প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা

প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা | Prodotto onuccheder vittite probondho rochona | Class 12 Bengali 4th Semester

প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা
প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা লেখার নিয়ম

কোনো একটি বিষয়ে কোনো একজন লেখকের লেখার একটি অংশ দেওয়া থাকবে। প্রদত্ত অনুচ্ছেদটি হল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা। এই প্রস্তাবনা বা ভূমিকাটিকে অবলম্বন করে পরীক্ষার্থী বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করবে এবং পরিণতি মান করবে।

এই ধরনের প্রবন্ধ লেখার আগে যে বিষয়গুলি মনে রাখতে হবে-

  • প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত অনুচ্ছেদটিকে মূল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা হিসেবে গ্রহণ করে পরবর্তী অংশে সেই ভাবটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।
  • প্রবন্ধ রচনার সময়ে মূল লেখাটি যে গ্রন্থের অন্তর্গত, তা পড়া না থাকলেও অসুবিধা নেই।
  • প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ব্যবহার করা যাবে।
  • প্রবন্ধের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যেন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রূপরেখাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
  • সমাজ-সমস্যামূলক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিকারের পথগুলিও উল্লেখ করতে হবে।
  • প্রবন্ধের শব্দসীমার প্রতি অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।

১। [বিগত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধে এবং সেইসঙ্গে শিল্প বিপ্লবের কল্যাণে মানবজীবনে নানা উন্নতি সত্ত্বেও আমাদের শান্তি অনেকখানি বিঘ্নিত হয়েছে। তাই কবিকে আক্ষেপের সুরে বলতে হয়েছে ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও হে নগর।’ স্বার্থের সংঘাত, লোভের অপরিমিত স্বভাব, ভ্রাতৃদ্বন্দু, অনৈক্যের চোরাবালি, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ ভারতের সমস্যাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যার জন্য দেখা দিয়েছে আয় ও সম্পদের দেশে বৈষম্য। এই বৈষম্যের ফলে দেখা দিয়েছে দারিদ্র্য। দারিদ্র্য দ্বারা যেমন বিঘ্নিত হয়েছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য, তেমনি নষ্ট হয়েছে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে বর্তমানে যে পরিবেশের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তাতে পৃথিবীর মানুষ বিপন্নতায় আক্রান্ত। তাই তার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও প্রকট হয়ে উঠেছে।]

পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ : প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার বিস্তারে মানুষ ক্রমশ প্রকৃতির উপর তার আধিপত্য কায়েম করেছে। মানুষ তার নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধানে ক্রমশ প্রকৃতির স্বাভাবিকত্বের উপর হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে অরণ্যনিধন বেড়েছে। প্রথমে চাষবাসের জন্য, পরবর্তীকালে নগরায়ণ ও শিল্পাঞ্চলের জন্য ব্যাপক বৃক্ষনিধন ঘটেছে। তাই মানুষের আবির্ভাবলগ্নে পৃথিবীর স্থলভাগের সবটুকু অরণ্য থাকলেও এখন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অরণ্যটুকুও নেই। সুস্থভাবে বাঁচার জন্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন ৩৩-৩৫ শতাংশ বনভূমি। সেখানে পৃথিবীতে ও ভারতে বর্তমান বনভূমির হার যথাক্রমে ৩০ শতাংশ ও ২৩-১ শতাংশ। প্রয়োজনীয় বনভূমি না থাকার ফলে কমছে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ, বাড়ছে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ। বায়ুদূষণের ফলে বাড়ছে তাপমাত্রা। অনাবৃষ্টির ফলে প্রভাব পড়ছে কৃষিকাজে, কমছে ভূগর্ভস্থ জল। ভূমিক্ষয় রোধ না হওয়ার জন্য বাড়ছে বন্যা। অবলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার পশুপাখি।

কারণ সুদীর্ঘকাল যাবৎ যান্ত্রিক প্রগতির অতি দানবীয় পদচারণায় বিশ্ব পরিণত হয়েছে ‘যক্ষপুরী’তে, সম্পদ পুঞ্জিত করাই যার একমাত্র লক্ষ্য। তাতে পৃথিবীর ‘আদিপ্রাণ’ গাছ-ই হয়েছে মানবজাতির মুখের গ্রাস। ফলে ধরিত্রী মা আজ ব্যথিত হৃদয়ে শরশয্যায় শায়িতা। তবে মানবসন্তানের সভ্যতার দম্ভ ও সম্পদ লালসার মধ্যেই যে বিশ্ব তথা তাদেরই সর্বনাশের বীজ লুকিয়ে, তারা তা বুঝতে পারেনি। বিনাশের অন্তিম লগ্নে উপস্থিত হয়ে তাই মানুষ আবার সবুজের উপাসনায় ব্রতী হয়েছে।

আসলে প্রকৃতির মধ্যে বাস করে অরণ্য নিধনের ফলে বিশ্ব আজ উন্নায়ন, দূষণ ও মারণব্যাধিতে আক্রান্ত। ‘Development’ বা ‘Progress’-এর নামেই এই ভোগ চরিতার্থের মাত্রা নির্ণীত হয়ে চলেছে। চলেছে সীমিত সম্পদ বাড়িয়ে তোলার রূঢ় আয়োজন। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য হচ্ছে বিঘ্নিত; প্রকৃতি হয়ে চলেছে লাঞ্ছিত। ভোগের উন্মত্ত তাণ্ডবে, সভ্যতার গগনস্পর্শী দম্ভে প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণীকুলকে উপেক্ষা করেই মানুষ পরিবেশের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ভোগলিঙ্গু মানুষ প্রকৃতির সম্পদ যথেচ্ছভাবে হরণ করতে প্রস্তুত। আর এই বস্তুবাদী ভোগে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন মানুষ এমনই আচ্ছন্ন যে মানবিক বোধটুকু পর্যন্ত হারাতে বসেছে। সবুজহীন মানবমনে সন্দেহ-ঘৃণা-ক্ষোভগ্রিন হাউস প্রভাবের মতোই ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। প্রকৃতির কোমলতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই মানবজীবনে নেমে এসেছে এমন যন্ত্রণাময় কঠোর দুর্ভোগ। অরণ্যঘাতক মানুষ বুঝেছে তারা মরুদানবের গ্রাসের মুখোমুখি। শুধু পার্থিব মৃত্যু নয়, আত্মিক মৃত্যুভাবনাতেও মানুষ আজ ক্লান্ত। কিন্তু সব ক্লান্তি কাটিয়ে তাকেই খুঁজতে হয়েছে উত্তরণের পথ; সেখানেও কবিগুরুর বাণী হয়েছে অক্ষয় প্রেরণা-“মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ/ধূলিরে ধন্য কর করুণার পুণ্যে হে কোমলপ্রাণ।” এই সংগীত কণ্ঠে নিয়ে আবার মানুষই নব-অরণ্য সৃজনের প্রয়াসী হয়েছে। এই আকুলতায় বনমহোৎসব পালন শুরু হয়েছে ১৯৫০ সাল থেকে। শুরু হয়েছে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। যা মানুষকে ‘প্রথম যুগের বচন’ শুনিয়ে বলতে চেয়েছে গাছ-ই সকল প্রাণের উৎস, তার মধ্যেই আছে অফুরান জীবন। বনসৃজনের এই উদ্যোগকে বাস্তবে সার্থক করে তোলার মধ্যেই আছে বসুন্ধরার আয়ু বৃদ্ধির সম্ভাবনা।

প্রকৃতির দূষণের মধ্যে বাস করে, গ্রিন হাউসের সন্ত্রাসে আক্রান্ত হয়ে, বিপন্নতার হাতে বলি হতে হতে আজ আমরা প্রকৃত বন্ধুকে চিনতে পেরেছি। আমরা বুঝতে পেরেছি গাছ আছে, তাই আমি আছি। সবুজশূন্য পৃথিবী মৃত্যু উপত্যকা, প্রাণের সেখানে শুধুই পরাজয়।

সবশেষে বলা যায়, যে তথাকথিত সভ্যতার অহংকারে আমরা নির্বিচারে সবুজ ধ্বংস করেছি-তাতে আমরা হয়তো পেয়েছি সাময়িক আরাম, ভোগ-সুখ; কিন্তু পাইনি শান্তি, আনন্দ, মুক্তি। তাই আজ আর করুণা প্রার্থনা নয়, মানবের প্রত্যয়ী কণ্ঠে ঘোষিত হোক- “ফিরিব তোমারে ঘিরি, কবির বিরাজ/তোমার আত্মীয় মাঝে, কীট পশুপাখি/তবু গুল্ম লতারূপে বারম্বার ডাকি/ আমারে লইবে তব প্রাণতপ্ত বুকে।” ‘বসুন্ধরার প্রতি’ এই অঙ্গীকারই হয়ে উঠুক আমাদের জীবনের মহামন্ত্র। আর এই প্রাণধর্মী, মননধর্মী ভাষাই হোক বিশ্বমানবের হৃদয়ের ভাষা।

২। [নিত্যনতুন আবিষ্কার আর প্রচণ্ড গতিকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ যে অপরিমেয় ভোগ ও স্বাচ্ছন্দ্যের পথে চলেছে, সেই সার্বিক অগ্রগতির পথে বর্তমানে নানা সংকটময় পরিস্থিতি উপস্থিত। এর মধ্যে ভয়ংকর সংকটটি হল বিশ্ব উন্নায়ন (Global Warming)। পৃথিবীর আবহাওয়া উয় থেকে উন্নতর হওয়ার ফলে সমস্ত গ্লেসিয়ার ও চির-তুহিন মেরু অঞ্চলের সাম্রাজ্য দ্রুত হারে গলছে, মরুভূমি অঞ্চলগুলির পরিধি বাড়ছে। বহু জলচর ও স্থলচর প্রাণী ইতিমধ্যে অবলুপ্ত বা বিলুপ্তির পথে। আত্মসচেতনতা বাড়িয়ে পৃথিবীর প্রাণকে রক্ষা করাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো কর্তব্য।]

বিশ্ব উষ্ণায়ন : প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

'একটা পৃথিবী চাই 
মায়ের আঁচলের মতো 
আর যেন ওই আঁচল জুড়ে 
গান থাকে 
যখন শিশুদের ঘুম পায়।'

-বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবী জন্মমুহূর্তে ছিল এক উয় আগ্নেয়পিণ্ড। ধীরে ধীরে তা শীতল হয়ে বাসযোগ্য পৃথিবী হয়ে উঠেছে। একবিংশ শতকের প্রথম দশকে এসে মানুষ নিত্যনতুন আবিষ্কার আর প্রচণ্ড গতিকে সঙ্গে নিয়ে ভোগ, স্বাচ্ছন্দ্যের পথে এগিয়ে চলেছে। বিজ্ঞানের জয়রথ চড়ে গ্রহান্তরে এঁকে দিয়েছে পদচিহ্ন। কিন্তু সভ্যতার এই সমুদ্রমন্থনে উঠেছে পরিবেশদূষণরূপী কালকূট বিষও। ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। গ্লোবাল ওয়ার্মিং জীবনের মৃত্যুঘণ্টা হয়ে বেজে চলেছে অহরহ। তাই আত্মসচেতনতা বাড়িয়ে প্রাণকে রক্ষা করাই আমাদের মূল্য কর্তব্য।

ভূভাগ ক্রমাগত দূষিত হতে থাকায় বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসগুলি (CO, CH, CFC, N₂O, NO2, CO, SO2, NO প্রভৃতি) মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিষাক্ত গ্যাসগুলি ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপের কিছু অংশ শোষণ করে নিয়ে বায়ুমণ্ডলের গড় উন্নতা বৃদ্ধি করে চলেছে। উন্নতার এই বৃদ্ধিকেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উন্নায়ন বলে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ভোগবিলাসিতা অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি। আমরা বর্তমান পরিবেশ, পরিবার ও কাজকর্মের পরিসরকে নতুনভাবে দেখতে শিখেছি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাপনের পদ্ধতিতেও তাই রূপান্তর এসেছে। ফল স্বরূপ প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য মূলত দায়ী করেছেন গ্রিন হাউস গ্যাসগুলিকে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়-শিল্পবিপ্লবের সাতশো বছর আগে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ২৪০ পিপিএম। ২০৫০ সালে এর পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৪৫০ পিপিএম। অতিরিক্ত যানবাহন, কলকারখানার ধোঁয়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত

যন্ত্রের ব্যবহার, জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, পারমাণবিক বিস্ফোরণ, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ-এসবের ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোনস্তরে ছিদ্রের সৃষ্টি হচ্ছে এবং চির-বরফাবৃত মেরু অঞ্চলের সাম্রাজ্য দ্রুতহারে গলছে, মরুভূমি অঞ্চলগুলির পরিধি বাড়ছে। জলচর প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটছে।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বসুন্ধরা শীর্ষ সম্মেলন। ২০০২ সালে জোহানেসবার্গেও একই উদ্দেশ্যে সম্মেলন হয়। ২০০৪ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশ্বের ১৫৬টি দেশ অংশগ্রহণ করে। ২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বালিতে গ্রিন হাউস গ্যাস রোধের জন্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও পশ্চিমি উন্নত দেশগুলির অসহযোগিতায় বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তবে এ ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকের সদিচ্ছা দরকার। প্রথমে দরকার বন সংরক্ষণ। যথাসম্ভব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার কমাতে হবে। এল ই ডি আলোর ব্যবহার অতি জরুরি। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ঘটবে। সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পরিবেশবান্ধব হয়ে বিশ্ব উন্নায়ন রোধ করার কাজে ছাত্রসমাজকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ জরুরি।

আধুনিক বিশ্বের অগ্নিগর্ভ সমস্যা হল বিশ্ব উন্নায়ন। ভোগবাদের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। মিষ্টি জলের অভাব দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হচ্ছে। একশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথ নাগরিক জীবনের যন্ত্রণায় আর্ত হয়ে লিখেছিলেন-‘দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর।’ কিন্তু ভোগবাদী মানুষের অর্থনৈতিক লোভলালসা বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে প্রকৃতির উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে বৃক্ষ পরিবেষ্টিত শ্যামল ধরিত্রীই কাম্য-সেখানে আমরা আত্মসচেতন হওয়ার পরিবর্তে স্বার্থসিদ্ধির লোভে নিজেদের সর্বনাশসাধনে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে উঠেছি।

৩। [অঙ্গার সম্পদ কিংবা মাটির তেল হল প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু সম্পদের সঞ্চয় ভাণ্ডার হতে যা খরচ হয়, তার প্রতিপূরণ হচ্ছে না। যে অবস্থায় এইসব সম্পদ সঞ্চয় সম্ভব হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তারও হয়েছে আমূল পরিবর্তন। মনুষ্য সমাজের নিত্য বর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত জ্বালানি জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। তাই মানুষ ছুটছে নতুন কয়লাখনির সন্ধানে, নতুন তেলের উৎস মাটির বাইরে আনতে।]

অদূর ভবিষ্যতে জ্বালানি সমস্যা : প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশে চলছে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকট। অঙ্গার বা কয়লা কিংবা মাটির নীচের খনিজ তেলই মানবসভ্যতার অগ্রগমনের কেন্দ্রবিন্দু। আধুনিক মানুষের তাবৎ সুখস্বাচ্ছন্দ্য, সমৃদ্ধি-সমুন্নতির মূলে জ্বালানির অবদান অতুলনীয়। অথচ তা অঙ্গার ও খনিজ তেলের ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে অপ্রতুল হতে বসেছে। আর তাই ভাবী জ্বালানি সংকটের দুশ্চিন্তা সংশ্লিষ্ট মহলকে ভাবিয়ে তুলছে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা বিকল্প শক্তি-উৎসের সন্ধানে নিরলস গবেষণায় নিয়োজিত।

জ্বালানি এমন একটি জিনিস, যার সৃষ্টি করা যায় না। আজ পর্যন্ত যে কয়েক প্রকার জ্বালানি মানুষের করায়ত্ত হয়েছে, তা সম্ভব হয়েছে জড়পদার্থকে নির্দিষ্ট পদার্থতে রূপান্তরিত করার কলাকৌশলের মাধ্যমে। জ্বালানি বহুবিধ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অঙ্গার বা কয়লা, পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস।

এই জ্বালানি সংকটের পিছনে কারণ কী?- এর কারণ মূলত পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা। এই বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানির চাহিদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অঙ্গার বা কয়লা হল প্রধান জ্বালানির উৎস। শিল্প কলকারখানায়, পরিবহণে, রান্নার কাজে প্রচুর পরিমাণে এই অঙ্গার বা কয়লা ব্যবহৃত হয়। এই উদ্দেশ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার টন কয়লা পুড়ে প্রকৃতির ভান্ডার ক্রমশ রিক্ত নিঃস্ব করে তুলছে। এভাবে ব্যবহৃত হতে থাকলে কয়েক দশক পরেই কয়লা হয়ে পড়বে অতীত ইতিহাসের বস্তু। কারণ ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কয়লা সৃষ্টির ক্ষমতা মানুষের নেই। আর একইভাবে নিঃশেষিত হচ্ছে- পেট্রোলিয়াম-সহ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। ফলে এদের সঞ্চয় ভান্ডার ক্রমাগত নিঃশেষ হয়ে পড়ায় জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে।

জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশ্বজুড়ে চলছে বিকল্প শক্তির সন্ধান। আর এ নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করে চোদ্দোটি বিকল্প শক্তির উৎসের কথা বলেছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি, পরমাণু শক্তি, জোয়ারভাটা থেকে প্রাপ্ত শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, সাগরের তাপীয় শক্তি, গোবর গ্যাস প্রভৃতি। কিন্তু ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের পক্ষে ভূ-তাপীয় শক্তি, পরমাণু শক্তি, তরঙ্গ শক্তি, জোয়ারভাটা থেকে প্রাপ্ত শক্তির উৎসগুলি থেকে শক্তি সৃষ্টি সম্ভবপর নয়, কারণ তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি, জ্বালানি কোষ, গোবর গ্যাস প্রভৃতি শক্তি উৎসগুলি অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়সাধ্য। এগুলির উপর দৃষ্টিনিবদ্ধ করলে আমাদের দেশ উপকৃত হবে।

পৃথিবীতে যত বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, তার শতকরা ৬০ ভাগ হল তাপবিদ্যুৎ এবং তাপবিদ্যুতের উৎস হল অঙ্গার বা কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি। অবশিষ্ট শতকরা ৪০ ভাগ ব্যবহৃত বিদ্যুতের উৎস হল জল, সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি প্রভৃতি। ভারতের সোলার মেশিন আশা প্রকাশ করেছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ২১,০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ ভারতে উৎপাদিত হবে, সেই উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হল ১,৩০০ মেগাওয়াট। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মাত্র ১ কেজি ডয়টেরিয়াম থেকে পাওয়া যেতে পারে ৩০ লক্ষ কেজি কয়লার সমতুল্য শক্তি।

বর্তমানে জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষকে সচেতন হতে হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গেলে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। কথায় বলে প্রয়োজনের তাগিদই আবিষ্কারের দ্বার খুলে দেয়, তাই বর্তমানে প্রচলিত শক্তি-উৎসগুলির ক্ষীয়মাণ সংকোচন নতুন নতুন উৎস সন্ধানে মানুষকে প্রয়াসী হতে বাধ্য করছে।

8। [বীজের উপর এক কঠিন ঢাকনা; তাহার মধ্যে বৃক্ষশিশু নিরাপদে নিদ্রা যায়। বীজের আকার নানাপ্রকার, কোনোটি অতি ছোটো, কোনোটি বড়ো। বীজ দেখিয়া গাছ কত বড়ো হইবে বলা যায় না। অতি প্রকাণ্ড বটগাছ, সরিষা অপেক্ষা ছোটো বীজ হইতে জন্মে। কে মনে করিতে পারে এত বড় গাছটা এই ক্ষুদ্র সরিষার মধ্যে লুকাইয়া আছে? তোমরা হয়তো কৃষকদিগকে ধানের বীজ ক্ষেতে ছড়াইতে দেখিয়াছ। কিন্তু যত গাছপালা, বনজঙ্গল দেখো, তাহার অনেকের বীজ মানুষ ছড়ায় নাই।]

গাছের কথা : প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে বৃক্ষপ্রাণ শ্যামল স্নিগ্ধ করে রেখেছে এই ধরিত্রীকে। অরণ্যের প্রাণেই জীবজগতের প্রাণ। বর্ণে-গন্ধে-পুষ্পে-পত্রে গাছই জগদ্ধাত্রী। মানুষ শুরু থেকেই পেয়েছে বৃক্ষের পরম আশ্রয়। বৃক্ষবীজ যেন জাগতিক প্রাণশক্তিরই প্রতীক। প্রত্যেক বীজ থেকে গাছ হয়তো জন্মায় না, কিন্তু বীজের ভিতর থাকে ভবিষ্যৎ উদ্ভিদের সম্ভাবনা। আর বীজ যখনই সবুজ পাতায় মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন সে শোনে শিকড়ে তার অরণ্যের বিশাল চেতনা।

মানুষের জীবন, প্রকৃতির ভারসাম্য সবকিছুর মূলেই আছে এই গাছের ভূমিকা। বৃক্ষ-পত্র-পুষ্প-কাণ্ড-মূল-এই সকলই ব্যাবহারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আরণ্যক ঋষিরা তাই মন্ত্রোচ্চারণে বৃক্ষবন্দনা করতেন। বৃক্ষের শ্যামলিমা দ্বারা রুক্ষতাকে ঢেকে দিতে রবীন্দ্রনাথও তাই পালন করেছিলেন হলকর্ষণ, বর্ষামঙ্গল। প্রার্থনা জানিয়েছিলেন-

"এসো শ্যামল সুন্দর
আন তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা..."

পৃথিবীর আদিপ্রাণ এই বৃক্ষ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছায়া। একান্ত নিভৃত বীজ থেকে ক্রমে ক্রমে সে কিশলয়, সবল কাণ্ড-পুষ্প-পত্র-ফলশোভিত বনস্পতিতে রূপান্তরিত হয়। আবার পাতাঝরা বৃক্ষ যেন বার্ধক্যের ক্ষণপ্রতীক।

অতীত কালে মানুষ প্রকৃতিকে ভালোবাসত, উপাসনা করত, প্রকৃতির অন্তর্গত প্রাণশক্তিটিকে সমপ্রাণের মর্যাদা দিত। ক্রমে মানবকে গ্রাস করল সভ্যতাদর্প। সে ভুলে গেল বৃক্ষপ্রাণের মর্ম। ভুলে গেল বৃক্ষও মানুষের মতো সগুণের আধার। তারাও একে অন্যকে সাহায্য করে, তাদেরও বন্ধুত্ব হয়, তারাও স্বার্থত্যাগ করে। এমনকি মা বৃক্ষ জীবন দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করে। সভ্যতাদর্পী মানুষ গাছের এই সত্যস্বরূপ ভুলে মেতে উঠল প্রকৃতি ধ্বংসে। সাময়িক আরাম, সুখভোগ আর আপন তৃপ্তির জন্য সে নিজেকে, নিজের উত্তরাধিকারকে আর প্রকৃতিকে বিপন্নতার চরম সীমায় নিয়ে গেল। জগদীশচন্দ্র যে সবুজে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন, মানুষ সেই বৃক্ষপ্রাণের আর্তনাদ ভুলে গেল। কবির সচেতন স্বর দাবি জানাল-

“দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর।”

তবু সবুজের অভিযান হল না। বরং নির্বিচারে সবুজ হত্যায় সভ্যতার নির্লজ্জ রূপটি মানুষকে নিয়ে এল উন্নায়নের আবর্তে। পৃথিবীর অন্যান্য জীবের ন্যায় অঙ্কুরিত সবুজ প্রাণ একদিন বীজের ঢাকনা ভেদ করে নিজেকে প্রকাশ করেছিল। সৃষ্টির প্রথম দিনে পৃথিবীর বক্ষে প্রাণসঞ্চার করতে অন্যান্য জীবের সঙ্গে বৃক্ষপ্রাণের যেন এক গভীর বোঝাপড়া ছিল। গাছ আশ্রয় দিয়েছে, প্রান্তিক মানুষদের খাদ্যের সংস্থান করেছে। এমনকি জীবিকার সন্ধানও দিয়েছে। মাটির বুকে পড়ে থাকা অবহেলিত বীজেরাও কোনো একদিন সবুজের সাম্রাজ্যের মহিরুহে পরিণত হয়েছে।

গাছপালা জড় নয়। সবুজ ধ্বংস প্রকৃতার্থে প্রাণেরই বিনাশ। আধুনিক মানুষ তাই ঘাতক মানুষ। বৃক্ষ ধ্বংস করে সে দূষণ, মারণব্যাধি ডেকে এনেছে। উন্নয়নের বিকৃত লালসায় সে প্রকৃতির ভারসাম্যকে বিনাশ করেছে। বস্তুবাদী চেতনার যন্ত্রণা, লালসার বিষ তাই আজ মানবসভ্যতার শিরায় শিরায় বইছে। গাছের মূক জীবন তবু আজও মানুষকে সাহচর্য দিয়ে চলেছে। সে এত ধ্বংসেও নিঃসাড়ে পালন করে চলেছে তার ধর্ম। মানুষের অতি প্রজননের বিষ ঢেকে দিতে সে আপ্রাণে বীজ সৃষ্টি করছে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবী বড়োই হৃদয়হীন! সে আপন স্বার্থ চরিতার্থতায় উন্মুখ। সবুজের আর্তনাদে তাই এই পৃথিবী বড়োই উদাসীন।

বসুন্ধরার মূল প্রাণশক্তি মানুষ নয়, গাছ। তার জন্য জগতের ভারসাম্য বজায় থাকে, জীবের জীবন বিকশিত হয়। গাছ হল পালিকা, ধাত্রী। সবুজশূন্য পৃথিবী মৃত্যুপুরী। সবুজহীনতায় প্রাণের বিনাশ। প্রকৃতিকে সে ধরে রেখেছে বলেই যে মানবজীবন প্রবাহিত-এ সত্যের বিস্মৃতি মানবসভ্যতার অভিশাপ।

৫। [“দেখো আমি চোর বটে, কিন্তু আমি কি সাধ করিয়া চোর হইয়াছি? খাইতে পাইলে কে চোর হয়? দেখো, যাঁহারা বড়ো বড়ো সাধু, চোরের নামে শিহরিয়া উঠেন, তাঁহারা অনেকে চোর অপেক্ষাও অধার্মিক। তাঁহাদের চুরি করিবার প্রয়োজন নাই বলিয়াই চুরি করেন না। কিন্তু তাঁহাদের প্রয়োজনাতীত ধন থাকিতেও চোরের প্রতি যে মুখ তুলিয়া চাহেন না, ইহাতেই চোরে চুরি করে। অধর্ম চোরের নহে-চোরে যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর। চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শত গুণে দোষী। চোরের দণ্ড হয়; চুরির মূল যে কৃপণ, তাহার দণ্ড হয় না কেন?”]

অপরাধের উৎস: বৈষম্যমূলক আর্থসামাজিক ব্যবস্থা : প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে আমরা যত অগ্রগতির উচ্চ শিখরে উঠছি ততই আমাদের সমাজজীবনে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। সেই জটিলতার ছিদ্রপথেই সমাজে প্রবেশ করছে নানা অন্যায়-অপরাধমূলক কাজ। আদিম সাম্যভোগবাদী সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর থেকে মানুষের সমাজজীবনে ঘটে চলেছে নানা পরিবর্তন। ব্যক্তি সম্পত্তির উদ্ভব, উৎপাদন ব্যবস্থার নানা কাঠামো ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন, উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ, উদ্বৃত্ত উৎপাদন, উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার পরিবর্তন, শিল্প-কলকারখানায় এবং কৃষিতে ভাড়া করা শ্রমিক নিয়োগ, ব্যাবসাবাণিজ্যের আন্তর্জাতিকতা, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ প্রভৃতির চরিত্র পরিবর্তনে বর্তমান সমাজে আর্থসমাজ দৃষ্টিভঙ্গিতে সৃষ্টি হয়েছে চার শ্রেণির মানুষ-ধনী, উচ্চমধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণি। একদিকে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণি অন্যদিকে অগণিত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। একদিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী শোষক সম্প্রদায়, অন্যদিকে সংখ্যাতীত বঞ্চিত শোষিত নির্যাতিত মানুষ। একদিকে ভোগবিলাসের প্রাচুর্য, আর একদিকে অনাহারে-অর্ধাহারে অপুষ্টিক্লিষ্ট মানুষের দীনতা। এই বৈষম্যমূলক সমাজে দেখা দিয়েছে তাই নানা ব্যাধি- চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, খুনখারাপি কার্যকলাপ। অথচ কোনো মানুষই চোর-ডাকাত-খুনি হয়ে জন্মায় না। কঠিন-কঠোর বাস্তব সমাজজীবন তাদের সেসব পথে ঠেলে দেয়।

যেদিন থেকে আর্থসমাজ ব্যবস্থায় এই অবক্ষয় শুরু হয়েছে তবে থেকেই এই অন্যায়-অপরাধমূলক কাজ ঘটে আসছে এবং তা আরও তীব্র মাত্রা লাভকরছে। আর এই অন্যায়-অপরাধ দমন করার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা তৎপর হয়ে উঠেছে। তাই গড়ে উঠেছে আইন-আদালত প্রশাসন। আইনের চোখে চোর দোষী, তার শাস্তি হয় আইনমাফিক। পরের দ্রব্য অপহরণ করাই হল চুরি এবং তা অন্যায় ও অপরাধ। আইনের চোখে চোর অপরাধী ও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু চোর কেন চুরি করল, সেটাও আমাদের জানতে হবে। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে যদি অভাবের তাড়নায় কেউ চুরি করতে বাধ্য হয়, তবে তা অপরাধ কিনা তা বিচার করার সময় এসেছে। দিনান্ত পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও যখন একজন দু-বেলা দু-মুঠো অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থান করতে পারে না, রোগে ছেলে-মেয়ে-বউ-এর চিকিৎসা করতে পারে না, চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় ও বিনা পথ্যে আপনজনকে মৃত্যু মুখে ঢলে পড়তে দেখে; তখন যদি কোনো ব্যক্তি স্নেহ-ভালোবাসা-মায়া-মমতার টানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও চুরি করে অনাহারক্লিষ্ট স্বজনের মুখে গ্রাস তুলে দিতে, রোগের চিকিৎসা করাতে; তখন কি তা খুবই অমানবিক, অন্যায়, অপরাধ? যখন একজন মানুষ লেখাপড়া শিখে কাজের জন্য হন্যে হয়েও বেকার থাকতে বাধ্য হয়, জঠর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে চুরি করতে বাধ্য হয়, তখন কি তা অমার্জনীয়? আমরা সংবেদনশীল দৃষ্টি মেলে অনুসন্ধান করব না-কেন মানুষ চুরি করে? কোথায় অপরাধের উৎস?

বৈষম্যমূলক আর্থসমাজব্যবস্থার মধ্যে অপরাধমূলক কাজের বিষবীজ উপ্ত রয়েছে। সমাজের একশ্রেণির মানুষ কম আয়াসেই ভোগবিলাসের আতিশয্যে বংশপরম্পরায় জীবন অতিবাহিত করেছে, আর-এক বৃহৎ শ্রেণির মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেও ন্যূনতম অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। যেসকল কৃপণ যক্ষের মতো ধনদৌলত আগলে রেখেছে; যারা সমাজে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে নিজস্বার্থ সিদ্ধ করছে, সে সকল ব্যক্তিই সমাজের ভাগ্যনির্ধারক। তারাই সমাজের প্রভাবশালী, তারাই সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তির ভাবমূর্তি হয়ে বিরাজ করে, এদেরই কারণে সমাজে এত অভাব-অনটন, এত বেকার, এত অন্যায়-অবিচার-অপরাধ। অথচ আইনের চোখে এরা নিরপরাধ। এরাই কৌশলে আইন-আদালত-প্রশাসনকে কুক্ষিগত করে শ্রমজীবী -কৃষক-শ্রমিক-মজদুর শ্রেণির মানুষের মুখের গ্রাস, পরিধানের বস্ত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিয়েছে। এদেরই কারণে সমাজে এত অন্যায়-অবিচার-অপরাধ ঘটে। যতদিন সমাজে এই ব্যবস্থা, এই কৃপণ ধনী থাকবে; ততদিন সমাজে চোর চুরি করবে, ডাকাত ডাকাতি করবে, খুনি খুন করবে।

বস্তুত আর্থসমাজব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার সময় এসেছে। চোর দোষী; কিন্তু তদপেক্ষা শত গুণ দোষী কৃপণ ধনী, যাদের কারণে সমাজে চোর-ডাকাত-খুনির জন্ম হয়। চোর-ডাকাত-খুনি হয়ে কেউ জন্মায় না। সমাজব্যবস্থাই মানুষকে সৎ, মহৎ ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে; আবার সেই সমাজই মানুষকে চোর-ডাকাত-খুনিও করতে পারে। বৈষম্যমূলক আর্থসমাজ ভেঙে সাম্যবাদী আর্থসমাজব্যবস্থা গড়ে উঠলে মানবসমাজ অনেক সমস্যা ও অন্যায়-অবিচার-অপরাধ থেকে মুক্ত হতে পারবে। তাই আইন-আদালতের শাসনব্যবস্থায় গড়ে উঠুক সুস্থ স্বাভাবিক উন্নত সমাজব্যবস্থা, যার ভিত্তি হবে-মানবতা, সততা ও সংবেদনশীলতা।

৬। [“যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে/নীচে পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।” রবীন্দ্রনাথ এভাবেই নিরক্ষরতার অভিশাপ সম্বন্ধে সচেতন করেছেন জাতিকে। নিরক্ষর মানুষ চলার পথে বারে বারে বাধাপ্রাপ্ত হয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাক্ষরতা প্রয়োজনীয়। পড়াশোনা মানুষকে একতাবদ্ধ করে। যে-কোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে একতা জরুরি। আর শিক্ষাই ঐক্য আনে।]

নিরক্ষরতার শাপমোচন : প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

কোনো দেশের উন্নতির মূল হল সার্বিক শিক্ষা, দেশবাসীর অক্ষরজ্ঞান। দেশের মানুষ যদি নিরক্ষর থাকে তবে তা দেশের বোঝা, জাতির অপমান। এই অপমান দূর করতে প্রয়োজন সকল দেশবাসীকে সাক্ষরতার আলোয় আলোকিত করা। আর তার ফলেই আমরা আমাদের কাম্য সুখ ও স্বাধীনতা লাভ করতে পারব। কিন্তু নিরক্ষরতা আজও এই দুর্ভাগা দেশের হতভাগ্য জনগণের নিষ্ঠুরতম অভিশাপ। সেই অভিশাপ দূর করতে হবে, আর তবেই জ্ঞান ও চিন্তার নবধারা বিকশিত হয়ে উঠবে।

নিরক্ষরতার অন্যতম কারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য। একটা সময় পর্যন্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা শিক্ষার অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এমনকি তাদের ধারণা ছিল যে, শিক্ষা তাদের জন্য নয়। এ ছাড়া কন্যাসন্তান পরের ধন বলেও শিক্ষায় অনেকে তাদের অধিকার দেয় না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি থেকে নিরক্ষরতা শব্দটি প্রায় মুছেই গিয়েছে। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর দুই দশকে দাঁড়িয়েও আমরা অর্থাৎ ভারতবাসীরা এখনও নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারিনি। ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতবর্ষে সাক্ষরতার হার ছিল ৫২.১১, ভারতবর্ষের কোনো কোনো রাজ্য অবশ্য সাক্ষরতায় যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও সাক্ষরতা অভিযানে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে মোট সাক্ষরতার পরিমাণ ৭৪.০৪, পশ্চিমবঙ্গে ৭১.১৬।

অক্ষরজ্ঞান মানুষের দৃষ্টিশক্তির মতো। যার সাহায্যে প্রতিটি মানুষ এই পৃথিবীকে, পরিবেশকে জানতে পারে, চিনতে পারে। নিরক্ষরতার অভিশাপে মানুষ অভিশপ্ত জীবনযাপন করে। তাই আমরা দেখতে পাই দেশের একটি অংশের জনগণকে অশিক্ষার অন্ধকারে অজ্ঞান, অচৈতন্য করে রাখার অপচেষ্টা চলেছে, যাতে তাদের পশুর মতো খাটিয়ে নেওয়া যায়। এর ফলে সমাজের এক শ্রেণির মানুষ সকল সুখভোগের অধিকার গ্রহণ করে আর সরল নিরক্ষর মানুষগুলিকে ছুঁড়ে ফ্যালে দারিদ্র্যের আস্তাকুঁড়ে।

গণতন্ত্রের সাফল্যের প্রয়োজনে সবার আগে চাই সচেতন নাগরিকতা। সাক্ষরতা। আর শিক্ষার প্রসার ছাড়া সচেতন নাগরিকতার প্রকাশ ঘটা সম্ভব নয়। এ যেন দৃষ্টিহীনের তীব্র বেগে ছুটে যাওয়ার পরিণামের শামিল। তাই সবার আগে প্রয়োজন দেশব্যাপী নিরক্ষরতা দূরীকরণের এক সুপরিকল্পিত, নিশ্ছিদ্র, বিশাল আয়োজন। ইতিমধ্যেই সারা দেশব্যাপী শুরু হয়েছে সাক্ষরতা অভিযান। সর্বশিক্ষা অভিযানের মতো পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে ভারতের প্রতিটি রাজ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং বিদ্যালয়ে সার্বিক সাক্ষরকরণ একটি অবশ্যকরণীয় কাজ বলে স্বীকৃত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এই কাজে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তারা এই উদ্দেশ্যে বিস্তৃত পরিকল্পনা নিয়েছে। বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে প্রেরিত হয়েছে বিভিন্ন বইপত্র, প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি।

আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না- এই অভিযোগ যুগ যুগ ধরে আমরা শুনে আসছি। কিন্তু সাক্ষরতার এই নব উদ্যমে এই ত্রুটিকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে নিরক্ষরতার জন্য দায়ী সাক্ষর জনসমাজ। আর এই নিরক্ষরতার সুযোগেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে বঞ্চনা-শোষণ-পীড়ন। আর এর ফলেই জন্ম নিয়েছে অন্ধ কুসংস্কার ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য। তাই দেরিতে হলেও সাক্ষরতার যে আকাঙ্ক্ষিত অভিযান শুরু হয়েছে তাতে আমাদের স্থান নিতে হবে প্রথম সারিতে।

সাক্ষরতা অভিযানের পথ মিশে যাবে পাড়াগাঁয়ের মেঠো পথে। সেই পথেই জনগণ পরস্পরের মধ্যে খুঁজে পাবে দুঃখ-বেদনার স্বরূপ, সেই পথেই তারা খুঁজে পাবে সুসংহত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপায়। সাক্ষরতাই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনো জাতির আত্মরক্ষার হাতিয়ার। সাক্ষরতাই তাদের ঐক্যবদ্ধ করে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রামে সচেষ্ট করবে। মনে রাখতে হবে, কয়েকটি বিদ্যালয় স্থাপনের দ্বারা দেশব্যাপী নিরক্ষরতা দূরীকরণ সম্ভব নয়। এজন্য চাই সকল দেশবাসীর একান্ত প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনা। গ্রামপঞ্চায়েত, অঞ্চল পঞ্চায়েত এবং জেলা পরিষদগুলিকে এ বিষয়ে উদ্যোগী করা যেতে পারে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাই দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সচেতন ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। তাদের হাত ধরেই নিরক্ষরতার অভিশাপ মুছে গিয়ে শিক্ষার আলোয় সারা দেশ আলোকিত হয়ে উঠবে।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment