তিমির হননের গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার | Timir Hononer Gaan Kobitar Question Answer

কবি পরিচিতি
জীবনানন্দ দাশ
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪) বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। বাংলা কবিতায় তিনি নিজস্ব কাব্যভাষা, চিত্রকল্প ও ভাবনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, ইতিহাস, সময়, মৃত্যু এবং মানুষের অস্তিত্বের নানা সংকট এক বিশেষ আবহে প্রকাশ পেয়েছে।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নেই; আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, হতাশা, বেদনা, অনিশ্চয়তা এবং জীবনসংগ্রামও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর কবিতার ভাষা ও চিত্রকল্প অনেক সময় সরাসরি নয়, কিন্তু তার ভিতরে সমকালীন জীবনের নানা বাস্তবতা ও সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ঝরা পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’ প্রভৃতি। বাংলা আধুনিক কবিতার বিকাশে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘তিমিরহননের গান’ কবিতাতেও তাঁর কবিসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—অন্ধকারের মধ্যে থেকেও আলোর সন্ধান—প্রকাশ পেয়েছে।
তিমিরহননের গান কবিতার বিষয়বস্তু
‘তিমিরহননের গান’ কবিতায় কবি প্রথমে অতীতের একটি স্মৃতিময় সময়ের কথা স্মরণ করেছেন। কোনো হ্রদে, নদীর ঢেউয়ে বা সমুদ্রের জলে যেমন জল পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়, তেমনই একসময় মানুষের জীবনও অন্য মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল। সেই ভোরের মতো উজ্জ্বল সময়ে মানুষ জীবনকে বুঝতে ও শিখতে চেয়েছিল। তারা হেসেছে, খেলেছে এবং ভালোবেসেছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পুরোনো মূল্যবোধ ও সম্পর্কগুলি যেন মৃতের চোখের মতো নিরালোক ও প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। অতীতের সেই জের এখনও মানুষকে টেনে নিয়ে চলেছে। চারপাশে সূর্যালোকের অভাব থাকলেও মানুষ সূর্যের আলোকে সুন্দর মনে করে হাসতে চায়। অর্থাৎ বাস্তব জীবনে অন্ধকার থাকলেও মানুষের মনে এখনও আলোর প্রতি আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
এরপর কবি সমকালীন সমাজের কঠিন বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। একদিকে রয়েছে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের বিষাদ, বেদনা ও নিরাশা, অন্যদিকে রয়েছে আরও অসহায় মানুষের জীবন। লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে, নর্দমা ও ওভারব্রিজের মধ্যে ঘুরে বেড়িয়ে, ফুটপাত থেকে ফুটপাতে গিয়ে তারা রাত কাটায়। কেউ কেউ নক্ষত্রের আলোয় ঘুমিয়ে পড়ে, আবার কারও জীবনের পরিণতি হয় মৃত্যুর মধ্যে।
কবি এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখে দেখিয়েছেন সমাজের গভীর বৈষম্য। একদিকে দরিদ্র মানুষের অসহায় জীবন, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত মানুষের নিজস্ব বেদনা ও সীমাবদ্ধতা। তবু কবি নিজেকে এবং নিজের মতো মানুষদের প্রশ্ন করেছেন—“আমরা কি তিমিরবিলাসী?” অর্থাৎ আমরা কি এই অন্ধকারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
শেষে কবি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। বরং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন—“আমরা তো তিমিরবিনাশী / হ’তে চাই।” অর্থাৎ অন্ধকার যত গভীরই হোক, তাকে দূর করে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
তিমিরহননের গান কবিতার মূলভাব
অন্ধকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়াই ‘তিমিরহননের গান’ কবিতার মূলভাব।
এখানে ‘তিমির’ শুধু রাতের অন্ধকার নয়। এটি হতাশা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, বেদনা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও মানুষের জীবনের নানা সংকটের প্রতীক। কবি দেখেছেন, সমাজের একদিকে মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনা ও নিরাশা, অন্যদিকে রয়েছে ফুটপাতবাসী ও অসহায় মানুষের আরও কঠিন জীবন। এই বাস্তবতা কবিকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।
তবু কবি অন্ধকারকে মেনে নিতে চাননি। সূর্যালোক না থাকলেও মানুষের মনে সূর্যালোকের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। এই আলোর আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। তাই কবিতার শেষে কবির কণ্ঠে আশাবাদী ঘোষণা শোনা যায়—“আমরা তো তিমিরবিনাশী।”
অর্থাৎ মানুষের জীবনে যত দুঃখ, হতাশা ও অন্ধকারই থাকুক, তাকে জয় করার চেষ্টা মানুষের মধ্যেই রয়েছে। অন্ধকারের সঙ্গে আপস নয়, অন্ধকারকে দূর করে আলোর পথে এগিয়ে চলাই কবির প্রত্যাশা।
‘তিমির’ ও ‘আলো’-এর প্রতীকী অর্থ
কবিতার ‘তিমির’ ও ‘সূর্যালোক’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক।
‘তিমির’ বলতে এখানে শুধু অন্ধকার বোঝানো হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের হতাশা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, বেদনা, নিরাশা ও জীবনের সংকট।
অন্যদিকে ‘সূর্যালোক’ হল আশা, জ্ঞান, মানবিকতা, সচেতনতা এবং সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতীক। বাস্তব জীবনে সূর্যালোক না থাকলেও মানুষ যখন তাকে ‘মনোরম’ মনে করে হাসে, তখন বোঝা যায়—অন্ধকারের মধ্যেও মানুষের মনে আলোর স্বপ্ন বেঁচে থাকে।
এই দুই প্রতীকের মধ্য দিয়েই কবি মানুষের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
তিমিরহননের গান কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পংক্তির ব্যাখ্যা
“পরস্পরের সাথে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে”
এখানে কবি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সহজ ও স্বাভাবিক অবস্থার কথা বলেছেন। একসময় মানুষ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে ছিল, যেমন জলের সঙ্গে জল মিশে যায়। এর মধ্যে মানুষে মানুষে ঘনিষ্ঠতা, ভালোবাসা ও সামাজিক সংযোগের ইঙ্গিত রয়েছে।
“স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে / একদিন ভালোবেসে গেছি।”
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
এই পংক্তিতে অতীতের একটি উজ্জ্বল সময়ের স্মৃতি ফুটে উঠেছে। মানুষ তখন নিজের উত্তরাধিকার ও অতীতকে নিয়ে লজ্জিত বা হতাশ ছিল না; বরং জীবনকে ভালোবেসে গ্রহণ করেছিল। এখানে জীবনের প্রতি ভালোবাসা ও অতীতের স্মৃতির প্রকাশ ঘটেছে।
“সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু— / তারার আলোর দিকে চেয়ে নিরালোক।”
অতীতে মানুষের মধ্যে যে মূল্যবোধ ও জীবনযাপনের রীতি ছিল, সময়ের পরিবর্তনে তা যেন প্রাণহীন হয়ে গেছে। ‘মৃতের চোখ’ এবং ‘নিরালোক’ শব্দের মাধ্যমে কবি সেই মূল্যবোধের অবক্ষয় ও জীবনের অন্ধকার বোঝাতে চেয়েছেন।
“সূর্যালোক নেই— তবু— / সূর্যালোক মনোরম মনে হ’লে হাসি।”
বাস্তব জীবনে আলো নেই, রয়েছে হতাশা ও অন্ধকার। তবুও মানুষ সূর্যালোককে সুন্দর মনে করে হাসতে চায়। এখানে কবি মানুষের আশাবাদী মন এবং আলোর প্রতি চিরন্তন আকর্ষণকে তুলে ধরেছেন।
“মধ্যবিত্ত মাহুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে”
মধ্যবিত্ত মানুষের নিজের জীবনে দুঃখ, বেদনা ও হতাশা থাকলেও সমাজে এমন মানুষ রয়েছে, যাদের জীবন আরও কঠিন। কবি সেই আরও গভীর দারিদ্র্য ও অসহায়তার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরান। এখানে সামাজিক বৈষম্যের একটি নির্মম ছবি ফুটে উঠেছে।
“নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে বা ম’রে যেতে জানে।”
এখানে ফুটপাতবাসী ও অসহায় মানুষের জীবনযন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে। তাদের মাথার ওপর নিরাপদ আশ্রয় নেই। নক্ষত্রের আলোই তাদের রাতের সঙ্গী। ‘ঘুমাতে বা মরে যেতে’ কথাটির মধ্যে তাদের জীবনের চরম অনিশ্চয়তা ও অসহায়তা প্রকাশ পেয়েছে।
“আমরা বেদনাহীন— অন্তহীন বেদনার পথে।”
পংক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী। ‘বেদনাহীন’ বলা হলেও তারা আসলে ‘অন্তহীন বেদনার পথে’ এগিয়ে চলেছে। এর মাধ্যমে কবি মধ্যবিত্ত মানুষের এমন এক মানসিক অবস্থাকে বোঝাতে চেয়েছেন, যেখানে বেদনা ও সংকটের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভ্যাস তাদের অনুভূতিকে অনেকটা ভোঁতা করে দিয়েছে।
“আমরা কি তিমিরবিলাসী?”
এটি কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কবি নিজেকেই এবং তাঁর সমকালীন মানুষদের প্রশ্ন করেছেন—তারা কি অন্ধকারকে ভালোবেসে ফেলেছে? অর্থাৎ দীর্ঘদিনের হতাশা, সংকট ও অন্ধকারের সঙ্গে থাকতে থাকতে মানুষ কি তার বিরুদ্ধে লড়াই করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেছে?
“আমরা তো তিমিরবিনাশী / হ’তে চাই।”
কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এখানে প্রকাশ পেয়েছে। কবি অন্ধকারকে মেনে নেওয়ার কথা বলেননি। বরং তিনি জানিয়েছেন, মানুষ অন্ধকার ধ্বংস করে আলোর দিকে এগিয়ে যেতে চায়। এই পংক্তিতে কবিতার আশাবাদী ও সংগ্রামী চেতনা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপতিমিরহননের গান কবিতায় মধ্যবিত্ত সমাজের চিত্র
কবিতায় মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। মধ্যবিত্ত মানুষ নিজের জীবনে বেদনা, নিরাশা ও সীমাবদ্ধতা বহন করে চলেছে। কিন্তু তার পাশেই রয়েছে আরও অসহায় মানুষের জীবন—যারা লঙ্গরখানার অন্ন খায়, ফুটপাতে রাত কাটায় এবং কখনও নর্দমা থেকে ওভারব্রিজে, আবার ওভারব্রিজ থেকে নর্দমায় নেমে জীবনের পথ খুঁজে বেড়ায়।
এই দুই শ্রেণির মানুষের জীবনকে পাশাপাশি রেখে কবি সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মানবিক সংকট তুলে ধরেছেন। মধ্যবিত্তের বেদনা যেমন সত্য, তেমনই দরিদ্র মানুষের বেদনা আরও নির্মম। কবিতার এই অংশ সমাজবাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে।
‘তিমিরবিলাসী’ ও ‘তিমিরবিনাশী’—বিরোধের তাৎপর্য
কবিতার শেষ অংশে ‘তিমিরবিলাসী’ এবং ‘তিমিরবিনাশী’ দুটি শব্দ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘তিমিরবিলাসী’ হল সেই মানুষ, যে অন্ধকারের সঙ্গে আপস করে অন্ধকারেই থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। আর ‘তিমিরবিনাশী’ হল সেই মানুষ, যে অন্ধকারকে দূর করতে চায় এবং আলোর সন্ধান করে।
কবি প্রথমে প্রশ্ন করেছেন—“আমরা কি তিমিরবিলাসী?” এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজের উত্তর দিয়েছেন—“আমরা তো তিমিরবিনাশী / হ’তে চাই।”
অর্থাৎ কবি মানুষের ভিতরের সংগ্রামী শক্তির ওপর আস্থা রেখেছেন। অন্ধকার থাকলেও মানুষ তাকে দূর করার স্বপ্ন দেখে—এই আশাই কবিতার শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
তিমির হননের গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর
১। ‘তিমির হননের গান’ কবিতাটি কোন্ প্রেক্ষাপটে লেখা? কবি কেন ‘তিমিরবিলাসী’ নন, ‘তিমিরবিনাশী’ হতে চেয়েছেন? ২+৩
প্রেক্ষাপট: ‘তিমির হননের গান’ কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা। এই কবিতাটি রচিত হয়েছে ১৩৫০ সালের মন্বন্তরের পটভূমিতে। সেই সময় গ্রাম উজিয়েছে শহরের বুকে। হাজার হাজার নিরন্ন মানুষ উদরপূর্তির আশায় শহরের ফুটপাতে, স্টেশনের ওভারব্রিজে আশ্রয় নিয়েছে। সেই নিরন্ন মানুষের মৃত্যুর মিছিলেও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ‘বেদনাহীন’। এমনই প্রেক্ষাপটে কবি আলোচ্যমান কবিতাটির রচনা করেছেন।
তিমিরবিলাসী নয় তিমিরবিনাশী: পাঠ্য ‘তিমিরহননের গান’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ বিংশ শতাব্দীর চারের দশকের মন্বন্তরক্লীষ্ট, অন্ধকার সময়ের কথা বললেও মানবসভ্যতার ইতিহাসের কথা স্মরণ করতে বিস্মৃত হননি। সেই ইতিহাসের দিকে আমরা লক্ষ্য করলে দেখব সভ্যতার অগ্রগতির পথে উত্থান এবং পতন এক স্বাভাবিক বিষয়। এই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার ঘটার বহুযুগ পরে সবথেকে বুদ্ধিমান জীব হিসেবে শুরু হল মানুষের জয়যাত্রা। সেই উদার, উন্মুক্ত মানবজীবনে ছিল না কোনো সংকীর্ণতা। কিন্তু সমসাময়িক অবক্ষয়ের জন্য কবি মানবজাতির উপর প্রথমে ভরসা হারিয়ে ফেলেছিলেন। মধ্যবিত্ত নাগরিকের নিষ্ঠুরতা কবির আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণ করেছিল। তবে কবিতার অন্তিমে এসে কবি তাঁর উপলব্ধিকে ব্যক্ত করলেন। কবি বুঝলেন অন্ধকার হল সাময়িক। মানুষের এই অন্ধকারের প্রতি আসক্তি ক্ষণিকের, কারণ যে-কোনো বিলাসিতাই একটা সময়ের পর ক্লান্তিকর অভ্যাস বলে বোধ হয়। সুতরাং এই অন্ধকার-বিলাসও একদিন মানবমনের প্রজ্ঞার আলোয়, জ্ঞানের দীপ্তিতে, চেতনার উদ্ভাসে দূরীভূত হয়ে যাবে। মানুষ পুনরায় আলোর পথে এগিয়ে যাবে, কারণ মানবসভ্যতা সূর্যালোক দ্বারা চালিত এবং মানুষ সত্যের পূজারী। সুতরাং সভ্যতার অগ্রগতির স্বার্থেই কবি ‘তিমিরবিনাশী’ হতে চেয়েছেন।
২। “আমরা কি তিমিরবিলাসী?” কবির মধ্যে কেন এই প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে, আলোচনা করো।
সমকাল যাঁকে স্বীকৃতি না দিলেও উত্তর কালের সাহিত্য রসপিপাসুর কাছে যিনি সমাদর লাভ করেছিলেন তিনি হলেন ‘প্রকৃতির কবি’, ‘প্রকৃত কবি’ জীবনানন্দ দাশ। ১৩৫০ এর মন্বন্তরের কালবেলায় রচিত তাঁর প্রতিনিধি স্থানীয় কবিতা হল ‘তিমির হননের গান’। কবিতার মধ্যে জিজ্ঞাসার পাশাপাশি এক সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা ও গভীর প্রত্যয়ে প্রকাশ ঘটেছে। সেখানে কবি তাঁর সহজাত প্রতিভায় হতাশা, নৈরাশ্যকে দূরে সরিয়ে আশাবাদে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
বিশ্বযুদ্ধের করালগ্রাসে সভ্যতা আচ্ছন্ন। মানুষের মনের গোপনে জমে থাকা লোভ লালসা, লাভের ভাবনার অন্ধকার মানবিকতাকে আচ্ছন্ন করেছে। অস্থির সময়কালের অনন্ত আদিমতা মানুষ ও তার সভ্যতাকে গ্রাস করেছে। সেখানে শুধুই সম্ভাবনাহীনতা আর আদিমতার আধিপত্য। সেই আদিমতম অন্ধকারের ফলশ্রুতিতে বাংলার বুকে আছড়ে পড়েছে মন্বন্তরের ঢেউ।
কবি জানেন ও মানেন শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজ যতই বাস্তব পরিস্থিতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখুক না কেন তাদের মধ্যে রয়েছে এক মানবিক সত্তা। এর বিনাশ নেই। আবহমান হিংসা, প্রতিহিংসা, লোভ, লালসা, মূল্যবোধহীনতার শিকার হলেও মানুষ কখনোই এর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করবে না। মানুষের মনের মধ্যেই রয়েছে এই প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার উদগ্রবাসনা। সেই বাসনার জাগরণে আমি মানুষ তুমি মানুষের ভাবনায় ভাবিত হবে, প্রাণিত হবে। সেই প্রাণনার বলেই সে তিমির হননে অগ্রসর হবে। ভেতরের ও বাইরে যে অন্ধকার রয়েছে তাকে হত্যা করতে সাহসী হবে, আগুয়ান হবে।
মানুষ অমৃতের সন্তান। তার প্রাণ ধর্মে রয়েছে মানবতার মন্ত্র। অন্ধকারের গর্ভ থেকে যে আলোর উৎসার মানুষ যেই আলোর পিয়াসী। তাই সে তিমির বিলাসী নয় সে তিমির বিনাশী। তিমিরের হননই তার একমাত্র লক্ষ, একমাত্র কর্তব্য। সেকারণেই কবি প্রশ্নোদ্ভূত পঙ্ক্তিটির মধ্যে প্রশ্নের জোগান দিয়েছেন।
৩। “সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু” —’সেই সব রীতি’ বলতে কোন্ রীতির কথা বলা হয়েছে? তাকে ‘মৃতের চোখের মতো’-ই বা বলা হয়েছে কেন?
অথবা, “সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু” —’মৃতের চোখের মতো’ রূপকটি কীভাবে কবিতায় তিমির বা অন্ধকারের প্রতীক রূপে কাজ করেছে এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও বিষণ্ণতাকে প্রকাশ করেছে, তা কবিতা অনুসারে লেখো।
যে রীতি: জীবনে চলার পথে মানুষ যা কিছু অর্জন করেছে তার মধ্যে অন্যতম হল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। একে অপরকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে মানুষ গড়ে তুলেছিলো আত্মীয়তার বন্ধন ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষ হয়ে উঠেছে আত্মকেন্দ্রিক ও সুবিধাবাদী, ক্ষণিকের প্রাপ্তির মোহে অন্ধ মানুষ অতীতের সেইসব আন্তরিক রীতি ভুলতে বসেছে। ফলে মানুষে-মানুষে সম্প্রীতি, স্বার্থহীন ভালোবাসার যে রীতি, যে স্মরণীয় উত্তরাধিকার তা ক্রমশ বিনষ্ট হয়ে চলেছে।
মৃতের চোখের মতো বলার কারণ: একদা যেসব অভ্যাস মানুষকে প্রগতির পথে চালিত করেছিল, মানুষের দৃষ্টিকে করেছিল আকাশের মতো উদার- সেইসব গৌরবময় সংস্কার, সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ আজ মানুষের মনের অন্ধকারের কাছে পরাজিত। ফলে মানবতা বিপন্নতার সম্মুখীন, বিশ্বশান্তি প্রশ্নচিহ্নের মুখে। যে আকাশের মতো দৃষ্টির প্রসারতা নিয়ে মানুষ মানুষকে আপন করে নিত, সেই দৃষ্টিতে বর্তমানে কেবলই সংকীর্ণতার আঁধার দেখা যায়। কবি মানুষের এই ভাবলেশহীন নির্বিকার দৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করেছেন মৃতের চোখের। কেন-না, বিংশ শতকের বাংলা প্রত্যক্ষ করেছিল দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, দুটো মহাযুদ্ধ, শরণার্থী সমস্যা, বেকারত্ব। অথচ এত কিছু দেখার পরেও মধ্যবিত্ত নাগরিকের দৃষ্টিতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ধরা পড়েনি অনুভূতির কোনো বিশেষ প্রতিফলন। তাই কবি জীবনানন্দ দাশ মধ্যবিত্ত নাগরিকের এই উদাসীন, আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিকে ‘মৃতের চোখের মতো’ বলেছেন।
৪। “স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে” — স্মরণীয় উত্তরাধিকার বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন। তাতে কোনো গ্লানি নেই কেন?
অথবা, “স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে” —’স্মরণীয় উত্তরাধিকার’ শব্দবন্ধটি এই কবিতায় কেন এসেছে? ‘গ্লানি নেই’ বলারই বা কারণ কী?
স্মরণীয় উত্তরাধিকার: স্মরণীয় শব্দটি দিয়ে যা কিছু মনে রাখার বা স্মরণ করার যোগ্য তা বোঝানো হয়। অন্যদিকে ‘উত্তরাধিকার’ হল উত্তরপুরুষ হিসেবে পূর্বপুরুষদের থেকে সম্পদ প্রাপ্তির অধিকার। এখানে কবি উক্ত শব্দবন্ধের দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন সভ্যতার প্রারম্ভ থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানুষ তার জীবনের পথে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল- তাই-ই তার ‘স্মরণীয় উত্তরাধিকার’। কিন্তু এই উত্তরাধিকারে আজ থাবা বসিয়েছে মানুষের অমানবিক আচরণ যাকে কবি মানবসভ্যতার ‘গ্লানি’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
গ্লানি নেই বলার কারণ: এই কবিতায় ‘গ্লানি’ অর্থে মানুষের মনের মলিনতাকে ইঙ্গিত করেছেন কবি। গ্লানির বোধ একমাত্র সেই মানুষেরই হতে পারে যার চেতনা আছে, যে চিন্তা করে। নিজের কাজের গাফিলতি বা স্খলনকে চিহ্নিত করে যে সংশোধনে সচেষ্ট হয় সে-ই প্রকৃত বোধসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু বর্তমানে মানুষ তার স্বার্থপর জীবনযাপনের পথে নিজের ত্রুটিকেই স্বীকার করতে চায় না, আত্মগ্লানিতে ভোগা তো দূরের কথা। মানুষের ‘স্মরণীয় উত্তরাধিকার’ যে কেবল হাসি-খেলার বিষয় নয়, তাতে মিশেছে মানুষের অন্তরের অন্ধকার, আর সেই নিয়ে মানুষের মনে কোনো গ্লানি নেই, নিজেকে সে নির্দ্বিধায় বিলাসিতার অন্ধকারে সঁপে দিয়েছে, তা উপলব্ধি করেই কবি সে বিষয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।
৫। “আরো বেশি কালো-কালো ছায়া / লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে” — কালো-কালো ছায়া বলতে কী বোঝানো হয়েছে? তারা লঙ্গরখানার অন্ন খায় কেন? ৩+২
কালো-কালো ছায়া: সময়টা ১৯৪৩, বাংলার বুকে ঘনিয়ে এল সে মন্বন্তরের ছায়া; সেই মন্বন্তরের মাঝে খাবারের সন্ধানে গ্রাম থেকে মানুষ উঠে এল শহরে। শহরে বসবাসকারী উচ্চবিত্ত নাগরিক কালোবাজারির মাধ্যমে মুনাফা লুটতে লাগল। আর মধ্যবিত্ত নাগরিক এরকম আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে আত্মগ্লানিতে ফেটে না পড়ে বিরক্ত হল। কারণ মন্বন্তরক্লীষ্ট অসময়ে তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ হচ্ছিল না, ফলে স্বভাবতই উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণি মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্বযুদ্ধ, বেকারত্ব নিয়ে চিন্তিত ও বিষণ্ণ ছিল। যে কিন্তু তাদের মনের এই বিষণ্ণতার ছায়ার থেকেও বৃহত্তর ক্ষুধার আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল বাংলার বুকে যা তাদের মৃতের মতো চোখে ধরা পড়েনি। খিদের জ্বালায় শহরে চলে আসা মানুষের ক্ষীণ চেহারা দেখে মানুষ নয়, মানুষের কালো ছায়া বলে ভ্রম হয়েছিল কবির, সেকথাই তিনি কবিতার উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটিতে প্রকাশ করেছেন।
লঙ্গরখানা প্রসঙ্গ: লঙ্গরখানা হল দুর্গত মানুষদের বিনামূল্যে খাওয়ার স্থান। সাধারণত সরকারি বা কখনও বেসরকারি উদ্যোগে এখানে খাদ্য বিতরণ করা হয়। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় বাংলার বুকে প্রচুর লঙ্গরখানা খোলা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা পর্যাপ্ত ছিল না। দেশের উৎপাদক শ্রেণি অর্থাৎ কৃষিজীবি, শ্রমজীবি মানুষের উপরেই এই মন্বন্তরের – সর্বাধিক প্রভাব পড়েছিল। একটু ভাত, নিদেনপক্ষে সামান্য ফ্যানের প্রত্যাশায় তারা লাইন করে দাঁড়িয়েছিল লঙ্গরখানার সামনে- যাদের – অস্থিসর্বস্ব চেহারা দেখে কবির মনে হয়েছে তারা মানুষ নয়, সমাজের *বুকে যে অবক্ষয়ের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে এরা যেন তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আরো পড়ুন : হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস
৬। ‘তিমির হননের গান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
সাহিত্যের নামকরণের শুধু শব্দ বা শব্দরাজিই নয়। এর মধ্যে স্রষ্টার মনন, মানসিকতা ও বিষয়ের প্রতি দখলের পরিচয় ব্যক্ত হয়। স্রষ্টা তার সৃষ্টির নামকরণের কায়া নির্মাণ করেন বিষয়, চরিত্র ও ব্যঞ্জনার নিরিখে। এখন আমরা বিচার করব জীবনানন্দ দাশের ‘তিমির হননের গান’ নামক কবিতার নামকরণ তিনি কোন্ অভিমুখে ধরতে চেয়েছেন।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যমালায় বিশিষ্ট কাব্য হল ‘সাতটি তারার তিমির’। কাব্যের একাধিক বিশিষ্ট কবিতার মধ্যে অন্যতম কবিতা হল ‘তিমির হননের গান’ কবিতাটি। কবিতার সূচনা ঘটেছে দূর থেকে দূরতর অতীতের গর্ভে। কবি কবিতার মূল প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন সময়ের সরণি বেয়ে। প্রাগৈতিহাসিক যুগকে অতিক্রম করে তিনি সমকালে এসেছেন। ১৩৫০ এর করালগ্রাস আচ্ছন্ন করেছে মানুষকে। মানুষের জীবনের সমুন্নতির আলো আজ নিভে গেছে। একদিন যে চোখে ছিল আলোর উজ্জ্বলতা, আকাশের মতো বিরাট বিস্তৃতি আজ তা নিভে গেছে। সেখানে নিরালোকের অপ্রতিরোধ্য অবস্থান। হেমন্তের কুয়াশা মাখা প্রান্তরে তারার আলো আজ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মনুষ্যত্বের অবনমন, অন্নসংকট, মন্বন্তর আর মৃত্যু মিছিলের চিত্র প্রকট হয়েছে। এই বিপর্যয় মানুষের স্বেচ্ছাকৃত। প্রকৃতি এখানে নির্বাক দর্শক। মানুষের সীমাহীন লোভ আর লালসা মানুষকে চরম সংকটের মধ্যে এনে ফেলেছে। অগত্যা লঙ্গরখানার অন্নে উদর পূর্তির ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছে।
চারিদিকে অসহায় মানুষের আর্তনাদ, ফুটপাত আর স্টেশনের ওভারব্রিজে আশ্রয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘোরা। এসব কিছুর মাঝেও আমরা বেদনাহীন, স্বার্থপর, উদাসীন। কবি সেই উদাসীনতার প্রতি ব্যঙ্গের বাণ নিক্ষেপ করেছেন। তিনি জানেন মানুষের সভ্যতার ইতিহাস। ধারাবহিকতার পথ বেয়ে মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর উদ্দেশে যাত্রা করেছে। মানুষ সততই আলোর প্রত্যাশী। আঁধারের মাঝেও যে আলো আছে সেটাই তো জগতের চালিকা শক্তি, সৃষ্টির প্রায় না।
কবিতার শেষে পরপর তিন পঙ্ক্তিতে কবি তাঁর মূল বক্তব্যকে উপস্থাপিত করেছেন। যার প্রথম অংশে আছে কবির জিজ্ঞাসা- আমরা তথা মানুষ তিমির বিলাসী কী না। উত্তরে অবশ্যই নঞর্থক। তার উত্তরে না দিলেও পরের দুই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে কবি তাঁর স্বীয় ভাবনার প্রকাশ করেছেন। তিনি ব্যক্ত করেছেন আকাঙ্ক্ষার কথা-‘আমরা তো তিমির বিনাশী হতে চাই।’ এ আকাঙ্ক্ষা শুধু কবির নিজের মধ্যে নয় ‘সমগ্র মানব সমাজের মধ্যে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। তাই শেষ পঙ্ক্তিতে উল্লেখ করেছেন এক গভীর প্রত্যয়ের ‘আমরা তো তিমির বিনাশী’।
প্রকৃত অর্থেই এ কবিতা হয়ে উঠেছে তিমির বিলাসের নয় তিমির বিনাশের গাথা। আবহমান তিমির অবগাহন করে নতুন সমাজ সভ্যতা আর জীবনের সূচনার আশাবাদের গাথা। দুই শব্দের ব্যঞ্জনায় নৈরাশ্য থেকে আশাবাদ, অন্ধকার মোচন করে জীবনের জয়গানের কথাকে বিধৃত করেছেন শব্দ সচেতন শিল্পী জীবনানন্দ দাশ। তাই ব্যঞ্জনধর্মী নামকরণ হিসেবে ‘তিমির হননের গান’ কবিতাটি হয়ে উঠেছে সার্থক ও সুপ্রযুক্ত।
৭। ‘হয়তো বা জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিল’ — জীবনকে কীভাবে শিখে নিতে চেয়েছিল? ৫
প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিনিধিস্থানীয় কবিতা হল ‘তিমির হননের গান’। কবিতাটি কবি ১৩৫০ সালের মন্বন্তরের পটভূমিতে রচনা করেছিলেন। কবি তাঁর মূল বক্তব্য তুলেধরার আগে কবিতার সূচনা ঘটিয়েছে দূর থেকে দূরতর অতীতের গর্ভে। প্রাগৈতিহাসিক সেই যুগে পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর সুবিশাল জলরাশির মধ্যে। সেই সৃষ্টিলগ্ন থেকেই জল হয়ে উঠেছে প্রাণের আধার ও প্রধান সহায়। আণুবিক্ষনিক জীব থেকে সবুজ শ্যাওলা সূর্যের আলোর স্পর্শ গায়ে মেখেছে। সৃষ্টিলগ্নের সূর্যের আলো তার মধ্যে বলবীর্যের সঞ্চার করেছে।
ক্রমে জীব জগতে লেগেছে আলোড়ন। অর্থাৎ বিবর্তনের ছাপ পড়েছে প্রাণের মধ্যে। এই বিবর্তনের ধারায় মানুষের সৃষ্টি। ক্রমে পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিকে সে পিছনে ফেলে দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেছে। কালক্রমে সেই হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সেরা সৃষ্টি। মেধা, বুদ্ধি, মনন দ্বারা তাড়িত, চালিত ও প্রাণিত হয়ে তারা গুহার আঁধারের জীবন পিছনে ফেলে সভ্যতার সূচনা করেছে। সেই সভ্যতার আলোয় একত্রিত হয়েছে। গঠন করেছে সমাজ, জনপদ, সভ্যতা, রাষ্ট্রের। সেই রাষ্ট্রের গঠন ও পরিচালনার সূত্রে তার মধ্যে জন্ম নিয়েছে হিংসা, প্রতিহিংসা, লোভ-লালসার মতো বিপরীতধর্মী আচরণগুলি। আর তারই বলে সে মনযোগী হয়েছে আধিপত্য বিস্তারে, সাম্রাজ্যের প্রসারে। কালের প্রবহমাণধারায় এভাবেই সে জীবনের ধর্মকে শিখেছে জীবন চর্যার মধ্য দিয়ে।
৮। ‘এরা সব এই পথে; / ওরা সব ওই পথে-তবু’ — ‘এরা সব এই পথে; / ওরা সব ওই পথে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ‘তবু’ শব্দটির প্রয়োগের কারণ কী? ৩+২
সময় সচেতন শিল্পী জীবনানন্দ দাশের তিমির হননের গান’ কবিতাটি সমকালীন সমাজের এক বাস্তব চিত্র। ১৩৫০ -এর মন্বন্তরের পটভূমিতে কবিতাটির কায়া নির্মাণ। স্মরণীয় অতীতকে পিছনে ফেলে মানুষ আজ এগিয়ে চলেছে। তার মধ্যে জন্ম নিয়েছে লোভ লালসা, প্রবঞ্চনা, মানবিক অনুভূতিহীনতার মতো মানব সভ্যতার পরিপন্থি দিকগুলি। বিশ্বযুদ্ধের প্রচণ্ডতায় মুনাফাবাজ আর কালোবাজারির দৌলতে বাংলার বুকে নেমে এসেছিল মন্বন্তর। সেই মন্বন্তরের অভিঘাতে প্রান্তিক মানুষ হয়েছিল দিশেহারা। অন্নদাতারা অন্নের প্রার্থনার ভিড় জমিয়েছিল শহরের বুকে। গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে নিরন্ন মানুষের হাহাকার আর অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মৃত্যুর মিছিল। সেই অনাহারক্লিষ্ট মানুষেরা ছিল দিশেহারা। আর শহুরে মধ্যবিত্ত ছিল উদাসীন, নির্বিকার। কবি সেই দিশেহারা ও উদাসীন মানুষদের বোঝাতেই ‘এরা’ ও ‘ওরা’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
‘তবু’ হল একটি অব্যয় পদ। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বিভিন্ন অব্যয়পদের মধ্যে ‘তবু’ অব্যয় পদের ব্যবহার হয়েছে বারে বারে। আলোচ্যমান কবিতাতেও কবি ‘তবু’ অব্যয়টির একাধিক বার ব্যবহার করেছেন। এখানে ‘তবু’ অব্যয়টির ব্যবহার হয়েছে এক বিশেষ অর্থে। চারদিকে নিরন্ন মানুষের হাহাকার আর মৃত্যুর মিছিল। সেই মৃত্যুর আর অসহায়তার মাঝেও শহুরে মধ্যবিত্ত নির্বিকার উদাসীন। তারা যেন নিজের মধ্যে নিজেই মশগুল। তাদের সেই মনোভাব ব্যক্ত করতেই কবি ‘তবু’ অব্যয়টির প্রয়োগ করেছেন।
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| HS 3rd Semester Bengali Last Minute Suggestion 2026-27 | উচ্চমাধ্যমিক তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা লাস্ট মিনিট সাজেশন 2026-27 | Click here |
| পথের দাবী গল্পের প্রশ্ন উত্তর | প্রশ্নমান MCQ 1, 3, 5 | ক্লাস 10 | Pother Dabi Golper Question Answer | Click here |
| বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর | প্রশ্নমান MCQ 1, 3, 5 | ক্লাস 10 | Bohurupi Golper Question Answer | Click here |
| বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো MCQ | Class 11 1st Semester Bengali | Click here |