ভাবসম্মিলন কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Vaabsommilon Kobitar Question Answer | Class 11 Second Semester Bengali

কবি পরিচিতি
বিদ্যাপতি :
মাথুর পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ পদকর্তা এবং বৈষ্ণব পদাবলীর অন্যতম প্রধান কবি বিদ্যাপতি। ১৪শ থেকে ১৫শ শতকের মধ্যভাগে তিনি বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের মিথিলা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে ‘মৈথিল কোকিল’ এবং ‘অভিনব জয়দেব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
বিদ্যাপতি মূলত মৈথিলী এবং সংস্কৃত ভাষায় কাব্য রচনা করলেও, বৈষ্ণব পদাবলীতে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ‘ব্রজবুলি’ ভাষার ব্যবহার। এটি ছিল মৈথিলী ও বাংলা ভাষার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা তৎকালীন বাংলা সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
তিনি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিশেষ করে রাধার রূপ, বাৎসল্য ও বিরহের (মাথুর পর্যায়) চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর পদে যেমন রাজকীয় আভিজাত্য ও পাণ্ডিত্য ছিল, তেমনই ছিল গভীর আবেগ। যদিও তিনি নিজে বৈষ্ণব ছিলেন না (সম্ভবত শৈব বা শাক্ত ছিলেন), তবুও বৈষ্ণব সমাজে ও বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরস্মরণীয়। শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর পদ শুনে ভাবাবিষ্ট হতেন। তাঁর রচিত পদাবলী আজও সমগ্র বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ভাবসম্মিলন কবিতার বিষয়বস্তু (সংক্ষিপ্তসার)
বিদ্যাপতির ‘ভাবসম্মিলন’ কবিতার মূল বিষয় হল দীর্ঘ বিরহের অবসানের পর প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের আনন্দ এবং সেই মিলনকে চিরস্থায়ী করে রাখার আকাঙ্ক্ষা। দীর্ঘদিন মাধবের বিচ্ছেদে রাধার মনে যে দুঃখ, শূন্যতা ও অপেক্ষা জমে ছিল, প্রিয়তমের মুখ দর্শনের সঙ্গে সঙ্গেই তা যেন আনন্দে পরিণত হয়েছে। তাই মাধবকে ফিরে পেয়ে রাধার আনন্দের কোনো সীমা নেই। সখীর কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সে বলে— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত মানুষকে কাছে পাওয়ার আনন্দ যে কত গভীর, এই উক্তির মধ্য দিয়ে তারই প্রকাশ ঘটেছে।
মাধবের বিরহে রাধা যে দুঃখ পেয়েছিল, তাঁর মুখ দর্শনে সে ততটাই সুখ লাভ করেছে। অর্থাৎ বিরহ ও মিলনের দুঃখ-সুখ যেন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। মাধবকে কাছে পেয়ে রাধার মনে আবার তাঁকে হারানোর আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তাই সে মাধবকে অমূল্য ‘মহানিধি’-র সঙ্গে তুলনা করে তাঁকে আর দূর দেশে পাঠাতে চায় না। দীর্ঘ বিচ্ছেদের কষ্টের পুনরাবৃত্তি রাধার কাছে অসহনীয়; সে চায় প্রিয়তম যেন চিরদিন তার কাছেই থাকেন।
কবিতায় মাধবের প্রতি রাধার গভীর নির্ভরতার কথাও বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় এবং বর্ষার ছত্রের উপমার মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, মাধব রাধার জীবনে কতখানি প্রয়োজনীয়। ঋতু বদলের সঙ্গে মানুষের যেমন বিভিন্ন আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়, তেমনই জীবনের প্রতিটি অবস্থায় মাধব রাধার কাছে একান্ত অবলম্বন।
সবশেষে “সুজনক দুখ দিবস দুই-চারি” পংক্তির মাধ্যমে কবি আশাবাদী একটি জীবনদর্শনের কথা বলেছেন। দুঃখের দিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না; তার পরে সুখের সময় আসে। ফলে ‘ভাবসম্মিলন’ শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের আনন্দের পদ নয়, বরং বিরহের বেদনা পেরিয়ে মিলনের সুখ, প্রিয়জনকে চিরদিন কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং দুঃখের শেষে সুখ ফিরে আসার আশাবাদ—এই সবকিছুর সুন্দর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি মানবিক প্রেমের পদ।
ভাবসম্মিলন কবিতার লাইন ধরে ধরে ব্যাখ্যা
১. “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।”
সহজ অর্থ: রাধা সখীকে বলছে—আমার আনন্দের কথা আর কী বলব! এই আনন্দের যেন কোনো সীমা নেই।
ব্যাখ্যা: দীর্ঘদিন মাধবের বিরহে থাকার পর তাঁকে কাছে পেয়ে রাধার মনে যে অপরিসীম আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই সখীর কাছে নিজের আনন্দের কথা বলতে গিয়ে সে প্রথমেই জানাচ্ছে যে, এই আনন্দের কোনো শেষ নেই। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়তমকে ফিরে পাওয়ার উচ্ছ্বাসেই রাধার মন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২. “চিরদিনে মাধব মন্দিরে মোর।। ”
সহজ অর্থ: অনেকদিন পরে মাধব আমার কাছে, আমার জীবনে ফিরে এসেছেন।
ব্যাখ্যা: দীর্ঘ বিরহের পর মাধবের আগমনে রাধার জীবনের শূন্যতা যেন পূর্ণ হয়েছে। এখানে ‘মন্দিরে মোর’ কথাটির মধ্যে রাধার নিজের আপন জগৎ বা জীবনের মধ্যে মাধবের উপস্থিতির ভাব প্রকাশ পেয়েছে। মাধবকে কাছে পাওয়ার আনন্দেই রাধার মনে হয়েছে, তাঁর জীবনে আবার পূর্ণতা ফিরে এসেছে।
৩. “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল।”
সহজ অর্থ: মাধবের বিচ্ছেদ আমাকে যত দুঃখ দিয়েছে—
ব্যাখ্যা: বিরহের সময় রাধাকে যে গভীর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, এখানে তারই কথা বলা হয়েছে। মাধব দূরে থাকায় তাঁর অনুপস্থিতি রাধার মনে দুঃখ ও শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার সেই বেদনা রাধার মনে গভীরভাবে জমে ছিল। তাই মাধবের ফিরে আসার পর সেই পুরোনো দুঃখের কথাও তার মনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
৪. “পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।। ”
সহজ অর্থ: প্রিয়তমের মুখ দেখেই আমি ততটাই আনন্দ পেয়েছি।
ব্যাখ্যা: রাধা বলছে, মাধবের বিরহে সে যতটা কষ্ট পেয়েছিল, তাঁর মুখ দর্শনে ততটাই সুখ লাভ করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে প্রিয়তমকে চোখের সামনে ফিরে পাওয়া তার কাছে অসীম আনন্দের বিষয়। অর্থাৎ মাধবের মুখ দর্শনেই যেন বিরহের সমস্ত বেদনা মুছে গিয়ে মন আনন্দে ভরে উঠেছে।
৫. “আঁচর ভরিয়া যদি মহানিধি পাই।”
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
সহজ অর্থ: যদি আঁচল ভরে কোনো মহানিধি বা অমূল্য সম্পদ পাওয়া যায়—
ব্যাখ্যা: এখানে রাধা মাধবকে একটি অমূল্য মহানিধির সঙ্গে তুলনা করেছে। দীর্ঘ বিরহের পরে মাধবকে কাছে পাওয়া তার কাছে এমন এক মূল্যবান প্রাপ্তি, যা কোনো সাধারণ সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ‘আঁচর ভরিয়া’ কথাটির মধ্যে প্রিয়তমকে নিজের কাছে যত্ন করে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছে।
৬. “তব হাম পিয়া দূর দেশে না পাঠাই।। ”
সহজ অর্থ: তাহলে আমি আমার প্রিয়তমকে আর কোনোদিন দূর দেশে যেতে দেব না।
ব্যাখ্যা: দীর্ঘ বিচ্ছেদের কষ্টের অভিজ্ঞতা রাধাকে মাধবকে হারানোর ব্যাপারে ভীত করে তুলেছে। তাই তাঁকে আবার দূরে পাঠানোর কথা সে ভাবতেই পারে না। মাধবকে কাছে পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে তাঁকে চিরদিন কাছে রাখার আকাঙ্ক্ষাও এখানে প্রকাশ পেয়েছে। এই পংক্তিতে রাধার গভীর ভালোবাসার পাশাপাশি বিরহের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার আকুলতাও ফুটে উঠেছে।
৭. “শীতের ওঢ়নী পিয়া গীরিষির বা।”
সহজ অর্থ: শীতের দিনে যেমন ওড়না প্রয়োজন, তেমনই মাধব আমার কাছে প্রয়োজনীয়।
ব্যাখ্যা: রাধা মাধবের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ঋতুর উপমা ব্যবহার করেছে। শীতের দিনে ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যেমন ওড়না প্রয়োজন, তেমনই মাধবও রাধার জীবনের একান্ত প্রয়োজন। অর্থাৎ মাধব তাঁর কাছে কেবল ভালোবাসার মানুষ নন; তিনি জীবনের প্রয়োজনীয় আশ্রয় ও সান্ত্বনার প্রতীক।
৮. “বরিষার ছত্র পিয়া দরিয়ার না।। ”
সহজ অর্থ: বর্ষার দিনে যেমন ছত্র প্রয়োজন, তেমনই মাধব আমার জীবনের প্রয়োজনীয় আশ্রয়।
ব্যাখ্যা: বর্ষার সময় বৃষ্টি থেকে বাঁচতে যেমন ছত্রের প্রয়োজন হয়, তেমনই রাধার জীবনে মাধব একান্ত প্রয়োজনীয়। শীত ও বর্ষার দুটি আলাদা উদাহরণ দিয়ে রাধা বোঝাতে চেয়েছে যে জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতেই মাধব তার আশ্রয়। তাঁর উপস্থিতি রাধার কাছে স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি এনে দেয়।
৯. “ভণয়ে বিদ্যাপতি শুন বরনারি।”
সহজ অর্থ: বিদ্যাপতি বলছেন—হে সুন্দরী নারী, আমার কথা শোনো।
ব্যাখ্যা: শেষ অংশে কবি নিজেই বক্তব্যের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। ‘বরনারি’ বলে তিনি সুন্দরী নারীকে সম্বোধন করেছেন। এই সম্বোধনের মধ্য দিয়ে কবি তাঁর বক্তব্যকে আরও আন্তরিক ও প্রত্যক্ষ করে তুলেছেন।
১০. “সুজনক দুখ দিবস দুই-চারি।। ”
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপসহজ অর্থ: সুজনের জীবনে দুঃখের দিন বেশি দিন স্থায়ী হয় না; তা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কেটে যায়।
ব্যাখ্যা: পদের শেষ পংক্তিতে কবি আশার কথা বলেছেন। জীবনে দুঃখ এলেও তা চিরস্থায়ী নয়। যেমন রাধার দীর্ঘ বিরহের পরে মাধবের সঙ্গে মিলন ঘটেছে এবং দুঃখের পরে আনন্দ এসেছে, তেমনই মানুষের জীবনেও দুঃখের সময় একদিন শেষ হয়। এই পংক্তির মাধ্যমে বিরহ ও বেদনার মধ্যেও আশাবাদী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।
ভাবসম্মিলন কবিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর
১. ‘ভাব সম্মিলন’ কাকে বলে? আলোচ্য পদটিতে রাধার আনন্দের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।
‘ভাব সম্মিলন’ বলতে বোঝায় প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের ফলে মনের যে গভীর আনন্দ ও তৃপ্তির সৃষ্টি হয়। আলোচ্য পদে দীর্ঘ বিরহের পর মাধবকে কাছে পেয়ে রাধার মনে যে অপরিসীম আনন্দের জোয়ার এসেছে, বিদ্যাপতি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তারই ছবি এঁকেছেন।
মাধবের সঙ্গে মিলনের আনন্দে রাধা এতটাই অভিভূত যে সখীর কাছে সে বলে ওঠে— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” তার আনন্দের যেন কোনো সীমা নেই, ভাষায় তাকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করাও সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের যে দুঃখ সে বয়ে বেড়িয়েছে, মাধবের মুখ দর্শনেই সেই সমস্ত বেদনা সুখে পরিণত হয়েছে। কবির ভাষায়, “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল / পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।” অর্থাৎ এতদিনের বিরহের যন্ত্রণা প্রিয়তমের মুখ দেখার আনন্দে সম্পূর্ণ সার্থক হয়ে উঠেছে। মাধবকে কাছে পেয়ে রাধার মনে আবার তাঁকে হারানোর ভয়ও জেগেছে। তাই সে চায়, মাধব যেন আর দূর দেশে চলে না যান। অমূল্য সম্পদ যেমন যত্ন করে আঁচলে ধরে রাখা হয়, তেমন করেই সে মাধবকে নিজের কাছে রাখতে চায়। মাধব তার কাছে শুধু প্রিয়তম নন, জীবনের প্রয়োজনীয় আশ্রয়ও। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের ছায়া এবং বর্ষার ছত্রের সঙ্গে তাঁকে তুলনা করে রাধা তাঁর অপরিহার্যতার কথাই জানিয়েছে।
২. “কি কহব বে সখি আনন্দ ওর।”- এই পদটি কোন্ পর্যায়ের পদ এবং এখানে ‘ওর’ শব্দটির অর্থ লেখো। আলোচ্য পদে বক্তার আনন্দ কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে লেখো। ২+৩
পদের পর্যায় : “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর”— এই পদটি ভাবসম্মিলন পর্যায়ের পদ। দীর্ঘ বিরহের পর রাধার সঙ্গে মাধবের মিলন ঘটেছে। সেই মিলনজাত অপরিসীম আনন্দই এই পদের মূল বিষয়।
‘ওর’ শব্দের অর্থ : ‘ওর’ বলতে সীমা, শেষ বা অন্ত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ রাধার আনন্দের কোনো সীমা বা শেষ নেই।
বক্তার আনন্দের প্রকাশ : দীর্ঘদিন মাধবের বিরহে থাকার পর তাঁকে কাছে পেয়ে রাধার মনে যে আনন্দের সঞ্চার হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাই সখীর কাছে নিজের আনন্দের কথা বলতে গিয়ে রাধা প্রথমেই বলে উঠেছে— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” তার আনন্দ এত গভীর ও অপরিসীম যে সে নিজেই যেন বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে সেই আনন্দের কথা প্রকাশ করবে।
মাধবের মুখ দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে রাধার এতদিনের বিরহ-বেদনা মুছে গেছে। কবি বলেছেন, “পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।” অর্থাৎ যত দুঃখ সে পেয়েছিল, প্রিয়তমের মুখ দেখে ততটাই সুখ লাভ করেছে। এই সুখ শুধু সাময়িক উচ্ছ্বাস নয়; মাধবকে কাছে পাওয়ার মধ্যে রাধা জীবনের অমূল্য সম্পদ খুঁজে পেয়েছে। তাই সে চায়, মাধব যেন আর দূর দেশে না যান। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের ছায়া এবং বর্ষার ছত্রের সঙ্গে মাধবের তুলনা করে রাধা বোঝায় যে, তাঁর উপস্থিতি জীবনের প্রতিটি সময়েই প্রয়োজন। ফলে আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে প্রিয়তমকে চিরদিন কাছে রাখার আকুল আকাঙ্ক্ষাও। এভাবেই মিলনের উচ্ছ্বাস, বিরহের অবসানের স্বস্তি এবং প্রিয়জনকে হারানোর ভয়—সব মিলিয়ে রাধার আনন্দ পূর্ণতা পেয়েছে।
৩. “চিরদিনে মাধব মন্দিরে মোর”- কে, কাকে মাধব বলেছেন? উক্তিটির তাৎপর্য কী? ২+৩
যে, যাকে মাধব বলেছেন : আলোচ্য পদে রাধা তাঁর প্রিয়তম কৃষ্ণকে ‘মাধব’ বলেছেন। দীর্ঘ বিরহের পর মাধব তাঁর কাছে ফিরে এসেছেন এবং তাঁকে কাছে পেয়ে রাধার মনে সীমাহীন আনন্দের সঞ্চার হয়েছে।
তাৎপর্য : “চিরদিনে মাধব মন্দিরে মোর”—এই পংক্তিটির মধ্যে রাধার গভীর প্রেম, আনন্দ এবং চিরসান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে ‘মন্দির’ বলতে শুধু কোনো ইট-পাথরের ঘর বোঝানো হয়নি; রাধার হৃদয় ও জীবনই যেন মাধবের মন্দির। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের পরে মাধবকে কাছে পেয়ে রাধা অনুভব করছে, তাঁর জীবনের শূন্যতা পূর্ণ হয়েছে। ‘চিরদিনে’ শব্দটির মধ্যেও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মাধবকে সাময়িকভাবে কাছে পাওয়া নয়, রাধা তাঁকে চিরদিন নিজের কাছে পেতে চায়। তাই পরের পংক্তিতে সে বলে—“তব হাম পিয়া দূর দেশে না পাঠাই।” অর্থাৎ প্রিয়তমকে আর দূর দেশে যেতে দিতে তার মন রাজি নয়। মাধব রাধার কাছে এমনই অমূল্য যে তাঁকে সে মহানিধির সঙ্গে তুলনা করেছে। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় এবং বর্ষার ছত্রের মতো মাধবও তার জীবনের একান্ত প্রয়োজন। ফলে এই পংক্তির মধ্যে শুধু মিলনের আনন্দ নয়, বিরহের ভয় কাটিয়ে প্রিয়তমকে স্থায়ীভাবে কাছে পাওয়ার আকুল বাসনাও প্রকাশিত হয়েছে।
৪. “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল। পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।।”— কার, কখন এই উপলব্ধি ঘটে? তাঁর এই মন্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা করো। ২+৩
যার, যখন এই উপলব্ধি ঘটে : এই উপলব্ধি রাধার। দীর্ঘদিন মাধবের বিরহে দুঃখভোগ করার পর যখন রাধা মাধবের মুখ দর্শন করে তাঁকে কাছে পায়, তখনই তাঁর মনে এই উপলব্ধি ঘটে। প্রিয়তমের মুখ দেখার আনন্দে তাঁর এতদিনের বিরহের কষ্ট যেন সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়।
এই মন্তব্যের কারণ : দীর্ঘদিন মাধবের বিচ্ছেদে রাধার জীবন দুঃখ ও অপেক্ষার মধ্যে কেটেছে। সেই বিরহের কষ্ট তাঁর মনে গভীরভাবে জমে ছিল। কিন্তু অবশেষে মাধব তাঁর কাছে ফিরে আসায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রিয়তমের মুখ দেখার মুহূর্তে রাধার মনে এমন আনন্দের সঞ্চার হয় যে, পূর্বের সমস্ত দুঃখ যেন তুচ্ছ ও দূরের বলে মনে হতে থাকে। তাই সে বলে— “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল। / পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।। ”
এখানে রাধা বোঝাতে চেয়েছে, বিরহে মাধবের অনুপস্থিতি তাকে যতটা কষ্ট দিয়েছিল, তাঁর মুখ দর্শনে সে ততটাই আনন্দ লাভ করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া এই মিলন তাই তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। শুধু মাধবকে দেখতে পাওয়াই নয়, তাঁকে কাছে পাওয়ার মধ্যে রাধা নিজের হারানো সুখ ও শান্তিকে ফিরে পেয়েছে।
এই কারণেই মাধবকে সে আর দূরে যেতে দিতে চায় না। অমূল্য সম্পদের মতো তাঁকে আঁচলে ধরে রাখতে চায়। ফলে উক্তিটির মধ্যে দীর্ঘ বিরহের যন্ত্রণা, মিলনের অপরিসীম আনন্দ এবং প্রিয়তমকে চিরদিন কাছে রাখার আকাঙ্ক্ষা—তিনটিই একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
৫. “পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।।”— ‘পিয়া-মুখ’ কার ও তা দেখে কে সুখ লাভ করেছে? তাঁকে দেখে কীভাবে সুখ পাওয়া গেল? ২+৩
‘পিয়া-মুখ’ বলতে মাধবের মুখ বোঝানো হয়েছে। আর সেই প্রিয়তম মাধবের মুখ দেখে রাধা সুখ লাভ করেছে। দীর্ঘদিনের বিরহের পরে মাধবকে কাছে পেয়ে রাধার মনে এই অপরিসীম আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘদিন মাধবের বিচ্ছেদে রাধার দিনগুলি দুঃখ ও অপেক্ষার মধ্যে কেটেছে। প্রিয়তমের অনুপস্থিতি তার মনে যে শূন্যতা ও বেদনা সৃষ্টি করেছিল, মাধবের মুখ দর্শনের সঙ্গে সঙ্গেই তা যেন দূর হয়ে গেল। তাই রাধা বলেছে— “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল। / পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।। ” অর্থাৎ মাধবের বিরহে রাধা যতটা দুঃখ পেয়েছিল, তাঁর মুখ দেখে ততটাই আনন্দ লাভ করেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে প্রিয়তমকে চোখের সামনে ফিরে পাওয়া তার কাছে এক বিরাট প্রাপ্তি। এই মিলনের মুহূর্তে অতীতের সমস্ত কষ্ট যেন মুছে গিয়ে মনে প্রশান্তি ও আনন্দ ভরে উঠেছে। মাধবের মুখ দর্শন রাধার কাছে শুধু প্রিয়জনকে দেখার আনন্দ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁকে আবার কাছে পাওয়ার নিশ্চয়তা। তাই মাধবকে সে অমূল্য সম্পদের মতো নিজের কাছে ধরে রাখতে চায় এবং আর দূর দেশে পাঠাতে চায় না। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় ও বর্ষার ছত্রের উপমায় মাধবের প্রয়োজনীয়তাও প্রকাশ পেয়েছে।
দীর্ঘ বিরহের বেদনার পরে মাধবের মুখ দর্শন রাধার মনে যে গভীর তৃপ্তি, স্বস্তি ও আনন্দ এনে দিয়েছে, সেই আনন্দই উক্ত পংক্তিতে সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
৬. “আঁচর ভরিয়া যদি মহানিধি পাই তব হাম পিয়া দূর দেশে না পাঠাই”— বক্তা শ্রীরাধিকা তাঁকে আর দূরদেশে পাঠাতে রাজি হননি কেন?
দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের পরে মাধবকে কাছে পেয়ে রাধা আর তাঁকে হারাতে চায় না। তাই সে বলে— “আঁচর ভরিয়া যদি মহানিধি পাই / তব হাম পিয়া দূর দেশে না পাঠাই।” এখানে মাধবকে রাধা ‘মহানিধি’-র সঙ্গে তুলনা করেছে। অর্থাৎ প্রিয়তমকে সে এমন এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে করে, যাঁকে একবার কাছে পাওয়ার পর আর হারাতে চায় না।
মাধবের বিচ্ছেদে রাধা যে গভীর দুঃখ পেয়েছিল, তাঁর মুখ দর্শনের পর সেই দুঃখই বিপুল আনন্দে পরিণত হয়েছে— “পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।” ফলে আবার বিচ্ছেদের কথা ভাবলেই তার মনে ভয় জাগে। মাধব তার কাছে শুধু প্রিয়তম নন; তিনি শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় এবং বর্ষার ছত্রের মতো জীবনের প্রয়োজনীয় অবলম্বন। তাই রাধা তাঁকে আর দূর দেশে পাঠাতে রাজি নয়। দীর্ঘ বিরহের কষ্টের পুনরাবৃত্তি সে কোনোভাবেই চায় না; বরং প্রিয়তমকে চিরদিন নিজের কাছে রাখাই তার একান্ত আকাঙ্ক্ষা।
৭. “শীতের ওঢ়নী পিয়া গীরিষির বা বরিষার ছত্র পিয়া দরিয়ার না।।”— প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আলোচ্য উদ্ধৃতিটি ব্যাখ্যা করো।
আলোচ্য পদটি বিদ্যাপতির ‘ভাবসম্মিলন’ পর্যায়ের পদ। দীর্ঘদিনের বিরহের পর মাধবের সঙ্গে মিলন ঘটায় শ্রীরাধার মনে অপরিসীম আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। মাধবকে কাছে পেয়ে তিনি আর তাঁকে দূরে পাঠাতে চান না। এই প্রসঙ্গেই রাধা মাধবের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে বলেন— “শীতের ওঢ়নী পিয়া গীরিষির বা / বরিষার ছত্র পিয়া দরিয়ার না।। ”
উদ্ধৃত পংক্তিতে রাধা বিভিন্ন ঋতুর প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সঙ্গে মাধবের তুলনা করেছেন। শীতের দিনে যেমন শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ওড়নি প্রয়োজন, তেমনই গ্রীষ্মের দিনে প্রয়োজন ছায়া বা আশ্রয়। আবার বর্ষাকালে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যেমন ছত্র প্রয়োজন, মাধবও তেমনই রাধার জীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় আশ্রয়। অর্থাৎ ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের যেমন বিভিন্ন আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়, রাধার জীবনে মাধবের প্রয়োজন তেমনি সর্বক্ষণ।
এই উপমাগুলির মধ্যে রাধার গভীর প্রেম ও নির্ভরতার পরিচয় পাওয়া যায়। দীর্ঘ বিরহে মাধবের অনুপস্থিতি তাঁকে যে দুঃখ দিয়েছে, তাঁর ফিরে আসায় সেই দুঃখ আনন্দে পরিণত হয়েছে। তাই মাধবকে আবার হারানোর কথা রাধা ভাবতেই পারে না। তার কাছে মাধব কোনো সাময়িক আনন্দের উৎস নন; তিনি জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একান্ত অবলম্বন।
৮. আলোচ্য ‘ভাব সম্মিলন’ পদটির মূলভাবটি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দাও।
বিদ্যাপতির ‘ভাবসম্মিলন’ পদটির মূল বিষয় হল দীর্ঘ বিরহের পর প্রিয়তম মাধবকে ফিরে পেয়ে শ্রীরাধার অপরিসীম আনন্দ এবং তাঁকে আর কখনও হারাতে না চাওয়ার আকুলতা। বিরহের দীর্ঘ দুঃখের পর মাধবের সঙ্গে মিলন রাধার মনে এমন আনন্দ এনে দিয়েছে, যা ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাই সখীর কাছে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সে বলে— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” মাধবের মুখ দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে রাধার এতদিনের বিরহ-বেদনা যেন মুছে যায়। সে অনুভব করে, মাধবের বিচ্ছেদে যত দুঃখ পেয়েছিল, তাঁর মুখ দেখে ততটাই সুখ লাভ করেছে— “পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।” এই আনন্দের মধ্যে শুধু মিলনের উচ্ছ্বাস নেই, আছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের স্বস্তিও।মাধবকে কাছে পেয়ে রাধা তাঁকে আর দূরে যেতে দিতে চায় না। সে মাধবকে অমূল্য ‘মহানিধি’-র সঙ্গে তুলনা করে। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় এবং বর্ষার ছত্রের উপমার মাধ্যমে রাধা বোঝায়, মাধব তাঁর জীবনের কতখানি প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ মাধব কেবল তাঁর প্রিয়তম নন, তিনি তাঁর জীবনের একান্ত আশ্রয় ও অবলম্বন।
পদের শেষে “সুজনক দুখ দিবস দুই-চারি” বলে কবি আশার বাণী শুনিয়েছেন। দুঃখের দিন চিরস্থায়ী নয়; তার পরে সুখের দিন আসে। তাই পদটির মধ্যে বিরহের বেদনা, মিলনের আনন্দ, প্রিয়জনকে আঁকড়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যতের আশাবাদ—সব মিলিয়ে এক গভীর মানবিক অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।
৯. ‘ভাব সম্মিলন’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
সাহিত্যে নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সার্থক নাম রচনার মূল বিষয় ও অন্তর্নিহিত ভাবকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে। বিদ্যাপতির ‘ভাবসম্মিলন’ পদটির নামকরণও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমগ্র পদ জুড়ে দীর্ঘ বিরহের পর রাধার মনে মাধবকে ফিরে পাওয়ার যে আনন্দ, আকুলতা ও তৃপ্তি প্রকাশ পেয়েছে, তার সঙ্গে ‘ভাবসম্মিলন’ নামটি সম্পূর্ণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
দীর্ঘদিন মাধবের বিরহে রাধার মন দুঃখে ভারাক্রান্ত ছিল। সেই বিরহের অবসান ঘটিয়ে মাধব যখন তাঁর কাছে ফিরে আসেন, তখন রাধার মনে আনন্দের যে ঢেউ ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তাই সে সখীর কাছে বলে— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” মাধবের মুখ দর্শনেই তার এতদিনের দুঃখ সুখে পরিণত হয়— “পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।” এই মিলন কেবল প্রিয়তমকে চোখের সামনে পাওয়ার ঘটনা নয়; রাধার সমস্ত মন-প্রাণ যেন মাধবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। মাধবকে সে অমূল্য ‘মহানিধি’ বলে মনে করে এবং আর দূর দেশে পাঠাতে চায় না। শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় ও বর্ষার ছত্রের সঙ্গে মাধবের তুলনা করে সে বুঝিয়ে দেয়, প্রিয়তম তার জীবনের একান্ত অবলম্বন।
পদের শেষেও দুঃখের পরে সুখের আগমনের কথা বলা হয়েছে— “সুজনক দুখ দিবস দুই-চারি।” ফলে বিরহের অন্ধকার পেরিয়ে মিলনের আনন্দই পদটির প্রধান সুর। রাধা-মাধবের মিলন, বিরহের অবসান, রাধার আনন্দ এবং প্রিয়তমকে চিরদিন কাছে রাখার আকাঙ্ক্ষা—সমস্ত কিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে ভাবের মিলন। তাই ‘ভাবসম্মিলন’ নামটি পদটির বিষয়বস্তু ও মূলভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নিঃসন্দেহে সার্থক।
১০. ভাব সম্মিলন’ কবিতাটির কাব্য সৌন্দর্য আলোচনা করো।
বিদ্যাপতির ‘ভাবসম্মিলন’ পদটি দীর্ঘ বিরহের পরে প্রিয়তমকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, তৃপ্তি ও আকুলতাকে কেন্দ্র করে রচিত। পদটির কাব্যসৌন্দর্য মূলত এর সহজ-সরল অথচ গভীর আবেগ, হৃদয়স্পর্শী চিত্রকল্প, উপমার সৌন্দর্য এবং বিরহ ও মিলনের অনুভূতির স্বাভাবিক প্রকাশের মধ্যে নিহিত।
পদটির শুরুতেই রাধার আনন্দের তীব্রতা ধরা পড়েছে— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” আনন্দের কোনো সীমা নেই; তাই তাকে প্রকাশ করার ভাষাও যেন রাধার কাছে হারিয়ে গেছে। এই একটি পংক্তিতেই তাঁর মনের উচ্ছ্বাস অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এরপর বিরহ ও মিলনের অনুভূতির চমৎকার বৈপরীত্য দেখা যায়— “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল। / পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল।। ” মাধবের বিচ্ছেদে যত দুঃখ, তাঁর মুখ দর্শনে তত সুখ—এই ভাবটি পদটির আবেগকে আরও গভীর করেছে।
মাধবকে ‘মহানিধি’-র সঙ্গে তুলনা করার মধ্যেও কাব্যিক সৌন্দর্য রয়েছে। প্রিয়তমকে অমূল্য সম্পদ হিসেবে পাওয়ার আনন্দ এবং তাঁকে হারাতে না চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখানে সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আবার “শীতের ওঢ়নী”, “গীরিষির বা” এবং “বরিষার ছত্র”-এর উপমাগুলির মাধ্যমে মাধবের প্রয়োজনীয়তা ও আশ্রয়দাতা রূপটি অত্যন্ত চিত্রময় হয়ে উঠেছে। ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে উপমাগুলির ব্যবহার রাধার ভালোবাসার গভীরতাকে সহজেই অনুভব করায়।
পদটির ভাষা সহজ, স্বাভাবিক ও আবেগময়। কোথাও অতিরিক্ত অলংকারের ভার নেই; বরং সরল কথনের মধ্যেই প্রেমের গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে। শেষে “সুজনক দুখ দিবস দুই-চারি” পংক্তিতে দুঃখের পরে সুখ আসার আশাবাদ পদটিকে একটি সুন্দর পরিণতি দিয়েছে।
তাই বলা যায়, সহজ ভাষা, গভীর আবেগ, বিরহ-মিলনের বৈপরীত্য, চিত্রময় উপমা এবং রাধার স্বাভাবিক অনুভূতির প্রকাশে ‘ভাবসম্মিলন’ পদটির কাব্যসৌন্দর্য অনন্য হয়ে উঠেছে।
আরো পড়ুন : তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের প্রশ্ন উত্তর
১১. বিদ্যাপতি রচিত ‘ভাব সম্মিলন’ পদটিতে বিদ্যাপতির কবি কৃতিত্ব আলোচনা করো।
বিদ্যাপতির ‘ভাবসম্মিলন’ পদে তাঁর কবিপ্রতিভার একটি উজ্জ্বল পরিচয় পাওয়া যায়। অতি সামান্য পরিসরের মধ্যে তিনি বিরহের দুঃখ, মিলনের আনন্দ, প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ভালোবাসার গভীর নির্ভরতার মতো নানা অনুভূতিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন। তাঁর কবিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল—জটিল অনুভূতিকে সহজ কথার মধ্যে জীবন্ত করে তোলা।
দীর্ঘ বিরহের পরে মাধবকে কাছে পেয়ে রাধার যে আনন্দ, কবি তা শুরুতেই অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে প্রকাশ করেছেন— “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর।” আনন্দের কোনো সীমা নেই—এই অনুভূতিকে এত সহজ অথচ শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করা বিদ্যাপতির কবিত্বের পরিচয়। আবার “পাপ সুধাকর যত দুখ দেল / পিয়া-মুখ-দরশনে তত সুখ ভেল” পংক্তিতে বিরহ ও মিলনের দুঃখ-সুখকে পাশাপাশি রেখে তিনি রাধার মনের পরিবর্তন অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিদ্যাপতির উপমা প্রয়োগের ক্ষমতাও এই পদে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মাধবকে ‘মহানিধি’-র সঙ্গে তুলনা করে তিনি প্রিয়তমের মূল্য বোঝিয়েছেন। আবার শীতের ওড়না, গ্রীষ্মের আশ্রয় এবং বর্ষার ছত্রের সঙ্গে মাধবের তুলনা করে দেখিয়েছেন, রাধার জীবনে মাধব কতখানি প্রয়োজনীয়। এই উপমাগুলি কৃত্রিম নয়; রাধার স্বাভাবিক অনুভূতির মধ্য থেকেই যেন তা উঠে এসেছে।
তাঁর ভাষাও অত্যন্ত সহজ, সরস ও আবেগপূর্ণ। সখীর সঙ্গে রাধার কথোপকথনের ভঙ্গি পদটিকে জীবন্ত করেছে। শেষ পংক্তিতে “সুজনক দুখ দিবস দুই-চারি” বলে কবি দুঃখের পরে সুখের আশার কথাও জানিয়েছেন।
সহজ ভাষায় গভীর অনুভূতির প্রকাশ, বিরহ-মিলনের সুন্দর সমন্বয়, স্বাভাবিক উপমা, চিত্রময়তা এবং মানবিক আবেগের আন্তরিক প্রকাশে ‘ভাবসম্মিলন’ পদে বিদ্যাপতির কবিকৃতিত্ব বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Telenapota Abishkar Golper Question Answer | Click here |
| ছুটি গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Chuti Golper Question Answer | Click here |
| HS 3rd Semester Bengali Question Paper 2027 PDF: উচ্চমাধ্যমিক তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা প্রশ্নপত্র উত্তর সহ! সংগ্রহ করে নিন | Click here |
| তিমির হননের গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার | Timir Hononer Gaan Kobitar Question Answer | Click here |
Our Latest Products
উচ্চমাধ্যমিক
All Subject দেখুন →
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম বাংলা সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক English সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম ইতিহাস সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক দর্শন সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক সংস্কৃত সাজেশন
একাদশ শ্রেণি
All Subject দেখুন →
একাদশ শ্রেণি বাংলা সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন
একাদশ শ্রেণি দর্শন সাজেশন
একাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ভূগোল সাজেশন
একাদশ শ্রেণি শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন