হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর । ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার । Class 12 harun salemer masi golpo long question answer । WBCHSE

১। “কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের, কিছুই ও ভোলে না।” -নিবারণের প্রতিহিংসার কারণ কী? কীভাবে সে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছিল?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পে একমাত্র বোন পুঁটির বিয়েতে নিবারণের বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে বাস-কনডাক্টর জামাইকে ঘড়ি, টর্চ ও সাইকেল দেওয়ায় ঈর্ষাকাতর নিবারণ দুই ভাইবোনের একজনকে বঞ্চিত করে একজনকে সব কিছু দেওয়া হচ্ছে বলে বাবার কাছে অভিযোগ করে। নিবারণের সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে বাপ-বেটায় ঝগড়া শুরু হলে মা গৌরবি নিবারণকে বলেছিল যে, নিবারণ পুঁটিকে হিংসা করছে এবং আর পাঁচটা মেয়ের মতো পুঁটিও নিশ্চয়ই বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখবে। গৌরবির সেই কথাই নিবারণের ঈর্ষানলে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল বলে তাই ছিল তার প্রতিহিংসার কারণ।
বাপ-বেটার ঝগড়ার সময় যখন গৌরবি নিবারণকে বলেছিল যে, বুড়োবয়সে পুঁটি অর্থাৎ সাবিত্রী তাদের দেখবে, তখন নিবারণ হিংস্র হয়ে তার মাকে শাসিয়েছিল- ‘ভালো। সময়ে বুঝা যাবে।’ তাই এই ঘটনার কয়েক বছর পরই সে ঘর তৈরি করে, মেঝে পাকা করে, আর তারপর বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই মাকে তার নিজের কাছে রাখতে অস্বীকার করে। পুরোনো দিনের কথা মাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সে জানায় যে, গৌরবি যেন তার মেয়ে পুঁটির বাড়িতে গিয়ে থাকে। এভাবেই নিবারণ মার ওপর তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছিল।
২। “এইসব সময়ে গৌরবির বড়ো কষ্ট হয়। ও রেললাইনের দিকে চেয়ে থাকে।”-গৌরবির বড়ো কষ্ট হয় কেন? তার রেললাইনের দিকে চেয়ে থাকার কারণ কী?
উত্তর: প্রিয় বান্ধবী হারার মা-র মৃত্যুর পর পুত্র-পরিত্যক্তা, সহায়-সম্বলহীনা বিধবা গৌরবির নিজের জন্য প্রায়ই কষ্ট হত। সে ভাবত যে, সারাজীবন দুঃখ-কষ্ট পেলেও হারার মা ভাগ্যবতী, নিজের ঘরে ঘুমের মধ্যেই সে চিরঘুমের দেশে চলে গেল এবং মৃত্যুর পর ছেলের হাতের মাটিও পেল। নিজের নিঃসম্বল জীবনের শেষের সেদিনের কথা ভেবে তার কষ্ট হত। নিজের ঘরে মরা আর ছেলের হাতে আগুন পাওয়ার সৌভাগ্য তার হবে কি না ভেবেই গৌরবির বেশি কষ্ট হয়।
গৌরবির রোজগেরে অবস্থাপন্ন ছেলে নিবারণ তার পরিবার নিয়ে থাকত কয়েকটামাত্র স্টেশন দূরে, যেখানে গৌরবির সমাজের লোকেরাও ঘর বেঁধে ছিল। নিবারণ মাকে দেখত না, মায়ের কোনো দায়িত্বও নিত না। মৃত্যুর পর ছেলের হাতের আগুন পাওয়ার আশা নিয়ে তাই হতভাগ্য গৌরবি রেললাইনের দিকে সতৃয় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত।
৩। “এই তো স্বর্গ। তার স্বর্গ আর হারার মা-র স্বর্গ কি এক হতে পারে?”-কোন্ অবস্থাকে স্বর্গ বলে মনে হল গৌরবির? স্বর্গ সম্পর্কে এ প্রশ্ন গৌরবির মনে কেন জাগত?
উত্তর: হারার মা-র মৃত্যুর পর গৌরবি একদিন স্বপ্ন দেখল হারার মা হাত ধরে তাকে নিয়ে গেছে এক আশ্চর্য দেশে, যেখানে থানকুনি আর দূর্বাঘাসের মেলা, মাদার গাছের ছায়ায় ঢেঁকিশাকের জঙ্গল। সেখানে গৌরবি দু-হাত ভরে সেইসব শাকপাতা তুলছে। স্বপ্নে দেখা এ অবস্থাকেই স্বর্গ বলে মনে হল গৌরবির।
গৌরবি ছিল হিন্দু, আর হারার সদ্যোমৃতা মা আয়েষা ছিল মুসলমান। তাই সম্প্রদায়গত বিভেদের কথা ভেবেই গৌরবির মনে উদ্ধৃত প্রশ্নটি জেগেছিল। নিরক্ষর গৌরবি ছোটোবেলা থেকে এটাই জেনে এসেছিল যে, হিন্দু ও মুসলমানের স্বর্গ পৃথক। তার আর হারার মায়ের স্বর্গ এক কি না-এ প্রশ্ন সেই কারণেই গৌরবির মনে জেগেছিল।
৪। “শাক-পাতা-গুগলি তুলতে হারার মা-র ওপরই ওর নির্ভর”-কে, কেন শাক-পাতা-গুগলি তুলত? কেনই-বা সে এ ব্যাপারে হারার মা-র ওপর নির্ভর করত?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প থেকে গৃহীত এই উদ্ধৃতিটিতে গৌরবির কথা হলা হয়েছে। পুত্র-পরিত্যক্তা সহায়-সম্বলহীনা বিধবা গৌরবি তার পেট চালানোর জন্যই শাক-পাতা-গুগলি তুলত খালপাড় ও বিলের ধার থেকে। প্রতিদিন কলকাতায় চাল বিক্রি করতে যাওয়া যশোদার মাধ্যমেই এসব শহরে বিক্রি করত সে।
জন্ম থেকেই গৌরবির একটা পায়ে খুঁত ছিল। সেই পায়ের গোড়ালি এবং পাতাটা ছিল বাঁকা, আঙুলগুলোও ছিল পিছন দিকে বাঁকানো। এজন্য সে তাড়তাড়ি হাঁটতে পারত না। তাই শাক-পাতা-গুগলি তুলতে হারার মা আয়েষা বিবির ওপর নির্ভর করতে হত গৌরবিকে।
৫। “ঈশ্বরের জিনিস তো। শাকে-পাতায় দোষ নেই।”-কোন্ জিনিসকে, কেন ‘ঈশ্বরের জিনিস’ বলা হয়েছে? শাক-পাতা কোন্ দোষ থেকে মুক্ত?
উত্তর : খালপাড় বা বিলের ধারে আপনা-আপনি জন্মানো শাক, বেলগাছের পাতা এবং খালে-বিলে জন্মানো গুগলিকেই এখানে ‘ঈশ্বরের জিনিস’ বলা হয়েছে। তা ছাড়া, কোনো মানুষের অধিকারভুক্ত জায়গাতে এগুলি জন্মায়নি বলেই এমনটা আরও সে ভাবতে পেরেছিল।
খোঁড়া পায়ের জন্য শাক-পাতা-গুগলি সংগ্রহের কাজে গৌরবি আয়েষা বিবির ওপর নির্ভর করত। আয়েষা বিবি মুসলমান হওয়ায় তার হাত থেকে এগুলি নিতে ধর্মভীরু হিন্দু-বিধবা গৌরবির মনের মধ্যে খুঁত খুঁত করত। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিত যে, ভগবানের তৈরি শাক-পাতা-গুগলি স্পর্শদোষ থেকে মুক্ত। ঈশ্বরের জিনিসে কোনো দোষ হয় না।
৬.। “মনে করেছে কাঙালের আস্পর্ধা।”-এখানে কার আস্পর্ধার কথা বলা হয়েছে এবং কে ‘মনে করেছে’? ‘আস্পর্ধা’ কোনটি?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প থেকে গৃহীত এই উদ্ধৃতিটিতে হারার ঘরামি বাবার আস্পর্ধার কথা বলা হয়েছে।
হারাদের সমাজের মানুষ অর্থাৎ হারাদের প্রতিবেশী ও জাতভাইদের মনে করার কথা এখানে বলা হয়েছে।
পেশায় ঘরামি হারার বাবা ঘর বেঁধে ছিল খুব উঁচু করে। মাথা তুলে সেই ঘর দেখতে হত, কিন্তু ঘর তোলার কিছুদিন পরেই নিয়ড়চাঁদা সাপের কামড়ে তার বাবার মৃত্যু ঘটে। যখন হারার বাবার মৃতদেহ কবরস্থ করতে যাওয়া হচ্ছে, তার সমাজের লোকেরা ব্যঙ্গ করেছিল সে কোঠাবাড়ির মতো ঘর তুলেছিল বলে। তখনই হারার মা বুঝতে পেরেছিল যে, তার সমাজের মানুষ এই উঁচু ঘর তোলাটা ভালোভাবে নেয়নি। তারা সেটাকে ‘কাঙালের আস্পর্ধা’ মনে করেছে। যার ছেলে-বউয়ের ভিখিরির দশা, যে নিজে সামান্য ঘরামি তার পাল বাবুদের থেকেও উঁচু করে ঘর তোলা গ্রামের লোকের সহজাত ঈর্ষার কারণ হয়েছিল।
৭। “গৌরবির হঠাৎ ভুল হয়ে গেল।”-কী ভুল হয়েছিল গৌরবির? কীভাবে তার ভুল ভাঙল?
উত্তর : অঘ্রানের এক ভোরে মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে হারা গিয়ে গৌরবিকে ডেকে আনে। গৌরবি এসে দেখে হারার মা শুয়ে রয়েছে। বেশি কিছুদিন ধরেই রোজ রাতে হারার মা-র জ্বর হচ্ছিল। গৌরবি এসে তাকে চোখের ওপর হাত চাপা দিয়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে দেখত। তাই সেদিন হারার সদ্যোমৃতা মাকে তেমনই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতে দেখে গৌরবি ভেবেছিল যে, সে বুঝি কাঁদছে। উদ্ধৃত অংশে গৌরবির এই ভুলের কথা বলা হয়েছে।
হারার মা কাঁদছে ভেবে গৌরবি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, সে কাঁদছে কি না। এ কথা বলে নীচু হয়ে সে হারার মাকে ভালো করে লক্ষ করে এবং তারপরই বুঝতে পারে যে তার বান্ধবীর মৃত্যু হয়েছে।
৮। “তখনই গৌরবি বুঝেছিল কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের।”-কখন গৌরবি এ কথা বুঝতে পারে? নিবারণের ভয়ানক প্রতিহিংসার স্বরূপ আলোচনা করো।
উত্তর : গৌরবির একমাত্র ছেলে রোজগেরে যুবক নিবারণ তার বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই মাকে নিজের কাছে রাখতে অস্বীকার করে এবং তাকে তার মেয়ে পুঁটির বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলে। এই সময়ই গৌরবি বুঝতে পারে, নিবারণের ভয়ানক প্রতিহিংসা।
নিবারণের একমাত্র বোন পুঁটির বিয়েতে নিবারণের ঘরামি বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে বাস-কনডাক্টর জামাইকে ঘড়ি, টর্চ এবং সাইকেল দিয়েছিল। নতুন সাইকেলটা দেখতে দেখতে সদ্যযুবক নিবারণ তার বাবার কাছে অভিযোগ করেছিল, দুটি সন্তান থাকতেও কেন সব কিছু একজন পাবে। নিবারণের সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই তার সঙ্গে তার বাবার ঝগড়া বেধেছিল।
৯। “তোর এত রিষ কেন? সময়ে পুঁটি আমায় ভাত দিবে।”-পুঁটি কে? উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ‘রিষ’-এর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র গৌরবির একমাত্র মেয়ে হল পুঁটি, যার ভালো নাম সাবিত্রী।
নিবারণের একমাত্র বোন পুঁটির বিয়েতে নিবারণের ঘরামি বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে বাস-কনডাক্টর জামাইকে পণ হিসেবে ঘড়ি, টর্চ ও সাইকেল দিয়েছিল। নতুন সাইকেলটা দেখে রেগে গিয়ে সদ্যযুবক নিবারণ তার বাবার কাছে অভিযোগ করেছিল, কেন সব কিছুই একজন সন্তানই পাবে, সে কি কেউ নয়। হিংসায় উন্মত্ত হয়ে স্বার্থপর নিবারণ ভেবেছিল যে, তার জন্য বরাদ্দ হয়তো এতে কম হয়ে যাচ্ছে। কন্যাদায়গ্রস্ত মা-বাবা যে নিতান্ত দায়ে পড়েই তাদের জমানো টাকা খরচ করছে-এ কথা সে ভাবেনি একবারও। এ কারণেই তার মা গৌরবি তাকে বলেছিল যে, সে ‘রিষ’ অর্থাৎ হিংসা করছে।
১০। “হারার মা-র কথা মনে পড়ল।” কখন গৌরবির হারার মা-র কথা মনে পড়ল? এ প্রসঙ্গে হারার মা-র যে ছবি তার মনে উদিত হয়েছিল, সেটি বর্ণনা করো।
উত্তর: মায়ের মৃত্যুর পর হারার কাকা তাকে তাড়িয়ে দিলে হারা যখন গৌরবির কাছে এসে উপস্থিত হল, তখন তাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল গৌরবি। এক গাল খুদ খেয়ে এবং এক গাল খুদ হারাকে দিয়ে চাটাই বিছিয়ে একা শুয়ে শুয়ে গৌরবির মনে পড়েছিল হারার মা আয়েষা বিবির কথা।
হারার মা-র কথা মনে পড়তেই গৌরবির চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল গেরো দিয়ে ছেঁড়া কাপড় পরা, রোগা ছিপছিপে, একমাথা রুক্ষ অথচ কোঁকড়া ও ফুরফরে বাহারি চুলের অধিকারিণী আয়েষা বিবির ছবি। গলায় একটা মাদুলি ছাড়া তার গায়ে আর কোনো গয়না ছিল না। হারার মা-র মতো এমন গরিবের গরিব, দুঃখীর দুঃখীকে দেখলে যৌবনবয়সে গৌরবির শাশুড়ি বলতেন, ‘তেলজল দেও, মাথায় দেউক। ভাত দেও, পেটে খাউক!’ গৌরবির তাই মনে হয়েছিল, নিজের কেউ নেই বলেই এমন হতদরিদ্র অবস্থায় দিন কাটত হারার মার।
১১। “দিনমানে ও যা পায় না, স্বপ্নে অনেকসময়ে তা পেয়ে যায়।” -স্বপ্নের মাধ্যমে কে, কী পেয়ে যায় সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প থেকে নেওয়া এই উদ্ধৃতিটিতে গৌরবির কথা বলা হয়েছে। গৌরবি ছিল এক দীন-দুঃখী, সহায়-সম্বলহীনা বিধবা। মেয়ে-জামাই এবং রোজগেরে সম্পন্ন ছেলে থাকা সত্ত্বেও পৌঢ় বয়সে তাকে একা থাকতে হত এবং শাক-পাতা-গুগলি তুলে কোনোক্রমে নিজের পেট চালাতে হত। সেই অসহায় অবস্থায় একমাত্র স্বপ্নের মধ্যেই সে নিজের ইচ্ছাপূরণ ঘটাত। মানুষ তার অবচেতনে যেসব আকাঙ্ক্ষা করে, সেই অপূর্ণ ইচ্ছাগুলিই তার স্বপ্নে এসে উপস্থিত হয়। বাস্তবের কঠোর-কঠিন জীবনে সামান্য যেসব চাহিদা গৌরবির ছিল, তা-ই সে স্বপ্নে পেয়ে যেত।
১২। “নাকি সব গরিবের স্বর্গ আসলে এক?”-স্বর্গ কী? উদ্ধৃত প্রশ্নটি কেন গৌরবির মনে জাগত?
উত্তর: স্বর্গ হল একটি কাল্পনিক স্থান, ঈশ্বরের আবাসস্থল। ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরা মনে করেন যে, যারা পূণ্যকাজ করেন তাঁরা মৃত্যুর পর স্বর্গে যান।
একদিন স্বপ্নে হারার মা আয়েষা বিবি গৌরবিকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল থানকুনি, দুর্বোঘাস ও ঢেঁকিশাকের জঙ্গলে, তাদের জীবিকার উপকরণের অফুরন্ত ভাণ্ডারে। বাস্তব জীবনের দুর্ভাগ্য আর দারিদ্র্য এই দুই ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিবেশী মহিলাকে একাত্ম ও সহমর্মী করে তুলেছিল। তাই গৌরবি ভেবেছিল যে, তার আর হারার অবস্থাটাই তাদের স্বর্গ, তা সে হিন্দুই হোক কিংবা মুসলমান। গৌরবি তাই মনে করেন যে, সব গরিবের স্বর্গ আসলে এক।
১৩। “খুব রাগ হতে লাগল গৌরবির।”-কেন গৌরবির রাগ হয়েছিল? এই রাগ স্থায়ী হয়নি কেন?
উত্তর : সদ্য-মাতৃহারা, পিতৃহীন বালক হারা গৌরবির কাছে আশ্রয় নিলে সে হারাকে কাজে পাঠিয়ে নিজের হতদরিদ্র অবস্থার কথা চিন্তা করছিল। হারার মা আয়েষা বিবিকে তার বেআক্কেলে বলে মনে হয়েছিল। কেন-না, সে গৌরবির ভরসাতেই হারাকে রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিল। এই অবস্থায় গৌরবি হারার খাওয়াপরার ব্যবস্থা কী করে করবে, আর মুসলমান হারাকে নিয়ে সে তার ধর্মই বা কীভাবে রক্ষা করবে-এ কথা ভেবে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাই আতান্তরে পড়া গৌরবির খুব রাগ হয়েছিল।
কিন্তু গৌরবির এই রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বেশ বেলা করে ফিরে হারা যখন তার আনা মেটে আলু রান্না করার অনুরোধ করে গৌরবিকে, তখন পুত্র-পরিত্যক্তা পৌঢ়া বিধবা গৌরবির মুখ হাসিতে ভরে গিয়েছিল।
১৪। “গৌরবির শুকনো বুকে কিসের যেন ঢেউ লাগে।”-প্রসঙ্গ উল্লেখ করো। গৌরবির শুকনো বুকে ঢেউ লাগার কারণ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: মাতৃহীন বালক হারা গৌরবিকে জানায় যে, তার মা মৃত্যুর আগে বলেছিল মেটে আলুটা মাসিকে দিতে, আর মাসির পা ধরে পড়ে থাকতে। এ কথা শুনেই গৌরবির স্নেহকাতর বুকে ঢেউ লাগে।
দীন-দুঃখী, সহায়-সম্বলহীনা গৌরবি ছিল এক পুত্র ও এক কন্যার জননী। কিন্তু রোজগেরে, বিবাহিত ছেলে নিবারণ তাকে দেখত না, আর বিবাহিত মেয়ে পুঁটি নিজের পরিবারের অসহনীয় দারিদ্র্যের জন্য মা-র দায়িত্ব নিতে পারত না। দুর্নিবার এক স্নেহতৃয়া তাই বুকে লালন করে চলেছিল গৌরবি। সেজন্যই হারার কথা শুনে তার স্নেহতৃয়া তৃপ্ত হয়, সে গৌরবান্বিত বোধ করে, জীবনের মানে সে খুঁজে পায়। এ দুনিয়ায় তারও যে প্রয়োজন আছে-এ কথা অনুভব করতে পারে গৌরবি। এসব কারণেই হারার কথা শুনে একাকী পৌঢ়া গৌরবির স্নেহ-কাঙাল বুকে আনন্দের ঢেউ লেগেছিল।
১৫। “ওদের পুরুষেরা কোনোদিন ভাত কাপড় দেয় না।”-এখানে ‘ওদের’ বলতে কাদের কথা বলা হয়েছে, সেই পুরুষেরা ভাতকাপড় দেয় না কেন? ‘ওদের’ ভাতকাপড়ের সংস্থান কীভাবে হয়?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে গৃহীত এই উদ্ধৃতিটিতে যশি ওরফে যশোদা এবং ওর জাতের বউদের কথা বলা হয়েছে।
তথাকথিত নিম্নশ্রেণির, দরিদ্র, নিরক্ষর পুরুষেরা স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে না। মূল কারণ-এ ব্যাপারে তাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের অভাব। এ ছাড়া আলস্য, নেশার প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদি কারণেও সে পুরুষেরা স্ত্রীদের ভাতকাপড়ের জোগান দিতে পারে না।
যশোদারা প্রতিদিন সকালের ট্রেনে গ্রাম থেকে চাল, শাকপাতা, গুগলি, যজ্ঞডুমুরের ডাল, ঝাঁটা-কাঠি ইত্যাদি নিয়ে শহরে যেত। কলকতার বিভিন্ন জায়গায় সেগুলি বিক্রি করে দুপুরের ট্রেনে বাড়ি ফিরে আসত। এভাবেই যশোদারা তাদের ভাতকাপড়ের ব্যবস্থা করত।
১৬। “দয়া-টয়া দেখলে ওর অঙ্গ জ্বলে।”কার, কেন দয়া-টয়া দেখলে অঙ্গ জ্বলত?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের অন্যতম চরিত্র যশি অর্থাৎ যশোদার কথা এখানে বলা হয়েছে।
ভাতকাপড়ের সংস্থানের জন্য প্রতিদিন চাল ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে যশোদা কলকাতায় যায় এবং সেগুলি বিক্রি করে বাড়ি ফিরে আসে। ট্রেনে তাকে বসার জায়গা দিয়ে যেমন কেউ দয়া দেখায় না, তেমনই মাল-বিক্রির পয়সাও তাকে বহু কষ্টে আদায় করতে হয়। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে তাকে রুজি-রোজগারে নামতে হয়েছে, এক বেলাও সে না খেটে ভাত পায়নি। এত খেটে সংসার চালিয়েও অকর্মণ্য স্বামীকে তার তোয়াজ করে রাখতে হয়, দেখভাল করতে হয় ছেলেমেয়েদের। বাস্তবজীবনের এই কঠিন ও কঠোর রূপ তার ভেতরের মমতাময়ী নারীসত্তাকে লুপ্ত করে দিয়েছে। দয়া-টয়া দেখলে সে-কারণেই তার অঙ্গ জ্বলত।
১৭। “নিবারণের বাড়ি দেখে গৌরবি আর চিনতে পারে না।”-নিবারণের বাড়ি দেখে গৌরবি চিনতে পারেনি কেন? তার নিজের বাড়ি কেমন ছিল?
উত্তর: অনেকদিন পর ছেলে নিবারণের বাড়ি গিয়েছিল। গিয়ে সে তার ছেলের টিনের চাল দেওয়া পাকা বাড়ি দেখেছিল। উঠোনে দেখেছিল চাপাকল। এসব পরিবর্তন দেখেই সে ছেলের বাড়ি চিনতে পারেনি।
গৌরবির কুঁড়েঘরের এখানে-সেখানে খড়ের নুটি গোঁজা ছিল, আমপাতা আর বকফুল পড়ে নোংরা হয়ে থাকত তার উঠোন। সন্ধের পর তার উঠোনে শেয়াল হাঁটত। একবার শীতকালে খাটাশ না বনবিড়াল এসে তার ঘরে ঢুকেছিল। এমনটাই ছিল গৌরবির বসতবাড়ি, দুঃসম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দ যেখানে তাকে দয়া করে থাকতে দিয়েছিল।
১৮। “তুমি নইলে এমন শত্রু আর কে হবে?”-প্রসঙ্গ উল্লেখ করো। বক্তার শ্রোতাকে শত্রু বলার কারণ কী?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে গৌরবি যখন অনাথ হারাকে নিয়ে কী করবে ঠিক করতে পারছিল না, তখন সে ভেবেছিল তার ছেলে নিবারণের কাছে গেলে হয়তো একটা সুরাহা হবে। গৌরবি আশা করেছিল যে, নিবারণ নিশ্চয় অসহায় হারার একটা ব্যবস্থা করবে। কিন্তু মার মুখে সব কথা শুনে নিবারণের মুখ অন্ধকার হয়ে যায় এবং মাকে উদ্দেশ্য করে সে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করে।
হিন্দু হয়েও গৌরবি মুসলমান হারাকে আশ্রয় দিয়েছে-এ কথা জানাজানি হলে গৌরবি ও তার ছেলে নিবারণকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তা ছাড়া, মুসলমান বালকের সঙ্গে তার মায়ের এই আন্তরিক সম্পর্কের জন্য ভবিষ্যতে তার মেয়ের বিয়ে দিতেও অসুবিধায় পড়বে নিবারণ। এসব কথা ভেবেই নিবারণ তার মাকে শত্রু বলেছিল।
১৯। “আমার মা হয়ে ওই অজ গাঁয়ে পড়ে থাকবে সেটা ভালো দেখায় না বলে!”-‘অজ গাঁ’ বলতে এখানে কোন্ গাঁয়ের কথা বলা হয়েছে? বক্তার এ কথা বলার কারণ কী?
উত্তর: পুত্র-পরিত্যক্তা গৌরবি তার গরিব মেয়ের বাড়ি থেকে তার দূর সম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দের দখলি যে জামিতে ঠাঁই পেয়েছিল, সেই জায়গাটা ছিল এক অজ গাঁ। এখানে সেই অজ গাঁয়ের কথাই বলা হয়েছে।
গৌরবির ছেলে নিবারণ ক্রমশ স্বচ্ছল হয়ে উঠেছিল। সমাজে নাম-ডাকও হয়েছিল তার। এমন ছেলের বিধবা মা অজ গাঁয়ে একলা পড়ে রয়েছে-এই ব্যাপারটা নিবারণের সম্মানহানি ঘটাচ্ছিল। সে-কারণেই সে তার মাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা ভেবেছিল, গর্ভধারিণীর প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য কিংবা তার প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়। নিবারণ কেবল লোকনিন্দার ভয়ে এবং নিজের সম্মানের কথা ভেবে উদ্ধৃত কথাগুলি বলেছিল।
২০। “দুজনে ধুন্ধুমার লেগে গেল।”-দুজন কে কে? তাদের ঝগড়া লাগার কারণ কী?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে গৃহীত এই উদ্ধৃতিটিতে ‘দুজন’ বলতে নিবারণ ও তার বউকে বোঝানো হয়েছে।
নিবারণের বাড়ি এসে হঠাৎই গৌরবি তার ছেলের কাছে আশ্রয় চাইলে নিবারণ তার আসন্নপ্রসবা স্ত্রীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নিমরাজি হয়। বরাবর স্বাধীনভাবে থাকা নিবারণের স্ত্রী এ কথা শুনে রেগে যায়। সে জানায় যে, শাশুড়ির সাহায্য ছাড়াই সে ইতিমধ্যে তিন সন্তানের মা হয়েছে। সে আরও বলে যে, আসন্নপ্রসবা স্ত্রীর সুরাহার জন্য নয়, নিবারণ তার মাকে আশ্রয় দিতে চায়, কারণ মা ডাকতে তার সাধ হয়েছে। এ কথা শুনে নিবারণ নিজের বাড়িতে তার শাশুড়ির থাকা নিয়ে বউকে খোঁটা দেয়। প্রত্যুত্তরে নিবারণকে তার স্ত্রী মনে করিয়ে দেয় যে, শাশুড়িকে তোয়াজ করে নেওয়া একুশ টাকা নিবারণ কিন্তু সেদিন পর্যন্তও ফেরত দেয়নি। তখনই দুজনে ধুন্ধুমার ঝগড়া বেধে যায়।
২১। “সে কী হারার মা না নিবারণের মা, কে গৌরবিকে মানা করতে লাগল।” কী ‘মানা’ করার কথা এখানে বলা হয়েছে? গৌরবির এই মানসিক অবস্থা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: গৌরবি হারাকে তাড়াতে পারলে তার ছেলে নিবারণ হয়তো তাকে বাড়িতে আশ্রয় গেবে-এমন ধারণা হয়েছিল গৌরবির। কিন্তু তাকে সেই কাজ করতে ‘মানা’ অর্থাৎ নিষেধ করার কথাই বলা হয়েছে উদ্ধৃত অংশে।
সহায়-সম্বলহীনা, পৌঢ় বিধবা গৌরবির শুকনো বুকে স্নেহের ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছিল সদ্য-মাতৃহীন মুসলমান বালক হারা। পুত্র নিবারণের কাছে সেই হারারই একটা ব্যবস্থা করার আর্জি নিয়ে গিয়েছিল সে। প্রসঙ্গক্রমে সে ছেলের কাছে নিজের জন্যও আশ্রয় প্রার্থনা করে বসে। নিবারণ তাকে জানায় যে, হারাকে তাড়িয়ে দিলে সে গৌরবিকে থাকতে দেবে। বাড়ি ফিরে তাই গৌরবি ভাবে, হারাকে তাড়াতে পারলেই তার বাকি জীবনের অনিশ্চয়তা দূর হবে। কিন্তু সেই সময়ে নিবারণের মা-র মন সহায়-সম্বলহীন মুসলমান বালকটির জন্য কেঁদে ওঠে।
২২। “সেখানে একবার মিশে যেতে পারলে আর কোনো ভয় থাকে না।”-সেখানে বলতে কোন্ জায়গার কথা বলা হয়েছে? সেখানে একবার মিশে গেলে ভয় থাকে না কেন?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পে ‘সেখানে’ বলতে কলকাতা শহরের কথা বলা হয়েছে।
গ্রামের পরিবেশে কখনোই সামাজিক সংকীর্ণতাকে এড়িয়ে চলা যায় না। এ কারণেই গৌরবি মুসলমান বালক হারাকে নিয়ে কলকাতা শহরের ফুটপাথে আশ্রয় নিতে চেয়েছিল। কলকাতা শহরের লোকসংখ্যা যেমন প্রচুর, তেমনই সেখানকার সমাজও সমুদ্রের মতো বিস্তীর্ণ। শহরের ফুটপাথে থাকা মানুষের জাত-ধর্ম নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না। হারা ও গৌরবি যদি সেই জনসমুদ্রে মিশে যেতে পারে, তাহলে আর কোনো ভয় থাকবে না দুই ভিন্ন ধর্মের অনাত্মীয় এই মা-ছেলের।
২৩। “শহরে গৌরবির আর হারার সমাজ অনেক বড়ো। সমুদ্রের মতো।”-গৌরবির আর হারার সমাজের পরিচয় দাও’। শহরে তা ‘সমুদ্রের মতো’ কেন?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পে গৌরবি ও হারার যে সমাজের পরিচয় আমরা পাই, সেই মূল্যবোধহীন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রাম্য সমাজ ছিল জাত-পাত ও অস্পৃশ্যতায় দীর্ণ। তাই রোজগেরে যুবক, নিবারণ তার বিধবা পঙ্গু মাকে ভরণপোষণ না দিয়ে তাড়িয়ে দিলে কেউ তার প্রতিবাদ করে না, অথচ সেই অসহায় বৃদ্ধা সন্তানতুল্য, অনাথ, মুসলমান বালক হারাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, তখন সমাজ তার বিরোধিতা করে। সুতরাং হারার ও গৌরবির সমাজ ছিল প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্র, সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ এক অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রাম্য সমাজ।
সমুদ্রের মধ্যে যেমন সব কিছুই বিলীন হয়ে যায়, কোনো কিছুরই আলাদা কোনো অস্তিত্ব থাকে না, তেমনই কলকাতার ফুটপাথে বাস করা সমাজের বিভিন্ন স্তরের নিঃস্ব মানুষগুলিরও সেখানে আলাদা কোনো অস্তিত্ব থাকে না। কলকাতা শহর এমনিতেই জনবহুল, তার ওপর সে শহরের ফুটপাথে তো সারা রাজ্যের সর্বহারা মানুষ এসে ভিড় করে। সেখানে বাস করা প্রতিটি মানুষ রুটি-রুজির চিন্তায় সর্বদা এতটাই ব্যতিব্যস্ত তাকে যে পাশাপাশি থাকা মানুষগুলোর জাত-ধর্ম-বর্ণ নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসত থাকে না তাদের। এ কারণেই শহরে গৌরবি ও হারার সমাজকে ‘সমুদ্রের মতো’ বলা হয়েছে।
২৪। ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অনুসরণ করে গৌরবির মাতৃরূপের পরিচয় দাও। অথবা, মাতৃত্বের কাছে জাতপাতের সংস্কার কীভাবে অর্থহীন হয়ে যায়, ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পটি থেকে তার পরিচয় দাও।
উত্তর: ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র গৌরবি এক সহায়-সম্বলহীনা, প্রৌঢ়া, বিশেষভাবে সক্ষম বিধবা। এক পুত্র ও এক কন্যার জননী হয়েও সে দূর সম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দের দয়ায় তারই এক দখলি জমিতে কুঁড়েঘরে একলা বাস করত এবং শাক-পাতা-গুৰ্গলি ইত্যাদি জোগাড় ও বিক্রি করে কোনোক্রমে দিন গুজরান করত। গৌরবির বহুদিন আগের বলা এক কথার অজুহাতে তার রোজগেরে ছেলে নিবারণ বিয়ের পরই তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল এবং নিজের সংসারের অভাব-অনটনে জর্জরিত মেয়ে পুঁটি ইচ্ছা থাকলেও তার দায়িত্ব নিতে পারেনি। মুকুন্দের থাকতে দেওয়া বাড়িতে প্রতিবেশিনী মুসলিম বিধরা আয়েষা বিবি ও তার সাত বছরের হাবা-গোবা ছেলে হারার সঙ্গে এ কারণেই এক হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল হতভাগ্য গৌরবির।
কিন্তু হঠাৎই একদিন সেই আয়েষা বিবির মৃত্যু হলে গৌরবি তার কাছে ঠাঁই নেওয়া হারার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। তাই ভালোভাবে কথা বলতে অক্ষম, জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হারা যখন তার কাছে আশ্রয় নিল, তখন সন্তানতুল্য ছেলেটির দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারল না সে। এই হারাই যখন তাকে মেটে আলু নিয়ে এসে তা রান্না করার আর্জি জানাল, তখন নিঃসঙ্গ গৌরবির মন আনন্দে ভরে উঠল। হারার আন্তরিক ‘মাসি’ ডাক এবং হারার প্রতি মায়ের শেষ উপদেশ-বাক্য ‘মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস’ শুনে গৌরবির আহত মাতৃত্ববোধ শান্তি পেল; এ পৃথিবীতে নিজের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভব করল সে. কিন্তু মুসলমান হারার ধর্ম-পরিচয়ের জন্য তাকে নিয়ে চরম সংকটে পড়ল গৌরবি। মাতৃহীন হারা ততদিনে গৌরবির হৃদয়ে এতখানিই জায়গা করে নিয়েছিল যে, তাকে ত্যাগ করতে কোনোমতেই সে রাজি ছিল না। তাই, যশির তাকে কলকাতায় ছেড়ে আসার পরামর্শ বা নিবারণের উদ্বাস্তু শিবিরে রেখে আসার ব্যবস্থায় সে রাজি হয়নি। এমনকি নিবারণ যখন তাকে জানাল যে, হারাকে তাড়িয়ে দিলে সে গৌরবিকে আশ্রয় দিতে পারে, তখনও গৌরবি তাতে সায় দিতে পারল না। হারার অকৃত্রিম ভালোবাসা, তার অসহায়তা এবং গৌরবির ওপর তার নির্ভরশীলতাই হারার মাসিকে পরিণত করে তুলল হারার মা-এ। তার ফলস্বরূপ, স্বার্থপর পুত্রের নিরাপত্তার প্রলোভন এবং গ্রাম-জীবনযাপনের চিরাচরিত অভ্যাস উপেক্ষা করে মানসপুত্র হারাকে নিয়ে শুরু হল তার নতুন পথ চলা।
‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পটিতে এইভাবে গৌরবির মাতৃত্বের কাছে জাতপাতের সংস্কার অর্থহীন হয়ে উঠেছে।
২৫। ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের গৌরবি চরিত্র আলোচনা করো।
কথামুখ: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবি।
বিশেষভাবে সক্ষম: গৌরবি ছিল বিশেষভাবে সক্ষম এক হতদরিদ্র হিন্দু বিধবা। প্রতিবেশী মুসলমান বিধবা হারার মা-ই গৌরবিকে বিলের ধার, খালপাড় থেকে শাকপাতা তুলে বিক্রি করে পেট চালানোর পথ দেখায়। সেই হারার মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর পর অসহায় হারা আশ্রয় নেয় তার অনাত্মীয় মাসি গৌরবির কাছে।
দুই সন্তানের জননী: গৌরবির দুই সন্তান-ছেলে নিবারণ ও মেয়ে পুঁটি। বাসের কনডাক্টর জামাই পাওয়ার জন্য পুঁটির বিয়েতে অনেক খরচ করেছিল গৌরবির স্বামী। নিবারণের রাগ হয়, তার বাবা-মা মেয়ের জন্যই সব টাকা খরচ করে ফেলল বলে। গৌরবি বলেছিল যে অসময়ে মেয়েই তাকে দেখবে।
মাতৃত্ব বোধ: দুর্ভাগ্যবশত গৌরবির একমাত্র মেয়ের জামাইয়ের কাজটা চলে যায়, পুঁটিকে বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালাতে হয়। নিবারণের ঈর্ষা ততদিনে প্রতিহিংসায় পরিণত হয়েছে, বিধবা মায়ের ওপর প্রতিশোধ নিতে সে তাকে ভাত দেয় না। নিজের ছেলের কাছ থেকে এরকম ব্যবহার পেয়ে গৌরবির বুকে স্নেহের ধারা শুকিয়ে যায়। মাতৃত্বের চিরন্তন বোধটা পরিস্থিতির অভিঘাতে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গেলেও মাতৃত্বের বিলুপ্তি ঘটে না।
হারানো মাতৃত্ববোধের জাগরণ: মাতৃহীত হারাকে অবলম্বন করে তা আবার জেগে ওঠে। গৌরবি জানতে পারে, হারাকে তার মা বলে গেছে মাসির পা ধরে পড়ে থাকতে। এ কথা শুনে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে তার মনে হয়। গৌরবি এতদিন ছিল গৌরবহীন, আজ যেন নতুন করে উপলব্ধি করল সে অবাঞ্ছিত নয়। সে অনুভব করল মাতৃত্বের গৌরব, তার হৃদয় পূর্ণ হয়ে উঠল মাতৃত্বে। তার ফলস্বরূপ, গৌরবি উপেক্ষা করতে পারল স্বার্থপর পুত্রের নিরাপত্তার প্রলোভন এবং গ্রাম-জীবনযাপনের চিরাচরিত অভ্যাস।
উপসংহার: মানসপুত্র হারাকে নিয়ে শুরু হল গৌরবির নতুন পথ চলা। এভাবেই এ গল্পে গৌরবি সামাজিক ভেদাভেদের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে মা-ছেলের একটি অকৃত্রিম সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করেছে।
২৬। ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের নিবারণ চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
কথামুখ: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে নিবারণ গৌরবির ছেলে।
প্রতিহিংসাপরায়ণ: বিবাহিত যুবক নিবারণের সচ্ছল সংসার হলেও মা-র ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সে নেয় না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সে সুখে থাকে, কিন্তু মাকে সে বোঝা বলে মনে করে। তার বোন পুঁটির বিয়েতে তার বাবা যখন ঘর তৈরির টাকা ভেঙে জামাইকে ঘড়ি, সাইকেল, টর্চ কিনে দিয়েছিল, তখনই সে তার ক্রোধ ও তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল। গৌরবি তখন বলেছিল যে, মেয়েরাও বাবা-মাকে দেখে। সেই রাগেই নিবারণ এখন তার মাকে ভাত দেয় না। নিবারণের প্রতিহিংসাপরায়ণতার চরম পরিচয় ফুটে উঠেছে মুকুন্দকে মায়ের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে মাকে ভিটে থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনায়।
মায়ের প্রতি কটূক্তি: নিবারণের ঘরে দেড়শো টাকা দামের রেডিয়ো থাকলেও গৌরবি একটা গাই-গোরু কেনার জন্য একশো টাকা চাইলে নিবারণ দেয় না, উলটে কটু কথা বলে। হারার অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিতে বললে সে মাকে ‘শত্রু’ বলে সম্বোধন করে।
স্বার্থপর ও সংকীর্ণচিত্ত: গৌরবি হারা-সহ তার ছেলের কাছে একটু আশ্রয় চাইলে প্রথমে অস্বীকৃত হলেও, পরে সমাজে নিজের সম্মানের কথা ভেবে ও আসন্নপ্রসবা স্ত্রীর সংসারে মাকে দিয়ে বিনা পয়সায় দাসীবৃত্তি করানো যাবে ভেবে নিবারণ রাজি হয়। তার মাকে জানিয়ে দেয় যে, মুসলমানের ছেলেকে ঘরে রাখলে সমাজ তা বরদাস্ত করবে না, ভবিষ্যতে তার মেয়ের বিয়েও হবে না। এখানেও নিবারণের স্বার্থপরতা ও সংকীর্ণচিত্ততার পরিচয় পাওয়া যায়।
উপসংহার: সন্তান হিসেবে নিবারণকে কুসন্তানই বলতে হয়। সন্তানের দায়িত্ব সে তা পালন করেইনি, উপরন্তু মাকে অপমান করেছে, বাস্তুহারা করেছে। স্বার্থ ছাড়া যেহেতু সে কিছু জানত না, কর্তব্যবোধও তার ছিল না, তাই মানুষ হিসেবেও সে অত্যন্ত হীন।
২৭। ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অবলম্বনে হারার চরিত্রটি বর্ণনা করো।
কথামুখ: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের হারা গৌরবির প্রতিবেশী আয়েষা বিবির ছেলে।
সর্বহারা বালক: হারুন সালেম ওরফে হারা আক্ষরিক অর্থেই এক সর্বহারা বালক। শৈশবে পিতৃহারা হওয়ার পর সে তার মাকেও হারায় মাত্র ছয়-সাত বছর বয়সে।
রোগে ভোগা শরীরের দুর্বলতা: ছোটোবেলা থেকে জ্বরে ভুগে ভুগে হারা স্পষ্ট কথা উচ্চারণ করতে পারে না, তার স্মৃতিশক্তিও অত্যন্ত দুর্বল, আঙুল গুণে গুণে কথা মনে রাখার চেষ্টা করে সে।
স্নেহ-মমতাবোধের উপলব্ধি: মৃত্যুকালে মায়ের একটি কথাকেহারা বেদবাক্য হিসেবে গ্রহণ করে। তার মা বলে গিয়েছিল ‘মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস’। মুসলমান হারা বুঝতে পারে মাসি তাকে না দিয়ে কিছু খায় না, মাসি একগাল খুদ খেলে তাকেও একগাল দেয়। এক অদৃশ্য স্নেহমমতার বন্ধন সে টের পায়।
অভিমানী শিশুমন: মাসি যখন গালাগাল দিয়ে হারাকে তাড়িয়ে দেয়, তখন তার শিশুমনের অভিমান যেন নতুন করে অনুভব করে, সে মাতৃহীন। তাই হারা নিজের ঘরে গিয়ে কাঁদে, মৃতা মায়ের জন্য কাঁদে। ঘুমিয়ে মাকে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু ঘুম ভেঙে মাসিকে দেখে ‘মাসি গো’ বলে ভয়ে কেঁদে ওঠে। মা আর মাসি যেন হারার কাছে এক হয়ে যায় তখন।
উপসংহার: গৌরবি যখন হারাকে নিয়ে শহরে যাওয়ার কথা বলে, তখন এই দরদি প্রশ্ন তার বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে-শওরে তুমি যাও না, তুমি হাঁটতে পার না যে? মাসির অসহায়তা ছোট্ট হারারও বুক ছুঁয়ে যায়। এভাবেই মৃতা আয়েষা বিবির ছেলে হারা গৌরবির আপন সন্তান হয়ে ওঠে।
২৮। ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প অবলম্বনে যশোদা চরিত্রটি বর্ণনা করো।
কথামুখ: ‘হারুন সালেমের মসি’ ছোটোগল্পের অন্যতম চরিত্র যশোদা ওরফে যশি।
হাড়ভাঙা পরিশ্রমী: যশি প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে চাল ও অন্যান্য মালপত্র নিয়ে ট্রেনে চেপে কলকাতায় যায় এবং সেসব বিক্রি করে বিকেলে বাড়ি ফেরে। তার অকর্মণ্য স্বামী রোজগার করে না বলেই তাকে প্রতিদিন এইভাবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হয়। সকাল থেকে রাত অবধি ঘরে ও বাইরে যশি এতই পরিশ্রম করে যে, তার অবসর বলতে কিছু নেই। তাই প্রায় সর্বক্ষণ তাকে ছুটতে দেখা যায়-‘যশিরা হাঁটে না, ছোটে’।
কর্তব্যপরায়ণ: সারাদিন বড়ির বাইরে থেকে অর্থ উপার্জন করলেও ঘরের কাজে, সংসারের কাজে ফাঁকি দেয় না যশি। সংসারের কাজ করা, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করা, অকর্মণ্য মেজাজি স্বামীর যত্ন নেওয়া-সমস্ত কাজই তাকে সমান তালে করতে হয়।
কোমলতা ও সহানুভূতির অভাব: নারী চরিত্রে সাধারণত যে কোমলতা ও সহানুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়, যশোদার মধ্যে তার অভাব আছে। তাই অনায়াসেই সে হারাকে ভিক্ষা করার জন্য কলকাতায় ছেড়ে আসার প্রস্তাব দেয় এবং জানায় যে ‘ভিক্কে করে খাবে খাবে, না খাবে না খাবে, তোমার কী, আমার কী?’ আসলে স্বভাবগতভাবে নয়, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতিই তাকে এমন করেছে-“জীবনে কারো কাছে দয়া পায়নি; এখনো পায় না। ট্রেনে একটু বসার জায়গা, চাল-বেচা লাভের পয়সা ওকে আঁচড়ে-কামড়ে আদায় করতে হয়। সাত বছর বয়স থেকে না খেটে একবেলা ভাত পেয়েছে মনে পড়ে না যশির।” নিরক্ষর হিন্দু সধবা হিসেবে যশি অত্যন্ত সংস্কারাচ্ছন্ন বলেই মুসলমান বালক হারার ব্যাপারে সে বারবার তার অস্বস্তি প্রকাশ করে।
রূঢ়ভাষী ও স্পষ্ট বক্তা: যশি অত্যন্ত রূঢ়ভাষী ও স্পষ্টবক্তা বলেই মুকুন্দবাবুকে নিয়ে গৌরবির আত্মীয়তার অহংকার ভেঙে দিয়ে বলে-‘আপনজনা! তাই যেয়ে শাক-গুগলি কুড়িয়ে বেড়াও আর পোষ্টা ভাত খাও’।
বাস্তববুদ্ধিসম্পন্না ও অভিজ্ঞ: গৌরবির সঙ্গে তার কথাবার্তার মধ্য দিয়েই আমরা প্রমাণ পাই যে, সমাজ ও চারপাশের মানুষজন সম্বন্ধে এই বাস্তববুদ্ধিসম্পন্না, পোড়খাওয়া নারী অত্যন্ত অভিজ্ঞ।
উপসংহার: এইভাবে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে যশি ওরফে যশোদা চরিত্রটি আলোচ্য গল্পে একটি বাস্তব চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২৯। “অসম্ভব দুশ্চিন্তা হল গৌরবির। …তার নিজের আধপেটা অন্ন জোটে কি না জোটে! তা ছাড়া! গৌরবি কেমন ক’রে বা হারাকে ঠাঁই দেয়? হারা কি তার ধর্মের মানুষ, না সমাজের?” -গৌরবির এই দুশ্চিন্তার কারণ কী? তার নিদারুণ দারিদ্র্য না তার ধর্মীয় গোঁড়ামি-আলোচনা করো।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প থেকে গৃহীত প্রশ্নোদ্ভূত উক্তিটিতে যে গৌরবির কথা বলা হয়েছে, সে ছিল সহায়-সম্বলহীনা, বিশেষভাবে সক্ষম এক প্রৌঢ়া বিধবা। এক পুত্র ও এক কন্যার জননী হয়েও সে দূর-সম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দের দয়ায় তারই এক দখলি জমির কুঁড়েঘরে একলা বাস করত এবং শাক-পাতা-গুগলি ইত্যাদি তুলে এবং একটি ছাগল পুষে কোনোক্রমে দিন গুজরান করত। প্রতিবেশিনী মুসলিম বিধবা আয়েষা বিবি এবং তার সাত বছরের জড়বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলে হারার সঙ্গে এ কারণেই এক হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল গৌরবির। হারার মা-ই গৌরবিকে শাক-পাতা-গুগলি সংগ্রহ করার পথ দেখায় এবং বিশেষভাবে সক্ষম গৌরবিকে এ ব্যাপারে সাহায্যও করে। সেই হারার মা একদিন যখন অকালে মারা গেল এবং তার মৃত্যুকালীন পরামর্শ অনুযায়ী সহায়-সম্বলহীন হারা যখন আশ্রয় নিল গৌরবির কাছে-তখনই ‘অসম্ভব দুশ্চিন্তা’ হয়েছিল গৌরবির।
স্বার্থপরের মতো গৌরবি যদি হারার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারত, তাহলে অবশ্য তার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু তার সদ্য-প্রয়াত প্রিয় বান্ধবীর ভালোভাবে-কথা-বলতে-অক্ষম, জড়বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলে যখন তার কাছে আশ্রয় চাইল, তখন সন্তানতুল্য সেই অসহায় ছেলেটির দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারল না সে। কারণ, একমাত্র ছেলে নিবারণের তাচ্ছিল্য ও দুর্ব্যবহার তার মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তার প্রতি মাতৃহীন হারার নির্ভরশীলতা তাতে প্রলেপ দিতে পেরেছিল।
গৌরবির দারিদ্র্য এতটাই অসহনীয় ছিল যে, তার নিজের পেট চালাতে সে হিমসিম খেত। এই অবস্থায় শারীরিক ও মানসিক বিশেষভাবে সক্ষম বালক হারাকে যদি তার আশ্রয় দিতে হয় তাহলে তা দুশ্চিন্তারই কারণ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া, সে যুগের গ্রামীণ সমাজে সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি প্রকট ছিল। ফলে সে-সমাজে গৌরবির পক্ষে মুসলমান হারাকে আশ্রয় দেওয়া ছিল একান্তই অসম্ভব ব্যাপার। নিরক্ষর, গ্রাম্য হিন্দু মহিলা হিসেবে তার যে সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি ছিল, হারার প্রতি টান তাকে তা থেকে মুক্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের গোঁড়ামির কথা ভেবেই সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই হারার ব্যাপারে গৌরবির মাতৃহৃদয় সাড়া দিলেও অসম্ভব দুশ্চিন্তায় পড়ে সে।
আরো পড়ুন : হলুদ পোড়া গল্পের বড়ো প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : প্রার্থনা কবিতার বড়ো প্রশ্ন উত্তর