কেন এল না কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা সুভাষ মখোপাধ্যায় | Class 12 keno ele na kobitar long question answer | WBCHSE

কবি পরিচিতি
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯–২০০৩) বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি ও লেখক। তাঁর কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানুষের স্বপ্ন ও বেদনা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সহজ, কথ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ ভাষা। খুব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি গভীর সামাজিক সত্যকে তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতায় যেমন প্রতিবাদের সুর রয়েছে, তেমনই রয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতা।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পদাতিক’, ‘চিরকুট’, ‘ফুল ফুটুক’, ‘যত দূরেই যাই’ প্রভৃতি। বাংলা কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবন ও সময়ের বাস্তবতাকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
‘কেন এল না’ কবিতার বিষয়বস্তু
কবিতার শুরুতেই দেখা যায়, একটি ছোট ছেলে সারাদিন আনন্দে নেচে নেচে বেড়িয়েছে। পুজোর সময় বলে তার মনে নতুন জামাকাপড়ের আনন্দ। তার বাবা সকালে বেরোনোর সময় বলে গিয়েছিল, মাইনে নিয়ে সকাল-সকাল ফিরে আসবে এবং পুজোর কেনাকাটা সেরে ফেলবে। তাই ছেলেটি অধীর আগ্রহে বাবার অপেক্ষা করতে থাকে।
কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাবা বাড়ি ফেরে না। মা রান্নাবান্না করছে, ঘরের নানা কাজ শেষ করছে, কিন্তু তার মনও যেন অস্থির। ছেলেটি ইতিহাসের বই নিয়ে বসে, অথচ পড়ায় মন বসে না। হিজিবিজি অক্ষরগুলো তার কাছে একগুঁয়ে ও অবাধ্য বলে মনে হয়, কারণ তার একমাত্র চিন্তা—বাবা কখন ফিরবে এবং কখন পুজোর জামা কেনা হবে।

রাত বাড়তে থাকে। মা বুনতে বসেও বারবার ঘরের হিসাব ভুল করে। ছেলেটিও বাবার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে ওঠে। একসময় সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় গিয়ে সে দেখতে পায় মোড়ে ভিড়, একটি কালো গাড়ি এবং চারদিকে বাজি ফুটছে। পুজোর আনন্দে চারপাশ মুখর হলেও ছেলেটির কাছে বাবার না-ফেরার প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
অনেক রাতের পর বাবা বাড়ি ফেরে। কিন্তু তার সঙ্গে আর দেখা হয় না ছেলের। কারণ, বাবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরলেও ছেলে সেই পুজোর রাতেই মৃত্যুর শিকার হয়েছে। কবিতার শেষ দুটি পংক্তি—“বাবা এল। / ছেলে এল না।”—সমগ্র কবিতার আনন্দময় অপেক্ষাকে এক মুহূর্তে গভীর শোক ও বেদনায় পরিণত করেছে।
‘কেন এল না’ কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পংক্তির ব্যাখ্যা
“বাবা কেন এল না, মা?”
এই প্রশ্নটি কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। এটি শুধু একটি শিশুর বাবার জন্য অপেক্ষার প্রশ্ন নয়; এর মধ্যে রয়েছে শিশুর ভালোবাসা, নির্ভরতা, প্রত্যাশা ও অস্থিরতা। বাবা পুজোর জামা কিনে আনবে—এই আশাতেই সে বাবার অপেক্ষা করছে।
“মাইনে নিয়ে সকাল-সকাল ফিরবে।”
বাবা যাওয়ার সময় ছেলেকে এই আশ্বাস দিয়েছিল। তার মাইনের টাকা দিয়েই পুজোর কেনাকাটা হবে। ফলে বাবার ফিরে আসা শুধু বাবাকে দেখার আনন্দ নয়, শিশুটির কাছে পুজোর আনন্দেরও সঙ্গে যুক্ত।
“হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুঁয়ে / অবাধ্য—”
বাবার অপেক্ষায় ছেলেটির পড়ায় মন বসছে না। ইতিহাসের বই খুলে সামনে বসে থাকলেও তার চোখ বইয়ের অক্ষরের দিকে স্থির হচ্ছে না। বাবার চিন্তা ও পুজোর জামার আকাঙ্ক্ষা তার মনকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে পড়াশোনা তার কাছে অর্থহীন হয়ে উঠেছে।
“মা এখন বুনতে বসে / কেবলি ঘর ভুল করছে।”
এখানে মায়ের অস্থির মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। বাবার এখনও না-ফেরায় মা-ও চিন্তিত। বুনতে বসেও বারবার ভুল করছে। অর্থাৎ অপেক্ষা শুধু ছেলেটির নয়, মায়ের মনেও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।
“মোড়ে ভিড়; / একটা কালো গাড়ি; / আর খুব বাজি ফুটছে।”
এই দৃশ্যের মধ্যে কবি আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাইরে উৎসবের পরিবেশ থাকলেও ‘কালো গাড়ি’ ও ভিড়ের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে রহস্যময় করে তোলে। বাজির শব্দের আড়ালে যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, পাঠক ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যায়।
“তারপর অনেক রাত্তিরে / বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা দিয়ে”
এখানে পুজোর আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হিংসা ও মৃত্যুর বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘বারুদের গন্ধ’ বুঝিয়ে দেয় যে রাস্তায় শুধু উৎসবের বাজি নয়, আরও ভয়ংকর কোনো ঘটনা ঘটেছে।
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
“মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে / বাবা এল।”
এই পংক্তিতে বাবার বাড়ি ফেরার পথের বিপদের ইঙ্গিত রয়েছে। চারপাশে মৃত্যুর পরিবেশ থাকলেও বাবা শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু পাঠক তখনও জানে না যে বাড়িতে তার জন্য আরও বড় শোক অপেক্ষা করছে।
“বাবা এল। / ছেলে এল না।”
এটাই কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী এবং তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। এতক্ষণ যে প্রশ্ন ছিল—“বাবা কেন এল না?”—তার উত্তর শেষ মুহূর্তে পাওয়া যায়। বাবা ফিরেছে, কিন্তু ছেলে আর ফেরেনি। বাবার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে যে শিশু বাইরে বেরিয়েছিল, সে আর জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারেনি। মাত্র কয়েকটি শব্দে কবি অপেক্ষা, আনন্দ, মৃত্যু ও শোকের সম্পূর্ণ পরিণতি প্রকাশ করেছেন।
১। ‘কেন এল না’ কবিতাটির প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতাটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের অনিশ্চিত জীবনযাত্রার এক মর্মস্পর্শী দলিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারতবাসী আশা করেছিল যে স্বাধীন দেশের সরকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেবে। কিন্তু স্বাধীনতার এক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যাভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ধীরে ধীরে স্বপ্নভঙ্গে পরিণত হয়।
এই সময় পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক গণআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৫৩ সালের ট্রামভাড়া বৃদ্ধি-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের শিক্ষক আন্দোলন, ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন এবং ১৯৬০ সালের ‘ভারত বন্ধ’-সহ বিভিন্ন আন্দোলন জনজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আন্দোলন দমন করতে পুলিশের লাঠিচার্জ, গুলিচালনা, গ্রেফতার ও দমননীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে আতঙ্কিত ও বিপর্যস্ত করে তোলে। অন্যদিকে দেশভাগের অভিঘাত, উদ্বাস্তু সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে। ফলে বাংলার জনজীবনে নেমে আসে এক চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার আবহ।
‘যত দূরেই যাই’ কাব্যগ্রন্থ (রচনাকাল ১৯৬০–৬২)-এর অন্তর্গত ‘কেন এল না’ কবিতাটি এই অস্থির সময়েরই শিল্পরূপ। বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী হলেও এই সময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্য থেকে সরে এসে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সাধারণ মানুষের অসহায় পরিণতির প্রতি গভীর মনোযোগ দেন। তাঁর উপলব্ধি ছিল—রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হয় নিরীহ সাধারণ মানুষকেই।
এই প্রেক্ষাপটেই কবিতায় একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের অপেক্ষা, উদ্বেগ ও আকস্মিক শোকের কাহিনি রূপায়িত হয়েছে। পুজোর কেনাকাটার স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষমাণ একটি পরিবারের আনন্দ মুহূর্তেই মৃত্যুর বিভীষিকায় ভেঙে পড়ে। ব্যক্তিগত এই ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে কবি সমকালীন বাংলার অশান্ত রাজনৈতিক পরিবেশ, সন্ত্রাস, সহিংসতা এবং তার নির্মম মানবিক মূল্যকে অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। তাই ‘কেন এল না’ কেবল একটি পরিবারের শোকগাথা নয়; স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার অস্থির সময়ে সাধারণ মানুষের অসহায় জীবনের এক অনবদ্য কাব্যিক দলিল।
২। ‘কেন এল না’ কবিতার বিষয়বস্তু আলোচনা করো।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কেন এল না’ কবিতাটি ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘যত দূরেই যাই’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, প্রতিবাদ, দমননীতি এবং তার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসা অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ের করুণ বাস্তবতাই এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু। কবি বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করেননি; বরং সেই আন্দোলনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের মধ্য দিয়ে সময়ের নির্মম সত্যকে তুলে ধরেছেন।
কবিতায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের পরিচিত জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। পরিবারের কর্তা সকালে অফিসে যাওয়ার সময় স্ত্রী ও ছেলেকে আশ্বাস দিয়ে যান যে, মাইনে নিয়ে ফিরে এসে পুজোর কেনাকাটা করবেন। নতুন জামা পাওয়ার আনন্দে সারাদিন উৎফুল্ল থাকে ছেলেটি। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বাবা বাড়ি না ফেরায় তার আনন্দ ধীরে ধীরে উৎকণ্ঠায় পরিণত হয়। সে বারবার মাকে প্রশ্ন করে— “বাবা কেন এল না, মা?” অথচ মায়ের কাছেও এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা, আবার পুজোর সামান্য আনন্দের আশাও—এই দুই বিপরীত অনুভূতির টানাপোড়েনে মায়ের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ছন্দ ভেঙে পড়ে। রান্না করতে গিয়ে তাঁর পা পুড়ে যায়, পরে উল বুনতে বসেও তিনি বারবার ভুল করতে থাকেন।
অন্যদিকে ছেলেটিও ইতিহাসের বই খুলে বসে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে জানালার বাইরে। ঘড়ির টিকটিক শব্দ, কলের জল পড়ার শব্দ, বাইরে বেড়ালের চলাফেরা—সবকিছুই যেন অপেক্ষার সময়কে আরও দীর্ঘ করে তোলে। বইয়ের অক্ষরগুলো তার কাছে অর্থহীন হয়ে ওঠে; পুজোর নতুন জামার স্বপ্নই তখন তার সমস্ত মন জুড়ে।
অবশেষে বাবার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে ছেলেটি নিজেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। মোড়ে ভিড়, কালো গাড়ি এবং বিকট শব্দ শুনে সে সরল মনে ভেবে নেয়, কোথাও বুঝি পুজো হচ্ছে। কিন্তু শিশুমন বুঝতে পারে না যে, সেগুলি উৎসবের বাজি নয়, আন্দোলন দমনের বোমা ও গুলির শব্দ; কালো গাড়িটিও পুলিশের গাড়ি। অজ্ঞাতসারে সে সেই সংঘর্ষের মধ্যে প্রবেশ করে। কবি তার মৃত্যুর দৃশ্য বর্ণনা করেননি; কিন্তু কবিতার শেষ দুটি পঙ্ক্তিই সমস্ত সত্যকে উন্মোচিত করে— “মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে / বাবা এল। / ছেলে এল না।”
এই মর্মান্তিক সমাপ্তির মধ্য দিয়ে কবি সমাজের বিবেকের কাছে এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিতে হয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে। বিশেষত, যে শিশু রাজনীতি বোঝে না, আন্দোলনের অর্থ জানে না, সেই নিষ্পাপ প্রাণও এই সহিংসতার শিকার হয়। তাই ‘কেন এল না’ কবিতাটি কেবল একটি পরিবারের শোকগাথা নয়; এটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার অস্থির সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হওয়া সাধারণ মানুষের জীবনবেদনার এক অনবদ্য মানবিক দলিল।
৩। “বাবা কেন এল না, মা?”- কে, কাকে এই প্রশ্ন করেছে? ছেলেটির বাবার বাড়ি না আসার কারণ কী? ২+৩
প্রশ্নকর্তা: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কেন এল না’ কবিতায়, যে ছোটো ছেলেটি তার বাবা অফিস থেকে মাইনে নিয়ে ফিরলে তার নতুন জামা কেনা হবে ভেবে অপেক্ষায় অধীর হয়ে গিয়েছিল সে-ই উদ্ধৃত প্রশ্নটি করেছে।
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: বাবার মাইনে নিয়ে ঘরে ফেরার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও বাবা না ফেরায় ছেলেটি, বাবার না আসার কারণ জানতে চেয়ে তার মাকে উদ্ধৃত প্রশ্নটি করেছে।
বাবার না আসার কারণ: রাজনৈতিক সংঘর্ষে উত্তপ্ত সময়ের বুকে সন্ত্রাসের গ্রাসে সামাজিক সুস্থিতি বিনষ্ট হয়েছিল। শহরের নানা প্রান্তে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, আর সেই আন্দোলনকে দমন করার জন্য শুরু হয়েছিল নানাবিধ কার্যকলাপ। স্বাভাবিক জীবনের চেনা ছন্দ হারিয়ে গিয়েছিল, চেনা পথ হয়ে উঠেছিল অচেনা। কবিতায় বর্ণিত ছেলেটির বাড়ির কাছেই সৃষ্টি হয়েছিল এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, চলছিল গুলি আর হচ্ছিল বোমাবর্ষণ, ফলে তার বাবা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সোজা পথে না ফিরে, পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূল এবং স্বাভাবিক হওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছিল। গভীর রাতে অন্য পথে, অনেক গলিপথ ঘুরে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল তাকে।
এই কারণে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও সে বাড়ি ফেরেনি।
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপ৪। ‘সেই মানুষ এখনও এল না।”- মানুষটি কে? তার জন্য কারা, কেন প্রতীক্ষা করে ছিল? ২+৩
অথবা, “সেই মানুষ এখনও এল না।”- ‘সেই মানুষ’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? ‘এখনও এল না’ বাক্যাংশের মধ্যে দিয়ে বক্তার কোন্ উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে? ২+৩
যে মানুষ: সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কেন এল না’ কবিতায় ‘সেই মানুষ’ বলতে একজন ছাপোষা, মধ্যবিত্ত, পারিবারিক মানুষের কথা বলা হয়েছে। মানুষটি কারো স্বামী, কারো পিতা- তার রোজগারের উপর নির্ভরশীল গোটা পরিবার। সে মাইনে নিয়ে ঘরে এলে তবেই পুজোর কেনাকাটা হবে। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ, দাবি বা দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। সে বাড়ি ফিরতে দেরি করলে প্রিয়জনেরা উৎকণ্ঠায় সময় কাটায়। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে সৃষ্ট বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে ঘরে ফেরাটাই যার জীবনের আদর্শ- তেমনই এক অতি সাধারণ, ছাপোষা মানুষ সে। কিন্তু যাবতীয় ঝামেলা থেকে যথাসম্ভব গা বাঁচিয়ে চলার পরেও, আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে যাকে সন্তানহারা হতে হয়, তেমনই এক হতভাগ্য পিতা কবিতার ‘সেই মানুষ’-টি।

প্রতীক্ষার কারণ: অফিস থেকে সঠিক সময়ে বাড়ি না ফেরায় প্রতীক্ষারত ছিল কবিতায় বর্ণিত সেই মানুষটির ছেলে এবং স্ত্রী। আসলে মধ্যবিত্ত জীবনে সাধ এবং সাধ্যের ব্যবধান দুস্তর। গৃহকর্তা মাইনের টাকা নিয়ে ফিরলে সেই টাকায় সব সাধপূরণ হবে। পূজোর কেনাকাটা সম্ভব হবে, নতুন জামা পরতে পারবে ছেলেটি, সেই আনন্দে সে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। বাবার অফিস থেকে ফিরে আসার জন্য তার আগ্রহ আর উদ্দীপনাও তাই ছিল বেশি। কিন্তু ছেলেটির মায়ের মনের মধ্যে একদিকে আশঙ্কা ছিল, চারপাশের আতঙ্ক আর ত্রাসের আবহে মানুষটি কখন সাবধানে বাড়ি ফিরতে পারবে তা নিয়ে- অন্যদিকে সংসারের নানা চাহিদা, সীমিত আয়, মাইনের টাকা এলে তা দিয়ে আর্থিক সংকট কতটা মেটানো যাবে সেসব ঘিরেও ঘনিয়ে উঠেছিল চিন্তার মেঘ। আন্দোলনের কালে ক্রমশ বাড়তে থাকা চাল-ডালের দাম, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অগ্নিমূল্য ভয়াবহ সংকটের মুখে এনে ফেলেছিল মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে। মাইনের দিনটি তাই মধ্যবিত্ত সংসারে বহু প্রতীক্ষিত হয়ে উঠেছিল, এই কারণে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে বলেও যে ফিরছিল না বাড়িতে তার জন্য ছেলেটি এবং তার মা দুজনেই প্রতীক্ষা করছিল।
৫। কড়ার গায়ে খুন্তিটা আজ একটু বেশি রকম নড়ছে।”- ‘আজ’ বলতে কোন্ দিনের কথা বলা হয়েছে? কড়ার গায়ে এভাবে খুন্তি নড়ার কারণ কী? ২+৩
যে দিনের কথা: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতায় ‘আজ’ বলতে সন্ত্রাস কবলিত অস্থির সময়ের বুকে যেদিন ছেলেটির বাবার মাইনে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল, সেই দিনটির কথা বলা হয়েছে। সে সময়ে প্রতিটি দিনই ছিল সন্ত্রাসমুখর। সংঘর্ষ, গুলি, বোমা বিস্ফোরণ, গণহত্যা ছিল প্রত্যহের খুবই স্বাভাবিক একটি চিত্র, সেদিনও ছিল এমনই এক দিন।
যুক্তির বেশি রকম নড়ার কারণ: সমস্যা-সংকটে পূর্ণ অস্থির সময়ে বাজার ছিল অগ্নিমূল্য, চালের দাম আকাশ ছুঁয়েছিল- ফলে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত জীবনে নানা শঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হয়েছিল। অন্যদিকে খাদ্য আন্দোলনে পথে নামা প্রতিবাদী মানুষের প্রতিরোধ, সেই আন্দোলন দমনে পুলিশের অতি সক্রিয়তা এবং আক্রমণে-প্রতিআক্রমণে জ্বলে ওঠা হিংসার আগুনে ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন। স্বাভাবিকভাবে স্বামীর জন্য প্রতীক্ষায় থাকা ছেলেটির মা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, নানা আশঙ্কায়। দোলায়িত মন চেয়েছিল তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে ফেলতে, তাই কড়ার গায়ে খুন্তি নড়ছিল দ্রুত। আবার স্বামী ফিরলে কেনাকাটা করতে যাওয়ার চিন্তা তার দৈনন্দিন কাজের গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ধৈর্য রাখতে পারছিল না সে। ভাবছিল স্বামী মাইনের টাকা নিয়ে ফিরে এলে হিসাব করে ফেলতে হবে, পুজোর কেনাকাটা কীভাবে করবে, কী কী জরুরি অত্যাবশ্যক জিনিস কিনতে হবে, কীভাবে সামঞ্জস্যবিধান হবে সাধ আর সাধ্যের। উপরন্তু, স্বামী না ফেরার উদ্বেগ নানা দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছিল তার মনে, বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল সে।
৬। “কেবলি ঘর ভুল করছে।” -। এমন হওয়ার কারণ কী? কোন্ প্রসঙ্গে একথা বলা হয়েছে? ২+৩
প্রসঙ্গ: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কেন এল না’ কবিতায় ছেলেটির মা তাড়াতাড়ি রান্না সেরে বসে থাকে স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষায়। কিন্তু তার সেই প্রতীক্ষা ফুরোয় না। আশঙ্কা আর ভীতির মেঘ সঞ্চারিত হয় তার উদ্বিগ্ন মনে। অপেক্ষার সেই দীর্ঘ প্রহর অতিবাহিত করতেই উল কাঁটা নিয়ে বসে সে। তবে উল বুনতে বসে বারবার ঘর ভুল হয়, সোজা উলটোর হিসেবে গোলমাল হয়ে যায়, একাগ্রতা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই প্রসঙ্গেই কবিতায় উদ্ধৃতাংশটি এসেছে।
ঘর ভুল করার কারণ: স্বামী মাইনে নিয়ে ফিরে এলে, পুজোর কেনাকাটা সেরে ফেলতে হবে এই চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে ছেলেটির মা। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা বলে যে বেরিয়েছিল, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও সেই মানুষ ঘরে ফেরে না। তাই নানা দুর্ভাবনায় বিচলিত হয়ে ওঠে তার স্ত্রী। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া বৃদ্ধি চালের অগ্নিমূল্য- মধ্যবিত্ত সংসার জীবনে নানারকম সমস্যা সৃষ্টি করে মানসিক সুস্থিতি বিনষ্ট হয়, যার প্রভাব পড়েছিল প্রতিদিনের যাপনে।
উল বোনা একটি শৌখিন কাজ। আর যে-কোনো সৃষ্টিশীল কাজের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানসিক শান্তি। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে গৃহকত্রীর মনের শান্তি বিনষ্ট করেছে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি। তাই, সংসারের অথ সংকটের চিন্তা, ছেলের শখপূরণের ভাবনা এবং সর্বোপরি দাঙ্গামুখর পরিস্থিতিতে স্বামীর বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ার দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে উল বোনার সময় ঘর ভুল হয়ে যায় গৃহকর্ত্রীর। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণীর তার স্বামীর চিন্তায় উৎকণ্ঠা, উদবেগ প্রকাশ করতে এবং তৎকালীন অস্থিরতার সময়ে সৃষ্টিশীলতার ভাঙনকে চিহ্নিত করতেই কবি উল বুনতে { ঘর ভুল হওয়ার প্রসঙ্গটি এনেছেন।
৭। ‘কেন এল না’ কবিতায় ছেলেটির মায়ের মানসিক অস্থিরতার চিত্রটি কীভাবে ফুটে উঠেছে লেখো। ৫
‘কেন এল না’ কবিতায় আমরা দেখি গৃহকর্তা যথাসময়ে ঘরে ফেরেনি। এদিকে বাইরের পরিস্থিতিও সুবিধাজনক নয়, তাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তার স্ত্রী। মধ্যবিত্ত সংসারের এই গৃহবধূটি এক ‘অবুঝ’ ছেলের মা, তাই ছেলেকে শান্ত রাখতে নিজের মনের শঙ্কাকে মনেই চেপে রাখে সে, ঘরের কাজের মাধ্যমে নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে চায় সর্বংসহা মায়ের চরিত্রটি। তথাপি তার দৈনন্দিন গৃহকর্মের মধ্যেই তাঁর মানসিক অস্থিরতা প্রকাশ পেয়ে যায়।
কড়ার গায়ে সজোরে খুন্তি নাড়া: গৃহকর্ত্রী, স্বামীর মাইনে নিয়ে ফেরার পূর্বেই দ্রুত ঘরের কাজ সেরে রাখতে চায় কারণ স্বামী ফিরলেই পুজোর কেনাকাটা করতে বেরোতে হবে। তবে, স্বল্প মাইনেতে সংসার কীভাবে চলবে সেই চিন্তা গৃহিণীর মাথায় ঘুরপাক খেতেই থাকে। উপরন্তু গৃহকর্তা মাইনে নিয়ে ফিরতে দেরি করেছে, সেই দুশ্চিন্তাও গ্রাস করে গৃহকর্ত্রীকে। ফলত, তার মানসিক অস্থিরতা কড়াইয়ে দ্রুত খুন্তি নাড়ার শব্দের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়।
ফ্যান পড়ে পা পুড়ে যাওয়া: ছেলেটির মা মাথায় হাজার দুর্ভাবনা নিয়েও ঘরের কাজ চালিয়ে যায়। কাজে তার মন নেই। বাইরে উত্তাল পরিস্থিতি, গণহত্যার আবহে স্বামীর না ফেরা তাকে অস্থির করে তোলে। অন্যমনস্কভাবে ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে পা পুড়িয়ে ফ্যালে সে। দৈনন্দিন কাজে ভুল হয়ে যাওয়া মায়ের মানসিক অস্থিরতার প্রতীক।
উলের ঘর বুনতে ভুল হয়ে যাওয়া: দ্রুততার সঙ্গে ঘরের সব কাজ সেরে নিজেকে মানসিক শান্তি দিতে, অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর অতিবাহিত করতে এবং ঘরের ভিতরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উল কাঁটা নিয়ে বুনতে বসে মা। কিন্তু অস্থিরচিত্তে উল বোনার মতো শৌখিন, সৃষ্টিশীল কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় সে। স্বামীর পথ চেয়ে, অন্যমনস্কভাবে উল বুনতে গিয়ে ঘর ভুল হয়ে যায় গৃহিণীর।
মায়ের মানসিক অস্থিরতার প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বাইরের উত্তাল সময়কেই প্রচ্ছন্নভাবে নির্দেশ করেছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সমাজ-রাজনীতির অশান্তি মিছিল-আন্দোলন-স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকেনি, রাজনৈতিক হিংসা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন গতিকেও রোধ করেছে, বিনষ্ট করেছে গৃহের শান্তি।
৮। “গলির দরজায় ছেলেটা দাঁড়িয়ে।”- গলির দরজায় ছেলেটি কেন, কখন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল? ছেলেটির পরিণতি কী হয়েছিল, তা লেখো।২+৩
কারণ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কেন এল না’ কবিতার আলোচ্য অংশটি থেকে আমরা জানতে পারি ছেলেটি তার বাবার জন্য প্রতীক্ষা করছিল, তাই সে গলির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিল তার বাবা বাড়ি ফিরছে কি না।
যে সময়: রেডিয়োতে যখন সংবাদপাঠক খবর পড়ছিলেন সেই সময় ছেলেটি বাবার প্রতীক্ষায় অধীর হয়ে গলির দরজায় দাঁড়িয়েছিল।
নির্মম পরিণতি: বাবার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিল ছেলেটি, সে জানত মাইনে নিয়ে বাবা বাড়ি ফিরলেই তার জন্য কেনা হবে পুজোর নতুন জামা। সেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে সারাদিন নেচে নেচে বেড়িয়েছে, পড়াতে মন বসাতে পারেনি। কিন্তু তার অপেক্ষা শেষ হয় না। দিনের শেষে, সন্ধে ফুরিয়ে রাত্রি নামলে আর নিজেকে ঘরে আটকে রাখতে না পেরে ছেলেটি, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখতে যায় তার বাবা আসছে কিনা। কিন্তু সে লক্ষ করে রাস্তার মোড়ে ভিড়, বাজি ফাটার শব্দ, কালো গাড়ি। সে ভাবে বুঝি কোথাও উৎসবের আয়োজন চলছে। তীব্র ঔৎসুক্য জাগে তার মনে, কৌতূহল মেটাতেই এগিয়ে দেখতে যায় কোন্ উৎসবের শোভাযাত্রা চলেছে সেখান দিয়ে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না সেই কালো গাড়ি আসলে পুলিশের গাড়ি, শব্দের যে তাণ্ডব পাড়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে তা আসলে বাজি নয়- বোমা বিস্ফোরণ, পুলিশের সঙ্গে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ চলছে প্রতিবাদী জনতার। চলছে গুলি। এ আনন্দের উৎসব নয় ৪ মৃত্যু- হত্যার উৎসব। অবুঝ অজ্ঞ ছেলেটি সরল মনে এগিয়ে যায় তার চেনা পাড়ার চেনা পথে, অচেনা এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদের দিকে। দুই পক্ষের যুযুধান লড়াইয়ের মধ্যে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। সেই বারুদের গন্ধের মধ্যে মিশে থাকে তার শেষ নিঃশ্বাস। দুঃসহ সময়ের অস্থিরতা, হিংসাত্মক কার্যকলাপ কেড়ে নেয় সেই নিরপরাধ শিশুটির প্রাণ। বাবার অপেক্ষায় ৪ চঞ্চল ছেলেটি বুঝে উঠতে পারেনি যে মৃত্যু এসে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরের ৪ কাছেই, রাস্তার মোড়ে। এক নির্মম সময়ে জাত হতভাগ্য নাগরিকদের দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের, বেদনাবহ পরিণতির কথাই সর্বসমক্ষে তুলে ধরেন কবি। একটি অনপেক্ষিত মৃত্যু দিয়ে কবিতাটি শেষ হয়। কবিতার শেষে – ‘বাবা এল/ছেলে এল না’ পঙ্ক্তি দুটি তৎকালীন সময়ের মানবতাহীন নির্মমতাকে দৃঢ়ভাবে পরিস্ফুট করে তোলে। ছেলেটির আকস্মিক মৃত্যু, হঠাৎ ৪ হারিয়ে যাওয়া, তার না ফেরা পাঠককে কার্যত স্তব্ধ করে দেয়। সাধারণ ৪ মানুষের দুর্ভাগ্যকে ব্যক্ত করতেই কবিতার শেষে ছেলেটির এরূপ নির্মম পরিণতির চিত্র এঁকেছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
৯। “কেন এল না” কবিতায় কবি ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’-কে কীভাবে প্রতীকায়িত করেছেন তা উদাহরণ সহযোগে বুঝিয়ে দাও। ৫
‘কেন এল না’ কবিতায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সরাসরি রাজনৈতিক সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেননি। প্রতীকী চিত্র ও ইঙ্গিতের ব্যবহারে তৎকালীন সময়ের হিংস্র রাজনীতির ছবিটি ফুটিয়ে তুলেছেন কবি।
ডিড় ও একটা কালো গাড়ি: ছেলেটি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই রাস্তার মোড়ে ভিড় লক্ষ করে। তার সামনে এসে দাঁড়ায় একটি কালো গাড়ি। কৌতূহলী হয়ে সেদিকেই এগিয়ে যায় সে। রাস্তার মোড়ে সেই ভিড় ছিল আন্দোলনকারীদের জটলা যা সমাজ-রাজনীতির উত্তাল সময়ের চিহ্ন। আর ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়ানো সেই কালো গাড়িটি আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ থামাতে আসা অস্ত্রধারী পুলিশ বাহিনীর গাড়ি। সঙ্গে ছিল বাজির শব্দ যা থেকে বোঝা যায় সশস্ত্র দু-পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে চলছিল গুলিবর্ষণ, বোমা বিস্ফোরণ। যুদ্ধের এই অচেনা আবহকে উৎসব বলে ভ্রম হয় নিষ্পাপ ছেলেটির, তাই সে নির্দ্বিধায় এগিয়ে যায় সেদিকেই ফলত, রাজনৈতিক হিংসার শিকার হতে হয় নিরপরাধ ছেলেটিকে।
বাবুদের গন্ধে ভরা রাস্তা: কবিতার শেষে অনেক রাতে ছেলেটির বাবাকে বারুদের গন্ধে ভরা রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়। বারুদের গন্ধ স্পষ্টতই সহিংসতা, বোমা বিস্ফোরণ, দাঙ্গার চিহ্ন বহন করে। অর্থাৎ, সংঘর্ষ থেমেছে বেশিক্ষণ হয়নি আর সেই মারণ-সংঘর্ষের রেশ বহন করছে বারুদের গন্ধে ভরা রাস্তা। যে রাস্তায় কিছুক্ষণ পূর্বেই নেমে এসেছিল ছেলেটি। তারপর সেই অস্থির সময়ের হিংস্র থাবা কেড়ে নিয়েছিল একটা নিষ্পাপ প্রাণ। সামরি
“ছেলে এল না/বাবা এল: কবিতায় বাবা হলেন এমন এক প্রজন্মের মুখপাত্র যাদের কাঁধেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্বভার অথচ দিনের শেষে সে প্রাণ বাঁচিয়ে, সুরক্ষিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারলেও, নিরপরাধ-নিষ্পাপ ছেলেটির আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এখানেই ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক সহিংসতার ভীষণ কদর্য রূপ আর রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা।
কবি এই সকলপ্রতীকী চিত্র দ্বারা বুঝিয়ে দিতে চান যে রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল শাসকবিরোধী বা আন্দোলনকারী আর পুলিশের সংঘর্ষ নয়, তা সাধারণ মানুষের গতানুগতিক জীবনকেও চিরতরে বদলে দেয়। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হতে হয় নিরপরাধ প্রাণগুলিকেই, যাদের কোনো পক্ষ নেই তাদেরকেও ধ্বংস হয়ে যেতে হয়- বিনা দোষে হারিয়ে যেতে হয় চিরতরে।
১০। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ‘রান্নাঘর’ কীভাবে অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল তা ‘কেন এল না’ কবিতা অবলম্বনে ব্যাখা করো। ৫
ব্যাখ্যা: ‘কেন এল না’ কবিতায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে সময়ের ছবি এঁকেছেন সেটি ছিল নাগরিক আন্দোলনে মুখর, পুলিশি অত্যাচারে সন্ত্রস্ত, গণহত্যায় দগ্ধ এক বিদ্ধস্ত সময়। যে অস্থির সময়ের আঁচ পড়েছিল সাধারণ, মধ্যবিত্ত গৃহস্থালিতেও। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে রান্নাঘর অবধি এসে পৌঁছেছিল জ্বলন্ত সময়ের আগুন, প্রভাবিত করেছিল জনজীবনের স্বাভাবিক যাপনকে।
রান্নাঘর হল কোনো সংসারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, পরিবারেরর সদস্যদের একটি সংবেদনের জায়গা। যে গৃহিণী পরিবারের সকলকে এক সুতোয় বেঁধে রাখেন কবিতায় সেই গৃহিণীর সর্বাধিক সময় কাটে রান্নাঘরেই। রান্নাঘর সংসারের শান্তির আধার আর গৃহিণী সেই শান্তির প্রতিমূর্তি। তবে, ঘরের মানুষ ঘরে ফিরতে দেরি করায় গৃহিণীর মনেই জমেছে দুশ্চিন্তার মেঘ, সেই মেঘ ছেয়ে ফেলেছে রান্নাঘরের পরিবেশকেও।
গৃহিণীর দৈনন্দিন কাজের গতিতে ছেদ পড়েছে। বাইরের বিপদমুখর পরিস্থিতিতে স্বামী সুরক্ষিত আছেন কি না সেই কথা ভাবতে ভাবতে আশঙ্কাগ্রস্ত গৃহিণী অকারণে কড়ার গায়ে সজোরে খুন্তির শব্দ করে ফ্যালে। গৃহকর্তার চিন্তায় অন্যমনস্ক হয়ে ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে গরম ফ্যান পায়ে পড়ে তার, সময়ের আগুন যেন বহিরঙ্গের সঙ্গে দগ্ধ করে তার মনকেও।
কবিতার গৃহকর্ত্রী একজন কর্তব্যপরায়ণ গৃহবধূ, দায়িত্বশীলা স্ত্রী ও স্নেহপরায়ণ মা। সে তার সংসারে বাহ্যিক অশান্তির আঁচ পড়তে দিতে চায় না। বাড়ির দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয় সে। কাজে ভুল হয়ে যায় তার। যখন সমগ্র সমাজ ও সময়টাই উত্তাল হয়ে উঠেছে তখন নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক, সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের চিরাচরিত শান্তিও বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দাঙ্গার আগুন গ্রাস করে সাধারণ একটি পরিবারের রান্নাঘরটিকেও।
১১। সামনে ইতিহাসের পাতা খোলা-“- ‘ইতিহাসের পাতা খোলা কথাটির তাৎপর্য লেখো।
অথবা, ইতিহাস বই পড়ায় ছেলেটির মন নেই কেন?- ব্যাখ্যা করো। ৫
প্রসঙ্গ: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কেন এল না’ কবিতায় দেখা যায় বাবার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষারত ছেলেটি সন্ধে গড়িয়ে রাত নামলে অভ্যস্ত নিয়মে ইতিহাস বই নিয়ে পড়তে বসে। কিন্তু বইয়ের পাতা খোলাই রয়ে যায়, বইয়ের পাতার একঘেয়ে অক্ষরগুলি তার বোধগম্য হয় না।
তাৎপর্য: ‘ইতিহাস’ শব্দটি কবিতার ক্ষেত্রে এক অন্যতর ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। ইতিহাস তো কেবল অতীতের কাহিনি নয়, এ হল মানুষের সভ্যতার পর্ব থেকে পর্বান্তরের ধারাবাহিক কালানুক্রমিক বিবরণ। ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদী শাসকের কৃতিত্ব আর রাজ্যজয়ের খতিয়ান লিখে রাখে, রাষ্ট্রবিপ্লব আর সংগ্রামের কারণ এবং ফলাফলের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, কিন্তু এই ইতিহাসের আড়ালে থেকে যায় সাধারণ মানুষের ছোটো ছোটো চাওয়া পাওয়ার না মেলা হিসেব। উপেক্ষিত থেকে যায় মনের অন্দরে ঘটে চলা নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। তাই সেই ইতিহাসের সঙ্গে বাবার ঘরে ফেরার জন্য অপেক্ষারত ছেলেটির অস্থির মনের উদ্বিগ্ন প্রহর কোনো সংযোগ রচনা করতে পারে না। সেই ইতিহাস ছেলেটির অশান্ত মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা ‘বাবা ফিরে এল না কেন?’-কে মেটাতে পারে না। বাবা ফিরে এলে পুজোর নতুন জামা কিনে দেবে তাকে, আনন্দে ভেসে বেড়াবে সে, সেই স্বপ্নে বিভোর ছেলেটির মনে তাই পাঠ্য ইতিহাসের বিষয়গুলো কোনও নতুন আকর্ষণের জন্ম দিতে পারে না। মানব ইতিহাসের তথ্যপঞ্জি নয়, বাবার ফিরে আসাই তার সেই মুহূর্তের পরম আকাঙ্ক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। পাঠ্য ইতিহাস, ছেলেটির অনুভূতির এই জগতে কোনো ভাবের উদ্রেক ঘটাতে অপারগ। ইতিহাসের খোলা পাতার সঙ্গে, বিষয়ের সঙ্গে তাই একাত্ম হতে পারে না ছেলেটি।
সেই ইতিহাসের সঙ্গে ছেলেটির চোখে দেখা বাস্তবের কোনো মিল নেই। ইতিহাস কেবলই বড়ো বড়ো যুদ্ধের কথা লেখে, স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদের কথা লেখে, মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব-সমাজ বদলের কান্ডারিদের কথা লেখে তবে নিত্য আন্দোলনে, দাঙ্গায় প্রাণ হারানো সাধারণের কথা লেখে না। সেই ইতিহাস মনে রাখে কেবল তাদের প্রিয়জনেরা, যার সঙ্গে বইয়ের ইতিহাসের কোনো মিল নেই। যে ইতিহাসে সাধারণ মানুষের অসহায়তার কথা নেই, কিশোরসমাজের দুর্দশার কথা নেই, যে ইতিহাসে বাবার জন্য ছেলেটির উদ্বেগের চিত্র ফুটে ওঠেনি সেই ইতিহাস ছেলেটির কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়। বাবার পথ চেয়ে বসে থাকা উদ্বিগ্ন ছেলেটির কাছে ইতিহাস বইয়ের লেখাগুলি কেবল কালো কালো অর্থহীন হিজিবিজি অক্ষর বলে প্রতীত হয় আর তাই পড়ায় তার মন বসে না।

সেই ইতিহাসের সঙ্গে ছেলেটির চোখে দেখা বাস্তবের কোনো মিল নেই। ইতিহাস কেবলই বড়ো বড়ো যুদ্ধের কথা লেখে, স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদের কথা লেখে, মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব-সমাজ বদলের কান্ডারিদের কথা লেখে তবে নিত্য আন্দোলনে, দাঙ্গায় প্রাণ হারানো সাধারণের কথা লেখে না। সেই ইতিহাস মনে রাখে কেবল তাদের প্রিয়জনেরা, যার সঙ্গে বইয়ের ইতিহাসের কোনো মিল নেই। যে ইতিহাসে সাধারণ মানুষের অসহায়তার কথা নেই, কিশোরসমাজের দুর্দশার কথা নেই, যে ইতিহাসে বাবার জন্য ছেলেটির উদ্বেগের চিত্র ফুটে ওঠেনি সেই ইতিহাস ছেলেটির কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়। বাবার পথ চেয়ে বসে থাকা উদ্বিগ্ন ছেলেটির কাছে ইতিহাস বইয়ের লেখাগুলি কেবল কালো কালো অর্থহীন হিজিবিজি অক্ষর বলে প্রতীত হয় আর তাই পড়ায় তার মন বসে না।
আরো পড়ুন : হলুদ পোড়া গল্পের বড়ো প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : প্রার্থনা কবিতার বড়ো প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| লালন শাহ ফকিরের গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Lalan Shah Fokirer Gaan Kobitar Question Answer | Click here |
| ভাবসম্মিলন কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Vaabsommilon Kobitar Question Answer | Click here |
| তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Telenapota Abishkar Golper Question Answer | Click here |
| ছুটি গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Chuti Golper Question Answer | Click here |
Our Latest Products
উচ্চমাধ্যমিক
All Subject দেখুন →
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম বাংলা সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক English সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম ইতিহাস সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক দর্শন সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক সংস্কৃত সাজেশন
একাদশ শ্রেণি
All Subject দেখুন →
একাদশ শ্রেণি বাংলা সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন
একাদশ শ্রেণি দর্শন সাজেশন
একাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ভূগোল সাজেশন
একাদশ শ্রেণি শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন