আন্তর্জাতিক সম্পর্ক : মূল ধরণা এবং রাজনৈতিক মতবাদসমূহ প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম অধ্যায় ছোটো প্রশ্ন উত্তর | International Relations short question answer | Class 12 4th Semester Political Science First Chapter Short question answer

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক : মূল ধরণা এবং রাজনৈতিক মতবাদসমূহ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর (মান ৬)
১। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংজ্ঞা দাও। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ধারাটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য পারস্পরিক সম্পর্কের অধ্যয়নকে বোঝায়। সহজভাবে বলা যায়, এক রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক আচরণ, স্বার্থ ও সহযোগিতা-সংঘাতের যে ধারাবাহিক অধ্যয়ন, তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ধারা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা যায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু ও পরিধিও ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।
(i) জাতিরাষ্ট্রের উৎপত্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশ : ইউরোপের নবজাগরণ ও ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে দীর্ঘস্থায়ী ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলির মর্যাদা স্বীকৃত হয়। রাষ্ট্রগুলি নিজেদের প্রয়োজন ও স্বার্থ অনুযায়ী অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ লাভ করে। এর ফলে আধুনিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়।
(ii) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশ : ১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংস ও প্রাণহানি বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব গড়ে ওঠে এবং গোপন কূটনীতিকে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তাঁর চোদ্দো দফা প্রস্তাব পেশ করেন। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের পূর্বসূরি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে আরও সংগঠিত ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা শুরু হয়।
(iii) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী পর্যায় : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা বিশ্বরাজনীতিতে গভীর পরিবর্তন ঘটায়। শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি স্বতন্ত্র পাঠ্য ও অধ্যয়ন বিষয় হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত ঠান্ডা লড়াই এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যয়ন নতুন মাত্রা লাভ করে।
(iv) সাম্প্রতিক প্রবণতা : নব্বইয়ের দশকে ঠান্ডা লড়াই ও দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার অবসানের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিকে একমেরু বিশ্বব্যবস্থা বলা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। একুশ শতকে প্রযুক্তিগত বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃতি ও পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রথমে মূলত রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয় হিসেবে বিকশিত হলেও সময়ের সঙ্গে এটি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংগঠন, অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিসহ বহুমাত্রিক একটি স্বতন্ত্র সমাজবিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
২। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও দুটি বিষয় সম্পূর্ণ সমার্থক নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি তুলনামূলকভাবে ব্যাপক। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক সম্পর্ক, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, বিরোধ ও সংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাই বিষয় দুটির মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
(i) পরিধিগত পার্থক্য : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারণা তুলনামূলকভাবে ব্যাপক। এতে শুধু রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নয়, বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও আলোচিত হয়। রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক ও পরিবেশগত বিষয়ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। এটি মূলত বিভিন্ন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা করে।
(ii) প্রকৃতিগত পার্থক্য : মরগেনথাউ-এর মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রধানত বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরোধ ও সংঘর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিপরীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, মিত্রতা, সমন্বয় ও বিরোধ—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত।
(iii) পামার ও পারকিন্সের মত : পামার ও পারকিন্স মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুলনায় ব্যাপক। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি হল ‘আন্তর্জাতিক সমাজের রাজনীতি’, যা মূলত কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্বসমাজের বিভিন্ন মানুষ ও গোষ্ঠীর নানা ধরনের সম্পর্ককে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অংশবিশেষ।
(iv) শ্লেইচারের মত : শ্লেইচারের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সমার্থক নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক বিরোধ ও সহযোগিতা—উভয় দিকই আলোচিত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রধানত বিরোধ, বিবাদ ও সংঘর্ষের দিকটির ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়।

(v) কে. জে. হলস্টির মত : হলস্টির মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক নীতি-নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন সম্পর্কিত বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত পররাষ্ট্রনীতি, সরকার বা উচ্চতর রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়গুলির ওপর গুরুত্ব দেয়।
(vi) মরগেনথাউ-এর দৃষ্টিভঙ্গি : মরগেনথাউ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক ক্ষমতার বিরোধের পাশাপাশি সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও সমন্বয়ের বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে তাঁর মতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল বিষয় হল ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা অর্জন, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যেখানে রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন শক্তির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের সামগ্রিক আলোচনা করে, সেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রধানত রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থ, বিরোধ, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুলনায় অধিক বিস্তৃত।
৩। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মার্কসবাদ-এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
কার্ল মার্কসের চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় একটি স্বতন্ত্র বিশ্লেষণধারা গড়ে উঠেছে। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ককে মূলত অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণিবিভাজন, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের আলোকে ব্যাখ্যা করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় মার্কসীয় তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
(i) অর্থনৈতিক উপাদানের প্রাধান্য : মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে অর্থনৈতিক উপাদানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যুদ্ধ, সংঘাত ও প্রতিযোগিতার পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই তত্ত্বে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হল ভিত্তি (Base) এবং আইন, কূটনীতি ও রাজনীতি হল উপরিকাঠামো (Superstructure)। উন্নত ও শক্তিশালী দেশগুলির অর্থনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও এখানে গুরুত্ব পায়।
(ii) শ্রেণি চরিত্রের গুরুত্ব : মার্কসীয় তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পরিবর্তে শ্রেণি-কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। মার্কসবাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পেছনে বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(iii) শ্রেণিসংগ্রামের গুরুত্ব : মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বরাজনীতিকে মূলত শ্রেণিসংগ্রামের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। তাঁদের মতে, বিশ্ব সমাজ মূলত ‘Haves’ ও ‘Have-nots’—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। পুঁজিবাদী শক্তিগুলি বিশ্ববাজারের নিয়ন্ত্রণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুর্বল ও দরিদ্র দেশগুলির ওপর শোষণ চালায়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অসম বিন্যাস তৈরি হয়।
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
(iv) সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা : মার্কসবাদ অনুসারে ধনতন্ত্রের সম্প্রসারিত রূপ হল সাম্রাজ্যবাদ। পুঁজিবাদী দেশগুলি নতুন বাজার, কাঁচামাল ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে উপনিবেশ বিস্তার করে। আধুনিক যুগে সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপকে নয়া সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। মার্কসবাদীরা মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হল অর্থনৈতিক শোষণ। তাই তাঁরা সব ধরনের অর্থনৈতিক শোষণের অবসানের পক্ষে।
(v) জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার : মার্কসীয় চিন্তাধারায় পরাধীন ও অবদমিত জাতিগুলির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। মার্কসবাদীদের মতে, সাম্রাজ্যবাদের অবসান এবং বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রেণিহীন ও রাষ্ট্রহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। কারণ শ্রেণিহীন সমাজে শোষণ ও যুদ্ধের সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে।
(vi) সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ : মার্কসবাদী দর্শনে শ্রমজীবী বা সর্বহারা শ্রেণির আন্তর্জাতিক ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বহারা শ্রেণি বিভিন্ন দেশে শোষিত ও অবদমিত। তাই পুঁজিবাদী শোষণ থেকে মুক্তির জন্য বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি সম্ভব বলে মার্কসবাদীরা মনে করেন।
(vii) বিশ্ববিপ্লবের ওপর গুরুত্ব : মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক শোষণ, সংঘাত ও যুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় মার্কসবাদ অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণিসংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিষয়গুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে। তবে এর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আদর্শ মার্কসবাদীরা কল্পনা করেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের ফলে সেই ধারণা নতুন করে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
৪। উদারনীতিবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
১৯৭০-এর দশকে বাস্তববাদী তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা ও তার প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় উদারনীতিবাদী তত্ত্ব নতুনভাবে গুরুত্ব লাভ করে। উদারনীতিবাদ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি, সহযোগিতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
(i) আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা : উদারনীতিবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, হিংসা ও সংঘাত থেকে মুক্ত করে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী। এজন্য আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
(ii) অরাষ্ট্রীয় সংগঠনের গুরুত্ব : উদারনীতিবাদীরা শুধু সার্বভৌম রাষ্ট্রকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একমাত্র শক্তি হিসেবে মনে করেন না। তাঁদের মতে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও বেসরকারি সংগঠন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহুজাতিক সংস্থাগুলিও অনেক সময় রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
(iii) গণতন্ত্রের প্রসার : উদারনীতিবাদ বিশ্বব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ বেশি থাকে বলে উদারনীতিবাদীরা মনে করেন। একই ধরনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলি পরিচালিত হলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ ও সংঘাতের সম্ভাবনা কমে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।
(iv) অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্ব : উদারনীতিবাদ সামরিক শক্তির পরিবর্তে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়। এজন্য অবাধ বাণিজ্য এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হয়। রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে যুদ্ধের প্রবণতা কমে এবং সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে ওঠে।
(v) ক্ষমতার রাজনীতির বিরোধিতা : উদারনীতিবাদ ক্ষমতার রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করে। রাষ্ট্রগুলি যখন ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তখন পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিরোধ ও যুদ্ধের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তাই উদারনীতিবাদ ক্ষমতার রাজনীতির পরিবর্তে সহযোগিতা ও সমঝোতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
(vi) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা : আন্তর্জাতিক বিরোধ ও দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলাকে উদারনীতিবাদ বিশেষ গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলি নিজেদের স্বার্থের পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে বলে এই তত্ত্ব মনে করে।
(vii) বিশ্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা : উদারনীতিবাদ সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতার মতো বিশ্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠার কথা বলে। এই কারণে উদারনীতিবাদকে অনেক সময় ‘উদার আন্তর্জাতিকতাবাদ’ বলা হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদারনীতিবাদ শান্তি, গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা ও বিশ্বজনীন মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে। তবে অতিরিক্ত পাশ্চাত্যনির্ভরতা এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি সহনশীলতার কারণে এই তত্ত্ব সমালোচিতও হয়েছে।
৫। মার্কসবাদের মূল সূত্রগুলি আলোচনা করো।
কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের চিন্তাধারার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মার্কসবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ। মার্কসবাদ সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তনকে প্রধানত বস্তুগত ও অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, শ্রেণিসংগ্রাম, উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব, বিপ্লব এবং সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণা মার্কসবাদের প্রধান সূত্র।
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপ(i) দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ
মার্কসবাদের দার্শনিক ভিত্তি হল দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এই মত অনুযায়ী বস্তুজগতই প্রকৃত বাস্তবতা এবং জগতের সবকিছুই পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন বস্তু ও শক্তির মধ্যে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব থেকেই পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটে। অর্থাৎ, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় নয়। দ্বন্দ্ব ও বিরোধের মধ্য দিয়েই নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলি হল—বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রাম, পরিমাণগত পরিবর্তনের গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তর এবং নেতির নেতিকরণ।
(ii) ঐতিহাসিক বস্তুবাদ
মানবসমাজ ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রয়োগকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলা হয়। মার্কসের মতে, সমাজের পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হল মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ও উৎপাদনব্যবস্থা। উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর সমাজের রাজনৈতিক, আইনগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপরিকাঠামো গড়ে ওঠে। তাই ইতিহাসের পরিবর্তনকে বোঝার জন্য অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
(iii) শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব
মার্কসবাদের অন্যতম প্রধান সূত্র হল শ্রেণিসংগ্রাম। মার্কসের মতে, মানবসমাজের ইতিহাস মূলত বিভিন্ন শ্রেণির পারস্পরিক সংঘাতের ইতিহাস। পুঁজিবাদী সমাজে প্রধানত বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণি এবং সর্বহারা বা শ্রমিক শ্রেণি—এই দুটি শ্রেণির মধ্যে স্বার্থের বিরোধ রয়েছে। পুঁজিপতি শ্রেণি উৎপাদনের উপায়ের মালিক, আর শ্রমিক শ্রেণি নিজের শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই পরস্পরবিরোধী স্বার্থ থেকেই শ্রেণিসংগ্রামের সৃষ্টি হয়।
(iv) উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব
মার্কসের অর্থনৈতিক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হল উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব। শ্রমিক তাঁর শ্রমের মাধ্যমে যে মূল্য সৃষ্টি করেন, তার সম্পূর্ণ অংশ মজুরি হিসেবে পান না। শ্রমিককে মজুরি দেওয়ার পর উৎপাদিত অতিরিক্ত মূল্য পুঁজিপতি নিজের মুনাফা হিসেবে গ্রহণ করেন। মার্কসের মতে, এই উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক শোষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
(v) বিপ্লবের তত্ত্ব
মার্কসবাদ অনুসারে পুঁজিবাদী সমাজের অভ্যন্তরে পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হয়। এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিণতিতে শ্রমিক শ্রেণি বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থার অবসান ঘটাবে। বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদনের উপায়ের ওপর পুঁজিপতি শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ দূর করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে।
(vi) সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্ব
মার্কসবাদে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান শক্তি হিসেবে সর্বহারা বা শ্রমিক শ্রেণিকে বিবেচনা করা হয়েছে। শ্রমিক শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করবে এবং পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থার অবসান ঘটাবে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যবর্তী পর্যায়ে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার ধারণাকে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কতন্ত্র বলা হয়।
(vii) সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা
মার্কসবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা। এই সমাজে উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মতো শ্রেণিবিভেদ এবং শোষণের অবসান ঘটবে। শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাও বিলুপ্ত হবে বলে মার্কসবাদী তত্ত্বে মনে করা হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, শ্রেণিসংগ্রাম, উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব, বিপ্লব, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্ব এবং সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা—এই সূত্রগুলির সমন্বয়েই মার্কসবাদী মতবাদ গড়ে উঠেছে। মার্কসবাদ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক শোষণ ও শ্রেণিবৈষম্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি শোষণমুক্ত, শ্রেণিহীন ও সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শও তুলে ধরেছে।
৬। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব হিসেবে বাস্তববাদ ও আদর্শবাদের তুলনামূলক পর্যালোচনা করো।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় বাস্তববাদ ও আদর্শবাদ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর আদর্শবাদী চিন্তার প্রসার ঘটে। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আদর্শবাদের সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করে বাস্তববাদ শক্তিশালী তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। উভয় তত্ত্বের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করা হলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
বাস্তববাদ ও আদর্শবাদের তুলনা
(i) মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা : আদর্শবাদীরা মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, সহযোগিতা ও শান্তির প্রবণতার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, শিক্ষা, নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষের আচরণকে উন্নত করা সম্ভব।
অন্যদিকে বাস্তববাদীরা মানুষের স্বার্থপরতা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিযোগিতার প্রবণতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
(ii) আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রকৃতি : আদর্শবাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন, নৈতিকতা ও শান্তির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রগুলি পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংঘাত কমাতে পারে।
বাস্তববাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত অরাজকতাপূর্ণ। এখানে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে কোনো সর্বশক্তিমান কর্তৃপক্ষ নেই। তাই প্রত্যেক রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়।

(iii) জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতা : বাস্তববাদে জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চায়।
আদর্শবাদ জাতীয় স্বার্থকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করলেও আন্তর্জাতিক শান্তি, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতার মতো সার্বজনীন মূল্যবোধকে অধিক গুরুত্ব দেয়।
(iv) যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কে ধারণা : আদর্শবাদীরা মনে করেন, যুদ্ধ অনিবার্য নয়। আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সংগঠন, নিরস্ত্রীকরণ এবং যৌথ নিরাপত্তার মাধ্যমে যুদ্ধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাস্তববাদীদের মতে, রাষ্ট্রগুলির স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতার কারণে যুদ্ধের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবসময়ই থেকে যায়। তাই শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা শান্তি রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
(v) আন্তর্জাতিক সংগঠনের ভূমিকা : আদর্শবাদীরা আন্তর্জাতিক সংগঠনকে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। রাষ্ট্রগুলির যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন।
বাস্তববাদীরা আন্তর্জাতিক সংগঠনের গুরুত্ব স্বীকার করলেও মনে করেন, এগুলির কার্যকারিতা অনেকাংশে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির স্বার্থ ও ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
(vi) আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতা : আদর্শবাদ আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখে।
বাস্তববাদীরা আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার গুরুত্ব স্বীকার করলেও রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থকে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা বিপন্ন হলে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে।
(vii) পরিবর্তনের ধারণা : আদর্শবাদীরা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নতির মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায় বিশ্বাসী।
বাস্তববাদীরা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনা করেন। তাই তাঁরা আদর্শবাদীদের তুলনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বেশি সতর্ক ও বাস্তবমুখী।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আদর্শবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্তি, নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক আইন, সহযোগিতা ও যৌথ নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেয়; বাস্তববাদ সেখানে জাতীয় স্বার্থ, ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্যকে প্রধান বলে মনে করে। আদর্শবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি উন্নত ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তুলে ধরে, আর বাস্তববাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তব ক্ষমতার কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণভাবে বোঝার ক্ষেত্রে উভয় তত্ত্বেরই নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক : মূল ধরণা এবং রাজনৈতিক মতবাদসমূহ সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন উত্তর (মান ২)
১। International Relation’ কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন কে?
উঃ ‘International Relation’ কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন প্রখ্যাত দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম। তিনি ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর ‘Principle of Moral and Legislation’ রচনাটিতে এই কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন।
২। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা প্রদান করো।
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে জ্ঞানচর্চার এমন এক আন্তঃশাস্ত্রীয় বিষয়কে বোঝায় যা বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় এককসমূহের মধ্যে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনগত প্রভৃতি সকলপ্রকার সরকারি ও বেসরকারি সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।
৩। স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আবির্ভাব কখন ঘটে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সুসংবদ্ধ আলোচনা বিংশ শতাব্দীর সূচনাপর্ব থেকেই লক্ষ্য করা যায়। তবে স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও তার পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে যুদ্ধের কারণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও সুসংবদ্ধ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এর ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পৃথকভাবে অধ্যয়ন ও চর্চা শুরু হয়। ক্রমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি শাখা থেকে স্বতন্ত্র অধ্যয়নক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
৪। আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে গণ্য করার পক্ষে দুটি যুক্তি দাও।
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে গণ্য করার পক্ষে দুটি যুক্তি হল—
- স্বতন্ত্র আলোচ্যসূচি : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র আলোচ্যসূচি রয়েছে। এই স্বতন্ত্র বিষয়বস্তুই তাকে একটি পৃথক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে।
- নিজস্ব বিশ্লেষণধারা : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিজস্ব বিশ্লেষণ পদ্ধতি, তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা রয়েছে। তাই এটিকে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
৫। আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে গণ্য করার বিপক্ষে দুটি যুক্তি দাও।
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে গণ্য করার বিপক্ষে দুটি যুক্তি হল—
- স্বতন্ত্র তাত্ত্বিক ভিত্তির অভাব : পামার ও পারকিন্সের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিজস্ব কোনো সুসংবদ্ধ ও স্বতন্ত্র তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই।
- পরিবর্তনশীল প্রকৃতি : আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সবসময় পরিবর্তনশীল। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু ও আলোচনার ক্ষেত্রও ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। এই কারণে এটিকে একটি সুসংবদ্ধ স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে নির্ধারণ করা কঠিন।
৬। Politics Among Nations’-গ্রন্থটি কার লেখা? এটি কত খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়?
উঃ ‘Politics Among Nations’ গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন হ্যানস্ জে. মরগেনথাউ (Hans J. Morgenthau)।
গ্রন্থটি ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
৭। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল আলোচ্য বিষয়গুলি উল্লেখ করো।
অথবা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি বা আলোচনাক্ষেত্র উল্লেখ করো।
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি গতিশীল বিষয় হওয়ায় এর বিষয়বস্তু ও আলোচনাক্ষেত্র সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও বিস্তৃত হয়েছে। এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলি হল— আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সংগঠন, জাতীয় শক্তি, জাতীয় স্বার্থের বিভিন্ন দিক, প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলির পররাষ্ট্রনীতি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস।
৮। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের গুরুত্ব কী?
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের গুরুত্ব : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতি, কূটনীতি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি ও বিশ্বরাজনীতির বিভিন্ন পরিবর্তনকে সহজে বোঝা সম্ভব হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জ্ঞান বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতা, বিদেশি রাষ্ট্রের দূতাবাস প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে।
৯। কবে, কেন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়?
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রতিরোধ করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান করা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
১০। কবে এবং কেন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়?
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রতিষ্ঠা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির পর বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর ৫১টি রাষ্ট্রকে নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা জাতিসংঘ (UNO) প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিষ্ঠার কারণ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক অভিজ্ঞতার পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, যুদ্ধ প্রতিরোধ করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা থেকেই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরো পড়ুন : হাসবিদ্যকথা গল্পের প্রশ্ন উত্তর
১১। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চর্চায় প্রথম মহাবিতর্ক কী?
প্রথম মহাবিতর্ক : ১৯৩০-এর দশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের মধ্যে যে তাত্ত্বিক বিরোধের সূত্রপাত হয়, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চর্চার প্রথম মহাবিতর্ক বা আদর্শবাদী-বাস্তববাদী মহাবিতর্ক নামে পরিচিত। আদর্শবাদীরা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা, নীতিবোধ, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তির ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে বাস্তববাদীরা জাতীয় স্বার্থ, ক্ষমতা ও শক্তির রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত থেকেই প্রথম মহাবিতর্কের সৃষ্টি হয়।
১২। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চায় আদর্শবাদের উদ্ভব হয় কখন?
আদর্শবাদী তত্ত্বের উদ্ভব : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ) ভয়াবহতা বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের কারণ এবং তা প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করে। যুদ্ধ পরিহার করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রনায়ক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন চিন্তাধারা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অধ্যাপক পদ সৃষ্টি হওয়ার মধ্য দিয়ে এই বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার সূচনা ঘটে। এছাড়া মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন-এর চিন্তাধারা, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর চোদ্দো দফা প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় আদর্শবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৩। আদর্শবাদী তত্ত্বের কয়েকজন তাত্ত্বিকের নাম লেখো।
আদর্শবাদের প্রধান তাত্ত্বিকগণ : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আদর্শবাদী তত্ত্বের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন। এছাড়া আদর্শবাদী চিন্তাধারার উল্লেখযোগ্য প্রবক্তাদের মধ্যে ন্যান অ্যাঞ্জেল, স্যার অ্যালফ্রেড জিমার্ন, বাটারফিল্ড এবং বার্ট্রান্ড রাসেল-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৪। আদর্শবাদী তত্ত্বের বিরুদ্ধে দুটি প্রধান সমালোচনা লেখো।
আদর্শবাদী তত্ত্বের বিরুদ্ধে দুটি প্রধান সমালোচনা : ১৯৩০-এর দশক থেকে আদর্শবাদী তত্ত্বের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে প্রধান দুটি সমালোচনা হল—
① ক্ষমতার রাজনীতিকে উপেক্ষা : সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলি কেবল নীতি ও নৈতিকতার দ্বারা পরিচালিত হয় না; ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থও রাষ্ট্রের আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু আদর্শবাদীরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্ষমতার রাজনীতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।
② অবাস্তব ধারণা : সমালোচকদের মতে, আদর্শবাদ একটি অতিরিক্ত আশাবাদী ও অবাস্তব তত্ত্ব। কারণ আদর্শবাদীরা সংঘাতমুক্ত, সহযোগিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমাজের যে ধারণা তুলে ধরেছেন, বাস্তব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার সম্পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে আদর্শবাদকে বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি কাল্পনিক ধারণা হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে।
১৫। কয়েকজন বাস্তববাদী তাত্ত্বিকের নাম উল্লেখ করো।
উঃ বাস্তববাদের প্রধান প্রবক্তা : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্বের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হলেন মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যানস্ মরগেনথাউ। তিনি তাঁর বিখ্যাত Politics Among Nations গ্রন্থে অভিজ্ঞতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে বাস্তববাদী তত্ত্বকে সুসংবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করেন। এছাড়াও সি. এইচ. কার, জর্জ কেন্নান, কুইন্সি রাইট এবং হেনরি কিসিংগার প্রমুখ চিন্তাবিদ বাস্তববাদী তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৬। বাস্তববাদী তত্ত্বের দুটি প্রধান সমালোচনা উল্লেখ করো।
উঃ বাস্তববাদী তত্ত্বের প্রধান সমালোচনাগুলি হল—
① সংকীর্ণতার দোষে দুষ্ট : বাস্তববাদী তত্ত্ব জাতীয় স্বার্থকে প্রধানত ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছে। সমালোচকদের মতে, জাতীয় স্বার্থের ধারণা আরও ব্যাপক। এর মধ্যে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, মহামারি প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। তাই জাতীয় স্বার্থকে শুধুমাত্র ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করায় বাস্তববাদ সংকীর্ণতার দোষে দুষ্ট।
② গণতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন : সমালোচকদের মতে, বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলি নিজেদের ইচ্ছামতো কেবল ক্ষমতার রাজনীতি অনুসরণ করতে পারে না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনমত, আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাস্তববাদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারণা আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
১৭। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় উদারনীতিবাদ বলতে কী বোঝো?
উঃ উদারনীতিবাদের সংজ্ঞা : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় উদারনীতিবাদ বলতে এমন একটি তত্ত্বকে বোঝায়, যা রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, নির্ভরশীলতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়। এই তত্ত্ব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংঘাত ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক সংগঠন ও পারস্পরিক নির্ভরতার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী। একই সঙ্গে উদারনীতিবাদ সকল রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি সুসংহত ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলে।
১৮। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে উদারবাদী তত্ত্বের দুটি সমালোচনা লেখো।
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উদারনীতিবাদী তত্ত্বের প্রধান সমালোচনাগুলি হল—
① একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি : সমালোচকদের মতে, উদারনীতিবাদ মূলত পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে এর তাত্ত্বিক আলোচনা অনেকাংশে পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় এই তত্ত্বকে একপেশে বলে সমালোচনা করা হয়।
② অবাস্তব ও নীতিধর্মী : সমালোচকদের মতে, উদারনীতিবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, আদর্শ ও সহযোগিতাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলির প্রধান লক্ষ্য হল জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা। ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থই অনেক সময় রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিকে পরিচালিত করে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তব পরিস্থিতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় উদারনীতিবাদকে অবাস্তব ও অতিরিক্ত নীতিনির্ভর তত্ত্ব বলে সমালোচনা করা হয়েছে।
১৯। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় তত্ত্বের দুটি প্রধান সমালোচনা উল্লেখ করো।
উঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রধান সমালোচনাগুলি হল—
① শ্রেণির ধারণাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব : মার্কসীয় তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শ্রেণি-কে প্রধান একক হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং রাষ্ট্রের ভূমিকাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই এখনও প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কারক। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণে শ্রেণির পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভূমিকার যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

② বিশ্বসমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি : মার্কসীয় তত্ত্ব বিশ্বসমাজতন্ত্র ও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রতিষ্ঠার আদর্শ তুলে ধরেছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশিত বিশ্বসমাজতন্ত্র বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং পরবর্তীকালে বহু দেশে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার প্রসার ঘটেছে এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা গেছে। ফলে মার্কসীয় তত্ত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও তার বাস্তব প্রয়োগের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| সংবিধান সংশোধন এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান | Click here |
| নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্ব সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 11 দ্বিতীয় সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান | Click here |
| মৌলিক অধিকারের অর্থ ও প্রকৃতি, নির্দেশমূলক নীতিসমূহ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 11 দ্বিতীয় সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান | Click here |
| সরকারের বিভিন্ন রূপ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 11 দ্বিতীয় সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান | Click here |
Our Latest Products
উচ্চমাধ্যমিক
All Subject দেখুন →
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম বাংলা সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক English সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম ইতিহাস সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক দর্শন সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক সংস্কৃত সাজেশন
একাদশ শ্রেণি
All Subject দেখুন →
একাদশ শ্রেণি বাংলা সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন
একাদশ শ্রেণি দর্শন সাজেশন
একাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ভূগোল সাজেশন
একাদশ শ্রেণি শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন