হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় | Holud Pora Golper Question Answer Class Twelve 4th Semester Bengali

হলুদ পোড়া — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (লেখক পরিচিতি)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক। ১৯০৮ সালে বিহারের দুমকায় তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের জীবন, সমাজ, দারিদ্র্য ও মনস্তত্ত্ব তাঁর সাহিত্যের প্রধান বিষয়।
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। অল্প বয়সেই গল্প ও উপন্যাস রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। তাঁর লেখায় বাস্তব জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব অত্যন্ত জীবন্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘জননী’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। বাংলা কথাসাহিত্যে বাস্তববাদী ও মনস্তাত্ত্বিক ধারাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৬ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর সাহিত্যকীর্তি আজও সমানভাবে স্মরণীয়।
হলুদ পোড়া গল্পের বিষয়বস্তু (সংক্ষিপ্তসার)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের পটভূমি গ্রামবাংলার একটি সাধারণ জনপদ। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে সেখানে পরপর দুটো খুন হয়। প্রথমে বলাই চক্রবর্তীকে মরা গজারি গাছের নিচে লাঠির আঘাতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বলাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রামবাসী খুব বেশি বিস্মিত না হলেও ষোলো-সতেরো বছরের শুভ্রার খুন তাদের মনে প্রবল কৌতূহল ও রহস্যের সৃষ্টি করে। শুভ্রা ছিল সাধারণ ঘরের মেয়ে; তাই তার এমন ভয়াবহ মৃত্যু গ্রামের মানুষ সহজে মেনে নিতে পারে না। দুটি খুনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
বলাইয়ের সম্পত্তি পেয়ে তার ভাইপো নবীন শহরের চাকরি ছেড়ে স্ত্রী দামিনীকে নিয়ে গ্রামে আসে। একুশ দিন পর সন্ধ্যাবেলায় দামিনী হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। শিক্ষিত ধীরেন এটিকে অসুখ মনে করে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়ার কথা বললেও গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কুঞ্জ মাঝির ঝাড়ফুঁকের ওপর বেশি বিশ্বাস করে। কুঞ্জ দামিনীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মন্ত্র, জল ছিটানো এবং পোড়া পাতা-শিকড়ের সাহায্যে ঝাড়ফুঁক করতে থাকে। শেষে পোড়া হলুদ নাকের কাছে ধরলে দামিনী নিজেকে মৃত শুভ্রা বলে পরিচয় দেয় এবং দাবি করে, বলাই চক্রবর্তী তাকে খুন করেছে। এই ঘটনায় গ্রামের কুসংস্কার আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
শুভ্রার দাদা ধীরেন ছিলেন শিক্ষিত, যুক্তিবাদী এবং গ্রামের অন্যতম সচেতন মানুষ। কিন্তু বোনের মৃত্যু, মানুষের গুজব, সন্দেহ এবং সামাজিক চাপ ধীরে ধীরে তার মনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। স্কুলেও তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং এক মাসের ছুটিতে পাঠানো হয়। বাড়িতে ফিরে সেও অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। এক সন্ধ্যায় ধীরেন বাঁশঝাড়ের কাছে গিয়ে কাদামাটি ও রক্তমাখা অবস্থায় ফিরে আসে এবং বাঁশের বাধা পার হতে না পেরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। গ্রামবাসীরা আবার কুঞ্জকে ডেকে আনে। পোড়া হলুদ নাকের কাছে ধরলে ধীরেন বলে ওঠে—“আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।”
গল্পের এই রহস্যময় সমাপ্তি পাঠকের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সত্যিই কি ভূতের অস্তিত্ব রয়েছে, নাকি কুসংস্কার, গুজব ও মানসিক চাপে মানুষ এমন আচরণ করতে পারে—লেখক সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেননি। বরং ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের মাধ্যমে তিনি গ্রামবাংলার অন্ধবিশ্বাসের পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক প্রভাবের গভীর দিকটি তুলে ধরেছেন।
হলুদ পোড়া গল্পের মূলভাব
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের মূলভাব হলো—কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, গুজব এবং সামাজিক চাপ কীভাবে মানুষের যুক্তিবোধ ও মানসিক স্থিরতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। গল্পে গ্রামবাসীর ভূত-প্রেত ও অশরীরী শক্তির প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষিত ধীরেনের যুক্তিবাদী মানসিকতার সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দামিনীর অসুস্থতাকে চিকিৎসার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা না করে কুঞ্জের ঝাড়ফুঁকের ওপর গ্রামের মানুষের নির্ভরতা এই অন্ধবিশ্বাসের পরিচয় দেয়।
গল্পে শুধু অশিক্ষিত গ্রামবাসী নয়, শিক্ষিত ধীরেনও শেষ পর্যন্ত এই সামাজিক পরিবেশের ভয়াবহ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। শুভ্রার হত্যার রহস্য, মানুষের গুজব ও সন্দেহ, বিদ্যালয়ে অপমান এবং নিজের মনের গভীর যন্ত্রণা তাকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলে যে মানুষটি প্রথমে দামিনীর ক্ষেত্রে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাকেই কুঞ্জের ঝাড়ফুঁকের শিকার হতে হয়।
গল্পের শেষ দৃশ্যে ধীরেনের মুখ দিয়ে “আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি”—এই কথা উচ্চারিত হওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। লেখক সত্যিই ভূতের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাননি; বরং এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে কুসংস্কার ও মানুষের মানসিক দুর্বলতা মিলেমিশে বাস্তবতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
তাই ‘হলুদ পোড়া’ মূলত অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তিবোধের এক গভীর সতর্কবার্তা। গল্পটি দেখায়, সমাজের গুজব ও কুসংস্কার যখন মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন শিক্ষিত মানুষও তার ভয়াবহ প্রভাব থেকে রেহাই পায় না।
হলুদ পোড়া গল্পের চরিত্র পরিচিতি
১. ধীরেন
ধীরেন শুভ্রার দাদা এবং গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করা ধীরেন শিক্ষিত, যুক্তিবাদী ও সচেতন মানুষ। সাধারণ রোগের চিকিৎসাও সে করে। দামিনীকে ভূতে পেয়েছে—এই ধারণা সে প্রথমেই অস্বীকার করে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে চেয়েছিল। কিন্তু বোনের রহস্যময় মৃত্যু, গ্রামবাসীর গুজব, সন্দেহ ও সামাজিক চাপ ধীরে ধীরে তার মানসিক স্থিরতা নষ্ট করে দেয়। শেষ পর্যন্ত তার মুখ দিয়েই বেরিয়ে আসে, “আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।” তাই ধীরেনের চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক চাপ একজন যুক্তিবাদী মানুষকেও কীভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
২. দামিনী
দামিনী নবীনের স্ত্রী। গ্রামে আসার একুশ দিন পর সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ তার অস্বাভাবিক আচরণ শুরু হয়। সে হাসে, কাঁদে, ছটফট করে এবং অন্যদের আঁচড়-কামড় দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। ধীরেন এটিকে অসুখ বলে মনে করলেও গ্রামবাসী ভূতের আছর বলে বিশ্বাস করে। কুঞ্জের ঝাড়ফুঁকের সময় পোড়া হলুদের প্রভাবে দামিনীর মুখ দিয়ে ‘শুভ্রা’ পরিচয় এবং বলাই চক্রবর্তীর নাম প্রকাশ পায়। দামিনীর চরিত্রকে ঘিরেই গল্পে কুসংস্কার ও রহস্যের আবহ সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে।
৩. কুঞ্জ মাঝি
কুঞ্জ মাঝি গ্রামের নামকরা ‘গুণী’। ভূত-প্রেত তাড়ানোর ক্ষমতা আছে বলে গ্রামবাসীর মধ্যে তার যথেষ্ট প্রভাব। দামিনীর চিকিৎসার বদলে সে মন্ত্র, জল ছিটানো, পোড়া পাতা-শিকড় এবং হলুদ পোড়ানোর মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করে। তার আচরণে একদিকে গ্রামবাংলার কুসংস্কারের প্রকাশ ঘটেছে, অন্যদিকে মানুষের ভয় ও কৌতূহলকে কাজে লাগানোর প্রবণতাও দেখা যায়। পরবর্তীতে ধীরেনের ক্ষেত্রেও সেই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে সে।
৪. নবীন
নবীন বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো। কাকার মৃত্যুর পর চল্লিশ টাকার চাকরি ছেড়ে স্ত্রী দামিনীকে নিয়ে গ্রামে আসে এবং কাকার সম্পত্তির দায়িত্ব নেয়। কাকার হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য সে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু স্ত্রী দামিনী অসুস্থ হয়ে পড়লে শিক্ষিত মানুষের মতো চিকিৎসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে শেষ পর্যন্ত কুঞ্জ মাঝির ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দেয়। তার চরিত্রে শিক্ষিত হয়েও কুসংস্কারের প্রতি দুর্বলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
৫. বলাই চক্রবর্তী
বলাই চক্রবর্তী গল্পের শুরুতেই খুন হওয়া ব্যক্তি। তাকে মরা গজারি গাছের নিচে মাথায় লাঠির আঘাতের চিহ্নসহ মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আশপাশের গ্রামের মানুষের কাছে তার মৃত্যু খুব বিস্ময়কর ছিল না; বরং অনেকে তার এমন পরিণতি প্রত্যাশা বা কামনা করেছিল। পরবর্তীতে দামিনীর মুখে শুভ্রাকে হত্যার জন্য বলাইয়ের নাম উঠে আসে। গল্পের রহস্য ও পরবর্তী ঘটনাবলির সঙ্গে তার চরিত্র গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।
৬. শুভ্রা
শুভ্রা ষোলো-সতেরো বছরের একটি সাধারণ, রোগা ও ভীরু মেয়ে। বিয়ের পর প্রায় দেড় বছর শ্বশুরবাড়িতে থাকার পরে সে বাপের বাড়ি ফিরে এসেছিল। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বাড়ির পিছনের ডোবার ঘাটে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই গল্পের রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। দামিনীর মুখে ‘শুভ্রা’ পরিচয় এবং বলাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গল্পের ঘটনাপ্রবাহকে নতুন দিকে নিয়ে যায়।
৭. পঙ্কজ ঘোষাল
বৃদ্ধ পঙ্কজ ঘোষাল বলাই চক্রবর্তীর অনুগ্রহে দীর্ঘদিন সপরিবারে প্রতিপালিত হয়েছিলেন। তাই গ্রামের মানুষের মধ্যে তার একটি প্রভাব ছিল। দামিনী অসুস্থ হলে তিনি চিকিৎসকের বদলে কুঞ্জ মাঝিকে ডেকে আনার পরামর্শ দেন। পরে দামিনীর মুখে বলাইয়ের নাম শোনার পর তিনিই মৃত বলাই কীভাবে শুভ্রাকে হত্যা করতে পারে, তার একটি কুসংস্কারপূর্ণ ব্যাখ্যা দাঁড় করান।
৮. কৈলাস ডাক্তার
কৈলাস ডাক্তার শা’পুরের চিকিৎসক। দামিনীর অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি সেখানে আসেন এবং কুঞ্জের ঝাড়ফুঁকের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন। তিনি দামিনীকে ঘরে নিয়ে গিয়ে ঘুমের ওষুধের ইনজেকশন দেন, ফলে দামিনী ঘুমিয়ে পড়ে। তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে গল্পে যুক্তিবাদী চিকিৎসাবোধের একটি বাস্তব উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
চরিত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ধীরেন, দামিনী, কুঞ্জ মাঝি, নবীন, বলাই চক্রবর্তী ও শুভ্রা। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঘটনাগুলির মধ্য দিয়েই গল্পে কুসংস্কার, যুক্তিবাদ, গুজব, ভয় এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট প্রকাশ পেয়েছে।
হলুদ পোড়া গল্পের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের ঘটনাগুলি পরপর সাজালে গল্পের রহস্য, কুসংস্কার এবং ধীরেনের মানসিক বিপর্যয়ের বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি হল—
১. পরপর দুটি খুন: কার্তিক মাসের মাঝামাঝি তিন দিনের ব্যবধানে বলাই চক্রবর্তী ও শুভ্রা খুন হয়।
২. বলাইয়ের মৃতদেহ উদ্ধার: ঘোষেদের মজা-পুকুরের ধারে মরা গজারি গাছের নিচে বলাইকে মাথায় লাঠির আঘাতের চিহ্নসহ মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
৩. শুভ্রার রহস্যজনক মৃত্যু: বাড়ির পিছনের ডোবার ঘাটে শুভ্রাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। দুটি খুনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে গ্রামে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
৪. নবীনের গ্রামে আগমন: বলাইয়ের সম্পত্তি তার ভাইপো নবীন পায়। সে শহরের চাকরি ছেড়ে স্ত্রী দামিনীকে নিয়ে গ্রামে আসে এবং কাকার হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।
৫. দামিনীর অস্বাভাবিক আচরণ: গ্রামে আসার একুশ দিন পর সন্ধ্যাবেলায় দামিনী হঠাৎ অদ্ভুতভাবে আচরণ করতে শুরু করে। সে হাসতে, কাঁদতে এবং ছটফট করতে থাকে।
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপ৬. ধীরেনের যুক্তিবাদী অবস্থান: শুভ্রার দাদা ধীরেন দামিনীর আচরণকে অসুখ বলে মনে করে এবং চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে কুঞ্জ মাঝিকে ডেকে আনে।
৭. কুঞ্জের ঝাড়ফুঁক: কুঞ্জ দামিনীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মন্ত্র পড়ে, জল ছিটিয়ে এবং আগুনে পাতা-শিকড় পুড়িয়ে ঝাড়ফুঁক শুরু করে।
৮. দামিনীর মুখে শুভ্রার পরিচয়: পোড়া হলুদ নাকের কাছে ধরলে দামিনী নিজেকে শুভ্রা বলে পরিচয় দেয় এবং বলে যে বলাই চক্রবর্তী তাকে খুন করেছে।
৯. বলাইকে ঘিরে কুসংস্কার: বলাই নিজে কীভাবে মৃত্যুর পর শুভ্রাকে হত্যা করতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তরে পঙ্কজ ঘোষাল ও কুঞ্জ মৃত মানুষের ‘ভর’ করার কুসংস্কারপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়।
১০. ধীরেনের ওপর সামাজিক চাপ: গ্রামের গুজব ও মানুষের সন্দেহ ধীরেনের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। স্কুলেও তাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় এবং এক মাসের ছুটি দেওয়া হয়।
১১. ধীরেনের মানসিক পরিবর্তন: বোনের মৃত্যু, গুজব ও সামাজিক চাপের মধ্যে ধীরেন ক্রমে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। তার মধ্যে ভয়, অস্থিরতা ও চিন্তার পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১২. বাঁশের বেড়া দেওয়ার ঘটনা: শুভ্রার আত্মা যাতে বাড়িতে প্রবেশ করতে না পারে, সেই বিশ্বাসে ঘাটের পথে পোড়া আগাযুক্ত বাঁশ পেতে দেওয়া হয়।
১৩. ধীরেনের অদ্ভুত প্রত্যাবর্তন: এক সন্ধ্যায় ধীরেন কাদা ও রক্তমাখা অবস্থায় ফিরে আসে। সে বাঁশের বাধা পার হতে না পেরে সেটি সরিয়ে দিতে বলে।
১৪. আবার কুঞ্জের ঝাড়ফুঁক: গ্রামবাসী ধীরেনকে কুঞ্জের হাতে তুলে দেয়। কুঞ্জ তাকে বেঁধে মন্ত্র, জল ও আগুনে পাতা-শিকড় পুড়িয়ে ঝাড়ফুঁক করে।
১৫. গল্পের রহস্যময় সমাপ্তি: পোড়া হলুদ ধীরেনের নাকের কাছে ধরলে সে বলে ওঠে—“আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।” এই চমকপ্রদ পরিণতিতেই গল্প শেষ হয় এবং সত্য-মিথ্যা, কুসংস্কার ও মানসিক বিপর্যয়ের রহস্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।
হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর
১। ছোটোগল্প হিসেবে হলুদ পোড়া’ গল্পটি কতদূর সার্থক তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
ছোটোগল্পের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য: আয়তনের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত, ভাবের দিক থেকে অখণ্ড, অনুভূতির দিক থেকে বৈচিত্র্য সম্পাদনকারী গদ্যে রচিত কাহিনি ছোটোগল্প নামে পরিচিত। সংক্ষিপ্ততাই ছোটোগল্পের প্রাণ। সমালোচক ছোটোগল্পকে বলেছেন ‘Peculiar product of the 19th century.’। ছোটোগল্পে চরিত্র সংখ্যা থাকে স্বল্প, ঘটনার ঘনঘটা কম, বিষয় একমুখী এবং কাহিনির শেষে থাকে একটা চমক। ছোটোগল্পে আরম্ভের তির্যকতা ও সমাপ্তির চমৎকারিত্ব পরিলক্ষিত হয়।
আমরা আলোচনা করে দেখব, গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘হলুদ পোড়া’ রচনাটি ছোটোগল্প হিসেবে কতখানি সার্থক।
সূচনা ও সমাপ্তি: ছোটোগল্পের সূচনা হয় বিদ্যুৎ চমকের মতো হঠাৎ করেই। জীবনের একটি অংশকে আলোকিত করাই এর মূল লক্ষ্য। ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের সূচনাতেই দু-দুটো মৃত্যুসংবাদ পাঠককে চমকিত করে, আবার প্রেতগ্রস্ত ধীরেনের দেহ অধিগ্রহণকারী প্রেতাত্মা বলাই চক্রবর্তীর স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে গল্পের সমাপ্তিও ঘটেছে হঠাৎ করেই।
সংক্ষিপ্ততা: ছোটোগল্প আকৃতি বা চেহারায় ছোটো হয়। আলোচ্য ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের গঠনগত ও কাহিনিগত সংক্ষিপ্ততা পাঠকবর্গকে পরিপূর্ণভাবেই গল্পের রস আস্বাদনে সাহায্য করে।
একমুখী আঙ্গিক: ছোটোগল্পের কাহিনি হয় একমুখী। ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের মধ্যেও এ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত। কোনো ভূত নয়, একমাত্র অধ সংস্কারই যুক্তিহীন করে মানুষকে, অবলীলায় বিকারগ্রস্ত করে, সেই কারণেই গল্পের শেষে শিক্ষিত, যুক্তিবাদী ধীরেন মানসিক বিকৃতির ঘোরে নিজেই বিস্মৃত হয়। গল্পে তার শেষতম সিদ্ধান্ত ‘আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।’-যা গল্পের একমুখী লক্ষ্যকেই পূর্ণ করে।
স্বল্প চরিত্র: ছোটোগল্পে চরিত্র সংখ্যা হয় হাতে গোনা। আলোচ্য ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের মূল চরিত্র ধীরেন, নবীন, দামিনী ও শান্তি। অন্যান্য অপ্রধান চরিত্রগুলি গল্প সমাপ্তির ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে মাত্র।
Climax বা চরম মুহূর্ত: ছোটোগল্পের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো Climax, যা গল্পে ‘Rising action’ এর পরেই থাকে, এটাই চূড়ান্ত পর্যায়। আলোচ্য গল্পের শুরু থেকে পাঠক কখনও ভাবতেই পারবে না যুক্তিবাদী শিক্ষিত ধীরেনকে ধীরে ধীরে কুসংস্কার গ্রাস করে নিচ্ছে, এবং পরিশেষে প্রেতগ্রস্ত ধীরেনের উক্তি প্রত্যুক্তি কার্যতই স্তম্ভিত করে পাঠকবর্গকে।
অতৃপ্তিবোধ: অতৃপ্তিবোধ ছোটোগল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কবিগুরুর ভাষায়-
'অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি' মনে হবে শেষ হয়ে হইল না শেষ।'
ধীরেন কর্তৃক গল্পের শেষতম উক্তি ‘আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।’- পাঠকের মনে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়ে হঠাৎ গল্পটির পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। বলা বাহুল্য, এই পরিণতি স্বাভাবিকভাবেই অতৃপ্তির রেশ রেখে যায় পাঠকমনে।
সুতরাং, সার্থক ছোটোগল্পের সবরকম বৈশিষ্ট্যগুণে ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি সার্থক ছোটোগল্পরূপে পাঠকের অন্তরে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্প অবলম্বনে ধীরেন চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
ভৌতিক আবহ, একের পর এক রহস্যমৃত্যু, রোমহর্ষক ঘটনার ঘনঘটা, অশরীরীর নিঃশব্দ পদচারণা, গুনিনের সুনিপুণ কৌশলে প্রেতাত্মার আর্তনাদ-‘হলুদ পোড়া’ গল্পের আঙ্গিকের এই বৈশিষ্ট্যগুলি আদতে মুখ্য নয়। কেবল অনুষঙ্গ হিসেবে এগুলিকে ব্যবহার করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গল্পের প্রাণভ্রমরটিকে স্থাপন করতে চেয়েছেন মানবমনের অন্ধকার কোণটিতে। এ গল্পের ধীরেন চরিত্রটি সেই সারসত্যরই প্রতিরূপ। শেকসপিয়র বলেছেন যে, সাহিত্যের সেই চরিত্রগুলিই শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত, যেগুলি হঠাৎই আমাদের বিস্মিত করে। অদ্ভুতভাবে কাহিনির শুরুতে হয়তো আমরা এসব চরিত্রের যে ক্রমপরিণতি প্রত্যাশা করি, দেখা যায়, তা না হয়ে এক অপ্রত্যাশিত পরিণতি আমাদের চমকিত করে দেয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে ধীরেনও তেমনই একটি নির্মাণ। গল্পে তার ক্রমবিবর্তিত মনস্তত্ত্বটি যেভাবে ধাপে ধাপে গল্পটিকে এক অনন্য পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছে তা নিম্নরূপ-
অসংগতিপূর্ণ চরিত্র: ধীরেন চরিত্রটিতে প্রথম থেকেই অসংগতি এবং ভারসাম্যহীনতা বর্তমান। নিহত শুভ্রার দাদা হল ধীরেন। সে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে স্নাতক অথচ স্কুলে সে ভূগোল পড়ায়। প্রথম যৌবনে সমাজগঠনে ব্রতী হয়ে লাইব্রেরি, তরুণ সমিতি, দাতব্য চিকিৎসা- নানাবিধ সমাজ কল্যাণমূলক কর্মে নিয়োজিত হয়েছিল সে। কিন্তু বিবাহ, সন্তানাদি হওয়ার পর তাকে দেখা যায় উদ্যমহীন হয়ে পড়তে। এমনকি যখন তার নিতান্ত নাবালিকা বোন শুভ্রার বিয়ে হয়, তখনও তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর গর্জে উঠেছিল বলে মনে হয় না। অচিরেই শুভ্রা আর পাঁচজন গ্রাম্যবধূর মতো মাত্র ষোলো-সতেরো বছর বয়সে সন্তানসম্ভবা হয়ে বাপের বাড়ি আসে – সন্তান প্রসবের কারণে এবং সাতমাসের গর্ভবতী শুভ্রার সঙ্গে ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা। যদিও তার খুনের কিনারা করার জন্যও ধীরেনকে বিশেষ উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। আসলে সংসারবৃত্তি অজুহাতমাত্র, তার পরিশ্রমবিমুখতা, দুর্বলচিত্ততা-ই এর মুখ্য কারণ। এমনকি বন্ধু নবীনের স্ত্রী দামিনীর অসুস্থতায় যে ধীরেন সর্বসমক্ষে গ্রামীণ সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, গল্পের পরিণতিতে সে-ই মনোবিকলনের শিকার হয়ে আত্মবিস্মৃত, প্রেতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তার বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী আধুনিক মন অজ্ঞতা, লোকবিশ্বাসের কাছে নতি স্বীকার করে পরিশেষে নিজের ভ্রান্ত মুখোশটিকে টেনে খুলে ফেলে দেয়।
যুক্তিবাদী মনোভাব : প্রথম পরিচয়ে দেখা যায়, ধীরেন শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী। নবীনের স্ত্রী দামিনীর হঠাৎ অসুস্থতায় ধীরেনকে ডেকে পাঠানো হলে, সে চিন্তিত মুখে নবীনকে জানায় শা’পুরের কৈলাস ডাক্তারকে একবার ডাকা দরকার। গ্রামবাসী কুঞ্জ ওঝার গুণপনায় বিভ্রান্ত হলে যুক্তিবাদী মন নিয়ে সে সংস্কারের বিরোধিতা করে। শুভ্রার মৃত্যু নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শোনা গেলেও সে তার যুক্তির দ্বারা সব সমাধান করতে চায়।
সমাজসংস্কারক: সমাজে থাকতে গেলে শিক্ষিত মানুষের উচিত সমাজসংস্কারে উদ্যোগী হওয়া। শিক্ষিত ধীরেন সে উদ্দেশ্যে প্রথম দিকে প্রবল উৎসাহের সঙ্গে সাতচল্লিশখানা বই নিয়ে লাইব্রেরি, সাতজন ছেলেকে নিয়ে তরুণ সমিতি, বই পড়ে পড়ে সাধারণ রোগের বিনামূল্যে ডাক্তারি- ইত্যাদি কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে সমর্পণ করেছিল।
সত্যবাদী: ধীরেন সত্যবাদীও বটে। পুথিগত শিক্ষা তাকে মানুষ ঠকাতে বাধা দেয়। তাই দামিনীর অসুস্থতায় তাকে ডাকা হলে সে অকপটে স্বীকার করে- ‘আমি তো পাশ করা ডাক্তার নই, দায়িত্ব নিতে ভরসা হচ্ছে না।’
কর্তব্যপরায়ণতা: ধীরেন কর্তব্যনিষ্ঠ। অন্তঃসত্ত্বা বোন শুভ্রার প্রতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে মানবিকতা হেতু তালগাছের টুকরো দিয়ে বাড়ির পিছনের ডোবাতে ঘাট বানিয়ে দিয়েছিল, যাতে শুভ্রা উঠতে নামতে গিয়ে পিছলে না পড়ে যায়।
অবসাদগ্রস্ততা: শুভ্রার মৃত্যু, মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নানা গুজব ধীরেনকে ক্রমশ অন্যমনস্ক করে দিয়েছিল। তাই স্কুলে গিয়ে সে পড়াতে পারে না। আবার বাড়িতে থেকেও অন্যমনস্কতা হেতু একা হয়ে যায়।
ভৌতিক রোমহর্ষক বৃত্তান্ত দিয়ে যে গল্পের শুরু তার পরিণতির চমক পাঠককে জানান দেয়, দুর্বলচিত্ত মানুষের অন্ধবিশ্বাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়া মানুষদের প্রতি, তীব্র বিদ্রূপবর্ষণই লেখকের উদ্দেশ্য। আর তখনই মনে হয় এ গল্পে ভৌতিক রসসঞ্চার আসলে মানবমনের জটিল মনস্তত্বকেই রূপদান করতে প্রযুক্ত হয়েছে- বলা বাহুল্য, সেই মনস্তত্ত্বের প্রকাশ ধীরেন চরিত্রকে ঘিরেই, আর এখানেই ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের ‘Soul’ হয়ে উঠেছে ধীরেন।
৩। মানিক বন্দ্যেপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্প অবলম্বনে গুনিন কুঞ্ঝ ওঝার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
প্রাককথন: গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে স্বল্প পরিসরে যে কয়েকটি চরিত্র কাহিনিবস্তুকে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি চরিত্র কুঞ্জ ওঝা, যে নামকরা গুনিন হিসেবে গল্পে আবির্ভূত হয়েছে। সমালোচক চার্লস ডিকেন্স (Charles Dickens) বলেছিলেন- ‘The Character is the vehicle that carries the story.’। কুঞ্জ মাঝি গল্পে সেই ‘Vehicle’-এর কাজ করেছে। তার চরিত্রের যে দিকগুলি পাঠকের চোখে সুচারুভাবে ধরা পড়েছে, তা নিম্নরূপ-
নামকরা গুনিন: কুঞ্জ ওঝা ছিল একজন নামকরা গুনিন। তার গুণপনার খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে সবাই একডাকে তাকে চিনত। একদিন নবীনের স্ত্রী দামিনী হঠাৎ অজানা রোগে আক্রান্ত হলে বুড়ো পঙ্কজ ঘোষাল তাই কুঞ্জের কথাই মনে করেছে। ডাক্তারের থেকেও যেন কুঞ্জ অনেক বেশি শক্তিশালী- অন্ধ সংস্কারে বিশ্বাসী গ্রামবাসী তাই কুঞ্জর গুণপনাতেই আস্থা রেখেছিল।
ভীতির মায়াজাল স্রষ্টা: ‘হলুদ পোড়া’ সংস্কারবদ্ধ মানুষের জীবনচিত্র। লোকসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রভাবে মানুষ কীভাবে প্রভাবিত হয়, এ গল্পে সেই প্রতিচ্ছবিই ফুটে উঠেছে। কুঞ্জ ওঝা সেই আদিম সংস্কারেরই ধ্বজাধারী। মানুষের অজ্ঞতা, ভীতিই তার বুটিবুজির উৎস। চক্রবর্তী বাড়িতে কুঞ্জের গুণপনা দেখার লোভে গাঁয়ের মানুষেরা ভিড় জমাতে শুরু করলে কুঞ্জ প্রথমেই সকলের মনে ভীতির উদ্রেক ঘটাতে বলে-
‘ভর সাঁঝে ভর করেছেন সহজে ছাড়বেন না।’
তবে পরে সবাইকে অভয় দিয়ে বলে, অশরীরী আত্মাকে শেষ পর্যন্ত ছাড়তেই হবে, কারণ কুঞ্জ মাঝির সঙ্গে চালাকি করা ভূতেরও অসাধ্য। অর্থাৎ, মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক ঘটিয়েই নিজের পসার জমিয়েছে কুঞ্জ।
কৌশল প্রয়োগে দক্ষতা: কুঞ্জ কৌশল প্রয়োগে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। দামিনীর রোগ সারাতে প্রথমেই উপস্থিত সকলকে ঘরের দাওয়া থেকে নামিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ শেষে দাওয়ায় জল ছিটিয়ে দামিনীর এলোচুল শক্ত করে খুঁটিতে বেঁধে দেয় সে। এরপর পুনরায় মন্ত্র পড়ে মালসার আগুনে নানা উপকরণ পুড়িয়ে তার গন্ধে দামিনীকে বশীভূত করে ফেলে। সবশেষে কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে তার নাকের কাছে ধরে আত্মার পরিচয় জেনে নেয়। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এসব কারসাজি করেই সে মানুষের বিশ্বাস জিতে নেয়।
ভীরু: কুঞ্জ বাহ্যিক সাহসিকতার পরিচয় দিলেও আসলে সে ছিল ভীরু স্বভাবের। ভীরুতার কারণেই সে কৈলাস ডাক্তারের তর্জনগর্জনের ভয়ে স্থান পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
অত্যন্ত চালাক: কুঞ্জ সমাজ মানসিকতা বোঝে। তাই শুভ্রা ও বলাই চক্রবর্তীর অপমৃত্যু ঘিরে জনতার আলোচিত এতদিনের গুঞ্জনকেই সে দামিনী বা ধীরেনের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিয়ে গুজবকেই বাস্তব ভিত্তি দিতে চায়। কারণ সে জানে রটনাকে সত্যি হতে দেখলে প্রবোধ পাওয়া বা পরিতৃপ্ত হওয়াই মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি। আসলে সবটাই তার ছলনা। নিহত বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো-বউ বা নিহত শুভ্রার দাদা ধীরেন – উভয়ই ছিল দুর্বলচিত্ত, অবসাদগ্রস্ত- আর এই মানসিক বিকারগ্রস্ততারই সদ্ব্যবহার করেছিল সুচতুর কুঞ্জ। আবার অন্যদিকে, দামিনী যখন জানায় সে শুভ্রা, বলাই চক্রবর্তী তাকে খুন করেছে- তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, তিনদিন আগে যে মৃত, সে খুন করবে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর পঙ্কজ ঘোষাল মিথ্যে যুক্তি দিয়ে উপস্থিত সকলকে বোঝাতে থাকলে, নিজের মর্যাদা রক্ষার তাগিদে ধূর্ত কুঞ্জ বুড়ো পঙ্কজ ঘোষালের যুক্তিকে সমর্থন করে তাতে নিজস্ব রং চড়ায়।
‘হলুদ পোড়া’ গল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে সমাজসত্য এবং মনস্তাত্ত্বিক ভাবনাকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, এভাবেই তার সহায়ক হয়ে উঠেছে কুঞ্জ ওঝা।
৪। হলুদ পোড়া’ গল্প অবলম্বনে নবীন চরিত্রটির পরিচয় দাও।
প্রাককথন: কল্লোল যুগের বিখ্যাত গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি ভৌতিক নয়, ভূত সংস্কারের গল্প। গল্পের এক একটি চরিত্রকে গল্পকার ধাপে ধাপে পাঠকের সম্মুখে এনেছেন, আবার সরিয়েও নিয়েছেন। গল্পের এরকমই এক চরিত্র নবীন।
তার চরিত্রের বিশেষ কয়েকটি দিক নিম্নরূপ-
শিক্ষিত যুবক: পরিচয়ে মৃত বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো নবীন, বন্ধু ধীরেনের সঙ্গে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়াশোনা করত। পরবর্তীকালে শিক্ষালাভহেতু সে শহরে চল্লিশ টাকা মাইনের চাকরি পেয়ে শহরেই বসবাস করতে শুরু করে- যা তার শিক্ষাগত যোগ্যতারই পরিচয় বহন করে। তবে বাস্তবে সেই শিক্ষার প্রয়োগ সে কতটুকু ঘটাতে পেরেছিল তা নিয়ে বারংবার প্রশ্ন তুলেছেন গল্পকার।
ছলনাময়: বলাই চক্রবর্তীর কেউ না থাকায় উত্তরাধিকার সূত্রে তার সমস্ত সম্পত্তি পায় নবীন। চাকরি সূত্রে বহুদিন যাবৎ শহরবাসী নবীন সম্পত্তির মালিকানা গ্রহণে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসে। কাকার রহস্যমৃত্যু নয়, কাকার সম্পত্তির প্রতি লোভ-লালসাই যে তাকে গ্রামে ফিরিয়ে এনেছে-পাছে এ সন্দেহ গ্রামবাসীর মনে জাগে, তাই লোক দেখানোর জন্য তাকে ছলনার আশ্রয় নিতে হয়। উপস্থিত গ্রামবাসীদের সামনে বারবার তাই সে কোঁচার খুটে কখনও চশমার কাচ কখনও নিজের চোখ মুছতে থাকে। কিন্তু এ যে তার শোক নয়, শোকের অভিনয়মাত্র, কেউ-ই তা বুঝতে পারে না। শুধু তাই নয়, ছলনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য নবীন তার কাকার খুনিকে যে ধরতে পারবে, তার জন্য পঞ্চাশ টাকা ‘রিওয়ার্ড’ ঘোষণা করে। এমনকি সে তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হেতু পাড়ার লোককে জানিয়ে দেয় যে, কাকাকে যারা ওইরকম নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তাদের সে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবেই।
দায়িত্ববান স্বামী: ছলনাকারী হলেও গল্পপাঠে বোঝা যায়, নবীন তার স্ত্রীর প্রতি ছিল বেশ দায়িত্ববান। তাই স্ত্রী হঠাৎই অজানা রোগে আক্রান্ত হলে সে শশব্যস্ত হয়ে উঠেছে। সকলের পরামর্শ নিয়ে একদিকে সে যেমন ডাক্তারকে ডেকে পাঠিয়েছে, অপরদিকে কুঞ্জ গুনিনকেও খবর দিয়েছে। মোটকথা স্ত্রীর আকস্মিক অসুস্থতায় নবীন দিশেহারা। তার উদ্দেশ্য ছিল স্ত্রী দামিনীকে যে-কোনো প্রকারে সুস্থ করে তোলা।
কুসংস্কারে বিশ্বাসী: ধীরেনের মতো নবীনের আচরণেও দ্বিচারিতা অর্থাৎ পরস্পরবিরোধিতা দেখা গিয়েছে। নবীন শহুরে চাকুরিরত শিক্ষিত যুবক হয়েও কুসংস্কারকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। স্ত্রীর অসুখ সারাতে সে ভরসা করেছে ডাক্তার নয়, ওঝার উপর। ‘এসব খাপছাড়া অসুখে ওদের চিকিৎসাই ভাল ফল দেয়’ এই ছিল নবীনের বিশ্বাস। তার স্ত্রীকে সুস্থ করতে কুঞ্জ গুণী শুরুতেই নানা বুজরুকিপূর্ণ কাজ করলে যুক্তিবাদী বন্ধু ধীরেন যখন প্রতিবাদ করে, তখন নবীন ধীরেনকে ‘তুমি চুপ কর, ভাই।’-একথা বলে কুসংস্কারেরই পক্ষ নিয়েছে।
এইভাবে গল্পের স্বল্প পরিসরে উপস্থিত থেকেও চরিত্রটি গল্পকাহিনিকে ক্লাইম্যাক্সের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আসলে লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আলোচ্য গল্পে, শিক্ষিতের মুখোশধারী অথচ অন্তঃসারশূন্য, দুর্বলচিত্ত, ভীরু অধসংস্কারের কাছে নতি স্বীকারকারী যে যুব সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্রুপের বাণ হানতে চেয়েছেন, নবীন সেই শ্রেণিরই যথার্থ প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে।
৫। “সে বছর কার্তিক মাসের মাঝামাঝি তিন দিন আগে পরে গাঁয়ে দু’দুটো খুন হয়ে গেল।”- কারা খুন হল? কীভাবে তাদের মৃত্যু ঘটেছিল?”
যারা খুন হল: কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের উদ্ধৃতাংশে যাদের খুনের প্রসঙ্গ রয়েছে, তাদের একজন হল মাঝবয়সী জোয়ান মদ্দ পুরুষ বলাই চক্রবর্তী ও গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধীরেনের বোন শুভ্রা, যে ছিল সন্তানসম্ভবা, রোগা, ভীরু প্রকৃতির ষোলো-সতেরো বছরের এক নাবালিকা।
বলাই খুড়োর মৃত্যু: কোনো এক বছর কার্তিকের মাঝামাঝি সময়, প্রকৃতি যখন সোনালি ধানের গন্ধে মাতোয়ারা, চতুর্দিকে নবান্নের আয়োজন- সেই আবহেরই বিপরীতে তিনদিন আগে পরে খুন হয়ে যায় গ্রামের বলাই চক্রবর্তী এবং শুভ্রা। গাঁয়ের দক্ষিণে ঘোষেদের মজা পুকুরের – ধারে মরা গজারি গাছের নীচে বনজঙ্গলের আবরুবিহীন এক নিরিবিলি স্থানে একদিন হঠাৎ বলাই চক্রবর্তীকে মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার আটচির হয়ে ফেটে যাওয়া মাথাটি দেখে মনে হয় অনেকগুলি লাঠির আঘাতে এই অবস্থা হয়েছে। বলাইয়ের মৃত্যুতে সারা গাঁয়ে হইচই পড়ে গেলেও গাঁয়ের লোকেরা কেউ তেমন বিস্মিত হয় না। গল্পকার এই প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘বলাই চক্রবর্তীর এই রকম অপমৃত্যুই আশেপাশের দশটা গাঁয়ের লোক প্রত্যাশা করেছিল’, কারণ সে ছিল স্বভাবদোষে দুষ্ট।
শুভ্রার মৃত্যু: অপরদিকে ষোলো-সতেরো বছরের রোগা ভীরু উপরন্তু সন্তানসম্ভবা শুভ্রার মৃত্যুতে গাঁয়ে হইচই হল কম কিন্তু বিস্ময় ও কৌতূহলের সীমা রইল না। সাধারণ গৃহস্থ ঘরের মেয়ে শুভ্রা, গাঁয়ের আর দশটা মেয়ের মতো সাধারণভাবেই বড়ো হয়েছিল। বিয়ের পর প্রথম সন্তান প্রসবের জন্য সে মাসখানেক আগে তার বাপের বাড়ি এসেছিল। তার জীবনের এমন কোনো ঘটনা কেউ খুঁজে বের করতে পারেনি, যে কারণে সে খুন হতে পারে। অথচ কার্তিকের এক সন্ধ্যায় বাড়ির পিছনে ডোবার ঘাটে শুভ্রার মতো নিরীহ মেয়েকে কে বা কারা গলা টিপে খুন করে গিয়েছিল, তা কেউ বুঝে উঠতে পারেনি। এমন নির্দয় এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে এবং এর কারণ অনুসন্ধান করতে না পেরে ‘গাঁ শুদ্ধ লোক যেন অপ্রস্তুত হয়ে রইল।’
৬। “চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল”-প্রসঙ্গ উল্লেখ করে চারিদিকে হইচই পড়ে যাওয়ার কারণ গল্প অনুসরণে লেখো।
অথবা, “চারিদিকে হইচই পড়ে গেল বটে, কিন্তু লোকে খুব বিস্মিত হল না।” চারিদিকে কীসের জন্য হইচই পড়ে গেল? কী ঘটনা ঘটেছিল ওই গ্রামে? ২+৩
প্রসঙ্গ: কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের সূচনা কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে, যখন প্রকৃতিতে সবুজ আর শীতের মিষ্টি আমেজ মিশে থাকে। ধানের শীষে দেখা যায় শিশিরবিন্দু, সোনালি রঙের প্রতিফলন। এমনই প্রকৃতিসজ্জার আনন্দঘন পরিবেশে গাঁয়ে হঠাৎ নেমে আসে বিষাদের ছায়া। মাসের মাঝামাঝি তিনদিন আগে পরে দু’দুটো খুনের ঘটনা ঘটে যায়, যা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। প্রথমে খুন হয় একজন জোয়ান মদ্দ পুরুষ বলাই চক্রবর্তী এবং তার ঠিক তিনদিন পর ষোলো-সতেরো বছরের রোগা, ভীরু, সাত মাসের গর্ভবতী এক নাবালিকা শুভ্রা। বনজঙ্গলহীন ফাঁকা স্থানে গাঁয়ের দক্ষিণে ঘোষেদের মজা পুকুরের ধারে একটা মরা গজারি গাছের নীচে একদিন বলাই চক্রবর্তীকে মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার মাথায় আঘাত চিহ্ন দেখে মনে হয়, খুব সম্ভবত অনেকগুলি লাঠির আঘাতে মাথাটা আটচির হয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়াতেই তার মৃত্যু ঘটেছে। এমন ভয়ংকর ঘটনায় গাঁয়ের- ‘চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল বটে কিন্তু লোকে খুব বিস্মিত হল না।’
হইচই পড়ার কারণ: গল্পের আবহ বুঝিয়ে দেয় বলাই চক্রবর্তী সৎ, মানবিক মানুষ ছিল না। তাই তার এরকম অপমৃত্যুই আশেপাশের দশটা গাঁয়ের লোক প্রত্যাশা করেছিল; অনেকে কামনাও করেছিল হয়তো। কিন্তু এমন ভয়ংকরভাবে তার মৃত্যু ঘটবে এটা গ্রামের কোনো মানুষই ধারণা করতে পারেনি। তাই সাদাসরল নিস্তরঙ্গ পল্লিজীবনে হঠাৎই আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যে গ্রামে বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে কেউ তেমনভাবে জখম পর্যন্ত হয়নি, সেখানে ভয়ংকরভাবে ঘটে যাওয়া জোড়া খুন মানুষকে হতবাক করে দিয়েছিল। তাই চারিদিকে হইচই পড়ে গিয়েছিল।
৭। “বুড়ো ঘোষালের ব্যাখ্যা শুনে সেটা কেটে গেল।”- বুড়ো ঘোষাল কী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন? সেই ব্যাখ্যার ফল কী হয়েছিল?
অথবা, “ব্যাখ্যাটা দেওয়া উচিত ছিল কুঞ্জ গুণীর।”- কোন্ ব্যাখ্যার কথা বলা হয়েছে? সেটা কুঞ্জ গুণীর দেওয়া উচিত ছিল কেন?
আলোচ্য ব্যাখ্যা: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে রহস্যজনকভাবে খুন হওয়া বলাই খুড়োর ভাইপো নবীনের স্ত্রী দামিনী কোনো এক সন্ধ্যায় অকস্মাৎ অদ্ভুত আচরণ প্রদর্শন শুরু করলে গ্রামবাসী ধরে নেয় তার উপর প্রেতাত্মার ভর হয়েছে। সেই সন্দেহে সিলমোহর পড়ে যখন গুনিন কুঞ্জের কৌশলে সে স্বয়ং ঘোষণা করে যে, তার দেহে বসবাসকারী আত্মা হল সদ্য খুন হওয়া গর্ভবতী শুভ্রা। শুধু তাই নয়, দামিনীর মুখ দিয়ে যেন স্বয়ং শুভ্রার আত্মাই জানান দেয় তার খুনির নাম হল অপঘাতে মৃত বলাই চক্রবর্তী।
কিন্তু খটকা ছিল এখানেই- বলাই চক্রবর্তী শুভ্রার মারা যাওয়ার তিনদিন আগেই খুন হয়েছিল। তাহলে সে কীভাবে শুভ্রার হত্যাকারী হতে পারে? এই ধাঁধার একটা বিশ্বাসযোগ্য সমাধান দেয় গ্রামের বৃদ্ধ পঙ্কজ ঘোষাল। সে বলে যে, শুধু জ্যান্ত মানুষই গলা টিপে খুন করতে পারে বা করে থাকে তা নয়, প্রেতাত্মাও এ কাজ করতে পারে। গ্রামবাসীর সংশয়ের এই বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাটি দেওয়া উচিত ছিল কুঞ্জ ওঝার, কিন্তু সময়মতো তার মাথায় এই ব্যাখ্যা না আসায় বৃদ্ধ ঘোষাল এই কথা সকলকে বলে সহজেই সংস্কারাচ্ছন্ন অজ্ঞ পল্লিবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলত, আপন মর্যাদা রক্ষার্থে কুঞ্জ তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধ ঘোষালের কথায় সায় দেয়।
কারণ: কুঞ্জ একজন গুনিন, যারা প্রেতে ভর করা রোগীর প্রেত ছাড়ানোর কাজ করে। চলতি কথায় এদের ওঝা-ও বলা হয়। এদের কাজটি মূলত সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও সংস্কার প্রবেশ করিয়ে তাদের মনের জোর ভেঙে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এ কাজ সঠিকভাবে করতে পারলে ওঝার উপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ে। সমাজে তাদের প্রতিপত্তিও বৃদ্ধি পায়। দামিনীর ঘটনায় শুভ্রার মৃত্যুর সঠিক ব্যাখ্যা কুঞ্জ ওঝা যদি সর্বপ্রথম দিতে পারত তবে গ্রামবাসীর কাছে তার আরও খ্যাতিবৃদ্ধি হত। কিন্তু বৃদ্ধ ঘোষাল গুনিন না হয়েও অভিজ্ঞতার বশে ব্যাখ্যাটি পূর্বেই করে ফেলায় সর্বসমক্ষে কুঞ্জর যেন কিছুটা মর্যাদাহানি ঘটে গুনিন হিসেবে কুঞ্জ ওঝার কাছ থেকেই সর্বাগ্রে এই ব্যাখ্যাপ্রাপ্তির প্রত্যাশা যুক্তিসংগত।
৮। “এক রাত্রে অনেক কান ঘুরে পরদিন সকালে এই কথাগুলি ধীরেনের কানে গেল।”- কোন্ কথাগুলি ধীরেনের কানে গেল? কথাগুলি শোনার পর ধীরেনের মধ্যে কী কী প্রতিক্রিয়া দেখা গেল?
যে কথাগুলি: কল্লোল যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটোগল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের কাহিনিতে দেখা যায় কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ে গাঁয়ে তিনদিনের তফাতে দু-দুটো খুনের ঘটনাবৃত্তান্ত-একজন বলাই চক্রবর্তী, অন্যজন শুভ্রা। এই দুটি খুনের সম্পর্ক আবিষ্কারের জন্য গাঁয়ের লোক যখন মরিয়া, ঠিক সেই মুহূর্তে নিহত বলাই খুড়োর ভাইপো নবীনের স্ত্রী দামিনীর শরীরে আশ্রয় নেওয়া আত্মা কুঞ্জ ওঝার গুণপনায় জানিয়ে দেয়-
“আমি শুভ্রা গো, শুভ্রা।… বলাই খুড়ো আমায় খুন করেছে।”
উপস্থিত অনেকে একথা বিশ্বাস না করলেও বুড়ো পঙ্কজ ঘোষাল এবং কুঞ্জ গুণীর অকাট্য যুক্তিতে সকলেই তা বিশ্বাস করে নেয়। তাদের কথায় বলাই চক্রবর্তী একজনকে ভর করে তার মধ্যস্থতায় শুভ্রাকে খুন করেছে, তার রক্তমাংসের হাত দিয়ে। এই কথাগুলিই অনেক কান ঘুরে অতিরঞ্জিত হয়ে ধীরেনের কানে যায়।
প্রতিক্রিয়া: দামিনীর শরীরে শুভ্রার প্রেতাত্মার অধিষ্ঠান, শুভ্রার স্বীকারোক্তিতেই তার খুনের রহস্য উন্মোচন গাঁয়ের অন্যান্য সকলের মতো অনেক কান ঘুরে শুভ্রার দাদা ধীরেনের কানেও এলে তার মধ্যে যে যে প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছিল, তা নিম্নরূপ-
পুরোনো ভাবনার সঞ্চার: বোন শুভ্রার মৃত্যুতে পাড়ার মানুষ বাড়ি বয়ে নানাবিধ গুজব শুনিয়ে গেলেও ডোবার কোন দিক থেকে কীভাবে কে সেদিন সন্ধ্যায় ঘাটে এসেছিল, কেন এসেছিল এইসব পুরোনো ভাবনা সে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
ক্ষোভ ও বিষাদের মাত্রাবৃদ্ধি: গাঁয়ের মানুষদের কথায় ধীরেনের মধ্যে একরাশ ক্ষোভ ও বিষাদের সৃষ্টি হয়, অথচ সে কাউকে কিছু বলতে পারে না, চুপচাপ থাকে, অন্য কোনো বিষয়ে তার মন বসে না।
অন্যমনস্কতা: পাড়ার মানুষেরা বাড়ি বয়ে গুজব রটিয়ে গেলে পাড়া প্রতিবেশীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ধীরেন মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। স্কুলে পড়ানোর ক্ষেত্রেও তার আর মন লাগে না।
রাগের বহিঃপ্রকাশ: পাড়ার মানুষের কথাগুলোকে স্ত্রী শান্তি মেনে নিয়ে “আমার কিন্তু মনে হয় তাই হবে” বললে ধীরেন ক্রুদ্ধ হয়ে কটমট করে তাকিয়ে স্ত্রীকে ধমক দেয়।
নিজেকে বহিরাগত ভাবা: স্কুলে গিয়ে ধীরেনের নিজেকে বহিরাগত মনে হতে থাকে, কারো দিকে সে তাকাতে পারে না, নিজেকে যেন তার ‘জীবন্ত ব্যঙ্গের’ মতো মনে হয়।
এইসব প্রতিক্রিয়া পুঞ্জীভূত হয়েই পরবর্তীকালে ধীরেনের মানসিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। তাই ধীরেন চরিত্রের ক্রমবিবর্তনে এসব প্রতিক্রিয়াই যে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে তা বলা বাহুল্য।
৯। ধীরেনের স্ত্রী শান্তি অশরীরী আত্মার থেকে নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করেছিল, তা গল্প অনুসরণে লেখো।
সতর্কতাসমূহ: গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি ভৌতিক গল্প নয়, ভূত-সংস্কারের গল্প। এই গল্পে বাঙালি গৃহবধূ শান্তির পরিচয় হল সে যুক্তিবাদী, শিক্ষিত ধীরেনের স্ত্রী। বাঙালি গৃহবধূ বলেই বাঙালি সংস্কার সে প্রাণপণে মেনে চলার চেষ্টা করে। গল্পের কাহিনি অনুযায়ী নবীনের স্ত্রী দামিনীর উপর ভর করা, নিহত শুভ্রার প্রেতাত্মা নিজমুখে ঘোষণা করেছে তাকে খুন করেছে বলাই চক্রবর্তী। এমন অস্বাভাবিক সংবাদ মুখে মুখে ছড়িয়ে গেলে পুরুতঠাকুর-সহ অনেকে ধীরেনকে যেমন নানা উপদেশ বা সংস্কারবাণী শুনিয়েছে, তেমনি শান্তিকেও পাড়াপ্রতিবেশীরা কিছু সংস্কার মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। বাঙালি গৃহবধূ শান্তি তাই পরিবারের মঙ্গলকামনায় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করেছিল।
সন্ধ্যার আগে রান্না-খাওয়া সমাপ্ত করা: বাড়ির চতুর্দিকে ভৌতিক পরিবেশের কারণে শান্তি সন্ধ্যার আগেই রান্নাবান্না আর ঘরকন্নার সব কাজ শেষ করে রাখত। আলো জ্বালার আগেই ছেলেমেয়েদের খেতে বসিয়ে। দিয়ে, নিজেও খেয়ে নিত সে। তার বিশ্বাস ছিল এতে অশরীরী আত্মার কুপ্রভাব তার পরিবারের উপর পড়বে না।
আমিষ রান্না বন্ধ করা: শান্তি বিকেল-সন্ধ্যাতে মাছ রান্না করা বন্ধ করে দেয়। তার বিশ্বাস এঁটোকাঁটা অশরীরী আত্মাকে আকর্ষণ করে। তাই এমন ব্যবস্থা নেয় সে।
ঘরের বাইরে সন্ধ্যায় না বেরোনো: শান্তি অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পর ধীরেনকে সঙ্গে না নিয়ে বড় ঘরের চৌকাঠ পেরোতে আর সাহস পায় না। অশরীরী আত্মার হাত থেকে রক্ষা পেতে ছেলেমেয়েদেরও ঘরের মধ্যে আটকে রাখা শুরু করে।
ঘাটের পথে বাঁশ পেতে রাখা: পরিবারের মঙ্গল কামনায় সতর্কতাহেতু গ্রামের অভিজ্ঞ ক্ষেন্তি পিসির পরামর্শ অনুযায়ী শান্তি কাঁচা বাঁশের দুই প্রান্ত খানিকটা পুড়িয়ে শোওয়ার ঘর আর রান্নাঘরের ভিটের সঙ্গে দুটি প্রান্ত ঠেকিয়ে পেতে দেয়। তার বিশ্বাস অশরীরী কোনো কিছু এ বাঁশ ডিঙোতে পারবে না। সে মনে মনে ভেবে নেয়-
“ঘাট থেকে শুভ্রা যদি বাড়ির উঠানে আসতে চায়, এই বাঁশ পর্যন্ত এসে ঠেকে যাবে।”
স্বামী ও সন্তানের অমঙ্গল সে কল্পনাও করতে পারে না, তাই তাদের রক্ষা করতে সে এমনই সতর্কতা অবলম্বন করেছিল।
১০। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে প্রকৃতির যে চিত্ররূপময়তা রয়েছে, তা বর্ণনা করো।
প্রাককথন: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি আপাদমস্তক একটি মনস্তাত্ত্বিক ময়নাতদন্ত হলেও মানবমনের গভীরে প্রতিনিয়ত যে পটপরিবর্তন, যে ওঠা-পড়া চলে- তাকে চিত্রায়িত করতেই যেন লেখক সচেতনভাবেই গল্পের বহিরঙ্গে রচনা করেছেন একটি রোমহর্ষক ভৌতিক আবহ। আর, অতিপ্রাকৃত এই রসসঞ্চারে সহায়ক হয়ে উঠেছে গল্পের চিত্ররূপময় প্রকৃতির সুগভীর ব্যঞ্জনা।
দৃষ্টান্তসমূহ: ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে প্রকৃতির যে অনুষঙ্গ বারবার ফিরে আসে- তা বিষণ্ণ, ম্লান হেমন্তের। কার্তিক মাস নাগাদই নিস্তরঙ্গ গ্রামজীবনে সাড়া ফেলেছে উদ্দেশ্যহীন দু-দুটি খুনের ঘটনা। প্রথম খুনের বর্ণনাকে আরও রহস্যপূর্ণ করেছে গাঁয়ের দক্ষিণে ঘোষেদের মজা পুকুরের ধারে মরা গজারি গাছ, বনজঙ্গলের আববুহীন ফাঁকা ধু-ধু একটি গা-ছমছমে স্থান। পাশাপাশি দ্বিতীয় খুনটির বর্ণনায় প্রকৃতির বিবরণ খুব বেশি সুস্পষ্ট না হলেও সাঁঝবেলা বা বাড়ির পিছনে ডোবার ঘাটের ইঙ্গিত সহজেই পাঠকমনে একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ এঁকে দিয়ে যায়।
গল্পের পরবর্তী ধাপে আসে অপঘাতে মৃত বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো-বউ দামিনীর প্রেতগ্রস্ত হওয়ার প্রসঙ্গ। সন্ধ্যাকাল, অতি মৃদু দমকা বাতাসে বাড়ির পূর্ব কোণের তেঁতুল গাছের পাতার মর্মর যেন অস্বাভাবিক, অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটার ইঙ্গিত বহন করে।
কার্তিক পেরিয়ে আসে অগ্রহায়ণ। লেখকের বর্ণনায় উঠে আসে উজ্জ্বল মিঠে রোদ, বর্ষার জলে পরিপুষ্ট সবুজের সমারোহ, কচুরিপানায় আবৃত ডোবা, গাঢ় সবুজ রসালো পাতার দল, ফুলে ফুলে কোমল রঙের ছড়াছড়ি। এই অংশে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বর্ণনাটি, তা হল অঘ্রান পড়তে না পড়তেই বষর্ণপুষ্ট ডোবার জল কমতে থাকায় তালের গুঁড়ির ঘাটটির ক্রমশ বেআবরু হতে থাকা। এ যে আসলে বিজ্ঞানমনস্ক ধীরেনেরই মানস বিবর্তনকে সূচিত করে-তা বলাই বাহুল্য। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপের অভ্যন্তরে যেমন অবক্ষয়ের খেলা- লেখক সেই বৈপরীত্যকেই যেন এরপর চিত্রায়িত করলেন আপাতদৃষ্টিতে সুশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী ধীরেনের মানসপটের পরিবর্তনে। বোন শুভ্রার মৃত্যু, তাকে ঘিরে নানা গুজব-প্রতিনিয়ত এই ভাবনায় আত্মমগ্ন থাকতে থাকতে হেমন্তের বিকেলের ম্লান আলোর ন্যায় তার চেতনার শেষ রেখাটুকুও ঘোর আঁধারে ডুবে যেতে থাকল।
গল্পের পরিশেষে প্রকৃতির চিত্ররূপময়তার যে শেষ দৃষ্টান্তটি পাওয়া যায়, তা যেন প্রকৃতির রূপ মাত্র নয়, তা ধীরেনেরই প্রতিবিম্ব ‘তখনো আকাশ থেকে আলোর শেষ আভাসটুকু মুছে যায়নি। দুতিনটি তারা দেখা দিয়েছে, আরও, কয়েকটি দেখা দিতে দিতে আবার হারিয়ে যাচ্ছে আর এক মিনিট দুমিনিটের মধ্যে রাত্রি শুরু হয়ে যাবে।’
যেন রাত্রির গভীরে বিলুপ্ত দিনের আলোর ন্যায় ধীরেনের সচেতন মনটিও সত্যই এরপর ভয়াবহ মনোবিকলনের শিকার হয়। ফিজিক্স অনার্স, স্কুলশিক্ষক ধীরেন আত্মবিস্মৃত হয়ে প্রেতগ্রস্ত হয়ে আপনার পরিচয় দেয়-‘আমি বলাই চক্রবর্তী’।
আরও পড়ুন : আঞ্চলিক রাজধানী ও রাজ্যগঠন MCQ প্রশ্ন উত্তর
১১। ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটিতে বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কারের যে দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
অথবা, ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে ধীরেনের জীবনে যেভাবে গ্রাম্য কুসংস্কার প্রভাব বিস্তার করেছে তা আলোচনা করো।
অথবা, ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কুসংস্কারই জয় লাভ করেছে।’- মন্তব্যটির সার্থকতা বিচার করো।
বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ, ফ্রয়েডির মনোবিকলনতত্ত্ব ও মার্কসীয় শ্রেণি সংগ্রাম দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথাসাহিত্য প্রাগুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতিফলন ঘটেছে বারে বারে। আমাদের পাঠ্য ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি এক গ্রাম্য কুসংস্কারের আখ্যান। গ্রামীণ জীবন সংস্কার, প্রথা, বিশ্বাস দ্বারা চালিত, তাড়িত ও প্রাণিত। আলোচ্যমান গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধীরেন, বিজ্ঞানের ছাত্র, পেশায় শিক্ষক। শিক্ষা ও যুক্তির বাঁধনে তার জীবনের কার্যধারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
ভর সন্ধ্যায় দামিনীর আচরণ গ্রামীণ দৃষ্টিতে খাপছাড়া অসুখ এর জন্য ডাক্তার নয় কুঞ্জকে প্রয়োজন। নবীন শিক্ষিত শহুরে যুবক হয়েও ধীরেনের বিপ্রতীপে অবস্থান করে ‘এসব খাপছাড়া অসুখে ওদের চিকিৎসাই ভালো ফল দেয় ভাই’। ধীরেন এর প্রতিবাদ করে। কৈলাস ডাক্তারকে খবর দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু গ্রামীণ আবর্তে তার বিচারধারা গ্রহণীয় নয়-
‘গাঁয়ের লোক কথা শোনে না বিরক্ত হয়’। প্রতিবাদ করেও চুপ করে থাকতে সে বাধ্য হয়। কুঞ্জ ওঝার গুণপনায় দামিনীর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় শুভ্রা ও তার খুনি বলাই চক্রবর্তীর নাম। গ্রাম্য সংস্কার ও বিশ্বাস জয়লাভ করে। বিজ্ঞানের ছাত্র যুক্তিবাদী ধীরেনকে পিছু হটতে হয়।
ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কুসংস্কার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সকলের শীতল চাহনি ধীরেনের চেতনায় আঘাত করে। সেও ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। সহকর্মীদের আচরণ, ছাত্রদের ভয়ার্ত দৃষ্টি, বাড়ির পরিবেশ তাকে একটা অন্য জগতের বাসিন্দা করে তোলে। সেও বিশ্বাস করতে থাকে অশরীরীর উপস্থিতি। আর সেই বিশ্বাসের কারণেই সেই শুভ্রার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে রত হয়। নিজের মানসিক টানাপোড়নে সেও শেষ পর্যন্ত হলুদ পোড়ার শিকার হয় আর উচ্চারণ করে-‘আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।’ এভাবে গল্পের শেষে ধীরেন শুধু গ্রাম্য কুসংস্কারের শিকারই হয় নি তার নিজের চিন্তা- চেতনা যুক্তিবোধেরও বিলুপ্তি ঘটেছে। ফলে গল্পটি হয়ে উঠেছে গ্রাম্য কুসংস্কারের এক আখ্যান।
১২। ‘হলুদ পোড়া‘ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
সাহিত্যের নামকরণে থাকে স্রষ্টার পরিচয়। বিষয়, ব্যঞ্জনা ও চরিত্রের নিরিখে নামকরণের কায়া নির্মাণ। এখন আমরা বিচার করব মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘হলুদ পোড়া’ নামকরণটি কতখানি সার্থকতা লাভ করেছে।
কয়েকদিনের মাথায় গ্রামে পরপর দুটি খুন হয়ে যায়। প্রথমে খুন হয় মাঝ বয়সী বলাই চক্রবর্তী আর দ্বিতীয় খুন হয় অল্প বয়সী মেয়ে শুভ্রা। বলাই চক্রবর্তীর আচরণের কারণে গ্রামীণ মানুষের তার মৃত্যুতে কোনো সহানুভূতি জাগে নি কিন্তু শুভ্রার খুন গ্রামীণ মানুষকে শুধু অবাকই করে নি, করেছে চিন্তিত। একদিন সন্ধ্যেবেলা বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো নবীনের স্ত্রী দামিনী উঠোনে পড়ে যায়। সে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে।
গ্রামের শিক্ষিত যুবক ধীরেন কৈলাস ডাক্তারকে ডাকার পরামর্শ দিলেও গ্রামের বুড়ো পঙ্কজ ঘোষাল কুঞ্জ ওঝাকে ডাকার কথা বলে। গ্রামের অন্যান্য সকলে সে কথায় সায়ও দেয়। কুঞ্জ ওঝা নামকরা গুণী। সে দামিনীকে নানাভাবে নিগৃহীত করে শেষে তার নাকের সামনে একখানা কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে ধরে, আর হলুদ পোড়ার গন্ধে দামিনী জানায় সে শুভ্রা, বলাই চক্রবর্তী তাকে খুন করেছে। যুক্তি আর বিশ্লেষণে এই কথাটাই প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ধীরেনের কানেও সে কথা পৌঁছায়। এই কথা চিন্তা করতে করতে সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। স্কুল থেকে তাকে কিছু দিন ছুটি দেওয়া হয়। সমস্ত গ্রামে একটা ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করে। ধীরেনের স্ত্রী, ছেলেমেয়েরাও ভীত হয়ে ওঠে। অশরীরীর হাত থেকে বাঁচার জন্য একখানা কাঁচা বাঁশের ডগা ও আগা পুড়িয়ে উঠোনে ফেলে রাখা হয়।
ধীরেনের মধ্যে একটা বিকার কাজ করতে থাকে। একদিন সন্ধেবেলায় তাকেও ভূতে পায়। সে নিজের নাম ধরে ডাকা ডাকি করতে থাকে। কুঞ্জ ওঝার হলুদ পোড়ার গন্ধে সে শিকার করে-‘আমি বলাই চক্রবর্তী। শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।’ গল্পের শুরু ও শেষে হলুদ পোড়া গ্রামীণ মানুষের সামানে এক অজানা সত্যকে প্রকাশিত করেছে। হলুদ পোড়াই হয়ে উঠেছে ভূত তাড়ানোর মূল অস্ত্র। হলুদ পোড়াতেই গ্রামীণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। আলোচ্যমান গল্পে লেখক গ্রামীণ বিশ্বাসকে সুন্দরভাবে মনোবিশ্লেষণের সূক্ষ্মতায় উপস্থাপিত করেছেন। সেই উপস্থাপনে হলুদপোড়া পেয়েছে বিশ্বাসের দৃঢ়তা। তাই বিষয়কেন্দ্রীক নামকরণ হিসাবে ‘হলুদ পোড়া’ সার্থক ও সুপ্রযুক্ত।
১৩। ‘নামকরা গুণী‘ কুঞ্জর গুণপনা ‘হলুদ পোড়া‘ গল্পে কীভাবে প্রদর্শিত হয়েছে?
কুঞ্জ–র দেখানো জীবনের শেষ সীমানার ওপারের ম্যাজিক:
গুণপনার প্রথম পরিচয়: দামিনীর ‘খাপছাড়া’ অসুখের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নবীনের বাড়ির দাওয়ায় গাঁয়ের অনেক লোক এসে জড়ো হয়। ডাক্তার আসার আগেই উপস্থিত হয় কুঞ্জ। দামিনীকে দেখে প্রথমেই সে বলে-‘ভর সাঁঝে ভর করেছেন সহজে ছাড়বেন না।’- আসলে গুনিনের গুণপনার প্রথম কৌশলই হল মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করা। পুনরায় সকলকে অভয় দিয়ে সে বলে যে অশরীরী আত্মা কখনও কুঞ্জ মাঝির সঙ্গে চালাকি করতে পারবে না, ছাড়তে তাকে হবেই।
খুঁটির সঙ্গে দামিনীর চুল বেঁধে দেওয়া: ম্যাজিশিয়ান যেমন তার সম্মোহনী জাদু প্রদর্শন করে দর্শককে বিমুগ্ধ করে আর মুগ্ধ দর্শকের বাহ্যজ্ঞান মুহূর্তে আচ্ছন্ন হয়ে আসে, গুনিন কুঞ্জও তেমনই শিহরণ জাগানো গুণপনায় রোমাঞ্চ আনে সমবেত দর্শকের মনে। কুঞ্জ, বাড়ির দাওয়া থেকে সকলকে উঠোনে নামিয়ে বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে দাওয়ায় জল ছিটিয়ে দেয়, দামিনীর এলোচুলকে শক্ত করে দাওয়ার একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেয়, ফলে দামিনীর নড়াচড়ার ক্ষমতাটুকুও চলে যায়, চুলে টান পড়ে সে আর্তনাদ করতে থাকে।
পুনরায় মন্ত্রোচ্চারণ: উঠোনে কুঞ্জের গুণপনা দেখতে আরও অনেক নারী-পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। কুঞ্জ এক পা সামনে এগিয়ে, পাশে সরে, পিছু হটে, সামনে-পিছনে বারবার দুলতে দুলতে দুর্বোধ্য মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকে। এসব দেখে মানুষের ভয় দূরীভূত হয়। থাকে শুধু তীব্র উত্তেজনা এবং কৌতূহল ভরা পরম উপভোগ্য শিহরণ।
মালসাতে আগুন প্রস্তুত: এরপর কুঞ্জ একটি মালসাতে আগুন প্রস্তুত করে তাতে দু-একটি শুকনো পাতা আর শিকড় পুড়তে দেয়। ফল স্বরূপ, চারিদিকে চামড়া পোড়ার মতো একটা উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। দামিনীর আর্তনাদ ও ছটফটানি ক্রমে অনেকটাই কমে আসে।
হলুদ পোড়া ঝুঁকিয়ে সত্য উদ্ঘাটন: গুণপনার চরম পর্যায়ে নিষ্পন্দ, নির্বাক দামিনী যখন অসহায় হয়ে কুঞ্জের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন কুঞ্জ একটা কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে তার নাকের কাছে ধরে, দামিনীর নিমীলিত নয়ন হঠাৎই বিস্ফারিত হয়, শিহরিত হয় সে। এমন অবস্থায় কুঞ্জ তার পরিচয় জানতে চাইলে সে বলে “আমি শুভ্রা, গো শুভ্রা। আমায় মেরো না।” এরপর কুঞ্জ কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই শুভ্রার প্রেতাত্মা দামিনীর কণ্ঠ দিয়ে পরম আকাঙ্ক্ষিত এক বৃত্তান্ত শোনায় কৌতূহলী দর্শকদের। সে বলে, বলাই খুড়োই তার হত্যাকারী।
এরপর কুঞ্জ আরও একটি প্রক্রিয়ার আয়োজন করছিল, কিন্তু কৈলাস ডাক্তার এসে পড়ায় আর সেই সুযোগ সে পায় না। এভাবেই কুঞ্জ গুনিনের গুণপনা গল্পে নাটকীয়তা তৈরি করেছিল।
১৪। ‘আকাশেরচেরা তীক্ষ্ণ গলায় আর্তনাদের পর আর্তনাদ শুরু করে দিল।‘- আর্তনাদের কারণ কী? ৫
‘হলুদ পোড়া’ গল্পে মনিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে গ্রাম্যসংস্কারের চিত্র তুলে ধরেছেন। দামিনীর উপর শুভ্রার আত্মা ভর করার পর থেকে গ্রামের অন্যান্য সকলের সঙ্গে শান্তির মনেও ভূতের ভীতি চেপে বসে। নিজের ননদ শুভ্রার আত্মাকে ঠেকানোর জন্য সে একখানা বাঁশ পুড়িয়ে ডোবার ঘাটের রাস্তায় ফেলে রাখে। ধীরেনকে সেই বাঁশ না ডিঙানোর কথাও বলে। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই খাওয়া দাওয়া সেরে ফেলে ছেলে মেয়েদের নিয়ে সে ঘরে ঢুকে যায়। ধীরেন বাড়ির দাওয়ায় বসে থাকে। খানিক বাদে শান্তি অদ্ভুত বিকৃত গলার আওয়াজ শুনতে পায়। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দেখে ধীরেন বাঁশের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সে হিংস্র জন্তুর মতো আওয়াজ করছে। আর গম্ভীর স্বরে নিজের নাম ধরে ডাকাডাকি করছে। তার গেঞ্জি ও কাপড় কাদা রক্তে মাখা। ঠোঁট থেকে চিবুক বেয়ে রক্ত পড়ছে।
শান্তি তাকে বাঁশ ডিঙিয়ে চলে আসতে বলে। তার এমন অবস্থার কারণ জানতে চায়। ধীরেন সেই বাঁশ ডিঙিয়ে উঠে আসতে পারে না। একজন সুস্থ যুবক মাটিতে শোয়ানো বাঁশ ডিঙিয়ে বাড়িতে উঠে আসতে পারছে না। তখন শান্তি বুঝে ফেলে যে ধীরেনের ওপর অশরীরী ভর করেছে। তাই সে ভয়ে আর্তনাদ করতে থাকে।
১৫। “দাওয়াটি যেন স্টেজ,” কে, কীভাবে, কার বাড়ির দাওয়াটিকে স্টেজে পরিণত করেছিল, গল্প অনুসারে তার বর্ণনা দাও।
অথবা, “এই দুর্লভ রোমাঞ্চ থেকে তাদের বঞ্চিত করার ক্ষমতা নবীনের নেই।” কোন্ দৃশ্যের কথা বলা হয়েছে। এর পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দাও। ২+৩
অথবা, দাওয়াটি যেন স্টেজ’- কোন্ দাওয়াটির কথা বলা হয়েছে? দাওয়াটিকে স্টেজ বলা হয়েছে কেন? ২ + ৩
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে নবীনের স্ত্রী দামিনীকে অসংলগ্ন আচরণের জন্য তাকে কুঞ্জ ওঝা বাড়ির দাওয়ার একটি খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয় এখানে সেই দাওয়াটির কথা বলা হয়েছে।
ইংরেজি শব্দ স্টেজ এর অর্থ হল মঞ্চ। মঞ্চে নানান বিষয়ের উপস্থাপন করা হয় দর্শকদের উদ্দেশে। দামিনীর উপর অশরীরীর ভর। তাই সেই অশরীরীর প্রকৃত পরিচয় জানার জন্য কুঞ্জ তাকে দাওয়ার একটি খুঁটিতে বেঁধে ফেলে। আর সেখানে সে আমদানি করে মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধির অতীত রহস্যময় একটি দিক। কিন্তু সেই নাট্যের উপস্থাপনের ভঙ্গিমাটি খুবই সহজ। এই দাওয়ার উপরেই কুঞ্জের চেষ্টায় জীবনের শেষ সীমার অর্থাৎ মৃত্যুর পরের জগতের বিষয় উঠে আসবে। দামিনীর মধ্যে রয়েছে এক বিদেহ। এই বিদেহকে ভয় নয়; সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে সেই বিদেহের প্রকৃত পরিচয় জানার। আর পুরো বিষয়ই এখানে রূপলাভকরে নাট্যের ভঙ্গিমায় এবং সেই ঘটনা ঘটেছে দাওয়ার উপর। তাই দাওয়াটিকে স্টেজ বলা হয়েছে।
১৬। ‘হলুদ পোড়া‘ গল্পটি কতখানি ভূতের গল্প হয়ে উঠেছে, তা আলোচনা করো।
“আমাদের জানা রহস্যের পরপারে এমন এক বিশ্বাস থাকে- যা আমাদেরকে সচকিত করে, ভীত করে। এই জানা বিশ্বাস থেকে গা-ছমছম করা এক অজানা ভয়ের জন্ম হয়।”- (দ্য আনক্যানি, সিগমুন্ড ফ্রয়েড)
লোকজীবনের যে অংশটিতে যুক্তি-তর্ক-প্রমাণাদি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, সেখানেই জন্ম হয় ভূত-সংস্কারের, মানুষের স্বাভাবিক জগতের সমান্তরালেই জন্ম নেয় এই লোকবিশ্বাস। আলোচ্য ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের সূচনাতেই সহজসরল এক নিভৃত পল্লিতে ঘটে যাওয়া দু-দুটি রহস্য-খুন এবং এই খুনের বর্ণনায় চিত্রিত মরা গজারি গাছের তলায় গা-ছমছমে পরিবেশ কিংবা ডোবার ঘাটে সন্ধ্যাকালের আলো-আঁধারি ভৌতিক আবহকে আরও ঘনীভূত করে তোলে এবং তার পর থেকেই কাহিনিবৃত্তে একের পর এক অলৌকিক ঘটনা।
যেমন- খুন হওয়া বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো-বউ দামিনীর শরীরে ভরসাঁঝে দমকা বাতাস লেগে প্রেতাত্মার ভর, চক্রবর্তী বাড়িতে কুঞ্জ ওঝার তন্ত্রমন্ত্র-ঝাড়ফুঁকে নানারূপ টিটকারি, অঙ্গভঙ্গিতে মানুষকে সম্মোহিত করার প্রচেষ্টা, সুনিপুণ কৌশলে সেই প্রেতিনীর স্বীকারোক্তি আদায়, ভূত-বিশ্বাসী পল্লিবাসীর ভূতচর্চা, এমনকি গল্পের পরিশেষে কাহিনির এক বিস্ময়কর বাঁকবদলও ঘটে। স্কুলশিক্ষক, বিজ্ঞানমনস্ক ধীরেনের প্রেতগ্রস্ত আচরণে; আর, আবারও সেই বৃত্তান্তের অনুষঙ্গে লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনীতে চিত্রিত হতে থাকা রোমহর্ষক প্রাকৃতিক চিত্ররূপময়তা- সবমিলিয়ে গল্পের পটভূমিতে ভৌতিক রস সঞ্চারের দ্বারা পাঠককে শিহরিত করেন বইকি।
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| তিমির হননের গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার | Timir Hononer Gaan Kobitar Question Answer | Click here |
| HS 3rd Semester Bengali Last Minute Suggestion 2026-27 | উচ্চমাধ্যমিক তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা লাস্ট মিনিট সাজেশন 2026-27 | Click here |
| পথের দাবী গল্পের প্রশ্ন উত্তর | প্রশ্নমান MCQ 1, 3, 5 | ক্লাস 10 | Pother Dabi Golper Question Answer | Click here |
| বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর | প্রশ্নমান MCQ 1, 3, 5 | ক্লাস 10 | Bohurupi Golper Question Answer | Click here |