হারুন সালেমের মাসি গল্পের বড়ো প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার মহাশ্বেতা দেবী | Harun Salemer Masi Golper Long Question Answer Class Twelve 4th Semester Bengali

১। “মানুষের বউ এসে শাশুড়িকে পর করে। গৌরবির কপালে তা হয়নি।”- উক্তিটির নিরিখে কথকের মনোভাব ব্যক্ত করো।
মনোভাব : কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে মেয়ে পুঁটির জন্য বাস কনডাক্টর পাত্র পেয়ে গৌরবি আর তার স্বামী দরাজ হাতে বিয়েতে খরচ করায় গৌরবির ছেলে নিবারণ ঈর্ষান্বিত হয়েছিল। তখন সে নিজের অংশ দাবি করলে গৌরবি গর্বভরে জানিয়েছিল- অসময়ে মেয়ে পুটিই তাকে দেখবে। তারপর সময় গড়িয়েছে নিজের নিয়মে-নিবারণ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ঘরে বউ এনেছে। কিন্তু মায়ের অহংকার করে বলা কথাটি সে ভোলেনি। নিজের ঘর করা সত্ত্বেও সে ঘরে মাকে আশ্রয় দেয়নি সে, গৌরবিকে মেয়ে পুঁটির কাছে গিয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রতিহিংসাপরায়ণ নিবারণ। সমাজে আজন্ম প্রচলিত রীতিতে দেখা গিয়েছে, পরের ঘরের মেয়ে বউ হয়ে এসে শাশুড়ির সঙ্গে অশান্তি বাধায়, অনেক ক্ষেত্রে শাশুড়িকে সংসার থেকে বিতাড়িত করে সংসারের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। কিন্তু গৌরবির সংসারে এই পরিচিত নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। নিবারণের বউ, শাশুড়ি অর্থাৎ গৌরবির সঙ্গে কোনোরকম দুর্ব্যবহার করেনি বা করার অবকাশ পায়নি কারণ সেরকম কিছু ঘটার আগে নিবারণ নিজেই মাকে ঘর ছাড়া করেছে। মায়ের সঙ্গে নিবারণের এমন অমানবিক আচরণে নিবারণের বউ-এর কোনো মদত নেই- তা গৌরবিও ভালো করেই জানত। তাই কথক প্রশ্নোদৃত উক্তিটি করে পাঠককে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করেছেন।
২। “কি ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের, কিছুই ও ভোলে না।”- কী কারণে নিবারণের প্রতিহিংসা? সে কীভাবে প্রতিহিংসা মিটিয়েছিল?
অথবা, “বাপছেলেতে খুব বেধেছিল। কী নিয়ে বাপ-ছেলেতে বেধেছিল? ভবিষ্যতে তার পরিণাম কী হয়েছিল? ২
অথবা, “তোর এত রিষ কেন? তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
প্রতিহিংসার কারণ: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের প্রধান চরিত্র গৌরবির ছেলে নিবারণ এবং মেয়ে সাবিত্রী ওরফে পুঁটি। মেয়ের বিয়েতে বাস কনডাক্টর জামাইকে নিবারণের বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে ঘড়ি-সাইকেল-টর্চ দেয়। নিবারণকে বঞ্চিত করে বোনকেই সব দেওয়া হচ্ছে দেখে সে তীব্র অভিযোগ জানায়- এই নিয়ে বাপ-ছেলেতে ঝগড়া বাধলে গৌরবি বলে- “তোর এত রিষ কেন? সময়ে পুঁটি আমায় ভাত দিবে”। অর্থাৎ এত হিংসা করার কী আছে- দুঃসময়ে পুঁটি তাদের দেখভাল করবে। মা গৌরবির এই কথায় নিবারণের ঈর্ষা বেড়ে গিয়ে প্রতিহিংসার রূপ নেয় এবং সে তা মনের মধ্যে পুষে রাখে।
প্রতিহিংসা চরিতার্থতা: বয়সকালে পুঁটি বাবা-মাকে ভাত দেবে একথা বলেছিল গৌরবি। নিবারণ সেকথা ভোলেনি। যথাসময়ে গৌরবির গ্রামের অদূরেই মাত্র কয়েকটা রেলস্টেশন পরে বাড়ি করেছে নিবারণ- বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছে। নিবারণের ঘরে গৌরবির জায়গা হয়নি। সে মা গৌরবিকে তার বাড়িতে রাখতে এবং খেতেপরতে দিতে অস্বীকার করেছে। শুধু তাই-ই নয়- বোনের বিয়ের সময়ের ঘটনা মাকে মনে করিয়ে দিয়ে সে গৌরবিকে বলেছে মেয়ে পুঁটির বাড়িতে গিয়ে থাকতে। মাকে বিতাড়িত করে এভাবেই নিবারণ নিজের মনের প্রতিহিংসার জ্বালা মিটিয়েছিল।
৩। বড়ো দুঃখ হল গৌরবির।”- গৌরবির অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। তার দুঃখ হল কেন?
গৌরবির অবস্থা: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘হাবুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পের মুখ্য চরিত্র গৌরবি। দীনদুঃখী বিধবা গৌরবি এক কন্যা ও এক পুত্রের জননী। বিবাহিতা কন্যার সংসারে কিছুদিন ঠাঁই পেলেও সেই সংসারে অভাবের কারণে গৌরবিকে সেখান থেকে চলে আসতে হয়েছে। পুত্র নিবারণের সংসারে সচ্ছলতা থাকলেও সে মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়নি। পুরোনো একটা ঘটনার প্রতিহিংসাবশত নিবারণ গৌরবির দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করার পর দূর সম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দের গ্রামের এক কুঁড়েঘরে গৌরবি বাস করে এবং শাকপাতা সংগ্রহ করে তা বেচে কোনো মতে দিন গুজরান হয় তার।
দুঃখের কারণ: গৌরবির একটি পায়ের গোড়ালি আর পাতা বাঁকা অর্থাৎ সে জন্মখুঁতো। চলাফেরার অসুবিধার কারণে সে শহরে যেতে পারে না। শাকপাতা সংগ্রহ করে যশিদের মাধ্যমে বিক্রি করে। তাকে শাকপাতা তুলতে সাহায্য করে তারই মতো অসহায় আর এক বিধবা আয়েছা বিবি ওরফে হারার মা। সেই প্রিয় বান্ধবী হারার মায়ের হঠাৎ মৃত্যুতে গৌরবির মনে পড়ে দুজনের হৃদ্যতা ও জীবনসংগ্রামের নানা ঘটনা- উঠোনে বসে উকুন বেছে দেওয়া, হাটুরেদের ফেলে যাওয়া বাঁধাকপির বুড়ো পাতা আর থ্যাঁতলানো বিলিতি বেগুন কুড়োনো ইত্যাদি। সেই অভিন্নহৃদয় সঙ্গীটি তাকে ছেড়ে নিঃসঙ্গ করে চলে গেল- তাই “বড় দুঃখ হল গৌরবির।”
৪।তারপর মনে হল তার চেয়ে হারার মা ভাগ্যবতী। – প্রশ্নোদ্ভূত অংশটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
অথবা, “তার চেয়ে হারার মা ভাগ্যবতী।”- কখন, কার এরকম মনে হয়েছে? এরকম মনে হওয়ার কারণ কী?
যখন, যার এইরূপ মনে হয়েছে: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প থেকে গৃহীত অংশটিতে এই ভাবনা ছিল গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবির। সে বিধবা এবং জন্মখুঁতো। তার এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জীবন-জীবিকার সংগ্রামে সে পাশে পেয়েছিল তারই মতো দীনদুঃখী এক দরদি প্রতিবেশী আয়েছা বিবি ওরফে হারার মাকে। হারার মা গৌরবিকে শাকপাতা, গুগলি তুলতে সাহায্য করত। তাদের পরস্পরের মধ্যে হৃদয়ের বন্ধন গড়ে উঠেছিল। সেই বন্ধন ছিন্ন করে হারার মা যখন হঠাৎই অকালে চলে গেল তখন গৌরবিই তাকে মৃত বলে শনাক্ত করেছিল। সাতকুলে কেউ ছিল না হারার মায়ের তাই তার শেষকৃত্যের সমস্ত তদারকি করতে হয়েছিল ভিন্ন ধর্মের গৌরবিকেই। মুসলমান ধর্মানুযায়ী হারাকে তার মায়ের কবরে মাটি দিতে পাঠায় গৌরবি। তারপর সব মিটে গেলে একার ঘরে ফিরে এসে নিঃসঙ্গ গৌরবির মনে হয়েছিল হারার মা, তার চেয়ে ভাগ্যবতী।
৫। “হারা কী তার ধর্মের মানুষ, না সমাজের?”- ‘তার ও হারার মাঝে ধর্মীয় পরিচয় কীভাবে অন্তরায় হয়ে উঠেছিল? উভয়ের কী পরিণতি হয়েছিল?
অন্তরায়: আলোচ্য উদ্ধৃতিটির উৎস মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পটি। গল্পের প্রধান চরিত্র গৌরবির মনে উদ্ধৃত ভাবনাটির উদয় হয়েছিল। ‘তার’ অর্থাৎ গৌরবির এবং হারার মাঝে ধর্মের পরিচয় সামাজিক বাধার সৃষ্টি করে। হারার মা- আয়েছা বিবি, গৌরবির সংগ্রামী জীবন-জীবিকার একমাত্র সঙ্গী হলেও গৌরবি হিন্দু আর হারা-রা মুসলমান, এই ধর্মীয় প্রভেদ সমাজের চোখে ম্লান হয়ে যায়নি। মায়ের মৃত্যুর পর অনাথ বালক হারা কাকার কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে একেবারে নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। তাই অসহায় হারা, গৌরবির উঠোনে এসে বসে থাকে, সমাজের ধর্মীয় সংস্কারজাত বোধ তাকে মাসির ঘরের ভিতর ঢুকতে দেয়নি। এদিকে হারাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা ভেবে গৌরবির মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা হয়। কারণ তাদের দুজনের ধর্ম আলাদা হওয়ার গ্রামসমাজের নানা দিক থেকে অন্তরায় বা বাধা আসবে অর্থাৎ হারাকে আশ্রয় দিলে গৌরবির সমাজ তাকে একঘরে করবে। অবশেষে, গৌরবি হারার জন্য অন্যের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হলে- যশি হারাকে শহরে ছেড়ে আসার প্রস্তাব দেয়, ছেলে নিবারণ শর্ত রাখে হারাকে বিদায় দিলে মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে সে। এমনকি মুকুন্দও স্পষ্ট জানিয়ে দেয় হারাকে না তাড়ালে গৌরবিকে ভিটেমাটি ছাড়তে হবে-চারিদিক থেকে সকলের চাপে জেরবার হয়ে ওঠে গৌরবি। গৌরবি আর হারার আন্তরিক ও মানবিক সম্পর্কের মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ধর্মীয় বিভেদ ও সমাজ।
পরিণতি: শেষপর্যন্ত ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও বিভাজনকে অতিক্রম করে মানবিকতা, মাতৃত্ব এবং বান্ধবী আয়েছার প্রতি কৃতজ্ঞতায় গৌরবি হারাকে নিয়ে গ্রাম ছাড়ে, শহরের অজানা-অনিশ্চিত পথে একত্রে পাড়ি দেয় তারা। সাম্প্রদায়িক ধর্মের চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে মাতৃধর্ম ও মানবধর্ম।
৬। “তার স্বর্গ আর হারার মা-র স্বর্গ কি এক হতে পারে?”- কোন অবস্থাকে স্বর্গ মনে হয় গৌরবির? স্বর্গ সম্পর্কে এরূপ প্রশ্ন তার মনে জাগত কেন?
স্বর্গের স্বরূপ: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের গৌরবি দীনদুঃখী, সহায়সম্বলহীনা এক বিধবা নারী। গৌরবির পায়ে সমস্যা থাকায় প্রতিবেশী আয়েছা বিবি ওরফে হারার মা তাকে শাকপাতা তুলতে সাহায্য করত। সেই হারার মা-র মৃত্যুর পর একদিন গৌরবি স্বপ্নে দেখল তাকে হাত ধরে হারার মা এক আশ্চর্য দেশে নিয়ে গিয়েছে। সেখানে থানকুনি আর দূর্বাঘাসের মেলা, মাদার গাছের ছায়ায় ঢেঁকি শাকের জঙ্গল। জীবিকার উপকরণের সেই অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে গৌরবি দু-হাত ভরে শাকপাতা তুলেছে আর এই অবস্থাকেই তার স্বর্গ বলে মনে হয়েছে।
প্রশ্ন জাগার কারণ: গৌরবি ও আয়েছা দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষ। বাস্তব জীবনের দুর্ভাগ্য, দারিদ্র্য, বঞ্চনা তাদের একাত্ম ও সহমর্মী করে তুলেছিল। অবচেতনে থেকে যাওয়া অপূর্ণ ইচ্ছাগুলিকেই গৌরবির স্বপ্নে এসে উপস্থিত হতে দেখা যায়। স্বপ্নের মধ্যেই সে নিজের ইচ্ছাপূরণ ঘটায়- “দিনমানে ও যা পায় না, স্বপ্নে অনেকসময়ে তা পেয়ে যায়।” হারার মা আয়েছা বিবি মুসলমান আর গৌরবি হিন্দু হওয়ায় ধর্মভেদের কারণে স্বপ্নে দেখা স্বর্গ নিয়েও গৌরবির মনে সংশয় জাগত- তাদের দুজনের স্বর্গ এক হতে পারে কি না সেই ভাবনাই ভাবত গৌরবি। সে আজন্ম এই সংস্কার পোষণ করে এসেছে যে, হিন্দু ও মুসলমানের স্বর্গ আলাদা।। কিন্তু গরিবের স্বর্গ যে ধর্ম দ্বারা বিভাজিত হয় না। যার পেটে ক্ষুধা- খাদ্যের অফুরন্ত জোগান যেখানে, সেটিই তার কাছে স্বর্গরাজ্য। স্বল্প পরিশ্রমেই তাদের জীবিকা নির্বাহের সামগ্রীগুলি মিলে গেলে তা স্বর্গের চেয়ে কম কিছু নয়। তাই এখানে এসেই আয়েছা বিবি আর গৌরবির সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ মুছে যায়। দুঃখদৈন্যে তারা সমগোত্রীয় বলেই দুজনের স্বর্গও বোধহয় এক হয়ে যায়।
৭। “এখন ওর হারার মা-র ওপর রাগ হল।”-গৌরবির রাগের কারণ ব্যক্ত করা।
অথবা, “খুব রাগ হতে লাগল গৌরবির”-গৌরবির রাগ হল কেন? সেই রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী না হওয়ার কারণ কী?
অথবা, “এখন জাত বা কেমন করে থাকে, ধর্মের বা কি হয়!”- গৌরবির এমন ভাবনার কারণ ব্যক্ত করো।
রাগের কারণ: ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে বিধবা ও সহায়সম্বলহীন গৌরবি তার ছেলে নিবারণের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে মুকুন্দদের দেওয়া কুঁড়েঘরে অসহায় অবস্থায় থাকে। ঠিকমতো দুবেলা খাওয়া জোটে না- অপরদিকে প্রতিবেশী-বান্ধবী আয়েছার হঠাৎ মৃত্যুতে তার বছর সাতেকের ছেলে হারার দায়িত্ব এসে পড়ে গৌরবির উপর। এখন সে কী করবে, হারাকে কী খাওয়াবে, কোথায় থাকতে দেবে, কীভাবে প্রতিপালন করবে সেসব ভেবেই আয়েছার উপর ভীষণ রাগ জন্মাল গৌরবির। তা ছাড়া হারা মুসলমান, তাকে হিন্দু গৌরবি নিজের কাছে রাখলে নানারকম সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হবে, এমনকি তার শেষ আশ্রয়টুকুও চলে যেতে পারে। হারার “সাতকুলে কেউ নেই”- গৌরবির “ভরসায় ছেলে রেখে চোখ বুজল” আয়েছা। এইসব নানা কথা চিন্তা করে “খুব রাগ হতে লাগল গৌরবির।”
রাগের উপশম: আসলে যত-না রাগ, তার চেয়ে বেশি অভিমান হয়েছিল গৌরবির। নিঃসঙ্গ গৌরবির দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের একমাত্র সম্বল ছিল হারার মা। সেই অবলম্বন যখন অকালে চলে গেল উপরন্তু ‘পঙ্গু’ গৌরবির ভরসায় রেখে গেল হারাকে তখন গৌরবি বুঝে উঠতে পারছিল না, হঠাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে আর অসহায়তা ও অভিমান তাই রাগের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল, অবিবেচক মনে হয়েছিল আয়েছা বিবিকে কিন্তু হারার মুখ থেকে যখন সে শুনল, মৃত্যুর আগে তার মা বলে গিয়েছে, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস” তখন গৌরবির শূন্য বুকে স্নেহ-ভালোবাসার ঢেউ লাগল, নিজেকে প্রথমবার গুরুত্বপূর্ণ মনে হল গৌরবির এবং তার রাগ আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।
৮। “গৌরবির শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল!”- উক্তিটির মধ্য দিয়ে বক্তার মনোভাব ব্যক্ত করো।
অথবা, “গৌরবির শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।”-উদ্ধৃতাংশটি ব্যাখ্যা করো।
অথবা, “বড়ো ভালো লাগল গৌরবির”- কী ভালো লাগার কথা বলা হয়েছে- পাঠ্যানুসারে ব্যাখ্যা করো।
অথবা, “নিজেকে বড়ো প্রয়োজনীয় মনে হল হঠাৎ।”- কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নিজেকে প্রয়োজনীয় মনে হল? এমন মনে হওয়ার কারণ লেখো।
অথবা, “দুঃখী আরেক দুঃখীর মন বুঝে।”- সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করো।
প্রসঙ্গ: প্রশ্নোদ্ভূত অংশটি মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘হারুন সালেমের মাসি’ শীর্ষক রচনা থেকে গৃহীত হয়েছে। হারার মা আয়েছা বিবির আকস্মিক মৃত্যুতে হতচকিত গৌরবি হারার আশ্রয় নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। হারা কোথাও ঠাই না পেয়ে গৌরবি মাসির কাছে চলে আসে। বিধর্মী, অনাথ একটি ছেলেকে গৌরবি কোথায় রাখবে! কী খাওয়াবে। এসব নানা চিন্তায় জর্জরিত হয়ে সেই মুহূর্তে তার মায়ের উপর খুব রাগ অনুভূত হয়েছিল গৌরবির। মনে হয়েছিল হঠাৎ করে হারাকে এভাবে একা ফেলে চলে যাওয়া উচিত হয়নি আয়েছার। যেখানে গৌরবি নিজেরই অস্তিত্বরক্ষায় বিপন্ন সেই পরিস্থিতিতে হারার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে সে ভীষণই চিন্তিত হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় হারার মুখে তার মায়ের বলে যাওয়া “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস” কথাটি গৌরবির প্রাণে মাতৃত্বের জোয়ার বয়ে আনে। নিজের ছেলের কাছ থেকে বিতাড়িত, অন্যের দয়ায় প্রতিপালিত গৌরবির প্রথমবার নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। সেও যে হারার মায়ের কাছে একইরকম প্রয়োজনীয় এবং তার অবর্তমানে হারার একমাত্র অবলম্বন ও ভরসাস্থল এসব ভেবেই এক পরম আত্মসুখ লাভ করে গৌরবি- আর সেই প্রসঙ্গেই গল্পে আলোচ্য বিষয়টির উত্থাপন হয়েছে।
ঢেউ লাগার কারণ: গৌরবির বুকের স্নেহ-মায়ামমতা সব যেন শুকিয়ে গিয়েছিল প্রতিকূল পরিস্থিতির চাপে। নিজের পেটের ছেলেমেয়ের নির্মম দুর্ব্যবহার তার বুকের মাতৃস্নেহধারায় চরম আঘাত হানে। পাশাপাশি প্রতিবেশী-বান্ধবী আয়েছা বিবির মৃত্যুও তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়। অবশেষে মাতৃহীন হারা মাসির কাছে আশ্রয় নিতে আসলে তার একটি কথা গৌরবির মনকে ছুঁয়ে যায়। মরার আগে আয়েছা বিবি ছেলে হারাকে বলে গিয়েছিল গৌরবি মাসির পায়ে ধরে পড়ে থাকতে- মাসি তাকে ঠাঁই দেবেই। পরম বিশ্বাসে হারা এ কথা উচ্চারণ করায় নিমেষের মধ্যে গৌরবির সব রাগ, জাতধর্মের হিসাব মন থেকে মুছে গিয়ে মনে বাৎসল্যরসের সঞ্চার ঘটে। তার মনে হঠাৎ এক আশ্চর্য অনুভূতি জাগে, বিশাল জগৎসংসারে গৌরবির মতো অতি তুচ্ছ মানুষেরও নিজেকে বড়ো প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। বলা বাহুল্য, এক অসহায় অনাথ বালকের আশ্রয়দাত্রী হিসেবে নিজের প্রতি মনে মনে গর্ববোধ হয় তার। তাই গৌরবির বুকের মধ্যে যেন স্নেহসুধার ঢেউ তোলপাড় করে ওঠে।
৯। “গৌরবির ভেতরটা ভয়ে শুকিয়ে গেল।”- ‘গৌরবির ভিতরটা ভয়ে শুকিয়ে গেল কেন?
ভয়ের কারণ: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ শীর্ষক গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃতিটির মধ্য দিয়ে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গৌরবির সামাজিক ভয়ভীতির প্রকাশ ঘটেছে। আয়েছা বিবির অকালমৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যন্ত গৌরবি হারার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো কুলকিনারা করে উঠতে পারে না। তার মাথায় হারাকে নিয়ে নানারকম চিন্তাভাবনার উদয় হয়- এতটুকু একটা ছেলে কোথায় থাকবে, কী খাবে, তার উপর দুজনের সমাজ আলাদা হওয়ায় সমাজে হারা কীভাবে নিজের অস্তিত্বরক্ষা করবে ইত্যাদি। একসময় যশির সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে হারাকে কলকাতায় পাঠানোর প্রসঙ্গ উঠলে ভয়ে আঁতকে উঠেছে গৌরবি। তার এইরকম মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখে যশি স্পষ্টভাবে তাকে জানিয়ে দেয়, “খাওয়া-দাওয়া ছোঁয়া নেপা ছিষ্টি কোরো না মাসি।” কারণ মুকুন্দবাবুর আশ্রিতা গৌরবি। শুধু তাই নয়, যশি এও বলে- “মুকুন্দবাবু এই বাড়িতে মনসাঘট পুজো করল ভাদ্দরে, পাঁটা কাটল…।” অর্থাৎ যশি, মুকুন্দর ঈশ্বরবিশ্বাসী ও ধর্মনিষ্ঠ প্রকৃতির হওয়ার কথাটিও স্মরণ করিয়ে দেয় গৌরবিকে। তাই গৌরবির কাছে হারার আশ্রয়ের কথা মুকুন্দবাবু জানতে পারলে ‘খুব বেজার’ হবেন শুনে অর্থাৎ, তার একমাত্র ‘আশ্রয়দাতা’ তার প্রতি বুষ্ট হবেন তা ভেবেই গৌরবির ভিতরটা ভয়ে শুকিয়ে যায়।
১০। মাতৃত্বের কাছে, জাতপাতের সংস্কার কীভাবে অর্থহীন হয়ে যায়, তা ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অবলম্বনে আলোচনা করো। অথবা, ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অনুসরণে গৌরবির মাতৃসত্তার পরিচয় দাও।
গৌরবির জীবনসংগ্রাম: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পের মুখ্য চরিত্র গৌরবি। এক পুত্র ও এক কন্যার জননী হয়েও এই প্রতিবন্ধী বিধবা প্রৌঢ়া খুবই অসহায়। সে দূর সম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দের দয়ায় কুঁড়েঘরে একা বাস করে। প্রতিবেশী আর-এক অসহায় বিধবা আয়েছা বিবির সাহায্য নিয়ে শাক-পাতা-গুগলি সংগ্রহ ও বিক্রি করে কোনোমতে তার দিন চলে।
আয়েছা ও হারার সঙ্গে গৌরবির হৃদ্যতা: বিবাহিতা কন্যা সাবিত্রী ওরফে পুঁটির অভাবের সংসারে গৌরবির স্থান হয়নি। বিবাহিত পুত্র নিবারণের আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও সে মায়ের দায়িত্ব নেয়নি। এই কারণেই প্রতিবেশী মুসলমান নারী আয়েছা বিবি ও তার সাত বছরের ছেলে হারার সঙ্গে গৌরবির আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু আয়েছা বিবির অকালমৃত্যুতে অনাথ হারার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
মাতৃত্বের নবজাগরণ: মৃত্যুর আগে আয়েছা ছেলেকে বলেছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।” একথা শুনে গৌরবির হৃদয়ে নতুন করে মাতৃত্ব জেগে ওঠে। মুসলমান হারাকে আশ্রয় দিলে হিন্দুসমাজ ভালো চোখে দেখবে না জেনেও হারাকে সে তাড়িয়ে দিতে পারল না। যে মাতৃত্ব নিজের সন্তান-দ্বারা আহত হয়েছে, তাতে যেন প্রলেপ দিল হারা। গৌরবি নতুন করে অনুভব করল পৃথিবীতে তার প্রয়োজন ফুরোয়নি। যশি বলেছিল হারাকে কলকাতার ভিড়ে ছেড়ে আসবে। নিবারণ বলেছিল উদ্বাস্তু শিবিরে রেখে আসবে। কিন্তু গৌরবি রাজি হয়নি। হারাকে ত্যাগ করলে জীবনের বাকি দিনগুলি গৌরবি ছেলের কাছে নিশ্চিন্তে কাটাতে পারত। কিন্তু শত বাধাবিপত্তি সহ্য করেও নিখাদ মাতৃত্বের জোরে গৌরবি হারাকে নিয়ে শহরের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াল। এভাবেই মাতৃত্বের কাছে ধর্ম ও জাতপাতের সংস্কার অর্থহীন হয়ে গেল।
আরো পড়ুন : হলুদ পোড়া গল্পের বড়ো প্রশ্ন উত্তর