ভারতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থী আন্দোলনের উদ্ভবের কারণ গুলি আলোচনা করো

ভারতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থী আন্দোলনের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রথম কুড়ি বছর কংগ্রেসের নেতৃত্ব নরমপন্থী নেতাদের হাতে ন্যস্ত ছিল। নরমপন্থী নেতারা ব্রিটিশ সরকার ও ইংরেজ জাতির উদারতা, মানবতা, সংস্কৃতির উপর গভীর আস্থাশীল ছিলেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সরকার উদার ও আন্তরিক হবে। কিন্তু এক দশকের মধ্যেই প্রমাণিত হয় যে, ব্রিটিশ সরকার নরমপন্থী নেতৃত্ব এবং ভারতবাসীর দাবিদাওয়া নস্যাৎ করে দিতেই বেশি তৎপর। বস্তুত, জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি সরকারের আদৌ আস্থা ছিল না। প্রাথমিকভাবে সরকার ভেবেছিল যে, কংগ্রেসের প্রভাব মুষ্টিমেয় শিক্ষিত, সম্পদশীল ও শহুরে মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যখনই স্পষ্ট হল যে, সাধারণ জনগণের মধ্যে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে সরকার কংগ্রেসের বিরূপ সমালোচনা শুরু করে। একের পর এক দমনমূলক আইন জারি করে কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করতে থাকে। এমতাবস্থায় কংগ্রেসের একাংশ মনে করেন যে, নরমপন্থা বা আবেদন-নিবেদন নীতি দ্বারা ভারতবাসীর দাবি আদায় করা সম্ভব নয়। এই সদস্যগণ অসহযোগিতামূলক নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ দ্বারা দাবি আদায়ের পথে এগোতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
নরমপন্থী নীতির ব্যর্থতা স্বাভাবিক নিয়মেই চরমপন্থাকে জনপ্রিয়তা দান করে। নরমপন্থীরা জনগণের মধ্যে বিশেষ কোনও প্রভাব ফেলতে পারেননি। কোনও সর্বভারতীয় আন্দোলন সংগঠিত করতেও তাঁরা ব্যর্থ হন। এমনকি, তাঁদের প্রচারও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। এমতাবস্থায় চরমপন্থীদের আদর্শ নবীন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে।
ভারতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থী আন্দোলনের উদ্ভবের কারণ
ব্রিটিশ সরকার নরমপন্থীদের দাবিদাওয়া পূরণের কাজে সামান্যতম আন্তরিকতা দেখাননি। ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন যে, নরমপন্থীদের প্রায় এক দশকব্যাপী আন্দোলন ইংরেজ শাসকদের কঠিন হৃদয় একটুও নরম করতে পারেনি। নরমপন্থীদের নীতির প্রতি ব্রিটিশ সরকারের এহেন ঔদাসীন্য কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একদল জাতীয়তাবাদী নেতৃবর্গকে সক্রিয় ও আন্দোলনমুখী নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করে। বস্তুত, একাধিক কারণ ও উপাদান কংগ্রেসে চরমপন্থী রাজনীতির উদ্ভব এবং প্রসারে সক্রিয় ছিল। নরমপন্থী নীতির ব্যর্থতার পাশাপাশি কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অনমনীয় এবং সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব, জাতীয়তাবাদী অর্থনীতির প্রচার, ভারতবাসীর ভাবজাগতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি ইত্যাদির পরিণতি ছিল চরমপন্থী রাজনীতির আবির্ভাব।
① কংগ্রেসের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা দখলের লড়াই: কেমব্রিজ গোষ্ঠীর ঐতিহাসিকেরা, যেমন- জুডিথ ব্রাউন, অনিল শীল প্রমুখ চরমপন্থার উৎস হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা দখলের লড়াইকে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে তাঁরা বাংলায় অমৃতবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর সঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ ও তাঁর বেঙ্গলী পত্রিকা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব: মহারাষ্ট্রে গোখলে-র সঙ্গে বাল গঙ্গাধর তিলক-এর দ্বন্দ্ব: পাঞ্জাবে লালা লাজপত রায়-এর সঙ্গে হরকিষেণ লাল-এর দ্বন্দ্ব; দক্ষিণ ভারতে এস সুব্রত্মণ্য আইয়ার, ভি কৃল্পস্বামী আইয়ার-এর সঙ্গে টি প্রকাশ, চিদাম্বরম পিল্লাই, কৃষ্ণরাও প্রমুখের মতভেদ ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরা এই সকল যুক্তি খণ্ডন করেছেন। তাঁদের মতে, সেই সময় কংগ্রেস একটি যথার্থ সংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পূর্ণ সময়ের কর্মী, নিজস্ব দফতর বা তহবিল কিছুই ছিল না তাদের।
② পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে অনুকরণের প্রতিবাদ: ড. অমলেশ ত্রিপাঠী তাঁর The Extremist Challenge গ্রন্থে চরমপন্থার উদ্ভবের প্রাথমিক কারণ হিসেবে পশ্চিমি সভ্যতার প্রতি নরমপন্থীদের অন্ধ আনুগত্যের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টির উল্লেখ করেছেন। ইউরোপের ভোগবাদী ও যান্ত্রিক ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রতি আকর্ষণ এবং জাতীয় ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করার অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে চরমপন্থী আদর্শ উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই মতবাদে স্বদেশ ও সংস্কৃতিকে উচ্চাসনে তুলে ধরার কথা বলা হয়।
③ ভাবজাগতিক পরিবর্তন: ড. অমলেশ ত্রিপাঠী চরমপন্থার উদ্ভবের প্রেক্ষাপটে ভাবজাগতিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। বস্তুত, ফরাসি বিপ্লবের ক্ষেত্রে যেমন মন্তেস্কু (Montesquieu), ভলতেয়ার (Voltaire), রুশো (Rousseau) প্রমুখের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল; তেমনই ঊনবিংশ শতকে ভারতবাসীর চিন্তাচেতনার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, দয়ানন্দ সরস্বতী প্রমুখ সাহিত্যিক-সংস্কারকদের উপদেশ ও আহ্বান।
- বঙ্কিমচন্দ্র চাট্টাপাধ্যায়-এর ভূমিকা: বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে গভীর সমাজ সচেতনতা, যুক্তিবাদ ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচার করলে ভারতীয়দের মনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আনন্দমঠ (১৮৮২ খ্রি.) উপন্যাসে ভারতের যুবসমাজকে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বন্দেমাতরম্ সংগীতটি ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয়দের প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র-এর অপর এক গুরুত্বপূর্ণ রচনা কৃষ্ণচরিত্র। এতে তিনি মহাভারতের কৃষ্ণের মতো মানবিক গুণসম্পন্ন একজন নেতার নেতৃত্বে ভারতে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার শিক্ষা দেন। সর্বোপরি, নরমপন্থী রাজনীতিকে তিনি ভিক্ষাবৃত্তি-র সমতুল্য হিসেবে বর্জন করার পরোক্ষ আভাস দেন।
- স্বামী বিবেকানন্দ-এর ভূমিকা: শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ-এর বাণী ও রচনা ভারতীয় সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে তিনি প্রাচ্যের সভ্যতা ও হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করলে শিক্ষিত যুব সম্প্রদায় অনুপ্রাণিত হয়। বিবেকানন্দ ঘোষণা করেন যে, প্রাচ্যের সবকিছুই বর্জনীয় নয়, আবার পাশ্চাত্যের অনেককিছুই গ্রহণযোগ্য। F2 তিনি ভারতের যুবসমাজকে মানসিক ও দৈহিক জড়তা ত্যাগ করে শক্তি, পৌরুষ, ক্ষাত্রতেজ ও ব্রহ্মতেজে উদ্দীপিত হতে আহ্বান জানান। স্বামীজি দৃপ্তকণ্ঠে জানান, ‘আমি চাই লৌহ-কঠিন পেশী, ইস্পাত-দৃঢ় স্নায়ু এবং বজ্রের মত মন।’ দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগের মন্ত্রে যুবসমাজকে উজ্জীবিত করার জন্য তিনি বলেন, ‘ভুলিও না তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলি প্রদত্ত।’ ড. ত্রিপাঠী লিখেছেন, ‘চরমপন্থীরা প্রেরণা পেয়েছিলেন বিবেকানন্দ উচ্চারিত অতুলনীয় মন্ত্রের দ্বারা, যা হল- উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।’
- দয়ানন্দ সরস্বতী-র ভূমিকা: আর্য সমাজ-এর প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী বৈদিক আদর্শের ভিত্তিতে হিন্দু ধর্মকে সংকীর্ণতা ও হিন্দু সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করে শক্তি সঞ্চয়ের শিক্ষা দেন। দয়ানন্দ সরস্বতী-র মতাদর্শ তথা আর্য সমাজ আন্দোলন চরমপন্থার উদ্ভবের অন্যতম প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে চরমপত্রী নেতা বিপিনচন্দ্র পাল লিখেছিলেন যে, ‘আর্য সমাজ আন্দোলন ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিকতার থেকে বহুগুণ বেশি সক্রিয় ছিল একটা রাজনৈতিক উদ্যোগরূপে।’
ভাবজাগতিক এসকল পরিবর্তনই বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায়, অরবিন্দ ঘোষ-এর ন্যায় নেতৃবৃন্দকে প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক কার্যাবলি সক্রিয়ভাবে চালাতে প্রেরণা দান করেছিল।
④ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: চরমপন্থার উদ্ভবের রাজনৈতিক পটভূমি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অমলেশ ত্রিপাঠীর মতে, মূলত নরমপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধেই চরমপন্থী আন্দোলনের আবির্ভাব। নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদন নীতির ব্যর্থতা, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক জাতীয় কংগ্রেসকে অগ্রাহ্য করার ঘটনা জাতীয়তাবাদীদের একাংশকে বিকল্প পথের সন্ধানে ব্রতী করে। নরমপন্থীদের আপস নীতির পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ এবং গণ আন্দোলন সংগঠিত করে অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাবনা চরমপন্থার জন্ম দেয়। আবেদন-নিবেদনের পরিবর্তে আত্মনির্ভরশীলতা ও গঠনমূলক কর্মসূচির দাবি উচ্চারিত হয়।
⑤ অর্থনৈতিক কারণ: রাজনৈতিক প্রভুত্ব স্থাপনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রবল শোষণ, ব্রিটিশ সরকারের বৈষম্যমূলক করব্যবস্থা তথা দেশীয় শিল্পের ধ্বংসসাধন ইত্যাদি বিষয়গুলির দরুন ভারতীয়রা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হতে থাকে, যা চরমপন্থী রাজনীতির উদ্ভবের পটভূমি রচনায় সাহায্য করেছিল। আলোচ্য পর্বে বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবিস্তারের ক্ষেত্রে সামরিক খাতে ক্রমাগত ভারতীয় সম্পদের অপচয়, হোমচার্জ খাতে ব্যয়বৃদ্ধি ইত্যাদি ভারতের স্বার্থবিরোধী প্রতিটি কাজেই ইংরেজ শাসকেরা ছিলেন অনড়। এই সকল ঘটনা ক্রমেই ভারতবাসীর মনে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। তিলক সম্পাদিত মারাঠা (মাহরাট্টা) পত্রিকা, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বেঙ্গলী পত্রিকা এসময় একত্রে ব্রিটিশ শাসকের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে প্রবলভাবে নিন্দা জানাতে থাকে। তাছাড়া আলোচ্য পর্বে দাদাভাই নৌরজি, রমেশচন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রাণাডে তাঁদের গ্রন্থে তুলে ধরেন ব্রিটিশ শোষণের নগ্নরূপ। এমনকি ব্রিটিশ লেখক উইলিয়ম ডিগবি (William Digby) তাঁর Prosperous British India গ্রন্থে ভারতের অর্থনৈতিক দুর্গতির জন্য ব্রিটিশ সরকারের শোষণকে দায়ী করেন।
⑥ দুর্ভিক্ষ ও ব্রিটিশ সরকারের অনাচার: ব্রিটিশ সরকারের বিমাতৃসুলভ অর্থনীতির ফলস্বরূপ ১৮৯৬ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে দেখা দেয় ভয়াবহ প্লেগ মহামারি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ব্রিটিশ সরকার কোনোরকম ত্রাণের ব্যবস্থা না করে মহারানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন আরোহণের হীরক জয়ন্তী উৎসব পালন করে। সরকারের এই অনাচার জনমানসে প্রবল হতাশা ও ঘৃণার জন্ম দেয় যা চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উন্মেষের পথ প্রশস্ত করে।
⑦ সরকারের উদাসীনতা: ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পিত উদাসীনতা এবং কঠোরতা চরমপন্থী মতাদর্শ বিকাশের পথ প্রশস্ত করে। আদিপর্বের নেতাদের নম্রনীতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ বা শাসনকে আদৌ প্রভাবিত করতে পারেনি। আইন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগ, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়স বৃদ্ধি, নির্বাচন প্রথার প্রচলন ইত্যাদি দাবির প্রতি সরকারের মনোভাব ছিল আগাগোড়া নেতিবাচক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল বিমাতৃসুলভ আচরণ। লর্ড লিটন, লর্ড কার্জন প্রমুখ সাম্রাজ্যবাদী ভাইসয়রদের ঔদ্ধত্য এবং দমনপীড়ন জাতীয়তাবাদীদের মনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞার জন্ম দেয়। লর্ড লিটন কর্তৃক দেশীয় সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের পরিকল্পনা (১৮৭৬ খ্রি.), লর্ড কার্জন কর্তৃক ইন্ডিয়ান অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (Indian Official Secrets Act, ১৯০৪ খ্রি.) পাস করা ছিল ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির নগ্ন প্রকাশ। এসবেরই পরিণতি ছিল চরমপন্থার আবির্ভাব ও জনপ্রিয়তা লাভ।
⑧ বহির্বিশ্বের প্রেরণা: সমকালীন বৈদেশিক কিছু ঘটনা ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উজ্জীবিত করে। ক্ষুদ্র দেশ ইথিওপিয়ার কাছে ইটালির পরাজয় (১৮৯৬ খ্রি.), নবীন এশীয় দেশ জাপানের কাছে রাশিয়ার পরাজয় (১৯০৫ খ্রি.), আয়ারল্যান্ডের আন্দোলন ইত্যাদি সমগ্র এশিয়া জুড়ে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে যা ভারতীয়দেরও সংগ্রামী প্রেরণা জোগায়। করাচি ক্রনিক্যাল (Karachi Chronicle) পত্রিকায় লেখা হয় (১৮ জুন, ১৯০৫ খ্রি.), ‘জাপান যদি রাশিয়াকে হটাতে পারে, তবে ভারতও ইংল্যান্ডকে হটিয়ে দিতে পারবে।’ এই ঘটনাবলি ভারতবাসীকে আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ করে। ড. অমলেশ ত্রিপাঠী লিখেছেন, ‘এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষেও সাবালক কংগ্রেসের আধো-আধো বুলিতে স্বায়ত্তশাসনের বায়না অথবা নাকিসুরে আবেদন-নিবেদনের পালা নিতান্তই বেমানান হয়ে উঠেছিল।’
আরো পড়ুন : একাদশ শ্রেণি বাংলা প্রশ্ন উত্তর