌশল প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার শিক্ষাবিজ্ঞান প্রথম অধ্যায় | Click here |
| আধুনিক শিক্ষায় ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা MCQ প্রশ্ন ও উত্তর ক্লাস 12 তৃতীয় সেমিস্টার শিক্ষাবিজ্ঞান | Click here |
| সকলের জন্য শিক্ষা MCQ প্রশ্ন ও উত্তর ক্লাস 12 তৃতীয় সেমিস্টার শিক্ষাবিজ্ঞান | Click here |