সমকালীন ভারতে নাগরিক সমাজের আন্দোলনসমূহ (পঞ্চম অধ্যায়) প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান | Somokalin Varote Nagorik Somajer Andolon somuha (5th Chapter) Question Answer Class 12 Semester IV

১। পৌর আন্দোলন বা নাগরিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো।
পৌর বা নাগরিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য:
পৌর আন্দোলনের কতকগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা যায়। এগুলি হল-
① নাগরিক সমাজের স্তরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনসমূহ ‘নতুন’, কারণ এই আন্দোলনগুলি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যেমন-পরিবেশ সংরক্ষণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ইত্যাদি। অর্থনৈতিক অসাম্য, মজুরি বৃদ্ধির দাবি ইত্যাদি বিষয়গুলির পরিবর্তে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
② এই ধরনের আন্দোলনগুলি প্রায়শই পরিচিতির রাজনীতি নির্ভর হয়ে থাকে। যেমন-লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, নারীবাদী আন্দোলন, LGBTQ-দের আন্দোলন ইত্যাদি।
③ এইরূপ আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পারস্পরিকতা। এই আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সমাজস্থ মানুষদের পারস্পরিক ও যৌথ সহযোগিতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়। শুধু তাই নয় এই আন্দোলনে মূলত এমন বিষয়গুলিকে তুলে ধরা হয় যা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা উপেক্ষিত হয়।
④ নাগরিক আন্দোলনগুলি স্বতন্ত্র আন্দোলন, কারণ এই আন্দোলন সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে কাজ করে। এই আন্দোলনগুলিতে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ গুরুত্ব পায় না বরং ‘Common’ বা সাধারণ স্বার্থ গুরুত্ব পায়। এর প্রধান লক্ষ্য বস্তুগত জীবনচর্চা অপেক্ষা জীবনের গুণগত মান বৃদ্ধি করা ও মানবাধিকার প্রসার করা। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক অবিচার মোকাবিলা করা, জনকল্যাণের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা, সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদিও এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
⑤ নাগরিক সমাজের আন্দোলন হল এক যৌথ আন্দোলন। এই আন্দোলন একক নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হয় না। প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলনগুলি নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে গড়ে উঠলেও অতি সহজেই তা তৃণমূল স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
২। নাগরিক সমাজের প্রকারভেদ আলোচনা করো।
নাগরিক সমাজের প্রকারভেদ: নাগরিক সমাজকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যথা-কার্যক্রম কাঠামো, পরিসর, প্রভাব ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবিভক্ত করা যায়। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রকারভেদগুলি হল-
কার্যক্রমের ভিত্তিতে নাগরিক সমাজের প্রকারভেদ :
(i) মানবাধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন: এই সংগঠন গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ-Amnesty International, Human Rights Watch ইত্যাদির কথা বলা যায়।
(ii) পরিবেশবাদী সংস্থা: জলবায়ু পরিবর্তন, বনসংরক্ষণ, সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এই সংগঠনগুলি কাজ করে। উদাহরণ-Green Peace, WWF ইত্যাদি।
(iii) ধর্মীয় ও দাতব্য সংস্থা: ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রচার এবং সমাজসেবা, দান-অনুদান কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে এই সংগঠনগুলি। উদাহরণ হিসেবে রামকৃষ্ণ মিশন, ইসকন, মিশনারিজ অফ চ্যারিটির কথা উল্লেখ্য।
(iv) শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন: শ্রমিক, কৃষক ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণমূলক কাজ করার জন্য এই সংগঠনগুলি গঠিত হয়। উদাহরণ-বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, IMA (Indian Medical Association) ইত্যাদি।
(v) নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা: নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা ও শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে। এ প্রসঙ্গে SEWA, CRY, CARE সংস্থাগুলির ভূমিকা উল্লেখ্য।
কাঠামোর ভিত্তিতে নাগরিক সমাজের প্রকারভেদ :
(i) অলাভজনক সংগঠন: সমাজসেবা ও উন্নয়নের জন্য অলাভজনকভাবে নাগরিক সংগঠনগুলি কাজ করে। উদাহরণ-Red Cross, Help Age India ইত্যাদি।
(ii) সামাজিক আন্দোলন ও অ্যাক্টিভিস্ট গুন: এই সংস্থাগুলি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন পরিচালনা করে থাকে। যেমন-চিপকো আন্দোলন, নির্ভয়া আন্দোলন ইত্যাদি।
(iii) কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠন: স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠন কাজ করে। এক্ষেত্রে যেমন, স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা Self Help Groups-এর কথা বলা যায়।
(iv) পেশাজীবী ও বাণিজ্য সংস্থা: এরূপ সংগঠন নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করে। এক্ষেত্রে বার কাউন্সিল, FICCI বা Federation of Indian Chambers of Commerce and Industry উল্লেখযোগ্য।
পরিসর ও প্রভাবের ভিত্তিতে নাগরিক সমাজের প্রকারভেদ:
(i) স্থানীয় নাগরিক সমাজ: নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করে। যেমন- সবুজ সংঘ ইত্যাদি
(ii) জাতীয় নাগরিক সমাজ: সারা দেশে নীতি নির্ধারণ ও সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। মূলত কেন্দ্র সরকারের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে নীতি পরিবর্তন বা নতুন উপযুক্ত নীতি প্রণয়নে বাধ্য করে। উদাহরণ হিসেবে মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠনের কথা বলা যায়। এই সংগঠন কৃষক শ্রমিকদের জন্য কাজ করে।
(iii) আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ: বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার, পরিবেশদূষণ হ্রাস, দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদিতে কাজ করে। উদাহরণ- UNHCR, WHO, Green peace ইত্যাদির কথা বলা যায়।
উপসংহার: নাগরিক সমাজ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে গঠিত হয় এবং এটি সরকার ও বাজার ব্যবস্থার বাইরে থেকেও সমাজ উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা পালন করে। সমাজের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র রক্ষায় নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।
৩। ভারতে পৌর সমাজ আন্দোলনের বিকাশ সংক্ষেপে আলোচনা করো।
ভারতে পৌর সমাজ আন্দেলনের বিকাশের ভূমিকা:
ভারতে পৌর আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সংক্ষেপে তা আলোচিত হল-
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে পৌর আন্দোলন: ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে ভারতে পৌর আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের হাত ধরে ভারতে পৌর আন্দোলনের জন্ম হয়। এর মধ্যে গান্ধিজির অহিংস, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে কৃষক অভ্যুত্থান: প্রতিটি আন্দোলন মূলত ব্রিটিশরাজের অত্যাচার ও কালা কানুনের বিরুদ্ধে এবং সামন্তশ্রেণির বিরুদ্ধে সংগঠিত গণআন্দোলন।
বনজ সম্পদভিত্তিক জীবন ও জীবিকানির্ভর ভারতীয় কৃষক ও উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাদের অরণ্যের অধিকার রক্ষার স্বার্থে বারংবার আন্দোলন সংগঠিত করেছিল। বিশেষত কৃষক ও উপজাতির মানুষেরা সংঘবদ্ধ হয়ে জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। তাদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকার, জমিদার, মহাজন এবং ইজারাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। এরূপ কৃষক অভ্যুত্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-সাঁওতাল গণবিদ্রোহ, তেভাগা কৃষক আন্দোলন, তেলেঙ্গানা কৃষক গণবিদ্রোহ ইত্যাদি।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের পৌর আন্দোলন: ভারতে স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সচেতনতার ভিত্তিতে পৌর আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে আদিবাসী ও উপজাতিদের অরণ্য অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত পরিবেশ আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ্য। যেমন-চিপকো আন্দোলন, আন্না আন্দোলন ইত্যাদি।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার আগেও যেমন পৌর আন্দোলনগুলি বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ ও অন্যায়-অবিচার রোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতেও এই আন্দোলন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
৪। ভারতে পৌর আন্দোলন হিসেবে কৃষ্ণক অভ্যুত্থানের ভূমিকা আলোচনা করো।
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে কৃষক গণঅভ্যুত্থান:
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে সংগঠিত গণআন্দোলন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এর মধ্যে বেশকিছু আন্দোলন গড়ে উঠেছিল কৃষক ও উপজাতিদের জীবিকা ও অরণ্যের অধিকার রক্ষায় তারা সংঘবদ্ধ হয়ে জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। তাদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকার, জমিদার, মহাজন এবং ইজারাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। এরকম কয়েকটি পৌর কৃষক অভ্যুত্থান হল-
সাঁওতাল গণবিদ্রোহ : দরিদ্র সাঁওতাল মানুষেরা জমিদার ও দিকু (মহাজন)-দের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল (১৮৫৫-৫৬ খ্রি.)। সাঁওতালদের দিয়ে ইংরেজ সরকার কর্তৃক জোর করে রেলপথ নির্মাণের প্রচেষ্টা বিদ্রোহের আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করেছিল। এই দুর্বিষহ ও ভয়াবহ জীবন থেকে ও শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় তারা বিদ্রোহ করে। ব্রিটিশদের নির্মম অত্যাচারে সিধু ও কান্ডু-সহ অসংখ্য সাঁওতাল এই আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।
তেভাগা কৃষক আন্দোলন : স্বাধীনতার পূর্বেই গণআন্দোলনের প্রথম রূপটি ধরা পড়ে তেভাগা কৃষক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে (১৯৪৬ খ্রি.)। তাদের আন্দোলনের মূল মন্ত্র ছিল ‘নিজ খামারে ধান তোলো’। এই ডাক দিয়ে বর্গাদার কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে সারা বাংলা জুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করেছিল।
তেলেঙ্গানা কৃষক গণবিদ্রোহ: ভারতের হায়দরাবাদের তেলেঙ্গানা অঞ্চলে নিজামের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে (১৯৪৬-১৯৫১ খ্রি.) বিপুল সংখ্যক জনগণ অবৈধ জমি দখল, বেগার শ্রম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং তাদের নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা পাওয়ার স্বার্থে ব্যাপক কৃষক আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের ফলেই জমিদার প্রথা, বেগার শ্রম ও সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছিল।
উপসংহার: উক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় স্বাধীনতার আগে থেকেই ভারতে কৃষক গণঅভ্যুত্থান গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পরবর্তীকালেও সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কারণে উপজাতি কৃষকদের অরণ্য অদিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে যাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। যেমন-গাড়োয়াল প্রদেশের চিপকো আন্দোলনের কথা বলা যায়।
৫। নাগরিক সমাজ আন্দোলনের কার্যাবলি লেখো।
অথবা, নাগরিক সমাজ আন্দোলনের ভূমিকা আলোচনা করো।
নাগরিক সমাজ আন্দোলনের ভূমিকা ও কার্যাবলি: নাগরিক সমাজ রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নাগরিক সমাজের প্রধান কাজগুলো হল-
(i) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করে ন্যায্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে নাগরিক সমাজ আন্দোলন। একইসঙ্গে জাতিভেদ, বর্ণভেদ, লিঙ্গ বৈষম্য ও অন্যান্য সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
(ii) নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ: রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বাড়ানোর জন্য সংরক্ষিত আসন, রাজনৈতিক সচেতনতার প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে নাগরিক সমাজ। সমাজের সকল স্তরের নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মহিলাদের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।
(iii) মহিলাদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন: নাগরিক সমাজ মহিলাদের প্রতি বৈষম্য দূর করে সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এনজিও ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিচালনা করা, তাদের মধ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এপ্রসঙ্গে SEWA – Self Employed Women’s Association কথা বলা যায়।
(iv) নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি : ‘Me Too’ (২০১৭ সাল)-এর মতো সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মহিলাদের উপর হওয়া যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সংবাদ মাধ্যম, পত্রপত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নারীদের অধিকারের পক্ষে সচেতনতামূলক প্রচার চালায় পৌর সমাজ।
(v) পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ করা নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম কাজ। বন্যা, খরা ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ত্রাণ ও দুর্যোগ পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করে বিভিন্ন পৌর সংগঠন।
উপসংহার: জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবাধিকার রক্ষা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে নাগরিক সমাজ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
৬। সমাজে পৌর বা নাগরিক আন্দোলনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
পৌর বা নাগরিক আন্দোলনের গুরুত্ব:
নাগরিক সমাজের আন্দোলনের গুরুত্ব নানাদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই আন্দোলন সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সংযোগ হিসেবে কাজ করে। নাগরিক আন্দোলনের গুরুত্বগুলি নিম্নে আলোচনা করা হল।
(i) সমাজ পরিবর্তনে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ : নাগরিক সমাজের আন্দোলন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি নাগরিকরা সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসে। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায়, নাগরিক সমস্যার প্রতিবিধানে ও সামাজিক পরিবর্তনের কাজে নাগরিকরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে।
(ii) জনসচেতনতা গড়ে তোলা: একদিকে নাগরিক সমাজের আন্দোলন যেমন নাগরিকদের সচেতনতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। তেমনই নাগরিক সমাজের আন্দোলন জনসচেতনতা গড়ে তুলতেও সাহায্য করে। বিভিন্ন ইস্যুতে নাগরিক সমাজের আন্দোলন জনগণের অধিকার সম্পর্কে নাগরিকদের সজাগ করে। এক্ষেত্রে পৌর সমাজ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে থাকে।
(iii) সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা : এই আন্দোলনগুলি সমাজের বিভিন্ন দুর্বল ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে। সামাজিক বৈষম্য দূর করতে ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে আন্দোলনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(iv) সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা: নাগরিক সমাজের আন্দোলন সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা নাগরিক জীবনকে আন্দোলিত করে যেমন-নারী সুরক্ষা, পরিবেশদূষণ, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন সেই ক্ষেত্রগুলিতে ন্যায়বিচারের দাবিতে নাগরিক সমাজ আন্দোলন গড়ে তুলে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।
উপসংহার: পৌর বা নয়া সামাজিক আন্দোলনগুলির বিবিধ গুরুত্ব থাকলেও, আন্দোলনগুলির বিরুদ্ধে নানা সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। যেমন, এই সামাজিক আন্দোলনসমূহ অনেকসময় চরমপন্থা ও হিংসাশ্রয়ী সক্রিয়তার জন্ম দিতে পারে। আবার বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ নাগরিক সমাজের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে।
৭। নাগরিক বা পৌর আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।
অথবা, নাগরিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে চারটি সমালোচনা উল্লেখ করো।
পৌর আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা: পৌর আন্দোলনগুলির বিবিধ গুরুত্ব থাকলেও, আন্দোলনগুলির বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা লক্ষ করা যায়। পৌর আন্দোলনের বিরুদ্ধে চারটি প্রধান সমালোচনা হল-
① সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কিছুক্ষেত্রে সরকার নাগরিক সমাজের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করে যা তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধা দেয়। যেমন- এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কার্যপরিচালনার জন্য বিদেশি অনুদান গ্রহণে কঠোর আইন Foreign Contribution Regulation Act, 2010 এনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করেছে।
② অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও তহবিলের অভাব: নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর জন্য অর্থায়নের অভাব অন্যতম বড়ো সমস্যা। অনেকসময় ফান্ডের স্বচ্ছতা না থাকায় সাধারণ জনগণের বিশ্বাস কমে যায়। অনেক এনজিও বিদেশি অনুদানের উপর নির্ভরশীল। বিদেশি অনুদান বা সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় সংস্থাগুলি সমস্যায় পড়ে।
③ সচেতনতার অভাব ও দুর্নীতি: অনেকসময় নাগরিক আন্দোলনকে ‘বিদেশি এজেন্ডা’ বা ‘সরকারবিরোধী কার্যক্রম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কম হয়। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত সংগঠনও নাগরিক সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট করে।
④ লক্ষ্যভ্রষ্ট এবং হিংসার প্রয়োগ : অনেকসময় আন্দোলনগুলি নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও পরবর্তীতে সেই লক্ষ্য থেকে সরে এসে কেবলমাত্র সরকার বিরোধিতায় পর্যবসিত হয়। আবার হিংসার ব্যবহার শুধু আন্দোলনকারীরাই করে না, সরকারও আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সময়ে হিংসার ব্যবহার করে থাকে।
এ ছাড়া সরকারি বাধা, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অসচেতনতা, আইনি জটিলতা ইত্যাদি কারণে নাগরিক সমাজ কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।
উপসংহার: প্রথাগত ভাবনার পরিপোষকরা পৌর আন্দোলনগুলির বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা করলেও বলা যায়, বিগত অর্ধশতকে নিঃসন্দেহে এই আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এই আন্দোলনগুলির প্রভাব সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গভীরভাবে পড়েছে।
৮। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করো। অথবা, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সম্পর্কে চীকা লেখো।
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন:
সাম্প্রতিককালে ভারতে সংগঠিত পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনগুলির মধ্যে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে পরিব্যাপ্ত নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারত সরকার ১৯৮০-এর দশকে নর্মদা নদীর উপত্যকা অঞ্চলের সামগ্রিক বিকাশ এবং জলবিদ্যুৎ ও জলসেচের উন্নতিকল্পে ‘নর্মদা ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (Narmada Valley Development Project -NVDP) নামক প্রকল্প গ্রহণ করলে নর্মদা উপত্যকা ও নর্মদা নদীর অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণ তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের অন্তর্গত নর্মদা উপত্যকায় গণ্ড, ভীল, ভীলাল্লা, বাইগা, কোরকু ইত্যাদি ভূমিজ আদিবাসীদের বাস, যারা নর্মদা নদীকে একাধারে ঈশ্বরজ্ঞানে ভক্তি করে এবং মাছ ধরা, কৃষিকার্য ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নদীর উপর নির্ভর করে। শুধু আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি নয়, নদী অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসকারী মূলস্রোতের মানুষ, যারা নর্মদা নদীকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করত এবং যাদের সংস্কৃতিতে নর্মদা জড়িত, তারাও এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। পরবর্তীতে নাগরিক সমাজ এই আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে আসে এবং বিদ্বজনেরা আন্দোলন সমর্থন করে। দেশে এবং দেশের বাইরে এর সমর্থনে জনমত গড়ে ওঠে।
নেতৃত্ব: নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য নেতৃত্বরা হলেন মেধা পাটেকর এবং বাবা আমতে। এ ছাড়াও কমলা দেবী, মোহন ভাই প্রমুখ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
প্রধান দাবি : নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল বাস্তুচ্যুতকরণ বধ করা, পুনর্বাসন, বাঁধ নির্মানের ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রতিরোধ করা।
উপসংহার: নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত ন্যায়, মানবাধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে একদিকে যেমন সচেতনতা সৃষ্টি করেছে অন্যদিকে তেমনি উন্নয়ন বনাম পরিবেশ ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার দাবিকে উপস্থাপন করেছে।
৯। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব গুলি লেখো।
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য:
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য নাগরিক আন্দোলন। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
① বৃহৎ নদী বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা: নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বৃহৎ নদী বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার নর্মদা নদীর উপরে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণের যে বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল তার ফলে পরিবেশের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল তার বিরুদ্ধেই গড়ে উঠেছিল এই আন্দোলন।
② বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা: নর্মদা নদীর উপরে বৃহদাকার সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণের ফলে বহু প্রান্তিক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রান্তিক মানুষজন তাদের অধিকার করার জন্য এই আন্দোলনে শামিল হন।
③ পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকরী ভূমিকা : নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বৃহৎ বাঁধ নির্মাণে পরিবেশের উপরে কি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে সেবিষয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের সচেতন করে তুলতে পেরেছিল। সেইসঙ্গে বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের ফলে নদী অববাহিকায় বনাঞ্চল ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ও বাস্তুতন্ত্রের উপরে নেতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি সম্পর্কে তীব্র জনমত গড়ে ওঠে।
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের গুরুত্ব:
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের গুরুত্বগুলি হল-
① সুস্থায়ী উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপ: নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বৃহদায়তন উন্নয়ন প্রকল্প সংক্রান্ত বিদ্যমান ভাবনাচিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল এবং সুস্থায়ী ও সামাজিক সম্প্রদায়ভিত্তিক বিকল্প উন্নয়ন পন্থা অন্বেষণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিল।
② অহিংস আন্দোলনের পথ অবলম্বন: সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন যেভাবে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত প্রান্তিক মানুষজনের পাশে দাঁড়িয়েছিল তার স্বীকৃতিস্বরূপ এই আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব মেধা পাটেকর এবং বাবা আমতে-কে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ‘রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।
③ ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন বন্ধ করা : নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণে পরিবেশ বিধ্বংসী বৃহৎ প্রকল্পটিকে বন্ধ করতে পেরেছে। নতুবা এই বৃহৎ প্রকল্পটি রূপায়িত হলে নর্মদা উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষজনের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হত।
১০। চিপকো আন্দোলনের পটভূমি আলোচনা করো।
চিপকো আন্দোলনের পটভূমি: হিমালয় অঞ্চলটি অরণ্যসম্পদে পূর্ণ। ফলে এখানকার অধিবাসীরা তাদের জীবন ও জীবিকার জন্য অরণ্যের উপরেই সর্বাংশে নির্ভরশীল। পাহাড়ি মানুষদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে অরণ্য তথা প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। পাহাড়ি অধিবাসীরা, বিশেষ করে পাহাড়ি মহিলারা জীবিকার প্রয়োজনে বনাঞ্চল থেকে ফল, মূল, ফুল, জ্বালানির কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করত, যা ছিল তাদের ‘বংশানুক্রমিক অধিকার’। ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকেই এই অঞ্চলের বনভূমি ধ্বংসের কাজ শুরু হয়েছিল।
১৯৬০-এর দশক থেকে এই অরণ্যসংকুল পার্বত্য অঞ্চলের রাস্তাঘাটগুলিকে উন্নত করা হয়। ফলস্বরূপ প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে পণ্যবাহী ট্রাক ঢুকতে শুরু করে। এই অরণ্য অঞ্চল থেকে ব্যাপক পরিমাণে মূল্যবান কাঠ ট্রাকে করে নিষ্কাশিত হতে থাকে, যা পাহাড়ি অধিবাসীদের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। অতিরিক্ত বর্ষার ফলে ভাগীরথীর উপনদী অলকানন্দায় বন্যা ওই অঞ্চলের জীবজন্তু, গবাদি পশু-সহ অধিবাসীদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের সরকার নিলাম করে একটি ক্রীড়া প্রস্তুতকারক সংস্থাকে ক্রীড়া সামগ্রী তৈরির জন্য বনাঞ্চলের বৃহৎ অংশ ঠিকাদারদের ইজারা দিয়ে দেয়। বহিরাগত ঠিকাদাররা বৈধ ও অবৈধভাবে হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অরণ্য সম্পদ লুঠ করতে থাকে, এই সময় স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সরকারি অনুমতিপ্রাপ্ত বহিরাগত ঠিকাদারদের সংঘর্ষ শুরু হয়। গ্রামীণ মহিলারা বৃক্ষচ্ছেদন রোধ করতে গাছগুলিকে সন্তানের মতো জড়িয়ে ধরে। এই প্রেক্ষিতে ১৯৭০-এর দশকে চিপকো আন্দোলন শুরু হয়।
১১। চিপকো আন্দোলনের প্রভাব সম্পর্কে যা জানো লেখো।
অথবা, চিপকো আন্দোলনের ফলাফল লেখো।
চিপকো আন্দোলনের প্রভাব: ভারতের প্রথম শক্তিশালী সংগঠিত পরিবেশ আন্দোলন ‘চিপকো আন্দোলন’ কেবল পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল পাহাড়ি অধিবাসীদের আজন্ম লালিত-পালিত অরণ্যের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। চিপকো আন্দোলনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, সাফল্য ছিল প্রশ্নাতীত। এই আন্দোলনের প্রভাবগুলি নিম্নে আলোচনা করা হল।
বৃক্ষচ্ছেদনের উপরে নিষেধাজ্ঞা : চিপকো আন্দোলনের একটি প্রভাব হল বৃক্ষচ্ছেদনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি। আন্দোলনের চাপে পড়ে উত্তরপ্রদেশ সরকার উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. বীরেন্দ্র কুমারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এই কমিটি চিপকো আন্দোলনকারীদের যুক্তি সমর্থন করে সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার আগামী ১৫ বছর তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলের গাড়োয়াল ও কুমায়ুন রেঞ্জে বৃক্ষচ্ছেদন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
পরিবেশ রক্ষায় প্রথম নারীবাদী আন্দোলন: ১৯৭০-এর দশকে উদ্ভূত চিপকো আন্দোলন ছিল ভারতে গ্রামীণ মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত একটি অহিংস সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলন। ফলে চিপকো আন্দোলন ভারতবর্ষে নারীবাদী আন্দোলনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। এটি হল পরিবেশের সুরক্ষা নিয়ে নারী আন্দোলন যাকে অন্য ভাষায় পরিবেশগত নারীবাদ বা Eco feminism বলা যায়।
পরিবেশ নীতির উপর প্রভাব: চিপকো আন্দোলনের ফলে পরিবেশের সঙ্গে জীবনযাপন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক নতুন মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। চিপকো আন্দোলনে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কিত নীতিকে বদলে ফেলতে সক্ষম হয়। এই আন্দোলনের ফলে সরকার হিমালয়ের বনাঞ্চল সংরক্ষণে নতুন নীতি ঘোষণা করে।
পরিবেশ নীতিতে স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা: চিপকো আন্দোলনের ফলে বনভূমি রক্ষায় স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরবর্তীকালে বনভূমি সংরক্ষণে সরকারি নীতিতে এই বিষয়টি স্থান পায়। ভারত সরকার অবৈধভাবে বনভূমি ধ্বংস করার বিরুদ্ধে ও বনভূমি সংলগ্ন আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার সপক্ষে কঠোর নিয়মকানুন তৈরি করে।
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর