স্বাধীনতা উত্তর ভারত প্রশ্ন উত্তর (ষষ্ঠ অধ্যায়) | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস

Table of Contents

স্বাধীনতা উত্তর ভারত প্রশ্ন উত্তর (ষষ্ঠ অধ্যায়) | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস | HS 4th Semester History Long Question answer 6th Chapter

স্বাধীনতা উত্তর ভারত প্রশ্ন উত্তর
স্বাধীনতা উত্তর ভারত প্রশ্ন উত্তর

১। ভারতের গণপরিষদের গঠন আলোচনা করো।
অথবা, গণপরিষদ কীভাবে গঠিত হয়েছিল?
অথবা, গণপরিষদ গঠনের প্রস্তুতি ও তার বাস্তবায়ন সম্পর্কে লেখো।
অথবা, সংবিধান সভা কীভাবে গঠিত হয়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে শ্রমিক দল

(Labour Party) ক্ষমতায় আসে। এই নতুন সরকার ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার মন্ত্রী মিশন-কে ভারতে পাঠায় (১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ)। মন্ত্রী মিশন ভারতে গণপরিষদ গঠনের রূপরেখা নির্দিষ্ট করে দেয়।

গণপরিষদের গঠন / সংবিধান সভা গঠন/ গঠনের প্রস্তুতি:

ভারতের সাংবিধানিক গতিপ্রকৃতির ইতিহাসে গণপরিষদের প্রতিষ্ঠা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।

মন্ত্রী মিশন না ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনা: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি কর্তৃক প্রেরিত ৩ জন সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রী মিশন বা ক্যাবিনেট মিশনের সদস্যরা ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ ২ দিল্লিতে এসে পৌঁছান। ক্যাবিনেট মিশন ভারতের সংবিধানের মূল কাঠামোর সুপারিশ এবং গণপরিষদের গঠনের পদ্ধতি কী হবে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।

চারটি মূল নীতি: ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনা ও অনুসারে চারটি মূল নীতির উপর ভিত্তি করে ভারতীয় গণপরিষদ গঠনের ব্যবস্থা করা হয়। যথা—

  • (i) ব্রিটিশশাসিত প্রদেশ ও দেশীয় রাজাগুলি তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে গণপরিষদে আসন পাবে। প্রতিটি প্রদেশ প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার জন্য একজন করে প্রতিনিধি গণপরিষদে পাঠাবে।
  • (ii) গণপরিষদের সকল আসন সাধারণ (অ-মুসলমান ও অ-শিখ), মুসলমান ও শিখ-এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে আনুপাতিক হারে বিভক্ত হবে।
  • (iii) প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে অবস্থিত প্রতিটি সম্প্রদায়ের সদস্যগণ একক হস্তান্তরযোগ্য সমানুপাতিক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবে।
  • (iv) দেশীয় রাজ্যগুলিকে ৯৩ জন প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়।

প্রতিনিধিত্বের বিভাজন : গণপরিষদ গঠনের এই মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী স্থির হয় যে, জন্য ক্যাবিনেট মিশন বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করে। গণপরিষদের মোট সদস্য থাকবেন ৩৮৯ জন।

ব্রিটিশশাসিত প্রদেশের ২৯২ জনের সম্প্রদায়গত বিভাজন ছিল।

এ ছাড়া স্থির করা হয়, গণপরিষদ গঠনের পরে পরিষদে একজন সভাপতি ও অন্যান্য পদাধিকারীদের নির্বাচন করা হবে।

গণপরিষদ গঠনের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন:

নির্বাচন: মন্ত্রী মিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে গণপরিষদ গঠনের জন্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশশাসিত ও চিফ কমিশনার-শাসিত প্রদেশ থেকে (২৯২+৪ = ২৯৬) কংগ্রেস ২০৮টি আসনে বিজয়ী হয়। মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ৭৮টি আসনের মধ্যে মুসলিম লিগ পায় ৭৩টি আসন। বাকি আসনগুলি কমিউনিস্ট পার্টি, সোশ্যালিস্ট দল, নির্দল প্রভৃতি ছোটো ছোটো গোষ্ঠীগুলি লাভ করে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দলগত বিচারে গণপরিষদ নির্বাচনে কংগ্রেস দল সবথেকে বেশি আসন পায়। তারা প্রায় ৬৯ শতাংশ আসন লাভের মাধ্যমে অর্জন করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ক্রমশ বিভিন্ন প্রতিনিধিরাও গণপরিষদে যোগ দেন। এরপর অনেক টালবাহানার মধ্যে দিয়ে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১ ডিসেম্বর গণপরিষদ সংবিধান রচনার কাজ শুরু করে।

ভারতীয় গণপরিষদে যেসকল বিশিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচিত হন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-জওহরলাল নেহরু, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, ড. বি আর আম্বেদকর, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ।

২। গণপরিষদের উল্লেখযোগ্য সদস্য কারা ছিলেন? গণপরিষদের প্রথম অস্থায়ী ও স্থায়ী সভাপতির নাম কী?

গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ: ভারতের গণপরিষদে যেসকল প্রথিতযশা ব্যক্তি নির্বাচিত হন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ড. বি আর আম্বেদকর, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, এইচ এন কুঞ্জুর, তেজবাহাদুর সপ্রু ড. সর্বপল্লী রাধাকৃয়ণ, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, কে শাখানাম, আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আইয়ার, কে এম মুন্সি প্রমুখ।

মহিলা সদস্যবৃন্দ: মহিলা সদস্যদের মধ্যে বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, সরোজিনী নাইডু, দুর্গাবাঈ, রাজকুমারী অমৃত কৌর প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

প্রথম অস্থায়ী ও স্থায়ী সভাপতি:

গণপরিষদের প্রথম অস্থায়ী সভাপতি ছিলেন-সচ্চিদানন্দ সিনহা এবং প্রথম স্থায়ী সভাপতির নাম ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।

৩। ভারতের ইতিহাসে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারির গুরুত্ব কী?

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারির গুরুত্ব

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি দিনটি ভারতবাসীর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ওইদিন থেকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

সংবিধান কার্যকর: ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকরী হয়।

প্রথম সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপন : ভারতীয় সংবিধানে ভারতকে গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বলা হয়েছে। ভারতের নেতৃবৃন্দ ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে সাধারণতন্ত্র দিবস হিসেবে স্মরণীয় করে রাখেন। প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবস (Republic Day) হিসেবে উদ্যাপিত হয়।

২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক গুরুত্ব: পরাধীন ভারতে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি কংগ্রেসের নবগঠিত কার্যনির্বাহক কমিটির বৈঠকে স্থির হয়েছিল যে, পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হবে। সেই অনুসারেই ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি সারাদেশে ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করে প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। জনসাধারণও স্বাধীনতার শপথবাক্য পাঠ করেন। এরপর থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৬ জানুয়ারি দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করে ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের নেতৃত্বে রচিত খসড়া সংবিধান ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত হলেও, তা ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি থেকে কার্যকরী করা হয়।

৪। টীকা লেখো: ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা। অথবা, ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনাটি ব্যাখ্যা করো।

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা:

ভারতীয় সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রস্তাবনা বা Preamble. প্রস্তাবনাকে মূলত ভারতীয় সংবিধানের দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এটিকে সংবিধানের মুখবন্ধ-ও বলা যেতে পারে। এ ছাড়াও সংবিধানের প্রস্তাবনাকে সংবিধানের ক্ষুদ্র সংস্করণ, সংবিধানের বিবেক বা সংবিধানের আত্মা বলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান থেকে ভারতের সংবিধানে প্রস্তাবনার ধারণাটি গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর জওহরলাল নেহরু গণপরিষদে তাঁর উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাবগুলি উত্থাপন করেন এবং সেগুলি সংশোধনের পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি অনুমোদিত হয়। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনাটি রচিত হয়েছে।চী

প্রস্তাবনার মূল বক্তব্য: বর্তমানে সংবিধানের প্রস্তাবনাটি হল- আমরা, ভারতের জনগণ, সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে সংকল্প করে ভারতকে একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে এবং তার সকল নাগরিকই যাতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা: মর্যাদা ও সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য ভোগ করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তির মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুনিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোধ-এর প্রসারকল্পে আজ ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর আমাদের গণপরিষদে এই সংবিধান গ্রহণ, বিধিবন্ধকরণ এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

প্রস্তাবনার সংযোজন: ভারতীয় সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় সমাজতন্ত্র (Socialist), ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) এবং সংহতি (Integrity) – এই শব্দগুলি ছিল না। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ৪২তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই শব্দগুলি সংযোজিত হয়েছে।

প্রস্তাবনার ব্যাখ্যা:

(i) জনগণের স্বরূপ: প্রস্তাবনায় আমরা ভারতের জনগণ এই কথাটির দ্বারা বলা হয়েছে যে, ভারতের জনগণ হল সংবিধানের রচয়িতা ও সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস।

ভারতের স্বরূপ: প্রস্তাবনায় ভারতকে সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বলা হয়েছে।

সার্বভৌম : সার্বভৌম বলতে বোঝায় ভারত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনও বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থার নির্দেশে ভারত রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না।

সমাজতান্ত্রিক: ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের (Marxist Socialism) পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র (Democratic Socialism) গৃহীত হতে দেখা যায়। মূলত দারিদ্র্য দুরীকরণ এবং জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতীয় সমাজতন্ত্র গঠিত হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষ : ধর্মনিরপেক্ষ বলতে বোঝায় ভারত রাষ্ট্রের কোনও নিজস্ব ধর্ম নেই। তাছাড়া রাষ্ট্র কোনও বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাত বা বিরোধিতা করে না।

গণতান্ত্রিক: সংবিধানের প্রস্তাবনায় গণতান্ত্রিক শব্দটির মাধ্যমে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও পৌর অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের মাধ্যমে কেন্দ্র, রাজ্য ও স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।

সাধারণতন্ত্র: রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। জনগণই হল সরকারের সকল ক্ষমতার উৎস।

(iii) নাগরিক অধিকার: প্রস্তাবনায় প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্ব অর্থাৎ, ব্যক্তির মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার কথা স্বীকৃত হয়েছে।

সংবিধানের প্রস্তাবনার গুরুত্ব প্রসঙ্গে পন্ডিত ঠাকুরদাস ভার্গব বলেছেন যে, প্রস্তাবনাই হল সংবিধানের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান অংশ-সংবিধানের প্রাণ।

৫। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ/ধারণা বলতে কী বোঝো?

ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ/ধারণা:

ভারতবর্ষ হল বহু ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশ। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ বা Secular শব্দের উল্লেখ রয়েছে। ল্যাটিন শব্দ Saeculum থেকে ইংরেজি Secular শব্দটি এসেছে।

প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ শব্দের সংযোজন: ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৪২ তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ বা Secular শব্দটি সংযোজিত হয়েছে।

সংকীর্ণ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা : সংকীর্ণ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা বা সাধারণ জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে ধর্মকে পৃথক রাখাকে বোঝায়। ভারতে এমন সংকীর্ণ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার আর্দশ গ্রহণ করা হয়নি।

ব্যাপক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা : ব্যাপক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হল ধর্মের বিষয়ে নিরপেক্ষতা। এখানে বিশেষ কোনও ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়ে রাষ্ট্রের দিক থেকে কোনও বিশেষ আচরণ কাম্য নয়।

ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে অধ্যাপক জোহারি-র মত: অধ্যাপক জোহারি-র মতে, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যথা-ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা উদার প্রকৃতির। এখানে ধর্ম বিষয়ে সমানাধিকারের পাশাপাশি সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়গুলির কিছু বিশেষ অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা প্রকৃতিগতভাবে গতিশীল। এখানে রাষ্ট্রের জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে প্রয়োজন অনুসারে ধর্মীয় রীতি লঙ্ঘন করে আইনও তৈরি করা যেতে পারে।

ভারতীয় সংবিধানের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতা: প্রাচীন ভারতে যে পরধর্মসহিষুতার আদর্শের উপস্থিতি ছিল, তারই পরিবর্তিত রূপ হল ধর্মনিরপেক্ষতা। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় মূলত ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিবাচক আদর্শকে গ্রহণ করা হয়েছে। সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নং ধারায় প্রকাশিত আদর্শে বলা হয়েছে যে- ভারত রাষ্ট্রের কোনও বিশেষ ধর্ম বা নিজস্ব ধর্ম থাকবে না। রাষ্ট্র কোনও বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না, রাষ্ট্রের কাছে সব ধর্মই সমান। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবে এবং রাষ্ট্র সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্য সমান সুযোগসুবিধার বিষয়টি সুনিশ্চিত করবে।

৬। ভারতীয় সংবিধানের দুটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করো।

ভারতীয় সংবিধানের বৈশিষ্ট্য:

ভারতীয় সংবিধানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল-

বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত ও জটিল সংবিধান:

বিশ্বের লিখিত সংবিধানগুলির মধ্যে ভারতের সংবিধান সর্বাপেক্ষা বিশাল, তথ্যবহুল ও জটিল। বিচারপতি মেহেরচাঁদ মহাজন বলেছেন- পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে ভারতবর্ষের মতো এত বিশাল শাসনতন্ত্র নেই। প্রবর্তনের সময়কালে এই সংবিধানে মোট ৩৯৫টি ধারা (Article) এবং ৮টি তফসিল (Schedule) ছিল। পরবর্তীকালে কয়েকবার সংশোধনের ফলে কয়েকটি অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণভাবে এবং কয়েকটি আংশিকভাবে বাদ পড়েছে। আবার কিছু নতুন ধারা সংযোজিতও হয়েছে। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে ১০৬ তম সংবিধান সংশোধনের পর সংবিধানে রয়েছে মোট ৪৪৮টি ধারা এবং ১২টি তফসিল। ভারতীয় সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে সম্পর্ক, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসনকাঠামো, মৌলিক অধিকার, নির্দেশমূলক নীতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ থাকার ফলে এই সংবিধান আয়তনে বিশাল এবং চরিত্রে জটিল হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় ও এককেন্দ্রিক সরকারের সমন্বয়: ভারতীয় সংবিধান হল- যুক্তরাষ্ট্রীয় ও এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সমন্বয়। সংবিধান অনুযায়ী ভারতকে একটি যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শে গঠন করা হয়েছে। একাধিক অঙ্গরাজ্যের সমন্বয়ে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠিত। সংবিধানে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে তিনটি তালিকার মাধ্যমে ক্ষমতা বণ্টন করা হয়েছে। এগুলি হল- কেন্দ্রীয় তালিকা, রাজ্য তালিকা ও যুগ্ম তালিকা। কেন্দ্রীয় তালিকাভুক্ত বিষয়গুলির উপর কেন্দ্রীয় সরকারের, রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়গুলির উপর রাজ্য সরকারের এবং যুগ্ম তালিকাভুক্ত বিষয়গুলির উপর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের যৌথ কর্তৃত্ব স্বীকৃত। অর্থ, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, পররাষ্ট্র সম্পর্ক ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি কেন্দ্রীয় তালিকার অন্তর্ভুক্ত। আবার এই তিনটি তালিকার বাইরেও সকল বিষয়ের উপর কেন্দ্রের ক্ষমতা স্বীকার করা হয়েছে। এই ক্ষমতাবণ্টন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারকে অধিক ক্ষমতাশালী করার প্রবণতা স্পষ্ট। তবে ভারত যুক্তরাষ্ট্র হলেও এখানে অঙ্গরাজ্যের পৃথক সংবিধান নেই। কেন্দ্র বিশেষ বিশেষ কারণে অঙ্গরাজ্যের প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ফলে শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রাভিমুখী হয়ে পড়েছে। তাই সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলেছেন- ভারতীয় সংবিধান আকারে যুক্তরাষ্ট্রীয়, কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে এককেন্দ্রিক। ড. বি আর আম্বেদকরের মতে, এই আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয় (Quasi-federal)।

৭। ভারতীয় সংবিধানের বৈশিষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কীভাবে পরিলক্ষিত হয়?

সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার আদর্শ ১৯৩৫ যুক্তরাষ্ট্র বা Federal কথাটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Foedus থেকে, যার অর্থ চুক্তি। ভারতীয় খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন থেকে গৃহীত হয়েছে। তবে সংবিধানে কোথাও ভারতবর্ষকে যুক্তরাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হয়নি। বরং সংবিধানের ১নং ধারায় ভারতকে রাজ্যসমূহের ইউনিয়ন বলে অভিহিত করা হয়েছে।

ভারতীয় সংবিধানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা:

যুক্তরাষ্ট্রের যে-সমস্ত স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থাকে, ভারতের শাসনব্যবস্থাতেও তার বেশকিছু বৈশিষ্ট্য বর্তমান। এগুলি হল-

কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে মতার বণ্টন: ভারতীয় সংবিধান কর্তৃক কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে কেন্দ্রীয়, রাজ্য ও যুগ্ম-এই তিনটি তালিকার মাধ্যমে ক্ষমতার বণ্টন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় তালিকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল-প্রতিরক্ষা, মুদ্রাব্যবস্থা, নাগরিকতা, বিদেশনীতি, ডাকব্যবস্থা প্রভৃতি। রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয় হল-জনস্বাস্থ্য, জনশৃঙ্খলা, কৃষি, মৎস্য চাষ প্রভৃতি। যুগ্ম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল-বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ, শিক্ষা, দত্তক, ফৌজদারি আইন ও পদ্ধতি প্রভৃতি। তবে যুগ্ম তালিকায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে কেন্দ্রের আইনই বলবৎ হবে। এক্ষেত্রে মূলত কেন্দ্রের প্রাধান্যই স্বীকৃত হয়।

লিখিত ও দুস্পরিবর্তনীয় সংবিধান: যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লিখিত ও দুস্পরিবর্তনীয় সংবিধান, ভারতের ক্ষেত্রেও যা সমানভাবে প্রযোজ্য। ভারতের সংবিধানটিও লিখিত এবং সাধারণ আইন পাসের মাধ্যমে এটি সহজে পরিবর্তন করা যায় না অর্থাৎ দুষ্পরিবর্তনীয়।

স্বতন্ত্র বিচার বিভাগ: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় স্বতন্ত্র বিচার বিভাগের কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে ভারতেও সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট-এর মাধ্যমে স্বাধীন নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হতে দেখা যায়। তবে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ বাধলে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত হিসেবে সুপ্রিমকোর্ট তার মীমাংসা করে।

প্রকৃতিগতভাবে নমনীয়: ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রকৃতিগতভাবে নমনীয়। কারণ, জরুরি অবস্থাকালে ভারতীয় ব্যবস্থাকে এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করা যায়। রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করলে তা সম্ভব। এজন্য সংবিধান সংশোধনের কোনও প্রয়োজন হয় না।

তবে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে এমন কতগুলি বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নীতি ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে না, যেমন- ভারতে দ্বৈত শাসনতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, এখানে অঙ্গরাজ্যগুলির পৃথক সংবিধান নেই। ভারতে দ্বৈত বিচারব্যবস্থাকেও স্বীকার করা হয়নি। এখানে বিচারব্যবস্থা এক, অখন্ড এবং কেন্দ্রীভূত। এ ছাড়া ভারতে দ্বিনাগরিকত্ব (Dual Citizenship) বলেও কিছু নেই। সকলেই কেবলমাত্র ভারত রাষ্ট্রের নাগরিক।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ সেমিস্টার সব অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment