নানা রঙের দিন নাটকের প্রশ্ন উত্তর (অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়) | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা | Nana ronger din natoker question answer | class 12 bengali 4th semester

নাট্যকার পরিচিতি
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় :
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৩–১৯৮৩) বাংলা নাট্যজগতের একজন বিশিষ্ট নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক। বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অভিনয় ও নাট্যপরিচালনার পাশাপাশি নাট্যরচনাতেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর নাটকে সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চরিত্রের মনের গভীরে প্রবেশ করে তার আনন্দ, বেদনা, হতাশা, স্বপ্ন ও একাকীত্বকে নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ করা তাঁর লেখার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ছিলেন একজন দক্ষ অভিনেতা। তাই অভিনয়জগতের ভেতরের অভিজ্ঞতা তাঁর নাটকে খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছে। ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে একজন বৃদ্ধ অভিনেতার স্মৃতি ও আত্মকথনের মধ্য দিয়ে শিল্পীজীবনের যে উত্থান-পতন তুলে ধরা হয়েছে, তা তাঁর নাট্যদৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
নানা রঙের দিন নাটকের বিষয়বস্তু
নাটকের শুরুতে দেখা যায়, গভীর রাতে পেশাদারি থিয়েটারের একটি ফাঁকা মঞ্চে একা দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি তখন দিলদারের পোশাকে। চারদিকে অন্ধকার, মঞ্চে পড়ে আছে নাটকের অবশিষ্ট দৃশ্যপট ও বিভিন্ন জিনিসপত্র। এই পরিবেশের মধ্যেই রজনীকান্ত নিজের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।
রজনীকান্তের মদ্যপানের অভ্যাস রয়েছে। মাঝরাতে একা ফাঁকা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে ভয় ও অস্থিরতা তৈরি হয়। তিনি রামব্রিজকে ডাকতে থাকেন। নিজের বয়স ও শরীরের কথাও ভাবেন। তাঁর মনে হয়, জীবনের অনেকটা পথ তিনি পেরিয়ে এসেছেন এবং এখন সামনে শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা। এই ভাবনা তাঁকে আরও বিষণ্ণ করে তোলে।
এরপর মঞ্চে প্রবেশ করে বৃদ্ধ প্রম্পটার কালীনাথ সেন। রজনীকান্ত প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে বুঝতে পারেন যে সে কালীনাথ। কালীনাথ তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চায়। কিন্তু রজনীকান্ত বাড়ি ফিরতে চান না। কারণ বাড়িতে তাঁর জন্য অপেক্ষা করার মতো কেউ নেই। তিনি বলেন, তাঁর বউ নেই, ছেলেমেয়ে নেই, সঙ্গীসাথিও নেই। তাই তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে করেন।
রজনীকান্ত এরপর নিজের অতীতজীবনের কথা বলতে শুরু করেন। একসময় তিনি পুলিশে চাকরি করতেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে থিয়েটারের জগতে প্রবেশ করেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট নামডাক ও খ্যাতি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সাফল্যের দিনগুলি হারিয়ে যায়। তিনি নিজের যৌবন, আদর্শ, প্রেম ও জীবনের নানা স্মৃতির কথা স্মরণ করেন।
রজনীকান্ত তাঁর এক পুরোনো প্রেমের কথাও কালীনাথকে বলেন। এক ধনী পরিবারের সুন্দরী মেয়ে তাঁর অভিনয় দেখে তাঁর প্রেমে পড়েছিল। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং একসময় বিয়ের কথাও ওঠে। কিন্তু মেয়েটি শর্ত দিয়েছিল, রজনীকান্তকে থিয়েটার ছেড়ে দিতে হবে। রজনীকান্ত থিয়েটার ছাড়তে রাজি হননি। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে প্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়ে যায়।

রজনীকান্তের কাছে থিয়েটার শুধুমাত্র জীবিকা ছিল না; এটি ছিল তাঁর জীবনের গভীরতম পরিচয়। তিনি মনে করেছিলেন, “নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প”। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি থিয়েটারজগতের বাস্তবতা সম্পর্কেও তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, দর্শক মঞ্চে অভিনেতাকে ভালোবাসলেও মঞ্চের বাইরে তাকে প্রকৃত সামাজিক সম্মান দেয় না।
শেষদিকে রজনীকান্ত আবার নিজের পুরোনো অভিনয় প্রতিভার কথা স্মরণ করেন। বিভিন্ন নাটকের সংলাপ বলতে বলতে তিনি যেন কিছুক্ষণের জন্য নিজের বার্ধক্য ও হতাশাকে ভুলে যান। কালীনাথ তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রজনীকান্ত শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের বাস্তব সত্যটি উপলব্ধি করেন—তাঁর দিন ফুরিয়ে এসেছে।
‘নানা রঙের দিন’ নাটকের পরীক্ষার উপযোগী প্রশ্নোত্তর
১। ‘নানা রঙের দিন’ একাঙ্ক নাটক হিসেবে কতখানি সার্থক আলোচনা করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘নানা রঙের দিন’ একটি সার্থক একাঙ্ক নাটক। একাঙ্ক নাটকের যে মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি—একক ঘটনা, সীমিত চরিত্র, সংহত কাহিনি, নাট্যসংঘাতের ক্রমবিকাশ, সংলাপনির্ভর অগ্রগতি, নাটকীয় পরিবেশ এবং হৃদয়স্পর্শী পরিণতি—এই নাটকে সেগুলির সফল সমন্বয় ঘটেছে। তাই নাটকটি কেবল একটি প্রবীণ অভিনেতার জীবনের কাহিনি নয়; বরং শিল্পীর আত্মমর্যাদা, শিল্পসাধনার মূল্য এবং সময়ের নির্মম পরিবর্তনের এক গভীর মানবিক দলিল হয়ে উঠেছে।
একাঙ্ক নাটকের প্রধান শর্ত হলো একটি কেন্দ্রীয় ঘটনাকে ঘিরে কাহিনির বিকাশ। ‘নানা রঙের দিন’-এ সেই কেন্দ্রীয় বিষয় হল প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জীবনসংকট, তাঁর অতীত গৌরবের স্মৃতি এবং বর্তমানের নিঃসঙ্গ বাস্তবতা। নাটকের সমস্ত ঘটনা ও সংলাপ এই একটিমাত্র বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। ফলে নাটকের কোথাও অপ্রয়োজনীয় ঘটনা বা কাহিনির বিস্তার দেখা যায় না।
এই নাটকের চরিত্রসংখ্যাও সীমিত। রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে প্রম্পটার কালীনাথ সেন এবং অন্যান্য কয়েকটি প্রয়োজনীয় চরিত্রের উপস্থিতিতে নাট্যকাহিনি অগ্রসর হয়েছে। প্রত্যেক চরিত্রই মূল বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলতে সাহায্য করেছে; কোনো চরিত্রই অপ্রয়োজনীয় নয়। বিশেষত রজনীকান্ত ও কালীনাথের সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকের আবেগ, স্মৃতিচারণ, শিল্পভাবনা এবং মানবিক টানাপোড়েন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
একাঙ্ক নাটকের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সংলাপের সংযম ও নাট্যগতি। এই নাটকে দীর্ঘ বর্ণনার পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমেই চরিত্রের মনোজগৎ, অতীত-বর্তমানের দ্বন্দ্ব এবং শিল্পীর অন্তর্দহন ফুটে উঠেছে। কোথাও সংলাপ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ হয়নি; বরং প্রতিটি সংলাপ নাট্যসংঘাতকে আরও গভীর করেছে। নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৌতূহল ও আবেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরিণতিতে তা এক গভীর মানবিক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।
নাটকের পরিবেশ নির্মাণও অত্যন্ত সফল। একটি সীমিত স্থান, অল্প সময় এবং সংহত ঘটনার মধ্যেই লেখক নাট্যমঞ্চের অতীত গৌরব, বর্তমানের অবহেলা এবং শিল্পীর মানসিক যন্ত্রণাকে জীবন্ত করে তুলেছেন। অতীতের উজ্জ্বল স্মৃতি ও বর্তমানের নির্জন বাস্তবতার সংঘাত নাটকটিকে এক বিশেষ শিল্পসৌন্দর্য প্রদান করেছে। এর ফলে পাঠক বা দর্শক কেবল একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন না, বরং একজন শিল্পীর জীবনসংগ্রামের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
নাটকটির সমাপ্তিও একাঙ্ক নাটকের সার্থকতার অন্যতম কারণ। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যেও শিল্পের অমরত্ব এবং প্রকৃত শিল্পীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সমাপ্তি দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী আবেগ ও চিন্তার সৃষ্টি করে, যা একটি সফল একাঙ্ক নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অতএব, সংহত কাহিনি, সীমিত চরিত্র, স্বাভাবিক সংলাপ, নাটকীয় সংঘাত, মানবিক আবেদন, শিল্পসম্মত পরিণতি এবং গভীর জীবনবোধের সফল প্রকাশের জন্য ‘নানা রঙের দিন’ নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক একাঙ্ক নাটক।
২। ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের সূচনায় মঞ্চসজ্জার যে বর্ণনা আছে, তা নিজের ভাষায় লেখো। নাটকটির নামকরণ কতখানি সার্থক, তা আলোচনা করো।
মঞ্চসজ্জার বর্ণনা : অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের সূচনায় অত্যন্ত সংযত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মঞ্চসজ্জার বর্ণনা রয়েছে। মঞ্চে দেখা যায় এক প্রবীণ নাট্যশিল্পীর সাধারণ বাসস্থান। ঘরের আসবাবপত্রে আভিজাত্যের চিহ্ন নেই; বরং সর্বত্র রয়েছে সরলতা, পুরোনো দিনের আবহ এবং সময়ের ক্ষয়ের ছাপ। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র, নাট্যজীবনের স্মারক, ব্যবহৃত আসবাব এবং পরিবেশ থেকেই বোঝা যায়, এই বাড়ির অধিবাসী একসময় নাট্যজগতের প্রতিষ্ঠিত মানুষ হলেও বর্তমানে তিনি নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত জীবনযাপন করছেন। সমগ্র মঞ্চসজ্জা দর্শককে প্রথম থেকেই অতীতের গৌরব ও বর্তমানের নিঃসঙ্গ বাস্তবতার মধ্যে এক তীব্র বৈপরীত্যের অনুভূতি দেয়। এই পরিবেশই নাটকের মূল আবহ নির্মাণ করে এবং পরবর্তী ঘটনাবলির জন্য দর্শককে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
নামকরণের সার্থকতা : নাটকের নাম ‘নানা রঙের দিন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিষয়ানুগ। এই নামের মধ্যেই নাটকের মূল জীবনদর্শন ও শিল্পভাবনা নিহিত রয়েছে।
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জীবন একরৈখিক নয়; সেখানে সাফল্য-ব্যর্থতা, সম্মান-অবহেলা, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-বঞ্চনা, আশা-হতাশা—জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিশে রয়েছে। একসময় তিনি ছিলেন মঞ্চের জনপ্রিয় ও সম্মানিত অভিনেতা। অভিনয়ই ছিল তাঁর জীবন, তাঁর পরিচয় এবং তাঁর গৌরব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই খ্যাতি ম্লান হয়েছে; তিনি ক্রমে নিঃসঙ্গ, অবহেলিত এবং স্মৃতিনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অতীতের উজ্জ্বল দিন এবং বর্তমানের নির্জন বাস্তবতার এই তীব্র বৈপরীত্যই জীবনের ‘নানা রঙ’-এর পরিচয় বহন করে।
নাটকে কেবল একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবন নয়, শিল্পীর মানসিক জগৎও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। শিল্পীর জীবনে যেমন করতালি আছে, তেমনি আছে বিস্মৃতিও; যেমন সাফল্যের আলো আছে, তেমনি বার্ধক্যের অন্ধকারও আছে। কিন্তু এই সমস্ত সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন সত্ত্বেও প্রকৃত শিল্পীর শিল্পসাধনা কখনও শেষ হয় না। রজনীকান্তের চরিত্র সেই চিরন্তন শিল্পীসত্তারই প্রতীক।
❖ আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুন
আপনার প্রয়োজনীয় সাজেশন
- ✅ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আপনার রেজাল্ট
- ✅ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ সহযোগিতা
- ✅ বিনামূল্যে অনলাইন মক টেস্টের সুবিধা
- ✅ Watermark-মুক্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন PDF
- ✅ সিলেবাস ও বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রস্তুত
এছাড়া নাটকের বিভিন্ন সংলাপ ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে অতীত ও বর্তমানের নানা রঙ, নানা অনুভূতি এবং নানা অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। ফলে নাটকের নাম কেবল একটি কাব্যিক অভিব্যক্তি নয়; এটি নাটকের বিষয়বস্তু, চরিত্র, জীবনদর্শন এবং অন্তর্নিহিত মানবিক তাৎপর্যকে সমগ্রভাবে ধারণ করেছে।
এই সব দিক বিচার করলে বলা যায়, ‘নানা রঙের দিন’ নামটি নাটকের কাহিনি, চরিত্রচিত্রণ, আবহ এবং মূল ভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই নাটকটির নামকরণ অত্যন্ত সার্থক ও শিল্পসম্মত।
৩। ‘নানা রঙের দিন’ নাটক অবলম্বনে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি একসময়ের খ্যাতিমান নাট্যাভিনেতা। তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে নাট্যকার একজন প্রকৃত শিল্পীর গৌরব, আত্মসম্মান, শিল্পনিষ্ঠা এবং জীবনের উত্থান-পতনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।
রজনীকান্ত সর্বাগ্রে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী। অভিনয় তাঁর কাছে শুধু জীবিকা নয়, জীবনসাধনা। নাট্যমঞ্চের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে একজন প্রকৃত শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে। অতীতের গৌরবময় দিনগুলির স্মৃতি তিনি গভীর আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন, কারণ সেই স্মৃতির মধ্যেই তাঁর শিল্পীজীবনের সার্থকতা নিহিত।
তিনি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি। সময়ের পরিবর্তনে জনপ্রিয়তা কমে গেলেও বা জীবনে অবহেলা এলেও তিনি কখনও নিজের সম্মান বিসর্জন দেন না। খ্যাতি হারানোর বেদনা তাঁকে কষ্ট দিলেও তিনি করুণার পাত্র হতে চান না। এই আত্মসম্মান তাঁর চরিত্রকে মহৎ করে তুলেছে।
রজনীকান্তের চরিত্রে স্মৃতিমেদুরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অতীতের অভিনয়, দর্শকদের করতালি, সহশিল্পীদের কথা তাঁর মনে বারবার ফিরে আসে। কিন্তু তিনি অতীতকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান না; বরং সেই স্মৃতির মধ্য দিয়েই বর্তমানের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেন।
তাঁর আর-একটি উল্লেখযোগ্য গুণ মানবিকতা। প্রম্পটার কালীনাথ সেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্যের নয়, বরং আন্তরিক সহকর্মীর। এই আচরণ তাঁর উদার মন ও বিনয়ের পরিচয় বহন করে।
নাটকের শেষে রজনীকান্ত উপলব্ধি করেন, মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, সম্মান-অবহেলা, সাফল্য-ব্যর্থতা—সবই জীবনের স্বাভাবিক রূপ। এই উপলব্ধিই তাঁকে একজন পরিণত জীবনদর্শী শিল্পীতে পরিণত করেছে।
অতএব, শিল্পপ্রেম, আত্মমর্যাদা, মানবিকতা, স্মৃতিমেদুরতা এবং গভীর জীবনবোধের সমন্বয়ে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
৪। “জীবনে ভোর নেই, সকাল নেই, দুপুর নেই, সন্ধেও ফুরিয়েছে এখন শুধু মাঝরাত্তিরের অপেক্ষা”— এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বক্তার যে মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে, তা আলোচনা করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে এই উক্তির বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, শিল্পীজীবনের উত্থান-পতন এবং বর্তমানের নিঃসঙ্গ বাস্তবতার উপলব্ধি থেকেই তিনি এই কথাগুলি বলেছেন। বক্তব্যটির মধ্যে তাঁর গভীর জীবনবোধ, হতাশা এবং আত্মসমীক্ষার পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে।
এখানে ‘ভোর’, ‘সকাল’, ‘দুপুর’, ‘সন্ধ্যা’ ও ‘মাঝরাত’ মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতীক। ‘ভোর’ ও ‘সকাল’ বোঝায় শৈশব ও যৌবনের সূচনা, ‘দুপুর’ কর্মময় জীবনের সাফল্য ও পূর্ণতা, ‘সন্ধ্যা’ বার্ধক্যের সূচনা এবং ‘মাঝরাত‘ মৃত্যুর প্রতীক। রজনীকান্ত মনে করেন, তাঁর জীবনের সমস্ত উজ্জ্বল সময় ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে। অভিনয়জীবনের খ্যাতি, দর্শকের করতালি, সাফল্য ও গৌরব আজ কেবল স্মৃতি। বর্তমানে তাঁর জীবনে নতুন করে কিছু পাওয়ার আশা নেই; তাই তিনি অনুভব করেন, এখন কেবল মৃত্যুর প্রতীক্ষাই অবশিষ্ট।
তবে এই বক্তব্যে শুধু হতাশা নয়, গভীর জীবন-উপলব্ধিও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জীবনের চরম সত্যকে মেনে নিয়েছেন। মানুষের জীবনে উত্থান যেমন আছে, তেমনি পতনও আছে; সাফল্যের পর একদিন অবসান আসবেই। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছেন বলেই তাঁর কথায় কোনো অভিযোগের চেয়ে আত্মসমর্পণের সুরই বেশি ধ্বনিত হয়েছে।
অতএব, উদ্ধৃত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অতীতস্মৃতিমেদুর, বাস্তববাদী, আত্মবিশ্লেষণী এবং মৃত্যু-সচেতন মানসিকতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। এই সংলাপ তাঁর চরিত্রকে আরও গভীর ও মানবিক করে তুলেছে।
৫। “থিয়েটারের দেয়ালে দেয়ালে অঙ্গারের গভীর কালো অক্ষরে লেখা, আমার জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর…”— উল্লিখিত সময়কাল অঙ্গারের গভীর কালো অক্ষরে কেন লেখা বলে মনে হয় বক্তার? বিষয়টি বিশদে ব্যাখ্যা করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে এই উক্তির বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের সম্পর্ক ছিল। এই দীর্ঘ সময় কেবল চাকরি বা অভিনয়ের ইতিহাস নয়; এটি তাঁর সমগ্র জীবন, সাধনা, সাফল্য, সংগ্রাম, আনন্দ এবং বেদনার ইতিহাস। তাই তিনি অনুভব করেন, থিয়েটারের প্রতিটি দেওয়ালে যেন তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ অধ্যায় “অঙ্গারের গভীর কালো অক্ষরে” লেখা রয়েছে।
এখানে “অঙ্গারের গভীর কালো অক্ষর” একটি শক্তিশালী রূপক। অঙ্গার যেমন আগুনের দহনশেষ স্মৃতি বহন করে, তেমনি রজনীকান্তের জীবনের পঁয়তাল্লিশ বছরও অসংখ্য ত্যাগ, পরিশ্রম, অপমান, সাফল্য এবং আত্মনিবেদনের সাক্ষী। থিয়েটারের জন্য তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন। অভিনয়ের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন জীবনের অর্থ, দর্শকের ভালোবাসা এবং শিল্পীর আত্মতৃপ্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই গৌরব ম্লান হয়েছে; করতালির জায়গায় এসেছে নিঃসঙ্গতা। তাই তাঁর অতীতস্মৃতি আজ যেমন গৌরবের, তেমনি বেদনায়ও আচ্ছন্ন।
HS Class 12
সেমিস্টার প্রস্তুতি
WhatsApp গ্রুপ
এই উক্তির মাধ্যমে রজনীকান্ত বোঝাতে চান, থিয়েটারের প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে তাঁর জীবনের স্মৃতি মিশে আছে। সেই স্মৃতি কখনও আনন্দের, কখনও যন্ত্রণার; কিন্তু কোনোটিই মুছে যাওয়ার নয়। তাই তাঁর জীবন যেন থিয়েটারের দেওয়ালে দগ্ধ অক্ষরের মতো স্থায়ী হয়ে রয়েছে।
অতএব, “অঙ্গারের গভীর কালো অক্ষরে” কথাটির মাধ্যমে রজনীকান্তের শিল্পসাধনার দীর্ঘ ইতিহাস, আত্মত্যাগ, বর্তমানের নিঃসঙ্গতা এবং থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য আত্মিক সম্পর্ক গভীর ব্যঞ্জনায় প্রকাশিত হয়েছে।
৬। “জানো, কালীনাথ, একটা মেয়ে।”— এই মেয়েটির বর্ণনা যেভাবে বক্তা কালীনাথকে বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। রজনীর জীবনে এই মেয়েটির প্রভাব আলোচনা করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে কালীনাথকে এক মেয়ের কথা বলেন। মেয়েটি ছিল সুন্দরী, প্রাণবন্ত, সংবেদনশীল এবং নাটকের একনিষ্ঠ অনুরাগী। সে রজনীকান্তের অভিনয়ের গভীর ভক্ত ছিল। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং শিল্পীসত্তায় মুগ্ধ হয়ে সে রজনীকান্তের প্রতি আন্তরিক আকর্ষণ অনুভব করেছিল। কিন্তু সেই আকর্ষণ কোনো সাময়িক মোহ ছিল না; বরং একজন শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল।
রজনীকান্তের জীবনে এই মেয়েটির উপস্থিতি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অভিনয়জীবনের ব্যস্ততা, সাফল্য ও সংগ্রামের মধ্যেও এই মেয়েটির আন্তরিক ভালোবাসা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তার স্নেহ, শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা রজনীকান্তকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল এবং শিল্পীজীবনের মূল্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল। তবে রজনীকান্ত ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে শিল্পকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে সেই সম্পর্ক পূর্ণতা লাভ করেনি, কিন্তু স্মৃতির ভাঁজে তা চিরস্থায়ী হয়ে রয়ে যায়।
বহু বছর পরেও রজনীকান্ত যখন কালীনাথের কাছে সেই মেয়েটির কথা স্মরণ করেন, তখন বোঝা যায় ঘটনাটি তাঁর হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে গেছে। জীবনের নানা সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্যেও এই স্মৃতি তাঁর কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। এর মাধ্যমে নাট্যকার দেখিয়েছেন, একজন শিল্পীর জীবনে দর্শকের আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কতখানি মূল্যবান।
নাটকের সেই মেয়েটি কেবল একটি চরিত্র নয়; সে রজনীকান্তের শিল্পীজীবনের এক উজ্জ্বল স্মৃতি এবং তাঁর মানবিক অনুভূতির এক মর্মস্পর্শী প্রতীক।
৭। “সেই রাত্রেই জীবনে প্রথম মোক্ষম বুঝলুম যে, যারা বলে ‘নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প’ তারা সব গাধা”— বক্তা কে? তিনি কখন এবং কেন এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি তাঁর দীর্ঘ নাট্যজীবনের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে গিয়ে প্রম্পটার কালীনাথের কাছে এই মন্তব্য করেন।
রজনীকান্তের জীবনের এক সময়ে তিনি মনে করতেন, নাট্যাভিনয় একটি মহৎ ও পবিত্র শিল্প, যেখানে শিল্পীর নিষ্ঠা, সাধনা এবং প্রতিভাই সর্বাধিক মূল্যবান। কিন্তু বাস্তব জীবনের এক নির্মম অভিজ্ঞতা তাঁর সেই বিশ্বাসকে নাড়া দেয়। এক বিশেষ রাতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, থিয়েটারের জগৎ কেবল শিল্পসাধনার ক্ষেত্র নয়; এখানে স্বার্থ, অর্থ, প্রতিযোগিতা, অবহেলা এবং নির্মম বাস্তবতাও সমানভাবে উপস্থিত। একজন শিল্পী তাঁর জীবন, যৌবন ও প্রতিভা থিয়েটারের জন্য উৎসর্গ করলেও সব সময় তার যথার্থ মূল্যায়ন হয় না। মানুষের স্বার্থের কাছে শিল্পের আদর্শ অনেক সময় ম্লান হয়ে যায়।
এই তিক্ত অভিজ্ঞতার অভিঘাতেই রজনীকান্ত ব্যঙ্গের সুরে বলেন— “যারা বলে ‘নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প’ তারা সব গাধা।” তাঁর এই উক্তির মধ্যে নাট্যকলার প্রতি অবজ্ঞা নেই; বরং রয়েছে নাট্যজগতের ভণ্ডামি ও বাস্তবতার বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ এবং অভিমান। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্পকে পবিত্র বললেই শিল্পীর জীবন পবিত্র বা নিরাপদ হয়ে ওঠে না। প্রকৃত শিল্পীকে প্রায়ই অবহেলা, অপমান এবং নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা বহন করতে হয়।
এই সংলাপের মাধ্যমে রজনীকান্তের জীবন-অভিজ্ঞতা, ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস, শিল্পীসত্তার বেদনা এবং থিয়েটারের কঠিন বাস্তবতা অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
৮। “অভিনেতা মানে একটা চাকর, একটা জোকার, একটা ক্লাউন। লোকেরা সারাদিন খেটেখুটে এলে তাদের আনন্দ দেওয়াই হল নাটক-ওয়ালাদের একমাত্র কর্তব্য।”— বক্তার কথার তাৎপর্য আলোচনা করো।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে এই উক্তির বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন আত্মসমালোচনা আছে, তেমনি রয়েছে একজন প্রকৃত নাট্যশিল্পীর জীবনদর্শন।
রজনীকান্তের মতে, একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ বা মানসিক যন্ত্রণা দর্শকের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। দর্শক সারাদিনের ক্লান্তি, দুঃখ ও কর্মব্যস্ততা শেষে নাট্যশালায় আসে কিছুক্ষণ আনন্দ, স্বস্তি এবং মানসিক মুক্তি লাভের জন্য। তাই অভিনেতার প্রধান কর্তব্য হলো নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আড়াল করে দর্শকদের আনন্দ দেওয়া। এই কারণেই তিনি অভিনেতাকে কখনও ‘চাকর’, কখনও ‘জোকার’, আবার কখনও ‘ক্লাউন’ বলে অভিহিত করেছেন। এখানে শব্দগুলি অবমাননাসূচক নয়; বরং শিল্পীর আত্মত্যাগ এবং দর্শকের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার প্রতীক।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নাট্যকার দেখিয়েছেন, একজন শিল্পীর জীবন সহজ নয়। মঞ্চে ওঠার পর তাঁকে নিজের সমস্ত কষ্ট ভুলে চরিত্রে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করতে হয়। দর্শকের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁর প্রকৃত সাফল্য। তাই শিল্পীর ব্যক্তিগত বেদনা অনেক সময় অন্তরালেই থেকে যায়, আর দর্শকের সামনে প্রকাশ পায় কেবল তাঁর অভিনয়।
এই সংলাপের মাধ্যমে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নাট্যশিল্পীর প্রকৃত কর্তব্য, আত্মত্যাগ, পেশাগত দায়িত্ব এবং শিল্পের প্রতি নিঃস্বার্থ নিষ্ঠার কথা গভীর ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। একজন সত্যিকারের অভিনেতা নিজের জীবনযন্ত্রণা গোপন রেখে অন্যের জীবনে আনন্দের আলো পৌঁছে দেন—এই জীবনদর্শনই উক্তিটির মূল তাৎপর্য।
৯। “প্রাক্তন অভিনেতা রজনী চাটুজ্জের প্রতিভার অপমৃত্যুর করুণ সংবাদ।”— কে বলেছেন? এই অপমৃত্যু কীভাবে ঘটে বলে বক্তা মনে করেন?
যে বলেছেন : উদ্ধৃত কথাটি বলেছেন রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি নিজের শিল্পীজীবনের পরিণতি সম্পর্কে গভীর বেদনা ও আত্মসমালোচনার সুরে এই মন্তব্য করেছেন।
এই অপমৃত্যু যেভাবে ঘটে বলে বক্তা মনে করেন : রজনীকান্তের মতে, একজন শিল্পীর প্রকৃত মৃত্যু শারীরিক মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে, অভিনয়ের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হলে এবং সমাজ তাঁকে বিস্মৃত হলে তাঁর প্রতিভারই ‘অপমৃত্যু’ ঘটে। একসময় তিনি ছিলেন নাট্যমঞ্চের জনপ্রিয় অভিনেতা। দর্শকের ভালোবাসা, করতালি এবং সম্মান ছিল তাঁর জীবনের বড়ো প্রাপ্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মঞ্চ থেকে দূরে সরে যান। নতুন প্রজন্মের আগমনে এবং মানুষের পরিবর্তিত রুচির ফলে তাঁর অসাধারণ অভিনয়প্রতিভা আর প্রকাশের সুযোগ পায় না।
রজনীকান্ত মনে করেন, শিল্পীর প্রতিভা যদি জীবিত অবস্থায় অবহেলিত হয়, তবে সেটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং করুণ অপমৃত্যু। কারণ শিল্পীর জীবন তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে; তিনি বেঁচে থাকলেও তাঁর শিল্প যেন মৃত হয়ে যায়। তাই তিনি নিজের অবস্থাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে “প্রাক্তন অভিনেতা রজনী চাটুজ্জের প্রতিভার অপমৃত্যুর করুণ সংবাদ” বলে উল্লেখ করেছেন। এই উক্তির মাধ্যমে নাট্যকার শিল্পীর অবমূল্যায়নের বেদনা এবং শিল্পের যথার্থ মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন।
১০। “শিল্পকে যে মানুষ ভালোবেসেছে—তার বার্ধক্য নেই, কালীনাথ।”— ‘নানা রঙের দিন’ নাটক অবলম্বনে মন্তব্যটির তাৎপর্য লেখো।
মন্তব্যটির তাৎপর্য : অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে উক্তিটির বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি তাঁর দীর্ঘ নাট্যজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রম্পটার কালীনাথকে এই কথাটি বলেন। উক্তিটির মধ্য দিয়ে শিল্প, শিল্পী এবং শিল্পসাধনা সম্পর্কে তাঁর গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ পেয়েছে।
রজনীকান্তের মতে, মানুষের শরীর একদিন বার্ধক্যে উপনীত হয়, কিন্তু প্রকৃত শিল্পীর শিল্পীসত্তা কখনও বুড়িয়ে যায় না। যে মানুষ সত্যিকারের ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিল্পচর্চা করে, তার মন চিরকাল সজীব, সৃষ্টিশীল এবং কর্মমুখর থাকে। শিল্প তাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়, জীবনের প্রতি আশাবাদী করে তোলে।
রজনীকান্ত নিজেই এর উজ্জ্বল উদাহরণ। বয়সের ভারে তিনি ক্লান্ত, খ্যাতির দিনও শেষ হয়েছে, কিন্তু নাটকের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। আজও তিনি অভিনয়ের স্মৃতি নিয়ে বাঁচেন, নাটক নিয়েই ভাবেন এবং শিল্পকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে মনে করেন। তাই তিনি বিশ্বাস করেন, প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় বয়সে নয়, তার শিল্পপ্রেমে।
এই উক্তির মধ্যে নাট্যকার শিল্পের চিরন্তন শক্তি ও অমরত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্থ, যশ বা জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী হলেও শিল্পের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে অন্তরে চিরযুবক করে রাখে। শিল্পীর শরীর ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃজনশীলতা, অনুভূতি ও শিল্পসাধনার আগুন কখনও নিভে যায় না।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে রজনীকান্ত প্রমাণ করেছেন যে, শিল্প মানুষের জীবনকে অনন্ত প্রাণশক্তিতে ভরিয়ে দেয়। তাই প্রকৃত শিল্পীর জীবনে বার্ধক্য আসে শরীরে, শিল্পীসত্তায় নয়। এই উপলব্ধিই উক্তিটির মূল তাৎপর্য।
১১। “এই তো জীবনের সত্য, কালীনাথ।”— ‘জীবনের সত্য’ বলতে বক্তা কী বুঝিয়েছেন? বক্তা জীবনের এই সত্যে কীভাবে উপনীত হয়েছিলেন?
‘জীবনের সত্য’ বলতে বক্তা যা বুঝিয়েছেন : অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। এখানে ‘জীবনের সত্য’ বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন—মানুষের জীবনে খ্যাতি, যশ, সাফল্য, করতালি ও জনপ্রিয়তা চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। একদিন যে শিল্পী দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত হন, অন্যদিন তিনিই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে পারেন। কিন্তু শিল্পের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসাই মানুষের জীবনের স্থায়ী সম্পদ।
বক্তা জীবনের এই সত্যে যেভাবে উপনীত হয়েছিলেন : রজনীকান্ত দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন। একসময় তিনি ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা; দর্শকের করতালি, সম্মান এবং জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৌরব ম্লান হয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের আগমনে তিনি ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে দূরে সরে পড়েন। জীবনের শেষ পর্বে এসে তাঁকে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা এবং বিস্মৃতির যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, জীবনের সব প্রাপ্তিই ক্ষণস্থায়ী। অর্থ, যশ কিংবা খ্যাতি কোনো কিছুই চিরকাল থাকে না। কেবল শিল্পের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা এবং শিল্পসাধনাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই তিনি কোনো তিক্ততা নয়, বরং গভীর জীবনবোধ থেকে কালীনাথকে বলেন— “এই তো জীবনের সত্য।”
এই উপলব্ধির মধ্যে রয়েছে এক পরিণত শিল্পীর আত্মসমীক্ষা ও বাস্তববোধ। তিনি জীবনের উত্থান-পতনকে স্বীকার করে নিয়েছেন এবং বুঝেছেন যে পরিবর্তনই জীবনের নিয়ম। এই কারণেই তাঁর বক্তব্য নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
১২। “আমি রোজ লুকিয়ে গ্রিনরুমে ঘুমোই চাটুজ্জেমশাই—”— কোন্ নাটকে, কার উক্তি? কার প্রতি এই উক্তি? তিনি কেন গ্রিনরুমে ঘুমোন?
যে নাটকে, যার উক্তি : উদ্ধৃত সংলাপটি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের। কথাটি বলেছেন কালীনাথ।
যার প্রতি এই উক্তি : উক্তিটি তিনি প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় (চাটুজ্জেমশাই)-এর উদ্দেশে বলেছেন।
তার গ্রিনরুমে ঘুমোনোর কারণ : কালীনাথ থিয়েটারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একজন মানুষ। তাঁর জীবনের সঙ্গে নাট্যমঞ্চের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে থিয়েটারই তাঁর কাছে দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে উঠেছে। আর্থিক অসচ্ছলতা ও জীবনের নানা প্রতিকূলতার কারণে তাঁর স্থায়ী ও স্বচ্ছন্দ বাসস্থানের অভাব রয়েছে। তাই তিনি প্রতিদিন গোপনে থিয়েটারের গ্রিনরুমে রাত কাটান।
এছাড়া তাঁর এই অভ্যাসের মধ্যে থিয়েটারের প্রতি গভীর টানও প্রকাশ পায়। গ্রিনরুমে থাকলে তিনি নাট্যমঞ্চের কাছাকাছি থাকতে পারেন এবং নিজের প্রিয় জগতের সঙ্গেই জীবন কাটানোর এক মানসিক শান্তি অনুভব করেন। থিয়েটারের পরিবেশ, শিল্পীদের স্মৃতি এবং অভিনয়ের আবহ তাঁকে আকর্ষণ করে। তাই বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি ভালোবাসাও তাঁকে গ্রিনরুমে আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

এই সংলাপের মাধ্যমে নাট্যকার থিয়েটারের অন্তরালের কর্মীদের দারিদ্র্য, আত্মত্যাগ এবং নাটকের প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসার এক মানবিক চিত্র তুলে ধরেছেন। কালীনাথের জীবনসংগ্রাম এবং শিল্পের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
| আরও পড়ুন | প্রয়োজনে |
|---|---|
| লালন শাহ ফকিরের গান কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Lalan Shah Fokirer Gaan Kobitar Question Answer | Click here |
| ভাবসম্মিলন কবিতার প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Vaabsommilon Kobitar Question Answer | Click here |
| তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Telenapota Abishkar Golper Question Answer | Click here |
| ছুটি গল্পের প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 11 বাংলা দ্বিতীয় সেমিস্টার | Chuti Golper Question Answer | Click here |
Our Latest Products
উচ্চমাধ্যমিক
All Subject দেখুন →
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম বাংলা সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক English সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ৪র্থ সেম ইতিহাস সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক দর্শন সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন
উচ্চমাধ্যমিক সংস্কৃত সাজেশন
একাদশ শ্রেণি
All Subject দেখুন →
একাদশ শ্রেণি বাংলা সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন
একাদশ শ্রেণি দর্শন সাজেশন
একাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন
একাদশ শ্রেণি ভূগোল সাজেশন
একাদশ শ্রেণি শিক্ষাবিজ্ঞান সাজেশন