স্বাধীনতার পথে (পঞ্চম অধ্যায়) প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস | HS 4th Semester History Long Question answer 5th Chapter

১। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখো।
অথবা, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করো।
দুজন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বশেষ ও বৃহৎ গণ আন্দোলন হিসেবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে এই আন্দোলন বিয়াল্লিশের বিপ্লব বা আগস্ট আন্দোলন নামেও পরিচিত।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ভারত ছাড়ো আন্দোলন /আগস্ট আন্দোলন:
প্রেক্ষাপট / কারণসমূহ:
(i) ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা: ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ক্রিপস প্রস্তাবে ভারতকে স্বাধীনতা দানের কোনও উল্লেখ না থাকায় ভারতবাসী তা গ্রহণ করেননি। – এই মিশনের ব্যর্থতার পর ভারতবাসীর কাছে স্পষ্ট হয় যে, যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের সাংবিধানিক সংস্কার ঘটানোর বিষয়ে আদৌ আগ্রহী এ নয়। এই ঘটনায় গান্ধিজি-ও নিরাশ হন।
(ii) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘটনাবলি: আলোচ্য পর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন ঘটনা গান্ধিজি ও জাতীয় নেতাদের উদ্বিগ্ন না করে। মালয়, সিঙ্গাপুর, বার্মা থেকে ব্রিটিশবাহিনী সরে এলে সেখানে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ওই এ সকল অঞ্চলের মানুষেরা বিশেষত ভারতীয়রা অক্ষশক্তি জাপানের হাতে লাঞ্ছিত হতে থাকেন।
(iii) জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা: মালয় ও বার্মার সমতো ভারতের উপরেও জাপানের আক্রমণ ও অত্যাচারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। যা ভারতীয় নেতাদের উদ্বিগ্ন করে।
(iv) পোড়ামাটি নীতি: জাপানি আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল পূর্ব ভারতে পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করেন। এর ফলে আসাম, বাংলাদেশ ও ওড়িশায় বহু কৃষিজমি, খাদ্যশস্য, নৌকা, সাইকেল, রাস্তাঘাট জোরপূর্বক ধ্বংস করা হয়-যাতে জাপানিরা এগুলি ব্যবহার করে এদেশে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু ভারতবাসী ব্রিটিশ শক্তির এহেন আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। এভাবেই ভারতে এক সর্বভারতীয় গণ আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল।
সূচনা:
প্রস্তাব গ্রহণ: ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি ওয়ার্ধায় একটি জাতীয় দাবির খসড়া প্রস্তুত করে। গান্ধিজি ঘোষণা করেন, পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া কোনও কিছুতেই আমি সন্তুষ্ট হব না। এরপর ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে ভারত ছাড়ো প্রস্তাব পাস হয়। এখানেই তিনি ঘোষণা করেন আন্দোলনের বিখ্যাত মন্ত্র-করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে (Do or Die)।
নেতৃবৃন্দের গ্রেফতারি: ভারত ছাড়ো প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর ৮ আগস্ট মধ্যরাতে গান্ধিজি, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, জওহরলাল নেহরু-সহ অন্যান্য কংগ্রেসি শীর্ষ নেতাদের পুলিশ গ্রেফতার করে। জাতীয় কংগ্রেসকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়।
স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলন: ৯ আগস্ট নেতাদের গ্রেফতারের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে ভারতবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ধর্মঘট, শোভাযাত্রা ও হরতাল পালনের মাধ্যমে ভারতবাসী তাদের প্রতিবাদ জানান।
প্রসার:
(i) ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রথমে বোম্বাই, কলকাতা, দিল্লি, নাগপুর, আহমেদাবাদ, বরোদা, ঢাকা প্রভৃতি শহরে বিস্তার লাভ করে।
(ii) অল্পদিনের মধ্যে এই আন্দোলন শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে জনতা সরকারি টেলিগ্রাফ, রেলপথ প্রভৃতি যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর প্রবল আক্রমণ শুরু করেন। এমনকি থানা, অফিস, আদালতের উপরও তারা আক্রমণ চালান।
(iii) যুক্তপ্রদেশ, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, মহারাষ্ট্রের সাতারা ও বাংলার মেদিনীপুর জেলায় এই আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। এছাড়া ওড়িশা, গুজরাট, আসাম, অস্ত্রপ্রদেশ ইত্যাদি অঞ্চলেও ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রসারিত হয়।
(iv) আগস্ট আন্দোলনে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণি সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ছাত্র তথা যুব সম্প্রদায় স্কুলকলেজ বয়কট করে সভাসমিতি, মিটিং-মিছিল, পথ অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচিতে শামিল হন। দিল্লি, লখনউ, আহমেদাবাদ, কানপুর, নাগপুর, মাদ্রাজ, কলকাতা প্রভৃতি শহরের শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন। আবার আসাম, বাংলা, বিহার, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও মাদ্রাজ অঞ্চলের কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
(v) এই আন্দোলনে নারীসমাজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গোপনে নারীদের সংগঠিত করার কাজে দুই প্রধান সংগঠক ছিলেন অরুণা আসফ আলি ও সুচেতা কৃপালনি। তাছাড়া তমলুকের ৭৩ বছর বয়স্কা ‘গান্ধিবুড়ি’ মাতঙ্গিনী হাজরা, আসামের ১৩ বছরের কনকলতা বড়ুয়া, পাঞ্জাবের গৃহবধূ ভোগেশ্বরী ফুকোননী প্রমুখ এই আন্দোলনে নতুন প্রেরণা সঞ্চার করেছিলেন।
ব্যর্থতা: ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে আগস্ট আন্দোলন বা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্রতা কমতে থাকে। শেষপর্যন্ত এই আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পিছনে ব্রিটিশ সরকারের প্রবল দমনপীড়ন, নেতৃত্ব ও সংগঠনের অভাব, মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা-র মতো দলগুলির আন্দোলনে যোগদান না করা প্রভৃতি বিষয়গুলি দায়ী ছিল।
গুরুত্ব: ভারত ছাড়ো আন্দোলন সফল না হলেও, এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে এটাই ছিল শেষ গুরুত্বপূর্ণ সর্বভারতীয় আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সমগ্র ভারতবাসীর সংগ্রামী চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল। সর্বোপরি এই আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর যে ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল তাতে বিদেশি শাসকবর্গ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতবর্ষে তাঁদের শাসনের মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে।
২। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রামের বর্ণনা দাও। এই সংগ্রাম কী ব্যর্থ হয়েছিল?
অথবা, আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযানের বর্ণনা দাও।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ। আজাদ হিন্দ বাহিনী (Indian National Army or INA)-এর সংগ্রাম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভারতকে ইংরেজদের অধীনতা থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতার স্বপ্নকে সফল করার ক্ষেত্রে এই বাহিনীর সংগ্রাম চিরস্মরণীয়।
আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম/আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান:
‘আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন: প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী রাসবিহারী বসু দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয়দের সংঘবদ্ধ করে জাতীয় সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। এসময় জাপানিদের সমর্থন নিয়ে ব্যাংককে এক সম্মেলনে ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ (Indian Independence League) গঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন রাসবিহারী বসু। রাসবিহারী বসুর উদ্যোগেই ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে আজাদ হিন্দ ফৌজ। এই সেনাদলের তিনটি আদর্শ ছিল- ঐকা (ইত্যাদ), আত্মবিশ্বাস (ইত্তেফাক) ও আত্মোৎসর্গ (কুরবানি)।
‘আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর নেতৃত্ব: ইতিমধে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি থেকে জাপানে এসে পৌঁছান সুভাষচন্দ্র বসু। পরবর্তীকালে সুভাষচন্ত বসুর হাতেই আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয় (২৫ আগস্ট, ১৯৪৩ খ্রি.)। সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্ বাহিনীর পুনর্গঠন করেন। গঠিত হয় ৩টি বাহিনী- আজাদ ব্রিগেড, গান্ধি ব্রিগেড ও নেহরু ব্রিগেড নারীদের নিয়ে গঠিত হয় ঝাঁসির রানি ব্রিগেড সুভাষচন্দ্রের আপত্তি সত্ত্বেও তাঁর অনুগামীদের ইচ্ছানুসারে বাছাই সেনাদের নিয়ে গঠন করা হয় সুভাষ ব্রিগেড।
আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা: আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সুভাষচন্দ্র সিঙ্গাপুরে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ২১ অক্টোবর স্বাধীন ভারতবর্ষের অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান সেনাপতি হন সুভাষচন্দ্র। জার্মানি, ইটালি, জাপান-সহ মোট ৯টি রাষ্ট্র এই অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। জাপান অস্থায়ী সরকারকে সমর্থনের প্রতীক হিসেবে তার অধিকৃত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ আজাদ হিন্দ সরকারকে অর্পণ করে। নেতাজি এগুলির নতুন নামকরণ করেন যথাক্রমে-শহিদ দ্বীপ ও স্বরাজ দ্বীপ। তিনি ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর আন্দামানে উপস্থিত হয়ে সেখানে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
ভারত অভিমানের সূচনাপর্ব: ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে আজাদ হিন্দ সরকার ও সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সদর দফতর স্থাপন (প্রথমটি ছিল সিঙ্গাপুরে) করে সুভাষচন্দ্র ভারত অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। সেনাদলের সামনে তিনি ধ্বনি দেন-দিল্লি চলো।
ইম্ফল ও কোহিমা অভিযান: জাপানি বাহিনীর সহযোগিতায় আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রথমে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি আরাকান দখল করে। মার্চের শেষদিকে ইম্ফল অধিকৃত হয় এবং ১৪ এপ্রিল মণিপুরের মৈরাং দখল করার পর মে মাসের শেষদিকে আজাদ হিন্দ ফৌজ কোহিমা-তে উপস্থিত হয়। শাহনওয়াজ খানের নেতৃত্বে সুভাষ ব্রিগেড, গুলজারা সিং-এর নেতৃত্বে আজাদ ব্রিগেড এবং জামন কিয়ানির নেতৃত্বে গান্ধি ব্রিগেড অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াই চালাতে থাকে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর তীব্র সক্রিয়তা; অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে জাপানের অসহযোগিতা ও চুক্তির শর্তভঙ্গের ঘটনা আজাদ হিন্দ ফৌজের মনোবলে ভাঙন ধরিয়ে দিয়েছিল। অস্ত্র ও রসদের অভাব, প্রবল বর্ষণ ও রোগের প্রাদুর্ভাব বাহিনীকে সংকটাপন্ন করে তোলে। ফলে ইম্ফল-কোহিমা ফ্রন্টে বীরত্বপূর্ণ লড়াই-এর পরও আজাদ হিন্দ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
যুদ্ধের অবসান: শেষপর্যন্ত ব্রিটিশবাহিনী তীব্র আক্রমণ চালিয়ে রেঙ্গুন দখল করে নেয়। নেতাজির বিশ্বস্ত অনুচর শাহনওয়াজ খান, জি এস ধিলন প্রমুখ গ্রেফতার হন। নিরাপত্তার কারণে সুভাষচন্দ্রকে ব্যাংককে চলে যেতে হয়। এইসময় বিশ্বযুদ্ধের গতি দ্রুত মিত্রপক্ষের অনুকূলে চলে যায়। ১৯৪৫-এর মে মাসে জার্মানি এবং আগস্ট মাসে জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অতঃপর বিদেশি সাহায্যের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সহকর্মীদের একান্ত অনুরোধে সুভাষচন্দ্র বসু হাবিবুর রহমানের সঙ্গে সায়গন থেকে জাপানি বিমানে চেপে টোকিও অভিমুখে রওনা হতে বাধ্য হন। কিন্তু তাইহোকু বন্দরে বিমানটি আকস্মিক আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় (১৮ আগস্ট, ১৯৪৫ খ্রি.)। কথিত আছে যে, এই দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্রের জীবনাবসান ঘটেছে। তবে তাঁর জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে এখনও অস্পষ্টতা ও প্রবল বিতর্ক আছে।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্যর্থতা: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ বীরবিক্রমে লড়াই করলেও, শেষপর্যন্ত অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারেনি।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে বিভিন্ন বিবদমান পক্ষগুলির অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এই বাহিনী সফল হতে চেয়েছিল, তাই পরবর্তীকালে ঘটনাক্রমের পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করতে তারা ব্যর্থ হয়।
- এই বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ঘটলে আজাদ হিন্দ বাহিনী তাদের আর্থসামরিক সাহায্য লাভ থেকে বঞ্চিত হয়।
- দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে বর্ষার সময় অভিযান চালানোয় এই ফৌজ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ, শীত ও পার্বত্য অঞ্চলের বিষাক্ত পোকার আক্রমণে বহু সৈন্য মারা গেলে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য, রসদ ও সাজসরঞ্জামের অভাবে বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে।
- এ ছাড়া জাপানি সেনাপতিদের সঙ্গে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাপ্রধানদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভারতের জাতীয় নেতৃবৃন্দের অসহযোগিতা প্রভৃতি কারণেও আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রাম ব্যর্থ হয়।
৩। ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধিজির ক্যারিশমা সম্পর্কে লেখো।
মহাত্মা গান্ধি (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রি.) ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। ভারতীয় জনমানসে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিশমা এমন ছিল যে, তিনি কেবল ভারতের জাতীয় আন্দোলনের নেতা নন, বরং সমগ্র জাতিকে একত্রিত করার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ক্যারিশমা (Charishma) শব্দটি একটি ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা অর্থ হল ব্যক্তিগত আকর্ষণ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, চুম্বকীয় আকর্ষণ বা অলৌকিক ক্ষমতা। ক্যারিশমা সাধারণত একজন ব্যক্তির মধ্যে থাকা একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যা অন্যদের আকৃষ্ট করে বা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
গান্ধিজি / মহাত্মা গান্ধির ক্যারিশমা বা জনপ্রিয়তার কারণ:
(i) গান্ধীজির সহজ সরল জীবনমাত্রা: প্রাক্-গান্ধি পর্বের রাজনীতিবিদদের বিলিতি ও মহার্ঘ্য পোশাক, শহুরে আদবকায়দা ভারতের গ্রামীণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে অন্তরের যোগ স্থাপন করতে পারেনি। কিন্তু গান্ধিজি-র সহজ-সরল জীবনধারা তাঁকে অন্যান্য রাজনীতিবিদদের থেকে আলাদা করেছিল। তাঁর ধর্মপরায়ণতা, নৈতিকতা, অনাড়ম্বর জীবনদর্শন সাধারণ মানুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। হাঁটুর ওপরে পরা চরকায় বোনা ধুতি ও চাদর পরিহিত গান্ধিজিকে সাধারণ মানুষ গ্রামীণ কৃষকসমাজের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বলে বরণ করে নিয়েছিলেন।
(ii) ধর্মীয় প্রতীক ও বাণীর ব্যবহার: গান্ধিজি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় প্রতীক ও বাণী দ্বারা অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। যেমন- আদর্শ রাষ্ট্র বলতে তিনি রামরাজ্য এর কথা বলেছেন। আর এর বিপরীতে ব্রিটিশ শাসনকে তিনি বলেছেন রাবণরাজ বা শয়তানের রাজত্ব, যার পরিবর্তে তিনি ঈশ্বরের বা ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। অন্যদিকে, তিনি মুসলমানদের কাছে খুদা-ই-রাজ বা খ্রিস্টানদের কাছে কিংডম অফ গড (Kingdom of God)-এর কথা বলে প্রতিটি সম্প্রদায়ের আপন মানুষ হয়ে উঠতে সক্ষম হন।
(iii) নতুন ধারার আন্দোলন: গান্ধিজির নৈতিকতা, অহিংসা, সত্যবাদিতা এবং সেবার আদর্শ ভারতীয়দের মনে গভীর রেখাপাত করে। গান্ধিজির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন তাই কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তিনি শুধু আন্দোলনের নেতা হিসেবে নন, তার চেয়ে বেশি একজন নৈতিক পথপ্রদর্শকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনগুলিতে অহিংস সত্যাগ্রহ আদর্শের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে, অহিংস উপায়ে আন্দোলন পরিচালনার এই পদ্ধতি বহু মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর নেতৃত্বে এই আন্দোলনগুলিতে – শামিল হন নারী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-সহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ।
(iv) সমাজকল্যাণ: গান্ধিজি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতা। তিনি শুধুমাত্র ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করেননি, এর পাশাপাশি তিনি কাজ করেছেন একটি ন্যায়সঙ্গত ও সাম্যবাদী সমাজ গড়ার লক্ষ্যে। তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী অধিকার, শিক্ষার প্রসার, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ প্রভৃতি বিষয়গুলিকেও আন্তরিকভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
গান্ধিজির ক্যারিশমা বা জনপ্রিয়তার প্রভাব:
(i) জাতীয় ঐক্য ও চেতনার বিকাশ: গান্ধিজির জনপ্রিয়তার জন্য তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনগুলিতে হিন্দু-মুসলমান, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। ফলে ভারতবাসীর মধ্যে ঐক্যভাব ও জাতীয়তাবাদী চেতনার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
(ii) গ্রামীণ সমাজের রাজনৈতিক জাগরণ: গান্ধিজি গ্রামের সাধারণ মানুষকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। গ্রামীণ শিল্পের উন্নয়ন ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে গ্রামকে আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন তিনি।
(iii) বিশ্বব্যাপী অনুপ্রেরণা: মহাত্মা গান্ধির আন্দোলনের আদর্শ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ও নেলসন ম্যান্ডেলা-এর মতো ব্যক্তিরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির ক্যারিশমা তাঁকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণপুরুষে পরিণত করেছিল। তাঁর চরিত্র, আদর্শ, আত্মত্যাগ, ও নৈতিকতার প্রভাব এতটাই গভীর ছিল, যে তা আজও ভারতবাসীর হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
৪। ভারতীয় রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র বসুর ক্যারিশমা সম্পর্কে লেখো।
সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে একজন আপোসহীন যোদ্ধা। জাতীয় কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক ও নেতা হিসেবে সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর সামরিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে আই সি এস (ICS) পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান লাভ করার পরও ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকুরি না নিয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে যোগদান করেন। তাঁর দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে তাঁকে এক বিশিষ্ট স্থান প্রদান করেছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ক্যারিশমা বা জনপ্রিয়তার কারণ:
(i) সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ: সুভাষচন্দ্র বসু সমাজতন্ত্রবাদ বা গান্ধিবাদের সঙ্গে পরিচিত হলেও, এদের তাত্ত্বিক শুদ্ধতা রক্ষার দায় তিনি গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে বিশেষ জরুরি ছিল ভারতের স্বাধীনতা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল কূটনৈতিক বিন্যাসের মধ্যে তিনি স্বাধীনতার স্বপ্নকে রূপায়িত করতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের জন্য আত্মত্যাগ ভারতবাসীর কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ।
(ii) রাজনৈতিক দিক: কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক, দলীয় সভাপতি, কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুভাষচন্দ্র বসুর ভূমিকা সম্পর্কে কোনও সংশয়ের অবকাশ নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কংগ্রেসের হরিপুরা অধিবেশনে (১৯৩৮ খ্রি.) তিনি কংগ্রেস সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের ত্রিপুরি অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে গান্ধিজি সমর্থিত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করেন। ফলে গান্ধিজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তিনি কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর বামপন্থী রাজনীতিকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ মে তিনি ফরয়ার্ড ব্লক নামে একটি দল গঠন করেন।
(iii) সংগ্রামে যোগদান: জাতীয় কংগ্রেস ও গান্ধিজির অহিংস গণ আন্দোলনের প্রতি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রাথমিকভাবে আস্থা ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সাম্রাজ্যবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার অনমনীয় মনোভাব তাঁকে আশাহত করে। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তিনি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ছদ্মবেশে আফগানিস্থান, রাশিয়া হয়ে জার্মানিতে পৌঁছান। শেষ বিকল্প হিসেবে বিদেশি শক্তির সাহায্যে সামরিক যুদ্ধের পথ বেছে নেন। জাপানের সহায়তায় ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে পুনর্গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। এই কাজের ঝুঁকি ও বিপদ তাঁর অজানা ছিল না, কিন্তু ভারতমাতার স্বাধীনতার জন্য নিবেদিতপ্রাণ সুভাষচন্দ্র সেই জীবন-মৃত্যুর পথ গ্রহণ করে অভূতপূর্ব ইতিহাস তৈরি করেন।
(iv) সামরিক নেতা: সুভাষচন্দ্র বসুর যে প্রতিচ্ছবি সমগ্র ভারতবাসীর মনে সদা-জাগরুক, তা হল সামরিক পোশাকে সজ্জিত সেনাপতি সুভাষচন্দ্র। তাঁর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের ভারত অভিযানে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি ডাক দেন-দিল্লি চলো। আর সাধারণ ভারতবাসীর উদ্দেশে বলেন-তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব (Give me blood and I promise you freedom)
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ক্যারিশমা বা জনপ্রিয়তার প্রভাব:
(i) সশস্ত্র সংগ্রামে প্রেরণা: সুভাষচন্দ্র বসুর জনপ্রিয়তা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে এক সাহসী ও আক্রমণাত্মক ধারার জন্ম দেয়। তাঁর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম সাধারণ ভারতবাসীর মনে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি আস্থা জাগিয়েছিল।
(ii) জাতীয় ঐক্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসার: সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজ ছিল সাম্প্রদায়িক চেতনা বিমুক্ত। শাহনওয়াজ খান, গুরবক্স সিং ধিলন, প্রেমকুমার সেহগল প্রমুখ সুযোগ্য সেনাধ্যক্ষের উপস্থিতি ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা বহন করেছিল।
(iii) আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের সংগ্রামকে গুরুত্বদান : নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্রিটিশবিরোধী অক্ষশক্তিভুক্ত দেশ জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি রাসবিহারী বসুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা আজাদ হিন্দ বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছিলেন। এরপর তিনি আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করলে জাপান, জার্মানি, ইটালি-সহ মোট নয়টি রাষ্ট্র এই অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।
সর্বোপরি বলা যায়, সুভাষচন্দ্র বসুর ক্যারিশমা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা, দূরদর্শিতা, আত্মত্যাগ ও জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার সমন্বয়। হয়তো তিনি তাঁর লক্ষ্যপূরণে পুরোপুরি সফল হতে পারেননি, কিন্তু তবুও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর উজ্জ্বল ভূমিকা আজও তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
৫। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নৌবিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
অথবা, নৌবিদ্রোহের প্রেক্ষাপট আলোচনা করো। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই বিদ্রোহের কী ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল?
ভারতের স্বাধীনতা অন্দোলনের ইতিহাসে সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সংগ্রাম হল ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ভারতীয় নৌবাহিনীর বিদ্রোহ। ড. সুমিত সরকার এই বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বীরোচিত বলে অভিহিত করেছেন।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নৌবিদ্রোহের কারণ:
(i) আজাদ হিন্দ সেনাদের বিচার: আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীদের বিচারকে কেন্দ্র করে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি রীতিমতো অশান্ত হয়ে উঠেছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর দৃষ্টান্তে প্রভাবিত হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং বিদ্রোহের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
(ii) নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ: ইতিপূর্বে ভারতীয় নৌ-সেনাদের নিম্নমানের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করা হত। ফলে এদেশীয় নৌবাহিনীর কর্মী ও অফিসারদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই বিক্ষোভ দানা বাধছিল।
(iii) জাতিবিদ্বেষ: ইংরেজ নৌ-সেনা অফিসারগণ এদেশীয় নাবিকদের অকারণে অকথ্য গালিগালাজ ও অপমান করতেন। ব্রিটিশ অফিসারদের এহেন জাতিবিদ্বেষমূলক মনোভাব তথা ভারতবিরোধী আচরণে অসন্তুষ্ট ভারতীয় নাবিকদের সহ্যসীমা অতিক্রম করেছিল।
(iv) বেতন বৈষম্য: কোনও কাজে নিযুক্ত ভারতীয় নাবিকরা যে পরিমাণ বেতন ও সুযোগসুবিধা পেতেন, সেই একই কাজে বা পদে নিযুক্ত থেকে ইংরেজ নাবিকরা ভারতীয়দের তুলনায় অনেক বেশি বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা লাভ করতেন।
(v) পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য: একই পদে চাকুরি ও সমযোগ্যতাসম্পন্ন ইংরেজ নাবিকদের চাকুরিক্ষেত্রে পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় নাবিক ও নৌ-সেনারা তা থেকে বঞ্চিত হতেন।
(vi) সেনাদের বরখাস্ত করা: ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর ভারতীয়কে নৌবাহিনীতে নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধশেষে অতিরিক্ত সেনার প্রয়োজন না থাকায় বহু সেনাকে চাকুরি থেকে সরকার বরখাস্ত করে। এর ফলে নৌবাহিনীতে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
নৌবিদ্রোহের গুরুত্ব বা তাৎপর্ষ:
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় নৌ-সেনাদের বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথা পন্ডিতগণ ভারতের তৎকালীন পরিস্থিতিতে সংঘটিত নৌবিদ্রোহের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। ড. সুমিত সরকার নৌ-সেনাদের অভ্যুত্থানকে আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
(i) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: নৌবিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলিম সেনাগণ একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা ও পরিচালনা করেন। পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এই বিদ্রোহে যোগ দিলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। মতি মি
(ii) ব্রিটিশ শাসনের অবসানের ইঙ্গিত: নৌ-সেনাদের বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসানের ইঙ্গিতস্বরূপ। কারণ-এই বিদ্রোহের পর ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতীয় সেনাদের উপর নির্ভর করে আর ভারতে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়।
(iii) ভারত ত্যাগের ভাবনা: অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, নৌবিদ্রোহের প্রভাবে সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেকার দূরত্ব বা ব্যবধান কমে যায়। ভারতে আবারও উভয়ের সমন্বয়ে এমন এক বিদ্রোহ শুরু হলে তার ভয়াবহ পরিণামের কথা আঁচ করেই ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের ভাবনা ভাবতে শুরু করেন।
(iv) মন্ত্রী মিশনের আগমন: ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্তের মতে, নৌবিদ্রোহের ফলে আতঙ্কিত হয়ে ইংরেজ সরকার শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের সঙ্গে আলোচনা করতে মন্ত্রী মিশনকে ভারতে পাঠায়। ১৮ ফেব্রুয়ারি নৌবিদ্রোহ শুরু হয় এবং পরের দিন ভারতে মন্ত্রী মিশন পাঠানোর কথা সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, নৌবিদ্রোহের পরই ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতালাভপ্রায় আসন্ন। আর তাই ইতিহাসবিদ রজনীপাম দত্ত নৌ-সেনাদের বিদ্রোহকে ভারত ইতিহাসের বিশেষ নির্দেশিকা ও নবযুগের সংকেত বলে উল্লেখ করেছেন।
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ সেমিস্টার সব অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর