ভারতের উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব (চতুর্থ অধ্যায়) প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস

ভারতের উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব (চতুর্থ অধ্যায়) প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার ইতিহাস | HS 4th Semester History Long Question answer 4th Chapter

ভারতের উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব প্রশ্ন উত্তর
ভারতের উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব প্রশ্ন উত্তর

১। ভারতীয় অর্থনীতির উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কীরূপ প্রভাব পড়েছিল?

অথবা, ভারতের উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ) ছিল বিশ্ব ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ এই যুদ্ধের দ্বারা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল গ্রেট ব্রিটেন। আর ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে সরকার ভারতবর্ষকে একটি ‘যুদ্ধরত দেশ’ বলে ঘোষণা করে। যুদ্ধের শেষে মিত্রপক্ষ ভারতে স্বশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হবে-এই আশা থেকেই ভারতবাসী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অর্থ, সম্পদ, সৈন্য, রসদ প্রভৃতি দিয়ে সাহায্য করেন।

ভারতীয় অর্থনীতির উপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবসমূহ:

ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ছিল বহুমুখী, নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক।

(i) অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি: ব্রিটেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে যুদ্ধখাতে ব্রিটিশ সরকারের প্রায় ১৩ কোটি স্টার্লিং পাউন্ড (পরিসংখ্যান অনুযায়ী) অর্থ ব্যয় হয়। ব্রিটিশ সরকার এই বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের একটি বড়ো অংশ ভারত থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করে। ফলে জাতীয় ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ শেষ হলেও ভারতে সামরিক খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ অব্যাহত রাখা হয়।

(ii) করভার বৃদ্ধি: যুদ্ধখাতে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকার ভারতীয়দের উপর অস্বাভাবিক হারে করের বোঝা চাপিয়ে দেয়।

  • এসময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়েছিল প্রায় ৩০ শতাংশ।
  • যুদ্ধের আগে (১৯১১-১২ খ্রি.) ভারতে মোট রাজস্বের মাত্র ২ শতাংশ সংগ্রহ করা হত আয়কর থেকে। কিন্তু যুদ্ধের পর ১৯১৯-২০ অর্থবর্ষে আয়কর বেড়ে হয় মোট আদায়ীকৃত রাজস্বের ১১.৭৫ শতাংশ।
  • এ ছাড়া ভূমিরাজস্বও ৮.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ১৪.৮ শতাংশ।
  • ধনী-দরিদ্র সবার উপরেই যুদ্ধকর চাপিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃষকেরা ও নিয়মিত রাজস্ব ছাড়াও উপকর দিতে বাধ্য হন।

(iii) মুদ্রাস্ফীতি: যুদ্ধ-পরবর্তী বছরগুলিতে ভারতে অস্বাভাবিক হারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। সরকার যুদ্ধের অতিরিক্ত ব্যয় মেটানোর তাগিদে কাগজের মুদ্রা ছেপে অর্থসংকট মেটাতে চেষ্টা করে। এর ফলে ভারতীয় বাজারে লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। পাউন্ড ও টাকার মূল্যমান (Money Value-মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা অর্থাৎ একটি মুদ্রা দ্বারা যে পরিমাণ পণ্য ও পরিসেবা ক্রয় করা যায়) পরিবর্তিত হয়। এই সময় থেকেই ব্রিটিশ সরকার রুপোর মুদ্রার উপর নির্ভর করতে শুরু করে।

(iv) দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: মুদ্রাস্ফীতির অনিবার্য ফলস্বরূপ দেখা দেয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। যুদ্ধকালীন অস্থিরতার সুযোগে বৃদ্ধি পায় মজুতদারি ও কালোবাজারিও।

(v) খাদ্য সংকট: ভারতীয় সৈন্যদের নিয়মিত খাদ্যের জোগান দেওয়ার প্রয়োজনে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য বিদেশে পাঠানো হতে থাকে। অথচ সে সময়ে দক্ষিণ ভারতের মানুষ অনাহারে ভুগছিলেন। ফলে দেশে এক কৃত্রিম খাদ্য সংকটের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে গ্রামাঞ্চলে কৃষক পরিবারগুলি খাদ্যশস্যের পরিবর্তে অর্থকরী ফসল উৎপাদনে বাধ্য হওয়ায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং চারিদিকে অন্নের জন্য হাহাকার পড়ে যায়।

(vi) কৃষকদের দুরবস্থা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ভারতীয় কৃষক শ্রেণি চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

  • যুদ্ধের সময় পাট, বস্ত্র, পশম প্রভৃতি পণ্যের প্রচুর চাহিদা ছিল তাই এই সকল পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পণ্য উৎপাদকেরা বর্ধিত মূল্যের সুবিধা পাননি।
  • বেশি লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যের মজুতদারি ও কালোবাজারি শুরু করে। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক ও সাধারণ শ্রেণির মানুষ।
  • পাশাপাশি দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতির মধ্যেও ব্রিটিশ সরকার কৃষকদের কর মুকুব না করে করের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেয়। ভূস্বামীরা বিভিন্ন অজুহাতে জমি থেকে কৃষকদের উচ্ছেদ করে নিজেদের আয় বাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে কর বৃদ্ধির জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানের কৃষকরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

(vii) ভারতীয় বণিক ও শিল্পপতিদের উপর প্রভাব: ভারতীয় বণিক ও শিল্পপতিদের উপরেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল-

  • (a) যুদ্ধ চলাকালীন শিল্পে অগ্রগতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাময়িকভাবে ভারতের শিল্পক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। এই সময় ইংল্যান্ড থেকে ভারতে শিল্পপণ্যের আমদানি হ্রাস পেলে নতুন শিল্পস্থাপন ও পুরোনো কারখানার আধুনিকীকরণ শুরু হয়। যুদ্ধকালে আবার বোম্বাই ও গুজরাটের কাপড়কলগুলি অতিরিক্ত উৎপাদন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদশালী হয়ে ওঠে। এই সময় ভারতীয় শিল্পপতিদের সমর্থন ও আস্থা অর্জনের জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতে শুল্কসংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে।
  • (b) যুদ্ধের শেষে পুনরায় শিল্পসংকট : বস্তুত, ভারতকে শিল্পে স্বনির্ভর করার ইচ্ছা ব্রিটিশ সরকারের ছিল না। তাই যুদ্ধ চলাকালে আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রয়োজনে তারা শিল্পবান্ধব নীতি সাময়িকভাবে গ্রহণ করেছিল। এর ফলে বণিক ও শিল্পপতিরা লাভবান হন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঔপনিবেশিক সরকার পুনরায় ব্রিটেন থেকে শিল্পপণ্যের আমদানি শুরু করে। ভারতীয় শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশকে বুদ্ধ করার জন্য কঠোর এবং বিমাতৃসুলভ অর্থনীতির প্রয়োগ শুরু হয়। ফলে দেশীয় শিল্প সংকটের মুখে পড়ে।

(viii) শ্রমিক ছাঁটাই: বিশ্বযুদ্ধের শেষে গোটা বিশ্বে প্রবল অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়।

  • অভ্যন্তরীণ বাজার দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় শিল্পপণ্য বিদেশে রফতানি নানাভাবে হ্রাস করতে থাকে।
  • গবেষক রবীন্দ্র কুমার তাঁর লাহোর সংক্রান্ত গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, ১৯১৭-২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে খাদ্যশস্যের মূল্য যখন ১০০ শতাংশ বাড়ে, তখন কারিগর ও শ্রমিকদের মজুরি মাত্র ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
  • এই অবস্থায় অনিবার্যভাবে কলকারখানা থেকে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। কর্মরত শ্রমিকদের মজুরিও বৃদ্ধি করা হয়নি। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়তে থাকে। শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হলে ভারতে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সংগঠিত হয়।

এইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোকে একেবারে দুর্বল করে দেয়। মুদ্রাস্ফীতি, সরকারি ঋণভার বৃদ্ধি, মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পে মন্দা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ইত্যাদির চাপে ভারতীয় অর্থনীতির বিকাশ বুদ্ধ হয়ে পড়ে।

২। গান্ধি-সুভাষ পর্বে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘S-T-S’ তত্ত্ব কী? অথবা, ‘P-C-P’ কী?

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধি ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অবদান অবিস্মরণীয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সাফল্যলাভের পর ভারতে ফিরে গান্ধিজি ১৯১৭খ্রিস্টাব্দে চম্পারণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে আবার ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে লোভনীয় সিভিল সার্ভিস চাকুরি প্রত্যাখ্যান করে সুভাষচন্দ্র বসু অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিলে সূচনা হয় এক নতুন পর্বের। আর জাতীয় আন্দোলনের এই পর্বেই বিকাশলাভ করেছিল এক অভিনব রাজনৈতিক তত্ত্ব, যা S-T-S নামে পরিচিত। S-T-S / P-C-P তত্ত্ব: গান্ধি-সুভাষ পর্বে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘S-T-S’ তত্ত্বের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

‘S-T-S’ তত্ত্বের ধারণা: ‘S-T-S’ তত্ত্বের পুরো অর্থ হল- সংগ্রাম-শান্তি-সংগ্রাম বা Struggle-Truce-Struggle। এটি ছিল মূলত গালিজির আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে গৃহীত এক রাজনৈতিক সুকৌশল।

সাধারণ ‘S-T-S’ তত্ত্বের প্রকৃতি: ‘S-T-S’ তত্ত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে বলা যায় যে-

  • গান্ধিজি ছিলেন গণ আন্দোলনের সংগঠক। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেন গণ-মানসিকতার প্রস্তুতি ছাড়া কোনও আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
  • সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট ও সহ্যের একটা সীমা আছে। তাই জনগণের সহ্যসীমা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই, তাকে সামরিক বিশ্রাম (Breathing space) দেওয়া জরুরি। এই মধ্যবর্তী পর্বে মানুষের সংগ্রামী উদ্যম নতুন শক্তি সঞ্চয় করবে। তারপর প্রয়োজন হলে পুনরায় নতুন উদ্যমে সবাই আন্দোলনমুখী হবে। এটি একটি চক্রবৎ রাজনৈতিক কৌশল। অর্থাৎ, সংগ্রাম (Struggle), শাস্তি (Truce) এবং পুনরায় সংগ্রাম (Struggle) বা Struggle-Truce-Struggle কিংবা সংক্ষেপে ‘S-T-S’ পদ্ধতির মাধ্যমে এক কৌশলী আন্দোলন।
  • একইভাবে গান্ধিজির আন্দোলনের এই কৌশল চাপ তৈরি-সমঝোতা-চাপ তৈরি [Pressure-Compromise-Pressure (P-C-P)] নীতি নামেও পরিচিত।
  • মধ্যবর্তী পর্ব অর্থাৎ, শান্তি (Truce)-র সময় তিনি জনশক্তিকে গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত থাকার পরামর্শ দেন। গ্রাম পুনর্গঠন, চরকা কাটা, শিক্ষাবিস্তার, নারী উন্নয়ন ইত্যাদি কর্মসূচি রূপায়ণের মধ্য দিয়ে এই সংগ্রাম বিরতি পর্বে আত্মশক্তি অর্জন এবং প্রতিপক্ষের (ব্রিটিশ সরকার) উপর চাপ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
  • বলা হয়, ব্রিটিশদের জন্য গান্ধিজির S-T-S কর্মপন্থা জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মতো (উভয়সংকট) পরিস্থিতি তৈরি করে এবং এই কৌশল জনগণকে ক্ষয়ক্ষতি সামলে নিয়ে পুনরায় লড়াইয়ে শামিল হওয়ার জন্য যথেষ্ট অবকাশ তৈরি করে দেয়।

‘S-T-S’ বা ‘সংগ্রাম শান্তি-সংগ্রাম’ তত্ত্ব গ্রহণের কারণ:

‘S-T-S’ তত্ত্ব গ্রহণের কয়েকটি কারণ হল-

(i) ব্রিটিশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল : গান্ধিজি মনে করতেন, ‘S-T-S’ রণকৌশল অত্যন্ত কার্যকরী। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।2-1-8

(ii) রাজনৈতিক বাস্তবতা: গান্ধিজির ডাকে ভারতের আপামর জনসাধারণ শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, নারী সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার জন্য তাদের পক্ষে একটানা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই গান্ধিজি বাস্তবতা মেনে আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন।

(iii) সরকারের দমনপীড়ন থেকে আন্দোলনকারীদের রক্ষা করা: তাছাড়া কখনো কখনো আন্দোলন হিংসাশ্রয়ী হয়ে উঠলে সরকারের দমনপীড়নের মুখে আন্দোলনকারীদের পড়তে হত। তাই গান্ধিজি সময় মতো বিরতি নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেন।

(iv) সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ : আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্লান্তি আসত এবং আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ কমে যেত। তাই গান্ধিজি বিরতি দিয়ে আবার নতুন উদ্যমে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করেন।

ভারতে গান্ধিজির আন্দোলনে ‘S-T-S’ তত্ত্বের প্রয়োগ: গান্ধিজি দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলন থেকে ভারতে সংঘটিত চম্পারণ, খেদা, আহমেদাবাদ আন্দোলনে ‘S-T-S’ নীতি প্রয়োগ করে সাফল্য পান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আইন অমান্য আন্দোলনের সময় জওহরলাল নেহরু ‘S-T-S’ কৌশলের পরিবর্তে সংগ্রাম-বিজয় বা Struggle-Victory (S-V) পদ্ধতি প্রয়োগের উপর গুরুত্ব দেন। যদিও গান্ধিজি এক্ষেত্রেও ‘S-T-S’ কৌশল গ্রহণ করতে দ্বিধা করেননি।

বস্তুত, গান্ধিজির ‘S-T-S’ তত্ত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ লক্ষ করা যায় আইন অমান্য আন্দোলনে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজি লবণ আইন ভঙ্গের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা করলেও ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে গান্ধি-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সময় লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকেও যোগ দেন গান্ধিজি। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় এই আন্দোলন শুরু করেন তিনি।

সুভাষচন্দ্র বসুর মতামত: জাতীয় আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্র বসুর লক্ষ্য ও কৌশল উভয়ই মহাত্মা গান্ধির থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। গান্ধিজি ‘S-T-S’ কৌশলের মাধ্যমে স্বরাজ আদায় করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র বসুর কৌশল ছিল আপোষহীন সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা আদায় করা। তিনি মনে করতেন ব্রিটেন ও ভারতবর্ষের মধ্যে কখনোই রাজনৈতিক বোঝাপড়া সম্ভব নয়, যেহেতু উভয়দেশের স্বার্থ সম্পূর্ণ পৃথক। তাই সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধিজির সংগ্রাম-শান্তি-পুনরায় সংগ্রাম বা ‘S-T-S’ তত্ত্বের বদলে ব্যাপক গণসংগ্রাম, সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে সশস্ত্র বিপ্লব এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, যোগাযোগ ও সাহায্যের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করেছেন। বস্তুত সুভাষচন্দ্রের মতে, ভারতের স্বাধীনতা একমাত্র ব্রিটিশ শক্তির পরাজয়ের মাধ্যমেই আসতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, গান্ধিজির আন্দোলন ছিল প্রকৃতপক্ষে বি-সমমিলন (Hybrid) বিশিষ্ট ক্রমিক একটি প্রক্রিয়া (Process)। এইরূপ রাজনৈতিক ও নৈতিক (Political and Ethical) আন্দোলনের কৌশল হিসেবে তিনি ‘S-T-S পদ্ধতির অবতারণা করেন। অধ্যাপক আদিত্য মুখার্জি তাই যথার্থই লিখেছেন, ‘গান্ধিজির সমালোচকরা প্রায়শই বুঝতে পারেন না যে, সব গণ আন্দোলনেরই একটা পর্যায়ে এসে সহজাত ভাটার প্রবণতা থাকে। মানুষের আত্মত্যাগের ক্ষমতাও সীমাহীন নয়। তাই একটা সময়ে এসে শক্তি সংগ্রহ করার জন্য দম ফেলার প্রয়োজন হয়।’

৩। সাইমন কমিশন কেন গঠন করা হয়েছিল? এই কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

অথবা, সাইমন কমিশন গঠনের পটভূমি কী ছিল? সাইমন কমিশন-বিরোধী আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

অথবা, ভারতীয়রা কেন সাইমন কমিশন বর্জন করেন?

ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক নীতি ছিল উপনিবেশগুলিকে ধাপে ধাপে স্বায়ত্তশাসনের উপযোগী করে তোলা। এই নীতি অনুসারে অন্যান্য উপনিবেশের মতো ভারতেও শাসনসংস্কার করা হয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের কার্যকারিতা বিচার করার জন্য ১৯২৭খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু কিছু ত্রুটির জন্য ভারতীয়রা এই কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

সাইমন কমিশনের গঠনের কারণ/ পটভূমি:

সাইমন কমিশন গঠনের পিছনে নিম্নলিখিত কারণগুলির উল্লেখ করা যায়-

  • ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইন পাস হলেও তা ভারতীয়দের কাছে ছিল অস্পষ্ট। তাই এই আইন পরিবর্তনের জন্য সব রাজনৈতিক দল সোচ্চার হয়ে ওঠে।
  • ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন পাসের সময় বলা হয়েছিল যে, এই নির্দিষ্ট আইনবিধির কার্যকারিতা সম্বন্ধে অনুসন্ধানের জন্য ১০ বছর পর একটি রাজকীয় কমিশন নিযুক্ত করা হবে।
  • ইংল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে শ্রমিক দল জয়যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায়, ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের নেতারা ভারত সংক্রান্ত শাসনতন্ত্র পুনর্বিচারের কৃতিত্ব নিজেদের হাতে রাখতে এক কমিশন নিয়োগের কথা ভাবেন।

কমিশন গঠন: বড়োলাট লর্ড আরউইন-এর সুপারিশ মেনে ব্রিটিশ সরকার ভারতে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য ১৯২৭খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর ইন্ডিয়ান স্ট্যাটুটরি কমিশন নিয়োগ করে। ৭ জন সদস্যবিশিষ্ট এই কমিশনের চেয়ারম্যান হন স্যার জন সাইমন। তাঁর নামানুসারে এটি সাইমন কমিশন নামে পরিচিত হয়। এই কমিশনের কাজ ছিল ব্রিটিশ ভারতের শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা বিচার করে প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থাগুলির উন্নয়ন ও দায়িত্বশীল সরকার স্থাপনের পথে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে সুপারিশ করা।

সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন/সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া:

নবগঠিত সাইমন কমিশনে কোনও ভারতীয় সদস্য নেওয়া হয়নি। সকলেই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। তাই ভারতবাসীর কাছে এটি ছিল ‘All White Commission’। বস্তুত, কমিশনের ভারতে আগমনের আগে থেকেই নানাভাবে দেশবাসী প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।

কমিশনের ভারতে পদার্পণের পূর্বের প্রতিবাদ: ভারতে সাইমন কমিশন গঠনের খবর ছড়িয়ে পড়লে ভারতের সকল রাজনৈতিক দল তার বিরোধিতা করে। ইতিমধ্যে ভারত-সচিব বার্কেনহেড ভারতীয়দের সাংবিধানিক জ্ঞান সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করলে সকল ভারতীয় রাজনৈতিক দল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, কমিউনিস্ট পার্টি-সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল কমিশনের গঠনপদ্ধতিতে আপত্তি জানায় এবং সাইমন কমিশন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের শেষদিকে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে সাইমন কমিশনকে সর্বক্ষেত্রে ও সর্বরূপে বয়কট করার এবং একটি গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র রচনার জন্য সর্বদলীয় অধিবেশন আয়োজন করার কথা স্থির হয়।

কমিশনের ভারতে পদার্পণ ও ভারতীয়দের কমিশন-বিরোধী আন্দোলন: ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশনের সদস্যরা বোম্বাই শহরে এসে পৌঁছান। ভারতে কমিশনের পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী একাধিক প্রতিবাদ আন্দোলন, মিছিল, সভা-সমাবেশ, কালো পতাকা প্রদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে ভারতবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। কলকাতা, বোম্বাই, দিল্লি, লাহোর, লখনউ-সহ প্রধান প্রধান শহরগুলিতে পালিত হয় হরতাল। সাইমন ফিরে যাও (Go Back Simon) ধ্বনির মাধ্যমে সর্বত্র এই কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। যুব সম্প্রদায়, কৃষক, শ্রমিক সমস্ত স্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগদান করেন। সরকার দমনপীড়ন দ্বারা আন্দোলন ভেঙে দিতে উদ্যত হয়। এমনকি মাদ্রাজে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় টি প্রকাশন নামক এক আন্দোলনকারীর। লখনউতে পুলিশ লাঠি চালায় জওহরলাল নেহরু ও গোবিন্দবল্লভ পন্থ-এর উপর। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ অক্টোবর লাহোরে জননেতা লালা লাজপত রায়কে লাঠি দিয়ে আঘাত করে পুলিশ। এই আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে ১৭নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

অবশ্য এত তীব্র অশান্তি এবং ভারতীয়দের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সাইমন কমিশন তার তদন্ত চালিয়ে যায়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। বস্তুত, এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই প্রণীত হয়েছিল ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন।

মূল্যায়ন: অসহযোগ আন্দোলনের পর সাইমন কমিশন-বিরোধী আন্দোলনকেই ভারতবাসীর সফল গণবিক্ষোভ বলা যেতে পারে। অবশ্য ঐতিহাসিকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন যে, জাতীয় কংগ্রেস বা অন্যান্য জাতীয়তাবাদী নেতারা এই গণ অভ্যুত্থানের কর্মসূচি নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসু বলেছেন যে, ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে যদি বৃহত্তর কোনও রাজনৈতিক গণ আন্দোলন শুরু করা যেত, তবে তা সময়োপযোগী হত। কারণ-আলোচ্য পর্বে জনগণের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চারিত হয়েছিল, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত আইন অমান্য আন্দোলনের তুলনায় তা বেশি ছিল।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ সেমিস্টার সব অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment